📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 অনেক বিষয়ে কেবল তাদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখতেন

📄 অনেক বিষয়ে কেবল তাদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রাখতেন


আবু সাইদ খুদরি (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুরোগ চলাকালীন একটি খুতবায় বললেন:

إِنَّ اللَّهَ خَيَّرَ عَبْدًا بَيْنَ الدُّنْيَا وَبَيْنَ مَا عِنْدَهُ فَاخْتَارَ مَا عِنْدَ اللَّهِ

'আল্লাহ তাআলা তাঁর এক বান্দাকে দুনিয়া ও আল্লাহর কাছে যা আছে, এতদুভয়ের কোনো একটি গ্রহণ করার সুযোগ দান করলেন। তখন তিনি আল্লাহর কাছে যা আছে, তা-ই গ্রহণ করলেন।'

এ কথা শুনে আবু বকর (রা) অঝোর ধারায় কাঁদতে শুরু করলেন। অতঃপর বললেন, "আপনার ওপর আমাদের পিতামাতা কুরবান হোক!"

আমি মনে মনে বললাম, "এ বৃদ্ধ লোকটা কাঁদছেন কেন? আল্লাহ তাআলা তাঁর এক বান্দাকে দুনিয়া ও আল্লাহর কাছে যা আছে, এতদুভয়ের কোনো একটি গ্রহণ করার ইচ্ছাধিকার দান করলেন আর তিনি আল্লাহর কাছে যা আছে, তা গ্রহণ করলেন (এতে কাঁদার কী আছে?)"

আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই ছিলেন সেই বান্দা। বস্তুত আবু বকর (রা) ছিলেন আমাদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

يَا أَبَا بَكْرٍ لَا تَبْكِ، إِنَّ أَمَنَّ النَّاسِ عَلَيَّ فِي صُحْبَتِهِ وَمَالِهِ أَبُو بَكْرٍ، وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا خَلِيلًا مِنْ أُمَّتِي لَا تَخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ، وَلَكِنْ أُخُوَّةُ الإِسْلَامِ وَمَوَدَّتُهُ، لَا يَبْقَيَنَّ فِي المَسْجِدِ بَابُ إِلَّا سُدَّ، إِلَّا بَابُ أَبِي بَكْرٍ

"হে আবু বকর, তুমি কেঁদো না। নিজের সাহচর্য ও সম্পদ দিয়ে যে আমাকে সবচাইতে বেশি ইহসান করেছে, সে হচ্ছে আবু বকর (রা)। আমি যদি আমার উম্মতের মধ্য থেকে কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম, তবে আবু বকরকে (রা) গ্রহণ করতাম। তবে তাঁর সাথে যে ইসলামি ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য রয়েছে, সেটাই যথেষ্ট। আবু বকরের (রা) দরোজা ব্যতীত মসজিদের কোনো দরোজা অবশিষ্ট থাকবে না। সব বন্ধ করে দেওয়া হবে।"'

এই হাদিসে আবু বকর (রা)-এর বিশেষ ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে।

উমর বিন শাব্বাহ (রহ) 'আখবারুল মাদিনা' গ্রন্থে লেখেন, 'আবু বকর (রা)-এর সেই ঘর, যার দরোজা খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তা মসজিদের সাথে লাগোয়া ছিল। এই ঘরটি আবু বকর (রা)-এর মালিকানাতেই ছিল, তবে একদিন তাঁর নিকট আসা একটি প্রতিনিধিদলকে কিছু দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে তিনি ঘরটি বিক্রি করে দিলেন। উম্মুল মুমিনিন হাফসা (রা) চার হাজার দিরহামের বিনিময়ে ঘরটি কিনে নিলেন। তারপর থেকে ঘরটি হাফসা (রা)-এর হাতে ছিল। পরবর্তী সময়ে উসমান (রা)-এর খিলাফতকালে মসজিদে নববি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলে কর্তৃপক্ষ তাঁর থেকে ঘরটি নিতে চাইলেন। তিনি দিতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং বললেন, "তখন আমি মসজিদে কীভাবে যাব?" তাঁকে বলা হলো, "আমরা আপনাকে এর চেয়ে প্রশস্ত ঘর দেবো এবং সেটাতে এর মতো মসজিদে যাওয়ার রাস্তা করে দেবো।" তখন তিনি সন্তুষ্টচিত্তে তাতে সম্মত হলেন।'

