📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর অতিথিপরায়ণতার ব্যপ্তি বেশি যেত

📄 দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর অতিথিপরায়ণতার ব্যপ্তি বেশি যেত


মিকদাদ বিন আমর (রা) বলেন, 'আমি ও আমার এক বন্ধু (মদিনায়) এলাম। ক্ষুধার তাড়নায় আমাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছিল। আমরা মানুষের কাছে নিজেদের পেশ করতে লাগলাম। কেউই আমাদের মেহমান হিসেবে গ্রহণ করল না। অতঃপর আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এলাম। বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমরা খুবই ক্ষুধার্ত। লোকদের নিকট গিয়েছিলাম, কেউ আমাদের মেহমানদারি করতে রাজি হয়নি। তাই আপনার নিকট আসলাম।"

তখন তিনি আমাদের তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সেখানে তিনটি মেষ ছিল। নбиজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা দুধ দোহন করবে। এ দুধ আমরা ভাগ করে পান করব।" এরপর থেকে আমরা দুধ দোহন করতাম। আমাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ অংশ পান করত। আর আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য তাঁর অংশ তুলে রাখতাম।'

মিকদাদ (রা) বলেন, "তিনি রাতে আসতেন এবং এমনভাবে সালাম দিতেন যাতে ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত না হয় আর জাগ্রত ব্যক্তি শুনতে পায়। এরপর তিনি মসজিদে এসে সালাত আদায় করতেন এবং ফিরে এসে দুধ পান করতেন। এক রাতে আমার কাছে শয়তান এল। আমি তখন আমার অংশ পান করে ফেলেছিলাম। সে বলল, "মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারিদের (রা) কাছে গেলে তারা তাকে হাদিয়া দিয়ে থাকে এবং তাঁদের কাছে তিনি খেয়েও থাকেন। তার এ সামান্য দুধের প্রয়োজন নেই।" তখন আমি এসে সেটুকুও পান করে ফেললাম। দুধ যখন ভালোভাবে আমার পেটে প্রবেশ করল এবং আমি বুঝলাম, এ দুধ বের করার আর কোনো উপায় নেই, তখন শয়তান আমার থেকে দূরে সরে গিয়ে বলল, "তোমার সর্বনাশ হোক তুমি কী কাণ্ড করলে! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুধ পান করে ফেলেছ? তিনি এসে যখন তা পাবেন না, তখন তোমার ওপর বদদোয়া করবেন। তাতে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তোমার দুনিয়া ও আখিরাত বরবাদ হয়ে যাবে।"

আমার গায়ে ছিল একটা চাদর। এটি এত ছোট যে পা ঢাকলে মাথা উন্মুক্ত হয়ে পড়ে আবার মাথা আবৃত করতে গেলে পা দেখা যায়। আমার ঘুম আসছিল না। আমার সঙ্গীদ্বয় ঘুমাচ্ছিল। তারা তো আমার মতো কাজ করেনি।'

এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে যেভাবে সালাম দিতেন, সেভাবেই সালাম দিলেন। তারপর তিনি মসজিদে এসে সালাত আদায় করলেন। এরপর দুধের কাছে এসে ঢাকনা খুলে সেখানে কিছুই পেলেন না। এরপর তিনি তাঁর মাথা আসমানের দিকে তুললেন। আমি তখন (মনে মনে) বললাম, "এখনই তিনি আমার ওপর বদদোয়া করবেন, আর আমি ধ্বংস হয়ে যাব।" তিনি বললেন, “হে আল্লাহ, যে ব্যক্তি আমাকে আহার করায়, তাকে তুমি আহার করাও। আর যে আমাকে পান করায়, তাকে তুমি পান করাও।"'

মিকদাদ (রা) বলেন, "এ সময় আমি চাদরটি নিয়ে শরীরে বাঁধলাম, আর একটি ছুরি নিলাম, তারপর (এই ভেবে) মেষগুলির কাছে গেলাম যে, এগুলোর মাঝে যেটি সবচেয়ে মোটাতাজা, আমি সেটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য জবাই করব। গিয়ে দেখলাম, সেটি দুধে পরিপূর্ণ এবং অন্যান্য সব মেষও দুধে পরিপূর্ণ। এরপর আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবারের একটি পাত্র নিয়ে এলাম, যাতে তাঁরা দুধ দোহানোর কথা ভাবতেন না (পাত্রটি বড় হওয়ার কারণে)।'

আমি তাতেই দুধ দোহন করলাম, এমনকি পাত্রের ওপরিভাগে ফেনা ভেসে উঠল। এরপর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলাম। তিনি বললেন, "তোমরা কি রাতের দুধ পান করেছ?” আমি বললাম, “ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি পান করুন।" তিনি পান করলেন, এরপর আমাকে দিলেন। আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি পান করুন।" তিনি পান করে আবার আমাকে দিলেন। যখন আমি বুঝতে পারলাম যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিতৃপ্ত হয়ে গেছেন এবং আমি তাঁর দোয়া পেয়ে গেছি, তখন আমি হাসতে হাসতে মাটিতে পড়ে গেলাম।'

