📄 প্রতিবেশী যত কাছের হবে হকের ওপরও তত গুরুত্বপূর্ণ হবে
আয়িশা (রা) বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমাদের দুজন প্রতিবেশী। কাকে হাদিয়া দেবো আমি?"
তিনি জবাব দিলেন, "যার ঘর তোমার অধিক কাছে, তাকে দাও।"'
হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'নিকটতর প্রতিবেশীকে হাদিয়াটা দেওয়ার কারণ হচ্ছে, একজনের ঘরে কোনো জিনিস প্রবেশ করলে সেটা নিকটের প্রতিবেশীই দেখে, দূরের প্রতিবেশী নয়। নিকটের প্রতিবেশী দেখার পর অপেক্ষায় থাকে সে জিনিসটার জন্য। অন্যদিকে দূরের প্রতিবেশী দেখেনি, তাই তার প্রতীক্ষায় থাকারও কথা না। তা ছাড়া নিকটের প্রতিবেশী বিপদের সময় সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারে সবার আগে। বিশেষ করে মানুষ যখন ঘুমন্ত বা চেতনাহীন থাকে, তখনও অন্য মানুষের তুলনায় নিকটের প্রতিবেশীই দ্রুত এগিযে আসতে পারে সাহায্য করার জন্য।'
টিকাঃ
৪৯৭. সহিহুল বুখারি: ২২৫৯।
৪৯৮. ফাতহুল বারি: ১০/৪৪৭।
📄 প্রতিবেশীর সজ্জনে আলিমদের বিভিন্ন মত
শাফিয়ি (রহ) ও হাম্বলিদের (রহ) মতে, নিজ ঘরের চারপাশের ৪০ ঘর হচ্ছে প্রতিবেশী। তাদের দলিল, 'প্রতিবেশীর অধিকার ৪০ ঘর পর্যন্ত। এদিক থেকে, এদিক থেকে এবং এদিক থেকে।'
মালিকিদের (রহ) মতে, নিজ ঘরের সাথে লাগোয়া ঘরের অধিবাসীই প্রতিবেশী। অথবা নিজ ঘরের মুখোমুখি যাদের ঘর, তারাই হচ্ছে প্রতিবেশী। পরস্পরের ঘরের মাঝে ছোটখাটো রাস্তা থাকতে পারে। তবে বেশি দূরত্ব থাকবে না। যেমন বাজার বা প্রশস্ত নদী বড় দূরত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছে এমন হবে না। অথবা একই মসজিদ বা পাশাপাশি দুই মসজিদের মুসল্লি পরস্পরের প্রতিবেশী।
আবু হানিফা (রহ)-এর মতে, লাগোয়া ঘরের অধিবাসীই প্রতিবেশী। কারণ প্রতিবেশী শব্দের আরবি কোনো কিছুর পাশ্ববর্তী হওয়া বোঝায়।
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'প্রতিবেশীর সংজ্ঞায় সালাফের (রহ) বিভিন্ন মত পাওয়া যায়-
আলি (রা) বলেন, "যারা একে অপরের ডাক শুনতে পায়, তারা পরস্পরের প্রতিবেশী।"
কেউ কেউ বলেন, "যে তোমার সাথে একই মসজিদে ফজরের সালাত আদায় করে, সে হচ্ছে তোমার প্রতিবেশী।"
সবচেয়ে সঠিক অভিমত হচ্ছে, প্রতিবেশীর সংজ্ঞা যার এলাকায় যেভাবে প্রচলিত, সেভাবে নির্ণীত হবে প্রতিবেশী কারা।
ইবনে কুদামা (রহ) বলেন, "যে নিকটবর্তী, সে-ই হচ্ছে প্রতিবেশী। এ ক্ষেত্রে যে দেশে যেরূপ প্রচলন আছে, তা-ই ধর্তব্য হবে প্রতিবেশীর সংজ্ঞায়।"'
টিকাঃ
৪৯৯. আবু ইয়ালা (রহ) কৃত ইতহাফুল মাহরাহ: ৫০৯৮। আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। হাদিসের মান: জইফ।
৫০০. ফাতহুল বারি: ১০/৪৪৭, মুগনি ৬/৫৭৮, মাওসুআতুল ফিকহিয়া কুয়াইতিয়া: ১৬/২১৭।
📄 অল্প হলেও হাদিয়া দিতে উৎসাহিত করেছেন
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "হে মুসলিম নারী, কোনো মহিলা প্রতিবেশিনী যেন অপর মহিলা প্রতিবেশিনীর হাদিয়া তুচ্ছ মনে না করে-চাই তা ছাগলের খুর হোক।"'
হাদিসের ব্যাখ্যা
'তুচ্ছ মনে না করার প্রতি নিষেধাজ্ঞা হাদিয়ার বস্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর হাদিসের মর্মার্থ হচ্ছে, পরিমাণ কম বলে কেউ যেন তার প্রতিবেশীকে কোনো কিছু হাদিয়া দিতে সংকোচ বোধ না করে। বরং যা থাকবে, কম হোক বেশ হোক, তা-ই হাদিয়া দেবে। যদিও পরিমাণে তা ছাগলের পায়ের খুরের মতো কোনো বস্তু হোক না কেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে ছাগলের খুরের কথা উল্লেখ করেছেন হাদিয়ার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য।'
হতে পারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ নিষেধাজ্ঞা হাদিয়াদানকারীর জন্য নয়; বরং এ নিষেধাজ্ঞা হাদিয়া যাকে দেওয়া হয়, তার জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ যে প্রতিবেশীকে হাদিয়া দেওয়া হবে, পরিমাণে কম হওয়ার কারণে সে যেন হাদিয়াকে তুচ্ছ মনে না করে।'
