📄 কল্যাণময় কাজে তাদের উৎসাহিত করতেন
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনদের ইবাদতের প্রতি উৎসাহ দিতেন। আখিরাতের পাথেয় জোগাড় করার উদ্দীপনা জোগাতেন। জাবির (রা) থেকে হজসংক্রান্ত দীর্ঘ এক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সে হাদিসে তিনি বলেন, 'এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইতুল্লাহর দিকে রওয়ানা হলেন। মক্কায় এসে জোহর আদায় করে বনি আব্দুল মুত্তালিবের (রা) কাছে আসলেন। তখন তারা হাজিদের জমজমের পানি পান করাচ্ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আব্দুল মুত্তালিবের (রা) সন্তানেরা, তোমরা পানি তুলতে থাকো। যদি আমার এ ভয় না হতো যে, লোকেরা এ কাজে তোমাদের পরাভূত করে ফেলবে, তবে অবশ্যই আমি তোমাদের সাথে পানি তুলতে লেগে যেতাম।" এরপর তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি পানির একটি বালতি এগিয়ে দিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে পানি পান করলেন।'
হাদিসের ব্যাখ্যা
'এ হাদিসে বনি আব্দুল মুত্তালিব (রা) বলে উদ্দেশ্য হচ্ছে আব্বাস (রা) ও তার দল। কারণ, হাজিদের পানি পান করানোর দায়িত্ব ছিল তাদের ওপর। "তোমরা পানি তুলতে থাকো"-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশসূচক বাক্য ব্যবহার ওয়াজিব অর্থে ছিল না, ছিল মুসতাহাব অর্থে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথাটি তাদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক ছিল। এ কথার মাধ্যমে তিনি তাদের অনুপ্রাণিত করছিলেন যে, এ কাজটি একটি বিরাট কল্যাণজনক কাজ। এতে রয়েছে অনেক সাওয়াব।'
"যদি আমার এ ভয় না হতো..."-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি তাদের সাথে পানি তোলার কাছে নেমে পড়তেন, তবে অন্য সব মুসলিমও এ কাজের জন্য ভিড় জমাত। আব্বাস (রা) ও তার দলকে মানুষ অব্যাহতি দিয়ে দিত পানি তোলার প্রতি উৎসাহিত হওয়ার ফলে।'
ইমাম নববি (রহ) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথার মর্ম হচ্ছে, আমি যদি পানি তুলতে নেমে পড়ি, তবে মানুষজন মনে করবে জমজমের পানি তোলাও হজের একটি বিধান। তাই তারা এসে ভিড় করবে এ কাজের জন্য। তারা তোমাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে এ কাজ থেকে তোমাদের হটিয়ে দেবে-যদি এ ভয় না থাকত, তবে আমিও তোমাদের সাথে এ কাজে অংশ নিতাম। কারণ, এ কাজে অনেক ফজিলত, অনেক সাওয়াব।'
টিকাঃ
৪৬০. সহিহু মুসলিম: ১২১৮।
৪৬১. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৮/১৯৪।
📄 আত্মীয় হলেও দ্বীনের হুকুম পালনে তাদের এতটুকু ছাড়ও দিতেন না
আনাস (রা) বলেন, 'আব্বাস (রা) বদরে বন্দী হলেন। কতক আনসার (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, "আমাদের অনুমতি দিন। আমরা আমাদের ভাগ্নের মুক্তিপণ মাফ করে দেবো।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা তার একটি দিরহামও ছাড়বে না।"'
হাদিসের ব্যাখ্যা
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'আনসারগণ (রা) আব্বাসকে (রা) ভাগ্নে বলার কারণ হচ্ছে. মূলত আনসাররা আব্বাস (রা)-এর পিতা আব্দুল মুত্তালিবের (রহ) মামা ছিলেন। কারণ, আব্দুল মুত্তালিবের (রহ) মা ইয়াসরিবের অধিবাসী ছিলেন। তার নাম ছিল সালমা বিনতে আমর বিন উহাইহা (রা)। তিনি বনু নাজ্জারের মেয়ে ছিলেন।'
এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়-আনসারগণ (রা) বলেছেন 'আমাদের ভাগ্নে'। তারা কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি সম্পর্কিত করে বলতে পারত 'আপনার চাচা'। কিন্তু তারা 'আমাদের ভাগ্নে' বলে তাদের ওপর অনুগ্রহ করতে বললেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে। যদি 'আপনার চাচা' বলতেন তারা, তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি অনুগ্রহের ব্যাপারটি চলে আসত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা মেনে নিতেন না। তাই তারা কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করে বললেন, আমাদের ভাগ্নে। এখানে তাদের মেধাশক্তি ও সম্বোধনের ক্ষেত্রে উত্তম আদবের বিষয়টি ফুটে উঠেছে।'
