📄 মেহমান কাফির হলেও সম্মান প্রদর্শন করতেন
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এক কাফির মেহমান হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য একটি ছাগল থেকে দুধ দোহন করতে নির্দেশ দিলেন। অতঃপর সে তার দুধ পান করল। অতঃপর আরেকটি ছাগলের দুধ দোহনের নির্দেশ দিলেন-সে তাও পান করল, তারপর আরেকটি ছাগল... এভাবে সাতটি ছাগল থেকে দুধ দোহন করে তাকে পান করালেন।'
সকালবেলা সে ইসলাম গ্রহণ করল। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য একটি ছাগলের দুধ দোহন করার নির্দেশ দিলেন। সে তা পান করল। অতঃপর আরেকটির দুধ দোহনের নির্দেশ দিলেন, কিন্তু তা পুরোপুরি পান করতে পারল না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "মুমিন এক পেটে খাবার গ্রহণ করে আর কাফির সাত পেটে খাবার গ্রহণ করে।"'
হাদিসের মর্ম হলো, মুমিন বিসমিল্লাহ বলে খাবার গ্রহণ করে। ফলে তার দুটি উপকার অর্জিত হয়। ১. খাবারে বরকত হয়। ২. শয়তান খাবারে ভাগ বসাতে পারে না। ফলে মুমিনের খাবার কম লাগে। যেন কেবল একটি পেটেই সে খাবার গ্রহণ করে।
পক্ষান্তরে, বিসমিল্লাহ না পড়ার কারণে কাফিরের খাবারে বরকত হয় না। এ ছাড়াও তার খাবার থেকে শয়তানও খায়। তাই স্বাভাবিকভাবে তার আহার্য বেশি হয়। যেন সাত অস্ত্র দিয়েই সে খাবার গ্রহণ করে।
মুমিন শরিয়তের শিষ্টাচার বজায় রেখে খাবার গ্রহণ করে। ফলে সে এক পেটে খায়। আর কাফির প্রবৃত্তির তাড়নায় তাড়িত হয়ে খাবার গ্রহণ করে, তাই সে সাত পেটে খাবার খায়।
কেউ কেউ বলেন, 'হাদিসের মর্ম হচ্ছে, প্রকৃত মুমিন প্রয়োজন অনুপাতে খাবার গ্রহণ করে। অল্পতেই পরিতৃপ্ত হয়ে যায়। কাফির তার বিপরীত। সে লোভীদের মতো যতটুকু পারে সাবাড় করে।'
টিকাঃ
৫৩৭. সহিহুল বুখারি ৫৩৯৭, সহিহু মুসলিম: ২০৬৩।
৫৩৮. আল-মুনতাকা: ৪/৩২৬।
📄 অতিথিদের সেবা করতেন
খন্দক যুদ্ধের বর্ণনা-সম্পর্কিত জাবির (রা)-এর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ডেকে বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমার (বাড়িতে) সামান্য কিছু খাবার আছে। আপনি একজন বা দুজন সাথে নিয়ে চলুন।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "কী পরিমাণ খাবার আছে?" আমি তার নিকট সব খুলে বললে তিনি বললেন, "এ তো অনেক উত্তম।" এরপর তিনি আমাকে ডেকে বললেন, "তুমি তোমার স্ত্রীকে গিয়ে বলো, সে যেন আমি না আসা পর্যন্ত উনুন থেকে ডেকচি ও রুটি না নামায়।"
এরপর তিনি বললেন, "ওঠো (জাবির তোমাদের খাবার দাওয়াত দিয়েছে)।" মুহাজিরগণ (রা) উঠলেন (এবং চলতে লাগলেন)। জাবির (রা) তার স্ত্রীর নিকট গিয়ে বললেন, "এখন কী হবে?" নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো মুহাজির, আনসার এবং তাঁদের অন্য সাথিদের নিয়ে চলে আসছেন। তিনি (জাবিরের রা স্ত্রী) বললেন, "তিনি কি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন?" আমি বললাম, "হাঁ।"
এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (উপস্থিত হয়ে) বললেন, "তোমরা সকলেই প্রবেশ করো এবং ভিড় কোরো না।" এ বলে তিনি রুটি টুকরো করে এর ওপর গোশত দিয়ে সাহাবিগণের (রা) নিকট তা বিতরণ করতে শুরু করলেন। (এগুলো পরিবেশন করার সময়) তিনি ডেকচি এবং উনুন ঢেকে রেখেছিলেন। এমনি করে তিনি রুটি টুকরো করে প্রত্যেকের হাত ভরে বিতরণ করতে লাগলেন। এতে সকলে পেট ভরে খাওয়ার পরেও কিছু বাকি রয়ে গেল। অতঃপর তিনি (জাবিরের রা স্ত্রীকে) বললেন, "এগুলো তুমি খাও এবং অন্যকে হাদিয়া দাও। কেননা, লোকদেরও ক্ষুধা পেয়েছে।"'
এই মুহাজির ও আনসার মেহমানগণ (রা) যদিও জাবির (রা)-এর ঘরে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁরা আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মেহমান ছিলেন। কেননা, খাবার বেড়ে যাওয়াটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুজিজার কারণেই হয়েছে। জাবির (রা)-এর যে খানা ছিল, তা কেবল কয়েকজন খেতে পারতেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বরকতে তা খন্দক খননে নিয়োজিত সকল মুজাহিদের জন্য যথেষ্ট হয়ে গেল।
এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেহমানদের সেবা করেছেন। তাদের হাতে হাতে গোশত ও খাবার বণ্টন করেছেন। এর সবই মেহমানের প্রতি তাঁর অনবদ্য অতিথিপরায়ণতার বহিঃপ্রকাশ।
টিকাঃ