এ হাদিসে পরিমাণ কম হলেও হাদিয়া দেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ, অনেক সময় বেশি পরিমাণ থাকে না। তাই কম কম করে যখন হাদিয়া দেওয়া হতে থাকে, একসময় তা বিরাট পরিমাণ ধারণ করে। এ হাদিসে হৃদ্যতার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, লৌকিকতা পরিহার করার।'
টিকাঃ
৫০১. সহিহুল বুখারি: ২৫৬৬, সহিহু মুসলিম: ১০৩০।
৫০২. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৭/১২০, ফাতহুল বারি: ৫/১৯৮, ১০/৪৪৫।
📄 প্রতিবেশীকে খাবার পাঠাতে উদ্বুদ্ধ করতেন তিনি
আবু জার (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে আবু জার, যখন তুমি তরকারি রান্না করবে, তখন তরকারিতে ঝোল বাড়িয়ে দেবে এবং কিছুটা তরকারি তোমার প্রতিবেশীকে দেবে।"'
হাদিসটি আবু জার (রা) থেকে অন্য শব্দেও বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, 'আমার বন্ধু আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, "তুমি তরকারি রান্না করার সময় ঝোল বাড়িয়ে দিয়ো। এরপর তোমার বাড়ির প্রতিবেশীদের খোঁজ নিয়ো। তাদের সে তরকারি থেকে সুষমভাবে কিছুটা দিয়ো।"'
আজকে যারা নিজেদের মুসলিম হিসেবে দাবি করে, তাদের মাঝে এ আমল দেখা যায় কি?! নিজ পরিবারে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার রান্না হয়। এরপর সে খাবার পুরোটা খেতে না পারায় ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়, কিন্তু প্রতিবেশীকে দেওয়া হয় না। অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছে। ক্ষুধা নিবারণের মতো কিছুই নেই তার কাছে।
আর এটি পরিষ্কার প্রতিবেশীর অধিকার লঙ্ঘন এবং মানবিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যে ব্যক্তি জ্ঞাতসারে তার প্রতিবেশীকে ক্ষুধার্ত রেখে তৃপ্তিভরে খেয়ে রাত যাপন করে, সে আমার প্রতি ইমান আনেনি।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের (রা) উৎসাহিত করতেন, তারা যেন প্রতিবেশীকে খাওয়ায়। আনাস (রা) বর্ণনা করেন, 'একবার উম্মে সুলাইম (রা) আমাকে বলেন, "নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যাও, তাঁকে বলো, যদি তিনি আমাদের এখানে খেতে চান, তবে যেন খেতে আসেন।"
আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তাঁকে খবর পৌঁছে দিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আমার সাথে যারা আছে, তারাও কি আসবে?"
আমি বললাম, "জি।"
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত লোকদের বললেন, "চলো।"
আমি উম্মে সুলাইমের (রা) কাছে চলে এলাম। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এত অধিক লোক দেখে বিস্মিত হলাম। পরিস্থিতি দেখে উম্মে সুলাইম (রা) বললেন, "আনাস, এ কী করলে তুমি?!"
এর পরপরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবেশ করলেন। উম্মে সুলাইমকে (রা) বললেন, “তোমার কাছে ঘি আছে?"
উম্মে সুলাইম (রা): জি, একটি কৌটায় অল্প ঘি আছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম: তা-ই নিয়ে আসো।
এরপর আমি ঘির কৌটা নিয়ে আসলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা খুললেন এবং বললেন, "বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ এতে বরকত দিন।"
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে সুলাইমকে (রা) বললেন, "এটি উল্টো করো।" তিনি উল্টো করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিসমিল্লাহ পড়ে কৌটাটি নাড়া দিয়ে ঘি বের করতে লাগলেন। তারপর আমি তৃপ্তিভরে খাওয়ার পরিমাণ নিলাম এবং সেখান থেকে ৮০ জনেরও অধিক লোক খেল। তারপরও কৌটায় ঘি থেকে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটি উম্মে সুলাইমকে (রা) দিলেন এবং বললেন, "এখান থেকে নিজে খাও এবং তোমার প্রতিবেশীদের খাওয়াও।"'
টিকাঃ
৫০৩. সহিহু মুসলিম: ২৬২৫।
৫০৪. সহিহু মুসলিম: ৪৭৫৯।
৫০৫. তাবারানি: ৭৫১। হাদিসের মান: সহিহ।
৫০৬. মুসনাদু আহমাদ: ১৩১৩৫। হাদিসের মান: সহিহ।