হাদিস থেকে যা বোঝা যায়:
আবু বকর (রা) বিশেষ ফজিলতের অধিকারী ছিলেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খলিল বা অন্তরঙ্গ বন্ধু হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন।
উপকারকারীর শুকরিয়া জ্ঞাপন করা ও তার প্রশংসা করা উচিত।
মসজিদের বিশেষ দরোজাসমূহ ছাড়া বিভিন্ন মানুষের জন্য আলাদা ছোট ছোট দরোজা রাখা যাবে না। তবে বিশেষ প্রয়োজনে রাখা যেতে পারে।

টিকাঃ
৫৭১. আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই কথায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাতের ইঙ্গিত আছে। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন অসুস্থ ছিলেন। (ফাতহুল বারি: ১২/৭)
৫৭২. সহিহুল বুখারি: ৩৯০৪, সহিহু মুসলিম: ২৩৮২।
৫৭৩. ফাতহুল বারি: ৭/১৪।
৫৭৪. ফাতহুল বারি: ৭/১৪, ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৫/১৫২।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাদের এমন অনেক আচরণ সহ্য করতেন, যা অন্যদের ক্ষেত্রে করতেন না

📄 তাদের এমন অনেক আচরণ সহ্য করতেন, যা অন্যদের ক্ষেত্রে করতেন না


উমর বিন খাত্তাব (রা) বলেন, 'আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল (রহ) মারা গেলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তার জানাজা পড়ানোর জন্য ডাকা হলো।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাজা পড়ানোর উদ্দেশ্যে দাঁড়ালে আমি দ্রুত তাঁর নিকট গিয়ে বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি ইবনে উবাইয়ের (রহ) জানাজা পড়বেন, অথচ সে অমুক দিন এমন এমন কথা বলেছে?"-এভাবে আমি এক এক করে তার (ধৃষ্টতাপূর্ণ) কথাগুলো তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিতে লাগলাম।'

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হাসলেন এবং বললেন, "আমার নিকট থেকে সরে যাও হে উমর!"

তারপরেও যখন আমি বারবার বলতে লাগলাম, তখন তিনি বললেন:

إِنِّي خُيَّرْتُ فَاخْتَرْتُ، لَوْ أَعْلَمُ أَنِّي إِنْ زِدْتُ عَلَى السَّبْعِينَ يُغْفَرُ لَهُ لَزِدْتُ عَلَيْهَا

"আমাকে (জানাজা পড়া ও না পড়ার ব্যাপারে) স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। আমি জানাজা পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যদি আমি জানতে পারতাম যে, তার জন্য সত্তরবারের অধিক ক্ষমা চাইলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে, তবে আমি সত্তরবারের অধিক ক্ষমা চাইতাম।"

উমর (রা) বলেন, 'অতঃপর তিনি তার জানাজা পড়ে ফিরে গেলেন।'

তারপর কিছু সময় অতিবাহিত হতে না হতেই সুরা বারাআতের (তাওবার) দুটি আয়াত নাজিল হলো:

وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَاسِقُونَ

"আর তাদের মধ্য থেকে কারও মৃত্যু হলে তার ওপর কখনো নামাজ পড়বেন না এবং তার কবরে দাঁড়াবেন না। তারা তো আল্লাহর প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে এবং রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিও। বস্তুত তারা নাফরমান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে।” (সুরা আত-তাওবা, ৯: ৮৪)'

উমর (রা) বলেন, 'সেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করার কারণে আমি নিজের প্রতি খুব আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলাম। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই ভালো জানেন।'

অপর এক বর্ণনায় এসেছে, 'উমর বিন খাত্তাব (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাপড় ধরে বললেন, "আপনি তার জানাজা পড়তে যাচ্ছেন, অথচ সে একজন মুনাফিক আর আল্লাহ তাআলা আপনাকে মুনাফিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে নিষেধ করেছেন!?"'

