📄 নবিজি ﷺ-এর বিশেষ দুই সাহাবি আবু বকর ও উমর
আলি বিন আবু তালিব (রা) বলেন, 'আমি প্রায়শ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনতাম-
ذَهَبْتُ أَنَا وَأَبُو بَكْرٍ، وَعُمَرُ، وَدَخَلْتُ أَنَا وَأَبُو بَكْرٍ، وَعُمَرُ، وَخَرَجْتُ أَنَا وَأَبُو بَكْرٍ، وَعُمَرُ
"আমি, আবু বকর (রা) ও উমর (রা) গেলাম। আমি, আবু বকর (রা) ও উমর (রা) প্রবেশ করলাম। আমি, আবু বকর (রা) ও উমর (রা) বের হলাম।"'
টিকাঃ
৫৫৭. সহিহুল বুখারি: ৩৬৮৫, সহিহু মুসলিম: ২৩৮৯।
📄 মানুষের সামনে তাদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ করতেন
আমর বিন আস (রা) থেকে বর্ণিত আছে, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে গাজওয়ায়ে জাতুস সালাসিল বা শিকলের যুদ্ধের সেনাপতির দায়িত্ব দিয়ে পাঠালেন। (তিনি বলেন) তখন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করলাম, "আপনার প্রিয় মানুষ কে?” তিনি উত্তর দিলেন, "আয়িশা (রা)।" আমি বললাম, "পুরুষদের মধ্যে কে?” তিনি বললেন, "তার (আয়িশার রা) পিতা (আবু বকর রা)।" আমি বললাম, "তারপর কে?” তিনি বললেন, "তারপর উমর বিন খাত্তাব (রা)।"'
কুরতুবি (রহ) বলেন, 'এই হাদিস থেকে ভালোবাসার মানুষের নাম নেওয়ার বৈধতা প্রমাণিত হয়, হোক সে পুরুষ অথবা নারী। ভালোবাসার মানুষ ভালো ও সৎকর্মশীল হলে তার নাম বলে দেওয়াতে দোষের কিছু নেই।'
তিনি সর্বপ্রথম আয়িশার (রা) নাম এ জন্যই নিয়েছেন যে, তাঁর প্রতি জৈবিক ও দ্বীনি উভয় প্রকার ভালোবাসা ছিল। পক্ষান্তরে অন্যদের প্রতি দ্বীনি ভালোবাসা থাকলেও জৈবিক ভালোবাসা ছিল না।'
কিন্তু তিনি যখন পুরুষদের মধ্যে প্রিয় ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলেন, তখন সর্বপ্রথম আবু বকর (রা)-এর নাম উল্লেখ করলেন। এর কারণ হলো, আবু বকর (রা) পুরুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একনিষ্ঠ কল্যাণকামী ছিলেন। ইসলাম ও মুসলমানদের অনেক উপকার করেছেন। আল্লাহ ও রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তুষ্টির জন্য নিজের জানমাল কুরবান করেছেন।'
টিকাঃ
৫৫৮. সহিহুল বুখারি: ৩৬৬২, সহিহু মুসলিম: ২৩৮৪।
৫৫৯. আল-মুফহিম: ৯/৯১, ফাইজুল কাদির: ১/২১৮।
📄 তাদের ব্যাপারে কেউ অসৎলগ্ন কথা বললে তিনি অসন্তুষ্ট হতেন
আবু সাইদ খুদরি (রা) বলেন, 'খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) ও আব্দুর রহমান বিন আওফের (রা) মাঝে তর্ক বাধল। একপর্যায়ে খালিদ (রা) আব্দুর রহমান বিন আওফকে (রা) গালি দিলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
لَا تَسُبُّوا أَصْحَابِي، فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ، ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ، وَلَا نَصِيفَهُ
"আমার সাহাবিদের (রা) গালি দিয়ো না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ দান করো, তবে তাদের এক মুদ অথবা অর্ধ মুদের সমপরিমাণ সাওয়াব হবে না।"'
'মুদ' একটি পাত্র, যা এক অঞ্জলির সমপরিমাণ এবং এক সা'-এর এক-চতুর্থাংশ।
হাদিসের অর্থ হলো, আমার কোনো সাহাবি (রা) এক মুদ অথবা অর্ধ মুদ দান করে যে বিশাল সাওয়াব অর্জন করে, তোমাদের কেউ উহুদ পরিমাণ স্বর্ণ দান করেও তার সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে না।
তাঁদের দানের ফজিলত ও সাওয়াব বেশি হওয়ার কারণ হলো, তাঁরা ইসলামের কঠিন ও প্রয়োজনের সময় দান করেছেন। তা ছাড়া তাঁদের দান ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হিফাজত ও সাহায্য করার জন্য। শুধু সাদাকাই নয়, তাঁদের জিহাদ ও অন্যান্য ইবাদতও অন্যদের তুলনায় অধিক ফজিলতপূর্ণ। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا يَسْتَوِي مِنْكُمْ مَنْ أَنْفَقَ مِنْ قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ أُولَئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِنَ الَّذِينَ أَنْفَقُوا مِنْ بَعْدُ وَقَاتَلُوا وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
