📄 ইহুদির মন আকৃষ্ট করার জন্য তাদের দাওয়াতও কবুল করতেন
আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, 'এক ইহুদি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে যবের রুটি ও তেলযুক্ত বাসি সালনের দাওয়াত দিলে তিনি তা গ্রহণ করলেন।'
হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, আহলে কিতাবের দাওয়াত কবুল করা বৈধ।
টিকাঃ
৫৪৫. সহিহুল বুখারি: ২০৯২, সহিহু মুসলিম: ২০৪১।
৫৪৬. ফাতহুল বারি: ৯/৫২৯। ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৩/২২৪।
📄 দাওয়াত অনিমন্ত্রিত কাউকে সঙ্গে নিতে চাইলে অনুমতি নিতেন
আবু মাসউদ আনসারি (রা) থেকে বর্ণিত, 'আবু শুআইব (রা) নামক জনৈক আনসারি সাহাবি ছিল। তার একজন কসাই গোলাম ছিল। আবু শুআইব (রা) একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারায় ক্ষুধার ছাপ দেখতে পেল। পরে তার গোলামকে বলল, "কী করছ! আমাদের পাঁচজনের জন্য তুমি খাবার প্রস্তুত করো। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দাওয়াত দিতে চাই। পাঁচজনের তিনি একজন হবেন।"
গোলাম খাবার প্রস্তুত করল। অতঃপর আনসারি সাহাবিটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তাঁকে-সহ পাঁচজনকে দাওয়াত দিলেন। এক ব্যক্তি তাঁদের অনুগমন করল। দরোজা পর্যন্ত পৌঁছালে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এ লোকটি আমাদের অনুসরণ করেছে। তুমি ইচ্ছা করলে তাকে অনুমতি দিতে পারো, আর যদি চাও, তবে সে ফিরে যাবে।" লোকটি বললেন, "না, আমি বরং তাকে অনুমতি দেবো ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।"'
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
কেউ অপরের জন্য খাবার তৈরি করলে, তা তার বাড়িতেও পাঠিয়ে দিতে পারবে অথবা নিজের ঘরে এনেও খাওয়াতে পারবে।
কাউকে দাওয়াত দিতে গেলে, তার কয়েকজন বিশেষ লোককেও দাওয়াত দেওয়া মুসতাহাব।
নিমন্ত্রিতের সাথে অনিমন্ত্রিত কেউ আসলে নিমন্ত্রণকারী তাকে বাধা দিতে পারবে। বাড়িতে ঢুকে গেলে বের করে দিতে পারবে।
টিকাঃ
৫৪৫. সহিহুল বুখারি: ২০৯২, সহিহু মুসলিম: ২০৪১।
৫৪৬. ফাতহুল বারি: ৯/৫২৯। ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৩/২২৪।
৫৪৭. মুসনাদু আহমাদ: ১৩৭৮৯।
৫৪৮. সহিহুল বুখারি: ২৪৫৬, সহিহু মুসলিম: ২০৩৬। শব্দউৎস: সহিহু মুসলিম।
৫৪৯. ফাতহুল বারি: ৯/৫৬০।
📄 কখনো দাওয়াত ছাড়াই মেহমান হতেন
আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, 'একদিন রাতে বা দিনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘর থেকে বের হলেন। পথিমধ্যে দেখা হয়ে গেল আবু বকর (রা) ও উমরের (রা) সঙ্গে। তিনি বললেন, "এ সময় তোমরা ঘরের বাইরে কেন?"
তাঁরা উভয়েই উত্তর দিল, "হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ক্ষুধার কারণে।"
তিনি বললেন, "ওই সত্তার কসম-যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের মতো আমাকেও ক্ষুধাই ঘরের বাইরে টেনে এনেছে-চলো...। উভয়েই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে চললেন। হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা জনৈক আনসারি সাহাবির (রা) কাছে এলেন। দেখা গেল, তিনি বাড়িতে নেই। তাঁর স্ত্রী তাঁদের দেখে বলল, "মারহাবান ওয়া আহলান! (স্বাগতম! আসুন, আসুন)"
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "ও কোথায়?"
