📄 উত্তম প্রতিবেশী সে-ই, যে তার প্রতিবেশীর নিকট উত্তম
আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমাদের মধ্যে উত্তম সঙ্গী সে-ই, যে তার সঙ্গীর নিকট উত্তম। তোমাদের মধ্যে উত্তম প্রতিবেশী সে-ই, যে তার প্রতিবেশীর নিকট উত্তম।"'
অর্থাৎ উত্তম সঙ্গী সে-ই, যে তার সঙ্গীর প্রতি উত্তম ব্যবহার করে। তেমনিভাবে উত্তম প্রতিবেশী সে-ই, যে তার প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করে।
'প্রতিবেশীর অধিকার কেবল এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয় যে, তাকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকলেই তার অধিকার আদায় হয়ে যাবে। বরং প্রতিবেশীর কল্যাণের জন্য দরকার হলে নিজেকে কষ্ট করতে হবে। কেবল এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয় প্রতিবেশীর অধিকার। প্রতিবেশীর প্রতি উত্তম ব্যবহার করতে হবে, তাকে সৎ ও কল্যাণের নির্দেশনা দিতে হবে। এর স্বরূপ এমন যে, প্রথমে আগ বেড়ে তাকে সালাম দিতে হবে। অসুস্থ হলে সেবা-শুশ্রূষা করতে হবে। তার বিপদে সান্ত্বনা দিতে হবে তাকে। আনন্দের সময় অভিবাদন জানাতে হবে। তার আনন্দে অংশগ্রহণ করতে হবে। তার ছোটখাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি উপেক্ষা করতে হবে। প্রতিবেশী গাইরে মাহরাম হলে দৃষ্টি অবনত রাখতে হবে। প্রতিবেশী যখন ঘরের বাইরে সফরে থাকবে, তখন তার ঘরের হিফাজত করতে হবে। তার সন্তানদের প্রতি কোমল আচরণ করতে হবে। দ্বীন-দুনিয়ার কল্যাণের পথে তাকে আহ্বান করতে হবে।'
টিকাঃ
৪৯৫. সুনানুত তিরমিজি: ১৮৬৭। হাদিসের মান সহিহ।
৪৯৬. ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন: ২/২১৩।
📄 প্রতিবেশী যত কাছের হবে হকের ওপরও তত গুরুত্বপূর্ণ হবে
আয়িশা (রা) বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমাদের দুজন প্রতিবেশী। কাকে হাদিয়া দেবো আমি?"
তিনি জবাব দিলেন, "যার ঘর তোমার অধিক কাছে, তাকে দাও।"'
হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'নিকটতর প্রতিবেশীকে হাদিয়াটা দেওয়ার কারণ হচ্ছে, একজনের ঘরে কোনো জিনিস প্রবেশ করলে সেটা নিকটের প্রতিবেশীই দেখে, দূরের প্রতিবেশী নয়। নিকটের প্রতিবেশী দেখার পর অপেক্ষায় থাকে সে জিনিসটার জন্য। অন্যদিকে দূরের প্রতিবেশী দেখেনি, তাই তার প্রতীক্ষায় থাকারও কথা না। তা ছাড়া নিকটের প্রতিবেশী বিপদের সময় সাহায্য করতে এগিয়ে আসতে পারে সবার আগে। বিশেষ করে মানুষ যখন ঘুমন্ত বা চেতনাহীন থাকে, তখনও অন্য মানুষের তুলনায় নিকটের প্রতিবেশীই দ্রুত এগিযে আসতে পারে সাহায্য করার জন্য।'
টিকাঃ
৪৯৭. সহিহুল বুখারি: ২২৫৯।
৪৯৮. ফাতহুল বারি: ১০/৪৪৭।
📄 প্রতিবেশীর সজ্জনে আলিমদের বিভিন্ন মত
শাফিয়ি (রহ) ও হাম্বলিদের (রহ) মতে, নিজ ঘরের চারপাশের ৪০ ঘর হচ্ছে প্রতিবেশী। তাদের দলিল, 'প্রতিবেশীর অধিকার ৪০ ঘর পর্যন্ত। এদিক থেকে, এদিক থেকে এবং এদিক থেকে।'