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে মিকদাদ, এটি তাহলে তোমার কাজ?" তখন আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি এই এই কাজ করেছি।" তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এটা একমাত্র আল্লাহর মেহেরবানি। তুমি কেন আমাকে অবহিত করলে না? আমরা আমাদের সাথিদ্বয়কে জাগ্রত করতাম, তাহলে তারাও এর ভাগ পেত।"

আমি তখন বললাম, "যে মহান সত্তা আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন-তাঁর শপথ, আপনি যখন পেয়েছেন এবং আমি যখন আপনার সাথে ভাগ পেয়েছি, তখন অন্য কোনো লোক পেয়েছি কি পায়নি, তার পরোয়া করি না।"'

'আমি হাসতে হাসতে জমিনে পড়ে গেলাম'-এর কারণ হলো, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভাগের দুধ খেয়ে খুব টেনশনে ছিলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদদোয়া করেন কি না! কিন্তু যখন দেখলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য আবার পরিতৃপ্ত হয়েছেন এবং তার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দোয়া কবুল হয়ে গেছে, তখন আনন্দের আতিশয্যে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। মাত্রাতিরিক্ত পেরেশানির স্থলে মাত্রাতিরিক্ত খুশি! এমন অবস্থায় আর নিজেকে ধরে রাখেন কেমন করে? তাই খুশিতে হাসতে হাসতে মাটিতে গড়িয়ে পড়লেন।

টিকাঃ
৫৩১. সহিহু মুসলিম: ২০৫৫
৫৩২. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/১৫।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মেহমানের সাথে বসে খোশগল্প করতেন

📄 মেহমানের সাথে বসে খোশগল্প করতেন


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আজাদকৃত দাস সাওবান (রা) বলেন, 'একবার আমাদের বাড়িতে এক বেদুইন মেহমান এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিয়ে বাড়ির সামনে বসলেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লোকদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন যে, ইসলামে এসে তারা কেমন খুশি, সালাতের সাথে তাদের কেমন সখ্যতা গড়ে উঠেছে? মেহমান তাঁকে প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলেন। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখলাম।'

আমাকে তারপর যখন দিন বেড়ে খাবারের সময় হলো, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডেকে চুপিচুপি বললেন, "আয়িশার (রা) ঘরে যাও আর তাকে বলো যে, রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মেহমান আছে।"

আয়িশা (রা) বললেন, "সে সত্তার শপথ-যিনি হিদায়াত ও সত্য দ্বীন প্রেরণ করেছেন, আমাদের ঘরে মানুষের খাওয়ার মতো কিছুই নেই।"

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে এক এক করে তাঁর সকল স্ত্রীর কাছে পাঠালেন। কিন্তু সকলেই আয়িশা (রা)-এর মতো ওজর পেশ করলেন। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা মলিন হয়ে উঠতে দেখলাম।'

বেদুইন বুদ্ধিমান ছিলেন। তিনি বুদ্ধি খাটিয়ে কথার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন, "এ যুগের বেদুইনরা কষ্ট সহ্য করতে পারে বেশ। আমরা শহরবাসীর মতো নই। একটি খেজুর ও একটু দুধই আমাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়।"

তখন সামনে দিয়ে সদ্য দুধ দোহনকৃত আমাদের একটি ছাগী হেঁটে যাচ্ছিল। তাকে আমরা সামরা বলে ডাকতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নাম ধরে 'সামরা, ও সামরা' বলে ডাক দিলেন।'

ছাগীটি ম্যাঁ ম্যাঁ করতে করতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিসমিল্লাহ বলে তার পায়ের পাশ দিয়ে হাত গলিয়ে ওলান স্পর্শ করলেন। সাথে সাথে ছাগীর ওলান দুধে ভরপুর হয়ে গেল!

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ডেকে পাত্র আনতে বললেন। পাত্র নিয়ে আসলে তিনি বিসমিল্লাহ বলে দুধ দোহন করলেন। পাত্রটি তখনই ভরে গেল দুধে।'

এরপর বললেন, "বিসমিল্লাহ বলে তাকে দাও।"

আমি মেহমানকে তা দিলাম। তিনি লম্বা এক চুমুক দিয়ে তা থেকে পান করলেন। অতঃপর পাত্র রেখে দেওয়ার ইচ্ছা করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আবার পান করো।" তিনি আবার পান করলেন। এরপর রেখে দেওয়ার ইচ্ছে করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, "আবার পান করো।" এভাবে কয়েকবার পান করে তার পেটভর্তি হয়ে গেল। আল্লাহ যতটুকু চাইলেন, মেহমান ততটুকু পান করলেন।'