সে উত্তর দিল, "আমাদের জন্য মিষ্টি পানির খোঁজে গেছেন। ইত্যবসরে আনসারি সাহাবি (রা) এসে পড়লেন; দুই সাথিসহ দাঁড়ানো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখে বলে উঠলেন, আলহামদুলিল্লাহ! মেহমান পেয়ে আজ আমার মতো সম্মানিত কেউ হতে পারেনি! তারপর তিনি (ভেতরে) গিয়ে খেজুরের একটি কাঁদি নিয়ে ফিরলেন-এতে কাঁচা, পাকা ও শুকনো সব ধরনের খেজুর ছিল। (তাঁদের সামনে রেখে) বললেন, "নিন, খেতে শুরু করুন আপনারা।" তারপর হাতে ছুরি নিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সাবধান, দুধালো বকরি জবাই করে বসো না আবার!"
তিনি একটি বকরি জবাই করলেন। সবাই পরিতৃপ্ত হলেন গোশত, খেজুর ও পানি খেয়ে। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর (রা) ও উমরকে (রা) বললেন, "সে সত্তার কসম-যার হাতে আমার প্রাণ, এই নিয়ামত সম্পর্কে কিয়ামতের দিন তোমরা অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে। ক্ষুধার যন্ত্রণা তোমাদের ঘরের বাইরে টেনে নিয়ে এসেছিল আর ঘরে ফেরার আগেই তোমরা এই নিয়ামত পেয়ে গেছ।"'
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও অনেক বড় সাহাবিগণের (রা) নিকট পার্থিব প্রাচুর্য তেমন একটা ছিল না। অনেক সময় তাঁদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ত এবং তাঁরা ক্ষুধায় জর্জরিত হতেন।
আল্লাহর ফয়সালার প্রতি অভিযোগ বা অসন্তুষ্টি প্রকাশ না করার শর্তে অন্যকে নিজের কষ্টের কথা ব্যক্ত করা বৈধ।
অভ্যর্থনামূলক বাক্য বলে মেহমানকে বরণ করে নেওয়া মুসতাহাব।
প্রয়োজনের মুহূর্তে গাইরে মাহরাম মহিলার সাথে পর্দার আড়াল থেকে কথা বলা বৈধ।
স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ব্যতীত এমন ব্যক্তিকে তার বাড়িতে প্রবেশ করার অনুমতি দিতে পারবে, যার ব্যাপারে স্বামীর আপত্তি না থাকাটা স্পষ্ট।
মিষ্টিজাতীয় ও উন্নতমানের খাবার খাওয়া বৈধ।
নিয়ামত অর্জিত হলে এবং বিপদ বিদূরিত হলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা মুসতাহাব।
মেহমানের আগমনে মেহমানের সামনে আনন্দ প্রকাশ করা এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা মুসতাহাব।
মেহমানের সামনাসামনি তার প্রশংসা করা বৈধ। তবে ফিতনার আশঙ্কা থাকলে কারও সামনাসামনি প্রশংসা করা ঠিক নয়।
উক্ত আনসারির (রা) ফজিলত ও তার বাগ্মিতার পরিচয় পাওয়া যায়।
রুটি, গোশত ইত্যাদি পরিবেশন করার পূর্বে ফল-ফলাদি পেশ করা মুসতাহাব।
মেহমান আসলে প্রথমে যা আছে, তা-ই দিয়ে দ্রুত মেহমানদারি করা মুসতাহাব। মূল খাবার তৈরি করা পর্যন্ত বসিয়ে রাখা উচিত নয়। বিশেষ করে যদি মেহমান ক্ষুধার্ত হয়।
পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হয়ে খাওয়া বৈধ। যেসব হাদিসে এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তা নিয়মিত পূর্ণ তৃপ্তি সহকারে খাওয়া সম্পর্কে। কেননা, নিয়মিত এভাবে খাবার খেলে কলব শক্ত হয়ে যায় এবং অভাবীদের অভাব অনুভূত হয় না।
লাকিত বিন সাবিরাহ (রা) বলেন, 'একটি প্রতিনিধি দলের সাথে আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম। কিন্তু তাঁকে তাঁর বাড়িতে পাইনি। বাড়িতে উম্মুল মুমিনিন আয়িশা (রা) ছিলেন। তিনি আমাদের আপ্যায়নের জন্য খাজিরা তৈরি করার আদেশ দিলে তা তৈরি করা হচ্ছিল। এদিকে আমাদের কাছে এক পাত্র খেজুর আনা হলো।'
এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরিফ আনলেন। আমাদের বললেন, "তোমাদের আপ্যায়ন করা হয়েছে বা তোমাদের আপ্যায়নের জন্য বলা হয়েছে?"