'তোমাদের মধ্যে যে মক্কা-বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে এবং জিহাদ করেছে, সে (তোমাদের) সমান নয়। এরূপ লোকদের মর্যাদা বড় তাদের অপেক্ষা, যারা পরে ব্যয় করেছে এবং জিহাদ করেছে। তবে আল্লাহ উভয়কে কল্যাণের ওয়াদা দিয়েছেন। তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।'
এর কারণ হলো, মক্কা-বিজয়ের পূর্বে দান ও জিহাদ অনেক কঠিন ছিল। কারণ, তখন ধন-সম্পদের খুব প্রয়োজন ছিল এবং সৈন্যসংখ্যাও অপ্রতুল ছিল। মক্কা-বিজয়ের পর দান ও জিহাদ তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়। কারণ, মক্কা-বিজয়ের পর মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করায় মুসলমানদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। তাই প্রাথমিক সময়ে ইসলাম গ্রহণ করা মুসলমানদের মতো কঠিন পরিস্থিতি তাদের মোকাবেলা করতে হয়নি।
এসব ছাড়াও তাঁদের অন্তরে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, হৃদ্যতা, নম্রতা, অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা ও আল্লাহর পথে যথাযথভাবে জিহাদ করার আগ্রহ ভরপুর ছিল।
আর কিছুক্ষণের জন্য হলেও যে ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছেন, তাঁর মর্যাদা অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে। কারণ, কোনো আমলই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুহবতের সমান হতে পারে না এবং অন্য কোনো উপায়ে ওই মর্যাদা অর্জন করাও সম্ভব নয়। আর ফজিলতের ব্যাপারে কোনো যুক্তি খাটে না; এটা আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা দান করেন।'
হাদিসে 'আমার সাহাবি' বলে বিশেষ সাহাবিদের (রা) বোঝানো হয়েছে। তাঁরা হলেন সেই সকল সাহাবি, যাঁরা মক্কা-বিজয়ের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, ফলে দীর্ঘ সময় ধরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সান্নিধ্যে থেকেছেন এবং তাঁর সাথে জিহাদ করেছেন, ইসলামের কল্যাণে ব্যয় করেছেন, হিজরত করেছেন এবং মুহাজিরদের সাহায্য করেছেন।
ফলে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তাঁরা অন্য সকল সাহাবির চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম। খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) একজন সাহাবি হওয়া সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে তার সাথে কথা বলেছেন, তা প্রাথমিক যুগের সাহাবিগণের (রা) শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে।
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'যাঁরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবি হওয়ার মর্যাদা লাভে ধন্য হয়েছেন, তাঁদেরকে তাঁদের পূর্বে ইমান আনয়নকারী সাহাবিদের (রা) গালমন্দ করতে নিষেধ করেছেন এবং এই ব্যাপারে ভর্ৎসনা করেছেন। এটা প্রমাণ করে যে, যাঁরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্য পেয়েছেন, তাঁদেরকে গালমন্দ করার অধিকার অন্যদের নেই।'
যেখানে খালিদ বিন ওয়ালিদের (রা) মতো হুদাইবিয়ার সময় ইসলাম গ্রহণকারী মহান সাহাবিকে (রা) সাহাবিদের (রা) গালমন্দ করা থেকে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন, সেখানে যারা সাহাবি নয়, তাদের অবস্থা কী হবে? কোনো একজন সাহাবিকেও (রা) গালমন্দ করার অধিকার কি তাদের থাকবে?