এ ব্যাপারে ইবনে হাজার (রহ) আরও বলেন, 'ইবনে আয়িজ (রহ) তাঁর "কিতাবুল মাগাজি” গ্রন্থে বলেন, "বন্দীদের বাঁধার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল উমরকে (রা)। তিনি আব্বাস (রা)-এর বাঁধন শক্ত করে বাঁধলেন। রাতের বেলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্বাস (রা)-এর গোঙানি শুনে ঘুমাতে পারছিলেন না। আনসাররা (রা) এটা জানতে পেরে আব্বাস (রা)-এর বাঁধন খুলে দিলেন।"
বাঁধন খুলে দেওয়ায় আনসাররা (রা) দেখলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তুষ্ট হয়েছেন। তখন তাঁরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আরও বেশি সন্তুষ্ট করার জন্য আব্বাসের (রা) মুক্তিপণ ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়টি তুললেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন।' 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনসারদের (রা) এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন, কারণ দ্বীনের মাঝে কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই।'
এ রকম আরও দৃষ্টান্ত হচ্ছে, জাহিলি যুগের রক্তপাতের বদলা নাকচ করার কথা বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম নিজের আত্মীয়দের রক্তপাতের বদলা নাকচ করলেন। সুদ হারামের ঘোষণা দিয়ে, তিনি সর্বপ্রথম তার চাচা আব্বাস (রা)-এর সুদি কারবারির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন।
আরাফাতের ময়দানে খুতবা দেওয়ার সময় তিনি বলেন, 'সাবধান! জেনে রাখো, জাহিলি যুগের সকল মন্দ রীতিনীতি আমার পদতলে। সেগুলো বাতিল। জাহিলি যুগের রক্তপাতের বদলা বাতিল। আমি সবার আগে আমার বংশের রক্তপাতের বদলা বাতিল করছি। রাবিআ বিন হারিসের (রা) ছেলের রক্তপাতের বদলা বাতিল। দুধপানের জন্য বনু সাদে ছিল সে। হুজাইল গোত্র তাকে হত্যা করে। জাহিলি যুগের সকল সুদ বাতিল ঘোষণা করছি। আর সবার আগে বাতিল ঘোষণা করছি আমার বংশের সুদের। আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের (রা) সুদি কারবার বাতিল ঘোষণা করছি। এসব কিছুই বাতিল ও প্রত্যাখ্যাত।'
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচাতো ভাই রাবিআ বিন হারিসের (রা) যে ছেলে নিহত হয়েছিল হুজাইলের হাতে, তার নাম ছিল ইয়াস (রা)। সে তখন দুগ্ধপোষ্য শিশু-এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াত। বনু সাদ ও বনু লাইস বিন বকর গোত্রের মধ্যকার লড়াইয়ে একটি পাথরের আঘাতে তার মৃত্যু হয়।'
ইমাম নববি (রহ) বলেন, 'এ হাদিস থেকে আমরা অনেক বড় একটা শিক্ষা পাই যে, নেতা বা সাধারণ কোনো মুসলিম যখন কোনো ভালো কাজের আদেশ করেন বা মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করেন, তখন সবার আগে তার মাঝে, তার পরিবারের মাঝেই এ আদেশ-নিষেধের প্রয়োগ করতে হবে। কারণ, এ রকমটা করে থাকলে মানুষ সহজেই তার কথা মেনে নেবে এবং আমল করবে। আর যারা নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছে, তাদের জন্যও এটি মানসিক স্থিরতার কারণ হবে।'
টিকাঃ
৪৬২. মুশরিকরা আব্বাসকে (রা) জোর করে বদরের সময় তাদের সাথে নিয়ে আসে।
৪৬৩. সহিহুল বুখারি: ২৫৩৭।
৪৬৪. ফাতহুল বারি: ৫/১৬৮।
৪৬৫. ফাতহুল বারি: ৭/৩২২।
৪৬৬. ফাতহুল বারি: ৫/১৬৮।
৪৬৭. সহিহু মুসলিম: ১২১৮।
৪৬৮. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৮/১৮২।