৫৩৯. সহিহুল বুখারি ৪১০১, সহিহু মুসলিম: ২০৩৯।
📄 মেহমানদের আচরণে কষ্ট হলেও তাদের বিদায় করতে লজ্জা পেতেন
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتَ النَّبِيِّ إِلَّا أَنْ يُؤْذَنَ لَكُمْ إِلَى طَعَامٍ غَيْرَ نَاظِرِينَ إِنَاهُ وَلَكِنْ إِذَا دُعِيتُمْ فَادْخُلُوا فَإِذَا طَعِمْتُمْ فَانْتَشِرُوا وَلَا مُسْتَأْنِسِينَ لِحَدِيثٍ إِنَّ ذَلِكُمْ كَانَ يُؤْذِي النَّبِيَّ فَيَسْتَحْيِي مِنْكُمْ وَاللَّهُ لَا يَسْتَحْيِي مِنَ الْحَقِّ
'হে মুমিনগণ, তোমাদের অনুমতি দেওয়া না হলে তোমরা খাওয়ার জন্য আহার্য রন্ধনের অপেক্ষা না করে নবির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গৃহে প্রবেশ করো না। তবে তোমরা আহুত হলে প্রবেশ করো, তবে অতঃপর খাওয়া শেষে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে চলে এসো, কথাবার্তায় মশগুল হয়ে যেয়ো না। নিশ্চয় এটা নবির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কাছে সংকোচ বোধ করেন; কিন্তু আল্লাহ সত্য কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন না।'
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর মুমিন বান্দাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গৃহে প্রবেশ করার আদব শিক্ষা দিয়েছেন। জানিয়ে দিয়েছেন, গৃহে প্রবেশের অনুমতি ছাড়া খাবার খাওয়ার উদ্দেশ্যে নবির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গৃহে প্রবেশ করা নিষেধ।
অনুরূপভাবে খাবারের অপেক্ষায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাড়িতে বসে থাকতে এবং খাবার খাওয়ার পর গল্পগুজব করতেও নিষেধ করেছেন।
আয়াতের সারমর্ম হচ্ছে: নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে দুটি শর্ত ব্যতীত প্রবেশ করা যাবে না-
১. প্রবেশের অনুমতি থাকতে হবে।
২. প্রয়োজন পূরণ হওয়ার পরপরই উঠে যেতে হবে।
এ জন্যই আল্লাহ বলেছেন, 'তবে তোমরা আহুত হলে প্রবেশ করো, তবে অতঃপর খাওয়া শেষে স্বেচ্ছায় চলে এসো। (খানা খাওয়ার আগে বা পরে) কথাবার্তায় মশগুল হয়ে যেয়ো না।'
এরপর আল্লাহ তাআলা এই নিষেধাজ্ঞার হিকমতও জানিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, 'নিশ্চয় এটা (প্রয়োজনের অধিক বসে থাকা) নবির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্য কষ্টদায়ক (অর্থাৎ তোমাদের বসে থাকার কারণে তিনি কষ্ট পান। কারণ, তোমাদের কারণে তাঁর বাড়ির স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়)।
فَيَسْتَحْيِي مِنْكُمْ 'তিনি তোমাদের কাছে সংকোচ বোধ করেন'-তোমাদের বের হয়ে যেতে বলতে পারেন না। কেননা, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ সাধারণত মানুষজনকে তাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বলতে লজ্জা অনুভব করেন। কিন্তু আল্লাহ সত্য কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন না।'
আয়াত থেকে একটা শিক্ষা পাওয়া যায় যে, শরিয়তের বিধান ছেড়ে দেওয়াটা বাহ্যিকভাবে শিষ্টাচার বা আদব মনে হলেও বা তা পালনে লজ্জা অনুভব হলেও, শরিয়তের বিধান মানা আবশ্যক। কারণ, শরিয়তের বিধানের বিপরীত আদব হতেই পারে না।
আর আল্লাহ তাআলা এমন কোনো বিষয় বলতে লজ্জা করেন না, যেখানে আমাদের কল্যাণ রয়েছে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি দয়া করতে তিনি কোনো কসুর রাখেননি।
টিকাঃ
৫৪০. সুরা আল-আহজাব, ৩৩ ৫৩।
৫৪১. তাফসিরুস সাদি: ১/৬৭০।
📄 মেহমান হিসেবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আচরণ
এতক্ষণ আমরা মেজবান হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আচরণ কেমন ছিল, তা নিয়ে আলোচনা করেছি। এখন আলোচনা হবে মেহমান হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। তিনি খাওয়ার দাওয়াত কবুল করতেন, যদিও তা খুব অল্প খাবারই হোক। তিনি বলেন, 'যদি আমাকে কেবল একটি হাতা বা পায়া খেতে দাওয়াত দেওয়া হয়, আমি অবশ্যই তা কবুল করব।'
তিনি জন্তুর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ও নিকৃষ্ট অংশ-উভয়টিকে একত্র করার জন্য বিশেষভাবে হাতা ও পায়ার নাম নিয়েছেন। কেননা, হাতা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খুব প্রিয় ছিল। আর পায়ার তো কোনো মূল্যই নেই।'
টিকাঃ
৫৪২. সহিহুল বুখারি: ২৫৬৮।
৫৪৩. ফাতহুল বারি: ৫/১৯৯।