📄 অতিথিপরায়ণ ব্যক্তির প্রশংসা করেছেন
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'তাবুক অভিযানের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা দিলেন। বললেন, “মানুষের মধ্যে দুই ব্যক্তির মতো (উত্তম) কেউ নেই। তাদের একজন হলো, যে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার উদ্দেশ্যে ঘোড়ার লাগাম ধরে প্রস্তুত থাকে এবং মানুষের অনিষ্ট থেকে বেঁচে থাকে। দ্বিতীয়জন হলো, যে ছাগলের পাল নিয়ে জঙ্গলে বসবাস করে, মেহমানদারি করে এবং মেহমানের হক আদায় করে।"'
টিকাঃ
৫২৩. মুসনাদু আহমাদ: ১৯৮৮।
📄 প্রত্যেক মুসলমান মেহমানদারি পাওয়ার হক রাখে
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'এক রাত মেহমানদারি করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য। কারও বাড়ির সীমানায় যদি মেহমানের পদার্পণ ঘটে, তবে এক দিনের মেহমানদারি তার ওপর কর্জ হিসেবে আপতিত হয়। মেহমান চাইলে তা আদায় করে নিতে পারে কিংবা তার দাবি পরিত্যাগ করতে পারে।'
খাত্তাবি (রহ) বলেন, 'যুগ যুগ ধরে মেহমানদারি ভালো ও নেককার মানুষদের আলামত হিসেবে স্বীকৃত এবং মেহমানদারি করতে অস্বীকৃতি মানুষের কাছে নিন্দিত।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসমান বিন মাজউন (রা)-কে বললেন, 'নিশ্চয় তোমার ওপর তোমার মেহমানের অধিকার রয়েছে।'
উকবা বিন আমির (রা) বলেন, 'একবার আমরা বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি কখনো কখনো আমাদের এমন সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরণ করেন, যারা আমাদের মেহমানদারি করে না। এমতাবস্থায় আমরা কী করব?” উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যদি তোমরা কোনো কওমের কাছে গিয়ে পৌঁছাও, তখন মেহমানদারিস্বরূপ তারা যা কিছু তোমাদের দেয়, তা সাদরে গ্রহণ কোরো। আর যদি তারা তা না করে, তখন মেহমানদারির অধিকার তাদের থেকে (যেকোনো উপায়ে) আদায় করে নিয়ো।"'
এই হাদিস মেহমানদারি গ্রহণ করতে একান্ত বাধ্য লোকদের জন্য প্রযোজ্য। কেননা, তাদের মেহমানদারি করা ওয়াজিব। সুতরাং কেউ যদি তাদের মেহমানদারি না করে, তখন তারা যেকোনো উপায়ে তাদের প্রয়োজন আদায় করে নেওয়ার অধিকার রাখবে।
আর কেউ কেউ বলেন, 'হাদিসের মর্ম হচ্ছে, তোমাদের মেহমানদারি না করার কারণে তোমরা তাদের কৃপণতা ও নীচুতার কথা লোকদের বলে তাদের মানহানি করতে পারবে।'
টিকাঃ
৫২৪. সুনানু আবি দাউদ: ৩৭৫০, সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩৬৭৭।
৫২৫. আওনুল মাবুদ: ১০/১৫৪।
৫২৬. সুনানু আবি দাউদ: ১৩৬৯। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত।
৫২৭. সহিহুল বুখারি: ২৪৬১, সহিহু মুসলিম: ১৭২৭
৫২৮. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১২/৩২।
📄 মেহমানদারির সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন
আবু শুরাইহ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের (কিয়ামতের) ওপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন মেহমানকে সম্মান করার মাধ্যমে তার ন্যায্য অধিকার আদায় করে দেয়। লোকেরা বলল, "হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার ন্যায্য অধিকার কী?" তিনি বললেন, "এক দিন ও এক রাত তার মেহমানদারি করা। সাধারণভাবে মেহমানদারি হলো তিন দিন। এর অতিরিক্ত করলে তা হবে সাদাকা অর্থাৎ অতিরিক্ত উদারতা। আর কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ নয় মেজবানের কাছে এত বেশি সময় অবস্থান করা, যাতে সে গুনাহে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়।" লোকেরা বলল, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, গুনাহে লিপ্ত হতে বাধ্য হয় মানে কী?" তিনি বললেন, "এত বেশি সময় তার কাছে অবস্থান করা, যাতে মেহমানদারি করার মতো তার কাছে কিছু থাকে না।"'