মালিকিদের (রহ) মতে, নিজ ঘরের সাথে লাগোয়া ঘরের অধিবাসীই প্রতিবেশী। অথবা নিজ ঘরের মুখোমুখি যাদের ঘর, তারাই হচ্ছে প্রতিবেশী। পরস্পরের ঘরের মাঝে ছোটখাটো রাস্তা থাকতে পারে। তবে বেশি দূরত্ব থাকবে না। যেমন বাজার বা প্রশস্ত নদী বড় দূরত্ব সৃষ্টি করে দিয়েছে এমন হবে না। অথবা একই মসজিদ বা পাশাপাশি দুই মসজিদের মুসল্লি পরস্পরের প্রতিবেশী।
আবু হানিফা (রহ)-এর মতে, লাগোয়া ঘরের অধিবাসীই প্রতিবেশী। কারণ প্রতিবেশী শব্দের আরবি কোনো কিছুর পাশ্ববর্তী হওয়া বোঝায়।
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'প্রতিবেশীর সংজ্ঞায় সালাফের (রহ) বিভিন্ন মত পাওয়া যায়-
আলি (রা) বলেন, "যারা একে অপরের ডাক শুনতে পায়, তারা পরস্পরের প্রতিবেশী।"
কেউ কেউ বলেন, "যে তোমার সাথে একই মসজিদে ফজরের সালাত আদায় করে, সে হচ্ছে তোমার প্রতিবেশী।"
সবচেয়ে সঠিক অভিমত হচ্ছে, প্রতিবেশীর সংজ্ঞা যার এলাকায় যেভাবে প্রচলিত, সেভাবে নির্ণীত হবে প্রতিবেশী কারা।
ইবনে কুদামা (রহ) বলেন, "যে নিকটবর্তী, সে-ই হচ্ছে প্রতিবেশী। এ ক্ষেত্রে যে দেশে যেরূপ প্রচলন আছে, তা-ই ধর্তব্য হবে প্রতিবেশীর সংজ্ঞায়।"'
টিকাঃ
৪৯৯. আবু ইয়ালা (রহ) কৃত ইতহাফুল মাহরাহ: ৫০৯৮। আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। হাদিসের মান: জইফ।
৫০০. ফাতহুল বারি: ১০/৪৪৭, মুগনি ৬/৫৭৮, মাওসুআতুল ফিকহিয়া কুয়াইতিয়া: ১৬/২১৭।
📄 অল্প হলেও হাদিয়া দিতে উৎসাহিত করেছেন
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "হে মুসলিম নারী, কোনো মহিলা প্রতিবেশিনী যেন অপর মহিলা প্রতিবেশিনীর হাদিয়া তুচ্ছ মনে না করে-চাই তা ছাগলের খুর হোক।"'
হাদিসের ব্যাখ্যা
'তুচ্ছ মনে না করার প্রতি নিষেধাজ্ঞা হাদিয়ার বস্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর হাদিসের মর্মার্থ হচ্ছে, পরিমাণ কম বলে কেউ যেন তার প্রতিবেশীকে কোনো কিছু হাদিয়া দিতে সংকোচ বোধ না করে। বরং যা থাকবে, কম হোক বেশ হোক, তা-ই হাদিয়া দেবে। যদিও পরিমাণে তা ছাগলের পায়ের খুরের মতো কোনো বস্তু হোক না কেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে ছাগলের খুরের কথা উল্লেখ করেছেন হাদিয়ার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য।'
হতে পারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ নিষেধাজ্ঞা হাদিয়াদানকারীর জন্য নয়; বরং এ নিষেধাজ্ঞা হাদিয়া যাকে দেওয়া হয়, তার জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ যে প্রতিবেশীকে হাদিয়া দেওয়া হবে, পরিমাণে কম হওয়ার কারণে সে যেন হাদিয়াকে তুচ্ছ মনে না করে।'
এ হাদিসে পরিমাণ কম হলেও হাদিয়া দেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ, অনেক সময় বেশি পরিমাণ থাকে না। তাই কম কম করে যখন হাদিয়া দেওয়া হতে থাকে, একসময় তা বিরাট পরিমাণ ধারণ করে। এ হাদিসে হৃদ্যতার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, লৌকিকতা পরিহার করার।'
টিকাঃ
৫০১. সহিহুল বুখারি: ২৫৬৬, সহিহু মুসলিম: ১০৩০।
৫০২. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৭/১২০, ফাতহুল বারি: ৫/১৯৮, ১০/৪৪৫।