এখানে দেখুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমর (রা)-এর কাপড় টেনে ধরা এবং লোকসমাগমের মাঝে তাঁর সাথে এমনভাবে কথা বলাকে মেনে নিয়েছেন। এমনকি এতদসত্ত্বেও তার সাথে মুচকি হেসে কথা বলেছেন।

ফায়দা : খাত্তাবি (রহ) বলেন, 'দ্বীনের সাথে সামান্য পরিমাণ সম্পর্ক রাখা লোকদের প্রতিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যধিক ভালোবাসা পোষণ করতেন। তাই আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের (রহ) ব্যাপারেও তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তা ছাড়া এর মাধ্যমে তিনি তার নেককার ছেলে আব্দুল্লাহর (রা) মন জয় করতে চেয়েছেন এবং তার কওম খাজরাজের লোকদের মন আকৃষ্ট করতে চেয়েছেন।'

যদি তিনি তার সন্তান আব্দুল্লাহর (রা) আবেদনে সাড়া না দিতেন এবং স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আসার পূর্বে তার জানাজা পড়া থেকে বিরত থাকতেন, তখন তার সন্তান খুব কষ্ট পেতেন এবং তার গোত্রের লোকেরাও খুব লজ্জা পেত। এসব বিষয় বিবেচনা করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাজনৈতিকভাবে উত্তম বিষয়টি অবলম্বন করলেন। পরে যখন স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আসলো, তখন থেকে তিনি এ থেকে বিরত থাকেন।'

হাদিস থেকে বোঝা যায়:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উন্নত চরিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। এই মুনাফিক তাঁকে এত কষ্ট দিয়েছে, তা জানা সত্ত্বেও তিনি উত্তম আচরণের মাধ্যমে তার প্রতিদান দিয়েছেন। তাকে নিজের কাপড় দিয়ে কাফন পরিয়েছেন। তার জানাজা পড়েছেন এবং তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। এ জন্যই তো আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, 'আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।'

কেউ কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তার জানাজা পড়া, তার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করা এবং দোয়ার উদ্দেশ্যে তার কবরের পাশে দাঁড়ানো হারাম।

টিকাঃ
৫৭৫. সহিহুল বুখারি: ১৩৬৬, সহিহু মুসলিম: ২৪০০।
৫৭৬. ফাতহুল বারি: ৮/৩৩৫।
৫৭৭. ফাতহুল বারি: ৮/৩৩৬।
৫৭৮. সুরা আল-কলাম, ৬৮:৪।
৫৭৯. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৫/১৬৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বিশেষ বিষয়সমূহে ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে তাদের ওপর বেশি ভরসা করতেন

📄 বিশেষ বিষয়সমূহে ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে তাদের ওপর বেশি ভরসা করতেন


যেমন, তাঁর ব্যয়-ব্যবস্থাপনার কাজের জন্য ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইমান আনয়নকারী সাহাবি বিলাল বিন রাবাহ (রা)-এর ওপর ভরসা করেছিলেন।