ওপরে উল্লেখিত হাদিসসমূহ থেকে প্রতীয়মান হয়, মেহমানের হক তিন স্তরের : ওয়াজিব, মুসতাহাব ও সাদাকা।
ওয়াজিব হলো এক দিন, এক রাত। মুসতাহাব হলো তিন দিন। তিন দিনের বেশি মেহমানদারি করা সাদাকা।
মেহমান যদি মুসাফির হয় এবং অন্য শহর থেকে আসা কোনো আগন্তুক হয়, তখন তাকে সম্মান করা এবং তাকে খানা খাওয়ানো মেজবানের ওপর ওয়াজিব। যদি না করে, তাহলে তার সম্পদে মেহমানের হক থেকে যাবে।
পক্ষান্তরে, মেহমান যদি নিজ শহরের হয়, তখনও হাদিসের ব্যাপকতার দাবি অনুযায়ী তাকে সম্মান করতে হবে এবং তাকে খানা খাওয়াতে হবে। তবে যে মেহমানকে খানা খাওয়ানো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াজিব বলেছেন, এই মেহমান সেই মেহমান নয়। তাই একে খানা না খাওয়ালে মেজবানের সম্পদে তার হক থেকে যাবে না।
আর তিন দিনের বেশি অবস্থান করার মাধ্যমে মেজবানের ওপর বোঝা হওয়া মেহমানের জন্য জায়িজ নেই। কেননা, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'মেহমানের জন্য বৈধ নয় যে, সে মেজবানের কষ্ট হওয়া পর্যন্ত তার নিকট অবস্থান করবে।'
টিকাঃ
৫২৯. সহিহুল বুখারি: ৬০১৯, সহিহু মুসলিম: ৪৮
৫৩০. সহিহুল বুখারি: ৬১৩৫। আবু শুরাইহ (রা) থেকে বর্ণিত।
📄 দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর অতিথিপরায়ণতার ব্যপ্তি বেশি যেত
মিকদাদ বিন আমর (রা) বলেন, 'আমি ও আমার এক বন্ধু (মদিনায়) এলাম। ক্ষুধার তাড়নায় আমাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছিল। আমরা মানুষের কাছে নিজেদের পেশ করতে লাগলাম। কেউই আমাদের মেহমান হিসেবে গ্রহণ করল না। অতঃপর আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এলাম। বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমরা খুবই ক্ষুধার্ত। লোকদের নিকট গিয়েছিলাম, কেউ আমাদের মেহমানদারি করতে রাজি হয়নি। তাই আপনার নিকট আসলাম।"
তখন তিনি আমাদের তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সেখানে তিনটি মেষ ছিল। নбиজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা দুধ দোহন করবে। এ দুধ আমরা ভাগ করে পান করব।" এরপর থেকে আমরা দুধ দোহন করতাম। আমাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ অংশ পান করত। আর আমরা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য তাঁর অংশ তুলে রাখতাম।'
মিকদাদ (রা) বলেন, "তিনি রাতে আসতেন এবং এমনভাবে সালাম দিতেন যাতে ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত না হয় আর জাগ্রত ব্যক্তি শুনতে পায়। এরপর তিনি মসজিদে এসে সালাত আদায় করতেন এবং ফিরে এসে দুধ পান করতেন। এক রাতে আমার কাছে শয়তান এল। আমি তখন আমার অংশ পান করে ফেলেছিলাম। সে বলল, "মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারিদের (রা) কাছে গেলে তারা তাকে হাদিয়া দিয়ে থাকে এবং তাঁদের কাছে তিনি খেয়েও থাকেন। তার এ সামান্য দুধের প্রয়োজন নেই।" তখন আমি এসে সেটুকুও পান করে ফেললাম। দুধ যখন ভালোভাবে আমার পেটে প্রবেশ করল এবং আমি বুঝলাম, এ দুধ বের করার আর কোনো উপায় নেই, তখন শয়তান আমার থেকে দূরে সরে গিয়ে বলল, "তোমার সর্বনাশ হোক তুমি কী কাণ্ড করলে! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুধ পান করে ফেলেছ? তিনি এসে যখন তা পাবেন না, তখন তোমার ওপর বদদোয়া করবেন। তাতে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে এবং তোমার দুনিয়া ও আখিরাত বরবাদ হয়ে যাবে।"