ইমাম নববি (রহ) বলেন, 'জেনে রাখো, সাহাবিদের (রা) গালমন্দ করা ভয়াবহ রকমের হারাম। চাই উক্ত সাহাবি (রা) ফিতনার (সাহাবিদের মধ্যে সংঘটিত বিভিন্ন ভ্রাতৃঘাতি লড়াই) সাথে সম্পৃক্ত হোক বা না হোক। কারণ, তারা নিজেদের ইজতিহাদ অনুযায়ী এসব যুদ্ধে জড়িয়েছেন। কোনো সাহাবিকে (রা) গালমন্দ করা কবিরা গুনাহ। জুমহুরের মাজহাব অনুযায়ী সাহাবিকে (রা) গালমন্দকারী ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া হবে; কতল করা হবে না। মালিকি মাজহাবের অনেক আলিম (রহ) তাকে হত্যা করার মত ব্যক্ত করেছেন।'
ইবনে কাসির (রহ) বলেন, 'আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যাঁরা প্রাথমিক সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে যাঁরা উত্তম উপায়ে তাঁদের অনুসরণ করেছেন, তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। সুতরাং ধ্বংস সেই লোকদের জন্য, যারা তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, অথবা তাঁদের গালি দেয়, অথবা তাঁদের মধ্য থেকে কারও প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে বা গালি দেয়। বিশেষ করে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর সকল সাহাবির (রা) সর্দার ও তাঁদের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব সিদ্দিকে আকবার (রা) ও মহান খলিফা আবু বকর বিন আবু কুহাফা (রা)-এর সাথে বিদ্বেষ পোষণ করে এবং তাঁকে গালি দেয়।'
কাজেই রাফিজি (শিয়া) সম্প্রদায়ের মধ্যে যারা সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবি (রা) ও অন্যান্য বড় সাহাবির (রা) সাথে শত্রুতা রাখে এবং তাঁদের গালমন্দ করে, তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত। তাদের জ্ঞানবুদ্ধি ও অন্তর রোগাক্রান্ত। আল্লাহ তাআলা তাদের কর্মকাণ্ড থেকে আমাদের হিফাজত করুন।'
টিকাঃ
৫৬০. সহিহুল বুখারি: ৩৬৭৩, সহিহু মুসলিম: ২৫৪১।
৫৬১. সুরা আল-হাদিদ, ৫৭: ১০।
৫৬২. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৬/৩৯।
৫৬৩. ফাতহুল বারি: ৭/৩৪।
৫৬৪. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৬/৯৩।
৫৬৫. তাফসিরু ইবনি কাসির: ৪/২০৩।
📄 বিশেষ সাহাবিদের মর্যাদা মানুষের সামনে স্পষ্ট করে দিতেন
আবু দারদা (রা) বলেন, 'আবু বকর (রা) ও উমর (রা)-এর মাঝে কোনো বাকবিতণ্ডা হলো। আবু বকর (রা) উমরকে (রা) রাগিয়ে দিলেন। তখন উমর (রা) রাগান্বিত হয়ে তার কাছ থেকে উঠে গেলেন। আবু বকর (রা) তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করার উদ্দেশ্যে তার পিছু নিলেন। কিন্তু উমর (রা) ক্ষমা তো করেননি, উল্টো তার মুখের ওপর দরোজা বন্ধ করে দিলেন।'
আবু দারদা (রা) বলেন, 'আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় আবু বকর (রা) পরনের কাপড়ের একপাশ এমনভাবে ধরে আসলেন যে তার দুই হাঁটু বেরিয়ে পড়ছিল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমাদের এ সাথি এইমাত্র কারও সঙ্গে ঝগড়া করে আসছে।" তিনি সালাম করলেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমার ও উমর বিন খাত্তাবের (রা) মাঝে একটি বিষয়ে কিছু কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে। আমিই প্রথমে কটু কথা বলেছি। অতঃপর আমি লজ্জিত হয়ে তার কাছে মাফ চেয়েছি। কিন্তু তিনি মাফ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এখন আমি আপনার নিকট হাজির হয়েছি।" নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বললেন:
يَغْفِرُ اللَّهُ لَكَ يَا أَبَا بَكْرٍ
"আল্লাহ তোমাকে মাফ করবেন, হে আবু বকর (রা)!"