আমরা বললাম, “হাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।"
এরপর আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বসে রইলাম। তখন রাখাল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক পাল ছাগল খোয়াড়ে রাখছিল। রাখালের সাথে একটি ছাগল আওয়াজ করছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে অমুক, কী বাচ্চা জন্ম হয়েছে?"
রাখাল জবাব দিল, "একটি মাদি ছাগলছানা।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তবে তার স্থানে একটি ছাগল জবাই করো।"
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বললেন, "মনে কোরো না যে, তোমাদের জন্য জবাই করছি। আমাদের একশ ছাগল আছে। ছাগলের সংখ্যা এর চেয়ে বাড়ুক, তা আমরা চাই না। তাই যখন কোনো ছাগল বাচ্চা দেয়, তখন আমরা সদ্যপ্রসূত বাচ্চার স্থলে একটি ছাগল জবাই করি।"'
এই হাদিস থেকে লোক-দেখানো মানসিকতা পরিহারের শিক্ষা পাওয়া যায়।
হাদিস থেকে বোঝা যায়:
কোনো বাড়িতে এমন সময় মেহমান আসলো, যখন বাড়ির কর্তা বাড়িতে নেই-এমন অবস্থায় মুসতাহাব হলো, গিন্নি কর্তার অপেক্ষা না করেই মেহমানকে খেতে দেবে।
মেহমানের সামনে সবচেয়ে উত্তম ও উন্নত খাবারটি পরিবেশন করা মুসতাহাব।
টিকাঃ
৫৫০. সহিহু মুসলিম: ২০৩৮।
৫৫১. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৩/২১৩।
৫৫২. খাজিরা এক ধরনের খাবার, যা তৈরি হয় আটা ও গোশত দিয়ে। গোশতকে ছোট ছোট টুকরো করে পানিতে সিদ্ধ করা হয়। তারপর এর ওপর আটা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
৫৫৩. সুনানু আবি দাউদ: ১৪২।
📄 আতিথেয়তায় ইবরাহিম -এর পদাঙ্ক অনুসরণ করতেন
ইবরাহিম (আ)-এর আতিথেয়তার ঘটনা বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন-
هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ ضَيْفِ إِبْرَاهِيمَ الْمُكْرَمِينَ . إِذْ دَخَلُوا عَلَيْهِ فَقَالُوا سَلَامًا قَالَ سَلَامٌ قَوْمٌ مُنْكَرُونَ . فَرَاغَ إِلَى أَهْلِهِ فَجَاءَ بِعِجْلٍ سَمِينٍ . فَقَرَّبَهُ إِلَيْهِمْ قَالَ أَلَا تَأْكُلُونَ . فَأَوْجَسَ مِنْهُمْ خِيفَةً قَالُوا لَّا تَخَفْ وَبَشِّرُوهُ بِغُلَامٍ عَلِيمٍ
'আপনার কাছে ইবরাহিমের (আ) সম্মানিত মেহমানদের বৃত্তান্ত এসেছে কি? যখন তারা তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, সালাম, তখন সে বলল, সালাম। এরা তো অপরিচিত লোক। অতঃপর সে গৃহে গেল এবং তাৎক্ষণিক একটি ঘৃতপক্ব মোটা গোবৎস নিয়ে হাজির হলো। সে গোবৎসটি তাদের সামনে রেখে বলল, তোমরা আহার করছ না কেন? অতঃপর তাদের সম্পর্কে সে মনে মনে ভীত হলো। তারা বলল, ভীত হবেন না। তারা তাঁকে একট জ্ঞানীগুণী পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিল।'
এই ঘটনায় মেহমানদারি-সম্পর্কিত বেশ কয়েকটি আদব বিবৃত হয়েছে।
১. মেহমানকে খাবারের নিকট আসতে না বলে, তার সামনে খাবার নিয়ে যাওয়া।
২. যথাসম্ভব দ্রুত খাবার পরিবেশন করা।
৩. খাবার আনার ঘোষণা না দিয়েই খাবার নিয়ে আসা।
৪. সর্বোত্তম খাবারটি আনা।
৫. উত্তম পদ্ধতিতে খাবার পরিবেশন করা।
৬. মেহমান পরিচিত হোক বা অপরিচিত, প্রথমে তাকে সালাম করা।
এখানে আমরা সংক্ষিপ্ত পরিসরে মেজবান ও মেহমান হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আচরণ কেমন ছিল, তার একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করা তাওফিক দান করুন। আমিন।
টিকাঃ
৫৫৪. সুরা আজ-জারিয়াত, ৫১: ২৪-২৮।