📄 মুহাজির প্রতিবেশী
নাজ্জার গোত্রের প্রতিবেশীরা ছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কয়েকজন মুহাজির প্রতিবেশী ছিল। তাঁরা হলেন, আবু বকর (রা), আলি (রা), আব্বাস (রা) প্রমুখ সাহাবি (রা)।
📄 মক্কার প্রতিবেশীরা রাসূল ﷺ-কে কষ্ট দিত
ইবনে ইসহাক (রহ) বলেন, 'মক্কায় যেসব লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কষ্ট দিত, তারা হচ্ছে, আবু লাহাব (রহ), হাকাম বিন আস বিন উমাইয়া (রহ), উকবা বিন আবু মুআইত (রহ), আদি বিন হামরা সাকাফি (রহ), ইবনে আসদা হুজালি (রহ) প্রমুখ। এরা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিবেশী। তবে হাকাম বিন আবুল আস (রহ) তাঁকে কষ্ট দিত না।'
তাদের কেউ এসে সদ্য প্রসব করা ছাগলের নাড়িভুঁড়ি এনে নামাজ পড়া অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর ফেলত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাঁর দরোজার সামনে দাঁড়িয়ে বলতেন, "হে আব্দে মানাফের গোত্র! এটা কোন ধরনের প্রতিবেশিত্ব?!"'
টিকাঃ
৪৭৪. তাহজিবু সিরাতি ইবনি হিশাম ১/১২১।
📄 প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে সচেতন করতেন
আয়িশা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "জিবরিল (আ) আমাকে প্রতিবেশীদের সম্পর্কে এত বেশি নির্দেশনা দিচ্ছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত আমার ধারণা হলো অচিরেই প্রতিবেশীদের ওয়ারিশ বানিয়ে দেওয়া হবে।"'
এক আনসারি সাহাবি (রা) বলেন, 'আমি ঘর থেকে বেরিয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম। দেখলাম, তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। এক লোক তাঁর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। আমার মনে হলো, হয়তো লোকটার কোনো প্রয়োজন আছে।'
আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকলেন যে, আমার নিজেরই দুঃখবোধ হতে লাগল তাঁর জন্য। লোকটা চলে গেলে আমি এগিয়ে এলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। বললাম, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, লোকটা এত দীর্ঘ সময় ধরে আপনাকে দাঁড় করিয়ে রাখল যে, আমি দুঃখবোধ করতে শুরু করেছিলাম আপনার জন্য।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি তাকে দেখেছ?"
"জি”, বললাম আমি।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি জানো, কে ছিল লোকটা?"
"না", বললাম আমি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "লোকটা ছিল জিবরিল (আ)। তিনি আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার বিষয়ে এত বেশি নির্দেশনা দিতে থাকলেন যে, আমার ধারণা হচ্ছিল প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ বানিয়ে ওহি নাজিল হবে।"'
এমনকি বিদায় হজের দিনও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের (রা) নির্দেশনা দিলেন প্রতিবেশীর অধিকার আদায়ের ব্যাপারে। আবু উমামা (রা) বলেন, 'বিদায় হজের দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাঁর উটের ওপর বসে বলতে শুনলাম, "আমি তোমাদের প্রতিবেশীর অধিকার বিষয়ে অসিয়ত করছি।" তিনি এ কথাটি অনেক বার বললেন। এমনকি আমি মনে মনে বলে ফেললাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ ঘোষণা করবেন।'
টিকাঃ
৪৭৫. সহিহুল বুখারি: ৬০১৪, সহিহু মুসলিম: ২৬২৪।
৪৭৬. মুসনাদু আহমাদ: ১৯৪৫৯। হাদিসের মান: সহিহ।
৪৭৭. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ৭/১১৮। হাদিসের মান: সহিহ।
📄 প্রতিবেশীর সম্মান করা ঈমানের নিদর্শন আখ্যা দিয়েছেন
আবু শুরাইহ আদাবি (রা) বলেন, 'আমি নিজ কানে শুনেছি। নিজ চোখে দেখেছি। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসে বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে সম্মান করে।"'
'এ হাদিসের রাবি আতা খুরাসানি (রহ)-এর কাছে জানতে চাওয়া হলো, প্রতিবেশীর অধিকার কী কী?'
তিনি বললেন, 'যখন প্রতিবেশী তোমার কাছে সাহায্য চায়, তাকে সাহায্য করা। যখন ঋণ চায়, ঋণ দেওয়া। প্রতিবেশী দরিদ্র হলে তাকে দান করা। অসুস্থ হলে সেবা করা। ভালো কিছু অর্জন করলে তাকে অভিনন্দন জানানো। বিপদে পতিত হলে সান্ত্বনা জানানো। মৃত্যুবরণ করলে তার জানাজায় অংশ নেওয়া।'
প্রতিবেশীর অনুমতি ছাড়া তোমার ঘরটি এত উঁচু তৈরি করবে না যে, এতে করে প্রতিবেশীর ঘরে বাতাস প্রবেশে বিঘ্ন ঘটে। প্রতিবেশীকে তোমার ঘরের রান্নার ঘ্রাণ দিয়ে কষ্ট দেবে না, যদি না তুমি তাকে সে খাবারের কিছু অংশ দাও।'
যদি ফল কিনে থাকো, তবে তার কিছু প্রতিবেশীকে হাদিয়া দাও। যদি হাদিয়া না দিতে পারো, তবে নিজের ঘরে ফল গোপনে প্রবেশ করাও। তোমার সন্তানদের হাতে দিয়ে সে ফল নিয়ে বাইরে বের হতে দেবে না। এতে প্রতিবেশীর সন্তানের মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়বে।'
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা পরিপূর্ণ ইমানের নিদর্শন। এমনকি ইসলাম-পূর্ব যুগেও এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করার ধরন হচ্ছে, সাধ্যমতো প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করা। যেমন: তাকে হাদিয়া দেওয়া, সালাম দেওয়া। তার সাথে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা। তার খোঁজখবর নেওয়া। প্রয়োজনের সময় তাকে সাহায্য করা। বাহ্যিক ও মানসিক দিক থেকে কষ্ট না দেওয়া এবং কষ্টের কারণ দূর করা।'
টিকাঃ
৪৭৮. সহিহুল বুখারি: ৬০১৯, সহিহু মুসলিম: ৪৮। ইমাম মুসলিমের (রহ) বর্ণনায় আছে, 'সে যেন তার প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করে।'
৪৭৯. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম ১/৩৫০।
৪৮০. ফাতহুল বারি: ১০/৪৪২।