অতঃপর উমর (রা) লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে আবু বকর (রা)-এর বাড়িতে এসে জিজ্ঞেস করলেন, "আবু বকর (রা) কি বাড়িতে আছেন?” তারা বলল, "না।” তখন উমর (রা) নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট চলে আসলেন। (তাকে দেখে) নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। আবু বকর (রা) ভীত হয়ে নতজানু হয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমিই প্রথমে অন্যায় করেছি।" এ কথাটি তিনি দুবার বললেন। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:
إِنَّ اللَّهَ بَعَثَنِي إِلَيْكُمْ فَقُلْتُمْ كَذَبْتَ، وَقَالَ أَبُو بَكْرٍ صَدَقَ، وَوَاسَانِي بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ، فَهَلْ أَنْتُمْ تَارِكُوا لِي صَاحِبِي
"আল্লাহ যখন আমাকে তোমাদের নিকট রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রূপে প্রেরণ করেছেন তখন তোমরা সবাই বলেছ, "তুমি মিথ্যা বলছ” আর আবু বকর (রা) বলেছে, "আপনি সত্য বলছেন।" তাঁর জানমাল সবকিছু দিয়ে আমার প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করেছে। তোমরা কি আমার সম্মানে আমার সাথিকে অব্যাহতি দেবে?"
এ কথাটি তিনি দুবার বললেন। এরপর থেকে আবু বকরকে (রা) আর কখনো কষ্ট দেওয়া হয়নি।'
হাদিস থেকে শিক্ষা
সকল সাহাবির (রা) ওপর আবু বকর (রা)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও ফজিলত।
কোনো ফজিলতওয়ালা ব্যক্তির জন্য তার চেয়ে অধিক ফজিলতওয়ালা ব্যক্তির সাথে রাগ করা ঠিক নয়।
সামনাসামনি প্রশংসা করা বৈধ, যদি প্রশংসার কারণে প্রশংসিত ব্যক্তি ফিতনা বা ধোঁকায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা না থাকে।
অন্যায়কর্মে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। তবে উত্তম ব্যক্তিরা দ্রুত তাওবা করে ফিরে আসে। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُمْ مُبْصِرُونَ
'যাদের মনে ভয় রয়েছে, তাদের ওপর শয়তানের আগমন ঘটার সাথে সাথেই তারা সতর্ক হয়ে যায় এবং তখনই তাদের বিবেচনাশক্তি জাগ্রত হয়ে ওঠে।'
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অন্যান্য মানুষ ফজিলতের শীর্ষচূড়ায় পৌঁছে গেলেও কেউই নিষ্পাপ নয়।
মজলুম থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করা মুসতাহাব।
হাঁটু সতরের অন্তর্ভুক্ত নয়।
রাবিআ আসলামি (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ও আবু বকরকে (রা) একটি করে জমি দান করলেন। যখন আমাদের মনে দুনিয়ার মোহ সৃষ্টি হলো, তখন খেজুরের একটি কাঁদি সম্পর্কে আমরা পরস্পর ঝগড়ায় লিপ্ত হলাম। আমি বললাম, "এটা আমার সীমানার মধ্যে।" আবু বকর (রা) বললেন, "এটা আমার সীমানার মধ্যে।" এতে আমার ও তাঁর মাঝে বাকবিতণ্ডা সৃষ্টি হলো। একপর্যায়ে আবু বকর (রা) একটা অপছন্দনীয় বাক্য উচ্চারণ করে বসলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি লজ্জিত হয়ে বললেন, "হে রাবিআ, আমাকেও অনুরূপ একটি বাক্য বলো, যেন সমান সমান হয়ে যায়।"