আব্দুল্লাহ বিন হাওজানি (রহ) বলেন, 'একদা হালব শহরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুয়াজ্জিন বিলাল (রা)-এর সাথে আমার দেখা হলো। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "হে বিলাল, আপনি আমাকে বলুন-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভরণপোষণের ব্যয় নির্বাহের ব্যবস্থা কীরূপ ছিল?" তিনি বললেন, "যখন থেকে আল্লাহ তাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিসেবে প্রেরণ করেন, তখন থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর কাজকর্মের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আমার ওপরই ন্যস্ত ছিল। যখনই তাঁর নিকট কোনো মুসলমান আসতেন এবং তিনি তাকে বস্ত্রহীন অবস্থায় দেখতেন, তখন আমাকে তার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিতেন। তখন আমি কর্জ নিয়ে তার জন্য চাদর খরিদ করে তাকে পরাতাম এবং তাকে খানা খাওয়াতাম।"

একদা জনৈক মুশরিক আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলল, "হে বিলাল, আমার কাছে অনেক ধন-দৌলত আছে। কাজেই তুমি আমি ছাড়া আর কারও থেকে ধার নিয়ো না।" এরপর থেকে আমি এরূপ করতে থাকলাম। একদিন আমি অজু করে যখন আজান দেওয়ার প্রস্তুত হচ্ছি, তখন আমি দেখতে পেলাম, সেই মুশরিক লোকটি একদল ব্যবসায়ীকে সাথে নিয়ে আমার দিকে আসছে। আমাকে দেখেই সে বলে উঠল, "হে হাবশি!” আমি বললাম, "কী বলবেন, বলুন।" তখন সে উত্তেজিত হয়ে আমাকে গালমন্দ করতে লাগল এবং বলল, "তোমার কি জানা আছে, মাসের আর কতদিন বাকি আছে?” আমি বললাম, "মাস তো প্রায় শেষ।” সে বলল, "তোমার মাস পূর্ণ হতে আর মাত্র চার দিন বাকি আছে। তারপর আমি তোমাকে কর্জের জন্য পাকড়াও করব। আমি তোমাকে এই জন্য ধার দিই না যে, তোমাকে আমি সম্মান করি কিংবা তোমার সর্দারকে (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে) শ্রদ্ধা করি। আমি তোমাকে আমার গোলাম বানানোর জন্য ধার দিয়েছি। আমি তোমাকে আগের মতো ছাগল চরানোর কাজে নিয়ে যাব।"

বিলাল (রা) বলেন, "তার এরূপ কথা শুনে আমি খুব মর্মাহত হলাম, যেমনটি এমন অবস্থায় অন্যান্য মানুষ মর্মাহত হয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশার সালাত আদায় শেষে যখন স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন, আমি তাঁর নিকট প্রবেশ করার জন্য অনুমতি চাইলাম। তিনি অনুমতি দিলেন। আমি তাঁর নিকট আরজ করলাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমার পিতামাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক! আমি যে মুশরিক ব্যক্তির নিকট হতে ধার নিতাম, সে আমাকে এরূপ এরূপ কথা বলেছে। এখন তো আপনার নিকট এমন কোনো সম্পদ নেই, যা দিয়ে আপনি আমার কর্জ পরিশোধ করতে পারেন। আমার কাছেও কিছু নেই। ওদিকে সে আমাকে বেইজ্জত করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। সুতরাং আপনি আমাকে অনুমতি দিন, যাতে আমি পালিয়ে গিয়ে এমন কোনো গ্রামে চলে যাই, যার অধিবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করেছে; আর ততদিন পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করি, যতদিন না আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য এ পরিমাণ মালের ব্যবস্থা করে দেন, যা দিয়ে আমি আমার কর্জ পরিশোধ করতে পারি।" এ কথা বলে আমি আমার ঘরে ফিরে আসলাম এবং আমার তরবারি, মোজা, জুতো ও ঢাল আমার শিয়রে রাখলাম (যাতে অতি ভোরে আমি চলে যেতে পারি)।'