আমার গায়ে ছিল একটা চাদর। এটি এত ছোট যে পা ঢাকলে মাথা উন্মুক্ত হয়ে পড়ে আবার মাথা আবৃত করতে গেলে পা দেখা যায়। আমার ঘুম আসছিল না। আমার সঙ্গীদ্বয় ঘুমাচ্ছিল। তারা তো আমার মতো কাজ করেনি।'
এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে যেভাবে সালাম দিতেন, সেভাবেই সালাম দিলেন। তারপর তিনি মসজিদে এসে সালাত আদায় করলেন। এরপর দুধের কাছে এসে ঢাকনা খুলে সেখানে কিছুই পেলেন না। এরপর তিনি তাঁর মাথা আসমানের দিকে তুললেন। আমি তখন (মনে মনে) বললাম, "এখনই তিনি আমার ওপর বদদোয়া করবেন, আর আমি ধ্বংস হয়ে যাব।" তিনি বললেন, “হে আল্লাহ, যে ব্যক্তি আমাকে আহার করায়, তাকে তুমি আহার করাও। আর যে আমাকে পান করায়, তাকে তুমি পান করাও।"'
মিকদাদ (রা) বলেন, "এ সময় আমি চাদরটি নিয়ে শরীরে বাঁধলাম, আর একটি ছুরি নিলাম, তারপর (এই ভেবে) মেষগুলির কাছে গেলাম যে, এগুলোর মাঝে যেটি সবচেয়ে মোটাতাজা, আমি সেটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য জবাই করব। গিয়ে দেখলাম, সেটি দুধে পরিপূর্ণ এবং অন্যান্য সব মেষও দুধে পরিপূর্ণ। এরপর আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবারের একটি পাত্র নিয়ে এলাম, যাতে তাঁরা দুধ দোহানোর কথা ভাবতেন না (পাত্রটি বড় হওয়ার কারণে)।'
আমি তাতেই দুধ দোহন করলাম, এমনকি পাত্রের ওপরিভাগে ফেনা ভেসে উঠল। এরপর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলাম। তিনি বললেন, "তোমরা কি রাতের দুধ পান করেছ?” আমি বললাম, “ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি পান করুন।" তিনি পান করলেন, এরপর আমাকে দিলেন। আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি পান করুন।" তিনি পান করে আবার আমাকে দিলেন। যখন আমি বুঝতে পারলাম যে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিতৃপ্ত হয়ে গেছেন এবং আমি তাঁর দোয়া পেয়ে গেছি, তখন আমি হাসতে হাসতে মাটিতে পড়ে গেলাম।'
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে মিকদাদ, এটি তাহলে তোমার কাজ?" তখন আমি বললাম, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি এই এই কাজ করেছি।" তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এটা একমাত্র আল্লাহর মেহেরবানি। তুমি কেন আমাকে অবহিত করলে না? আমরা আমাদের সাথিদ্বয়কে জাগ্রত করতাম, তাহলে তারাও এর ভাগ পেত।"
আমি তখন বললাম, "যে মহান সত্তা আপনাকে সত্য দ্বীনসহ পাঠিয়েছেন-তাঁর শপথ, আপনি যখন পেয়েছেন এবং আমি যখন আপনার সাথে ভাগ পেয়েছি, তখন অন্য কোনো লোক পেয়েছি কি পায়নি, তার পরোয়া করি না।"'
'আমি হাসতে হাসতে জমিনে পড়ে গেলাম'-এর কারণ হলো, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভাগের দুধ খেয়ে খুব টেনশনে ছিলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদদোয়া করেন কি না! কিন্তু যখন দেখলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য আবার পরিতৃপ্ত হয়েছেন এবং তার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দোয়া কবুল হয়ে গেছে, তখন আনন্দের আতিশয্যে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। মাত্রাতিরিক্ত পেরেশানির স্থলে মাত্রাতিরিক্ত খুশি! এমন অবস্থায় আর নিজেকে ধরে রাখেন কেমন করে? তাই খুশিতে হাসতে হাসতে মাটিতে গড়িয়ে পড়লেন।
টিকাঃ
৫৩১. সহিহু মুসলিম: ২০৫৫
৫৩২. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/১৫।