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিসমিল্লাহ বলে আবারও দুধ দোহন করলেন। সাথে সাথে পাত্রটি ভরে গেল। অতঃপর বললেন, "এগুলো আয়িশার (রা) কাছে নিয়ে যাও। তারপর যে পরিমাণ সম্ভব, সে পরিমাণ যেন সে এখান থেকে পান করে।"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ পালনের পর আমি ফিরে এলাম। তিনি আগের মতো বিসমিল্লাহ বলে দুধ দোহন করলেন। পাত্র পূর্ণ হলো। অতঃপর আমাকে এক এক করে তাঁর প্রত্যেক স্ত্রীর নিকট পাঠালেন। যখনই কোনো স্ত্রী পান করতেন, বিসমিল্লাহ বলে পুনরায় দুধ দোহন করে আমাকে আরেক জনের কাছে পাঠাতেন। এভাবে একে একে আমাকে তাঁর সকল স্ত্রীর কাছে পাঠালেন। সবার কাছ থেকে ফিরে এসে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম।'

তিনি বললেন, "আমার দিকে বাটিটি উত্তোলন করো।" আমি বাটি ওঠালাম। তিনি বিসমিল্লাহ বলে আল্লাহ যতটুকু চান পান করলেন। এরপর আমাকে দিলেন। আমি পাত্রে ঠোঁট লাগিয়ে পান করলাম। দুধটা মধুর চাইতেও মিষ্টি ছিল। মিশকের চাইতেও বেশি সুগন্ধ ছিল। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হে আল্লাহ, এ ছাগীর মাঝে তার পরিবারের জন্য বরকত দিন।"'

টিকাঃ
৫৩৩. আজুরি (রহ) রচিত কিতাবুশ শারিআহ ১০৪৮।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মেহমানদারির সামর্থ্য না থাকলে মেহমানকে অন্যের হাতে তুলে দিতেন

📄 মেহমানদারির সামর্থ্য না থাকলে মেহমানকে অন্যের হাতে তুলে দিতেন


আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, "আমি খুব ক্ষুধার্ত।” তিনি তাঁর কোনো এক স্ত্রীর কাছে লোক পাঠালে তিনি বললেন, “যে সত্তা আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন-তাঁর শপথ, আমার কাছে পানি ছাড়া কিছুই নেই।” তিনি অন্য এক স্ত্রীর কাছে লোক পাঠালে তিনিও একই কথা বললেন। এভাবে তাঁরা সকলে একই কথা বললেন, "সেই সত্তার শপথ-যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন, আমার নিকট পানি ছাড়া আর কিছুই নেই।"

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন:

أَلَا رَجُلٌ يُضَيِّفُهُ هَذِهِ اللَّيْلَةَ، يَرْحَمُهُ اللهُ

"কোনো ব্যক্তি কি নেই, যে আজ রাতে লোকটির মেহমানদারি করবে? আল্লাহ তার ওপর রহম করবেন।"

এ সময় জনৈক আনসারি ব্যক্তি (রা) উঠে বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি করব।" এ বলে তিনি মেহমানকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন এবং স্ত্রীকে বললেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মেহমানকে সম্মান করো।" স্ত্রী বললেন, "বাচ্চাদের খাবার ব্যতীত আমাদের ঘরে তো আর কিছুই নেই।" আনসারি (রা) বললেন, "তুমি আহার প্রস্তুত করো এবং চেরাগ জ্বালিয়ে রাখো। আর বাচ্চারা খাবার চাইলে তাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও। আর যখন মেহমান প্রবেশ করবেন, তখন চেরাগ সেখানে রাখবে। তাকে বোঝাবে যে, আমরাও আহার করছি। মেহমান যখন খাওয়া শুরু করবে, তখন তুমি চেরাগের কাছে গিয়ে সেটা নিভিয়ে দেবে।"

(স্বামীর কথা অনুযায়ী) স্ত্রী চেরাগ জ্বালালেন, বাচ্চাদের ঘুম পাড়ালেন এবং সামান্য খাবার যা ছিল, তা উপস্থিত করলেন। (তারপর মেহমানসহ তারা খেতে বসলেন।) তখন চেরাগ ঠিক করার বাহানা করে স্ত্রী উঠে গিয়ে তা নিভিয়ে দিলেন এবং মেহমানকে বোঝাতে থাকলেন যে, তারাও সঙ্গে খাচ্ছেন।'

এভাবে তারা উভয়ে (বাচ্চারা-সহ) সারা রাত ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকলেন।

সকালে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলেন, তখন তিনি বললেন, “আল্লাহ তাআলা তোমাদের গতকালের কার্যকলাপ দেখে হেসে দিয়েছেন অথবা (বলেছেন) খুশি হয়েছেন।" এবং আয়াত নাজিল করেছেন:

وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

"তারা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের ওপর অন্যদের অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। আর যাদের অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।"

হাদিস থেকে বোঝা যায়:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবার দুনিয়াবিমুখ ছিলেন। বিলাসিতা তাঁদের মাঝে ছিল না। ক্ষুধা ও অনটনেরর সময় তাঁরা সবর করতেন।

কওমের সর্দারের জন্য উচিত হলো, প্রথমে তিনি নিজেই যথাসাধ্য মেহমানদারি করার চেষ্টা করবেন। অতঃপর অন্যান্য লোকের কাছে ভালো কাজের সহযোগিতা চাওয়ার ভিত্তিতে মেহমানদারি করার কথা বলবেন।

অনটনের সময়েও অপরের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করা চাই।

মেহমানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া ফজিলতপূর্ণ কাজ।

উল্লিখিত আনসারি সাহাবি (রা) ও তাঁর স্ত্রীর অনেক ফজিলত অর্জিত হয়েছে।

মেহমান মেজবানের অভাব দেখে স্বাচ্ছন্দ্যে মেহমানদারি গ্রহণ না করার আশঙ্কা থাকলে মেজবান কোনো উপায় অবলম্বন করে মেহমানকে তার অভাব বুঝতে দেবে না। যেমনটি হাদিসের ঘটনায় সাহাবি (রা) ও তাঁর স্ত্রী চেরাগ নিভিয়ে উপায় অবলম্বন করেছেন। কেননা, যদি মেহমান দেখতে পেতেন যে, বাড়িতে খাবার খুব কম আছে, আর মেজবান তার সাথে খাচ্ছেন না, তখন তিনিও আহার করা থেকে বিরত থাকতেন।

টিকাঃ
৫৩৪. আল-হাশর, ৫৯: ৯।
৫৩৫. সহিহুল বুখারি: ৩৭৯৮, সহিহু মুসলিম: ২০৫৪।
৫৩৬. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/১২।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 মেহমান কাফির হলেও সম্মান প্রদর্শন করতেন

📄 মেহমান কাফির হলেও সম্মান প্রদর্শন করতেন


আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত আছে, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এক কাফির মেহমান হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য একটি ছাগল থেকে দুধ দোহন করতে নির্দেশ দিলেন। অতঃপর সে তার দুধ পান করল। অতঃপর আরেকটি ছাগলের দুধ দোহনের নির্দেশ দিলেন-সে তাও পান করল, তারপর আরেকটি ছাগল... এভাবে সাতটি ছাগল থেকে দুধ দোহন করে তাকে পান করালেন।'

সকালবেলা সে ইসলাম গ্রহণ করল। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য একটি ছাগলের দুধ দোহন করার নির্দেশ দিলেন। সে তা পান করল। অতঃপর আরেকটির দুধ দোহনের নির্দেশ দিলেন, কিন্তু তা পুরোপুরি পান করতে পারল না। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "মুমিন এক পেটে খাবার গ্রহণ করে আর কাফির সাত পেটে খাবার গ্রহণ করে।"'

হাদিসের মর্ম হলো, মুমিন বিসমিল্লাহ বলে খাবার গ্রহণ করে। ফলে তার দুটি উপকার অর্জিত হয়। ১. খাবারে বরকত হয়। ২. শয়তান খাবারে ভাগ বসাতে পারে না। ফলে মুমিনের খাবার কম লাগে। যেন কেবল একটি পেটেই সে খাবার গ্রহণ করে।

পক্ষান্তরে, বিসমিল্লাহ না পড়ার কারণে কাফিরের খাবারে বরকত হয় না। এ ছাড়াও তার খাবার থেকে শয়তানও খায়। তাই স্বাভাবিকভাবে তার আহার্য বেশি হয়। যেন সাত অস্ত্র দিয়েই সে খাবার গ্রহণ করে।

মুমিন শরিয়তের শিষ্টাচার বজায় রেখে খাবার গ্রহণ করে। ফলে সে এক পেটে খায়। আর কাফির প্রবৃত্তির তাড়নায় তাড়িত হয়ে খাবার গ্রহণ করে, তাই সে সাত পেটে খাবার খায়।

কেউ কেউ বলেন, 'হাদিসের মর্ম হচ্ছে, প্রকৃত মুমিন প্রয়োজন অনুপাতে খাবার গ্রহণ করে। অল্পতেই পরিতৃপ্ত হয়ে যায়। কাফির তার বিপরীত। সে লোভীদের মতো যতটুকু পারে সাবাড় করে।'

টিকাঃ
৫৩৭. সহিহুল বুখারি ৫৩৯৭, সহিহু মুসলিম: ২০৬৩।
৫৩৮. আল-মুনতাকা: ৪/৩২৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00