যখন আমি অতি প্রত্যুষে পলায়ন করার জন্য প্রস্তুত হলাম, তখন হঠাৎ দেখতে পেলাম যে, এক ব্যক্তি দৌড়ে আমার কাছে এসে বলল, "হে বিলাল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে ডাকছেন।" তখন আমি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে দেখতে পেলাম যে, পিঠে মাল বোঝাই করা চারটি উট বসে আছে। এরপর আমি তাঁর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইলাম। তিনি বললেন, "সুসংবাদ গ্রহণ করো। তোমার কর্জ পরিশোধের জন্য আল্লাহ তাআলা এই মাল পাঠিয়ে দিয়েছেন।" আমি আল্লাহর প্রশংসা করলাম। অতঃপর তিনি বললেন, "তুমি কি দেখছ না, চারটি মাল-বোঝাই উট বসে আছে?" আমি বললাম, “হাঁ, দেখছি।” তিনি বললেন, "এ পশুসমূহ এবং এদের পিঠে যে মালামাল আছে, সবই তোমার। এতে কাপড় ও খাদ্যশস্য আছে, যা ফিদাকের বিশিষ্ট ধনী নেতা হাদিয়াস্বরূপ আমার জন্য পাঠিয়েছেন। সুতরাং তুমি এসব বুঝে নাও এবং তোমার যাবতীয় দেনা পরিশোধ করো।"

আমি তা-ই করলাম। উটগুলোর ওপর থেকে মালের বোঝা নামিয়ে সেগুলোকে বেঁধে রাখলাম। তারপর ফজরের আজান দেওয়ার জন্য মসজিদে গমন করলাম। নামাজ শেষ হওয়ার পর বাকি কবরস্থানের নিকট গিয়ে কানে আঙুল দিয়ে (বড় আওয়াজে) ঘোষণা করলাম, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কারও পাওনা থাকলে এখানে আসো।" তারপর আমি উক্ত মালগুলো বিক্রি করে এক এক করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সকল কর্জ পরিশোধ করে দিলাম। এমনকি জমিনের বুকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আর কোনো কর্জ রইল না। সব কর্জ পরিশোধ করার পর আমার নিকট দুই কি দেড় আওকিয়া অবশিষ্ট রইল।'

অতঃপর আমি মসজিদে গেলাম। এতক্ষণে দিনের অনেক প্রহর অতিবাহিত হয়ে গেল। মসজিদে গিয়ে দেখতে পেলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে বসে আছেন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম।'

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি যে সম্পদ পেয়েছ, তার কী করেছ?” আমি বললাম, “আল্লাহ তাআলা ওই সমস্ত দেনা পরিশোধ করে দিয়েছেন, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর ছিল। আর কোনো দেনা অবশিষ্ট নেই।"

তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "ওই মাল হতে কিছু কি অবশিষ্ট আছে?" আমি বললাম, “হাঁ।” তখন তিনি বললেন, "আমি চাই যে, তুমি অবশিষ্ট মাল হতেও আমাকে চিন্তামুক্ত করবে (অর্থাৎ অতিসত্বর তা বিতরণ করে দেবে)। যতক্ষণ না তুমি আমাকে তা হতে চিন্তামুক্ত করবে, ততক্ষণ আমি আমার স্বজনদের কাছে ফিরে যাব না।"

সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের নিকট কেউই আসলো না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশার সালাত আদায় শেষে আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, "অবশিষ্ট মালের কী করেছ?"

আমি বললাম, "তা আমার কাছেই আছে। তা গ্রহণের জন্য কেউ-ই আমার নিকট আসেনি।"

এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে রাত মসজিদেই কাটালেন। দ্বিতীয় দিন ইশার সালাত আদায় শেষে তিনি আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, "অবশিষ্ট মালের ব্যাপারে কী করেছ?” আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আল্লাহ তাআলা সেই মাল থেকে আপনাকে চিন্তামুক্ত করেছেন।" এ কথা শুনে তিনি “আল্লাহু আকবার" বললেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করলেন। কারণ, তিনি সেই মাল তাঁর হাতে থাকা অবস্থায় তাঁর মৃত্যু এসে যাওয়ার ভয় করছিলেন।'