আমি বলতে অস্বীকার করলাম। তখন আবু বকর (রা) বললেন, "হয়তো তুমি আমাকে অনুরূপ বাক্য বলবে, নতুবা আমি এ ব্যপারে তোমার বিরুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরণাপন্ন হব।"
আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল রইলাম।
আবু বকর (রা) মাটিতে পদাঘাত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে রওনা হলেন। আমিও তাঁর পিছু নিলাম। তখন আসলাম গোত্রের একদল লোক এসে আমাকে বলল, "আল্লাহ তাআলা আবু বকরের (রা) ওপর রহম করুন! তিনি কোন মুখে তোমার বিরুদ্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরণাপন্ন হচ্ছেন, অথচ তিনিই তোমাকে অসংগতিপূর্ণ কথা বলেছেন!?"
আমি তাদের বললাম, "তোমরা কি জানো, ইনি কে?" তিনি ছিলেন গুহা-অভ্যন্তরের দ্বিতীয়জন। তিনি মুসলমানদের সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তোমরা তাঁর বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করতে এসো না। কেননা, তখন তিনি রাগান্বিত হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে যাবেন। আর তাঁর রাগ দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও রাগান্বিত হবেন। অতঃপর তাঁদের দুজনের রাগ দেখে স্বয়ং আল্লাহ আমার ওপর রেগে যাবেন এবং রাবিআকে (রা) ধ্বংস করে দেবেন।"
তারা বলল, "তাহলে এখন আমাদের প্রতি আপনার কী নির্দেশ?”
আমি বললাম, "তোমরা ফিরে যাও।"
অতঃপর আবু বকর (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে রওনা হলেন। আমিও একাকী তাঁর অনুসরণ করলাম। একসময় আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পৌঁছে গেলাম।
আবু বকর (রা) ঘটনার বৃত্তান্ত শোনালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দিকে চেয়ে বললেন, “হে রাবিআ, তোমার এবং সিদ্দিকের (আবু বকর রা) মাঝে কী সমস্যা হয়েছে?"
আমি বললাম, “ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমাদের মাঝে এই এই হয়েছে। তিনি আমাকে একটি অপছন্দনীয় বাক্য বললেন। তারপর আমাকে বললেন, "আমি তোমাকে যে রকম বলেছি, তুমিও আমাকে সে রকম বলো, যেন প্রতিশোধ হয়ে যায়।" কিন্তু আমি তা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছি।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হাঁ, তাকে প্রত্যুত্তরে ওই রকম কথা বোলো না, তবে বলো, "আল্লাহ তাআলা আপনাকে ক্ষমা করুন, হে আবু বকর (রা)!"
তখন আমি বললাম, "আল্লাহ তাআলা আপনাকে ক্ষমা করুন, হে আবু বকর (রা)!"
অতঃপর আবু বকর (রা) কাঁদতে কাঁদতে ফিরে গেলেন।'
টিকাঃ
৫৬৬. সহিহুল বুখারি: ৩৬৬১।
৫৬৭. সুরা আল-আরাফ, ৭: ২০১।
৫৬৮. হানাফি মাজহাব মতে, হাঁটু সতরের অন্তর্ভুক্ত।
৫৬৯. ফাতহুল বারি: ৭/২৬।
৫৭০. মুসনাদু আহমাদ: ১৬১৪৩।