এরপর তিনি ঘরে ফিরে গেলেন। আমি তাঁর পিছু পিছু সেখানে গেলাম। ঘরে যাওয়ার পর তিনি প্রত্যেক স্ত্রীকে আলাদাভাবে সালাম করলেন, তারপর সে রাতে যেখানে রাত্রিযাপন করার পালা ছিল, সেখানে গেলেন। এ-ই ছিল তাঁর ব্যয়-সম্পর্কিত বিস্তারিত বর্ণনা, যা তুমি আমার নিকট জানতে চেয়েছ।'

টিকাঃ
৫৮০. সুনানু আবি দাউদ: ৩০৫৫।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বিশেষ সাহাবিদের মধ্যে থেকে কাউকে দেখতে না পেলে তার খোঁজ করতেন

📄 বিশেষ সাহাবিদের মধ্যে থেকে কাউকে দেখতে না পেলে তার খোঁজ করতেন


আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'যখন এই আয়াত নাজিল হলো:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ

"মুমিনগণ, তোমরা নবির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কণ্ঠস্বরের ওপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উঁচু স্বরে কথা বলো, তাঁর সাথে সেরূপ উঁচু স্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তোমরা টেরও পাবে না।"

তখন সাবিত (রা) নিজের ঘরে বসে গেলেন এবং বলতে লাগলেন, "আমি জাহান্নামি।” এরপর থেকে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যাওয়া বন্ধ করে দিলেন।'

(তাকে দেখতে না পেয়ে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ বিন মুআজ (রা)-কে জিজ্ঞেস করলেন, "হে আবু আমর, সাবিতের (রা) কী হলো? তার কোনো অসুখ-বিসুখ হয়েছি কি?"

সাদ (রা) বললেন, "সে তো আমার প্রতিবেশী আর আমি কোনো অসুখ হয়েছে বলে জানি না।"

বর্ণনাকারী বলেন, 'অতঃপর সাদ (রা) তার কাছে গেলেন এবং তার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী বলেছেন, তা জানালেন। তখন সাবিত (রা) বললেন, “এই আয়াত নাজিল হয়েছে। আর তোমরা তো জানোই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে আমার কণ্ঠস্বরই সবচেয়ে বেশি উঁচু হয়ে যায়। সুতরাং আমি তো একজন জাহান্নামি।"

অতঃপর সাদ (রা) তা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে সাবিত (রা)-এর কথাটি বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "না, বরং সে জান্নাতি।"'

কুররা বিন ইয়াস (রা) থেকে বর্ণিত, 'এক ব্যক্তি তার ছেলেকে সাথে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আগমন করলেন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "তাকে কি ভালোবাসো?” তিনি বললেন, "আমি তাকে যে পরিমাণ ভালোবাসি, আল্লাহ তাআলা আপনাকে সেই পরিমাণ ভালোবাসুন।"

একদিন ছেলেটি মারা গেল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুপস্থিতি অনুভব করে তার ব্যাপারে খোঁজখবর নিলেন। অতঃপর ছেলেটির পিতাকে বললেন: مَا يَسُرُّكَ أَنْ لَا تَأْتِيَ بَابًا مِنْ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ إِلَّا وَجَدْتَهُ عِنْدَهُ يَسْعَى يَفْتَحُ لَكَ؟

"তুমি কি এতে খুশি হবে যে, তুমি জান্নাতের যে দরোজার পাশেই যাবে, সেখানেই তোমার সন্তানকে দৌড়ে গিয়ে তোমার জন্য দরোজা খুলে দিতে পাবে?”'

টিকাঃ
৫৮১. সুরা আল-হুজুরাত, ৪৯: ২।
৫৮২. সহিহুল বুখারি: ৩৬১৩, সহিহু মুসলিম: ১১৯।
৫৮৩. সুনানুন নাসায়ি: ১৮৭০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00