📄 আত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতার কতিপয় নির্দেশ
আত্মীয়দের কারও সাথে মন্দ কিছু ঘটে গেলে, দুঃখ ও চিন্তা এসে তাঁকে গ্রাস করত। হামজা (রা) যখন শহিদ হলেন এবং তার লাশ বিকৃত করা হলো-তিনি অত্যন্ত শোকাতুর হয়ে পড়েন। একে তো প্রিয় চাচার বিয়োগব্যথা। তার ওপর চাচার লাশ বিকৃত করার বিষয়টি তাঁকে খুবই কষ্ট দেয়।
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'হামজার (রা) শাহাদাতের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পাশে এসে দাঁড়ালেন। হামজার (রা) শরীর বিকৃত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকালেন। প্রিয় চাচার বিকৃত শরীর দেখা ছিল তাঁর কাছে চরম বেদনাদায়ক। এর আগে কোনো আচরণে এতটা ব্যথা পাননি কখনো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন। তুমি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করতে। তুমি কল্যাণময় কাজে অগ্রগামী ছিলে। তোমার রেখে যাওয়া আত্মীয়রা যদি মনে কষ্ট না পেত, তবে আমি তোমার লাশ এখানেই ছেড়ে যেতাম আর হাশরের দিন তোমার দেহ জোড়া নিত বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে। আল্লাহর শপথ, তোমার স্থলে আমি তাদের ৭০ জনের দেহ বিকৃত করব।"
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানেই দাঁড়িয়েছিলেন। তখন জিবরাইল (আ) সুরা নাহলের শেষ দিকের অংশ নিয়ে আসলেন। আল্লাহ নাজিল করলেন:
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ وَلَئِن صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ
"যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চাও, তবে ততটুকু প্রতিশোধ গ্রহণ করো যতটুকু অন্যায় তোমাদের ওপর করা হয়েছে। আর যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো, তবে ধৈর্যধারণকারীদের জন্য অবশ্যই তা উত্তম।” (সুরা আন-নাহল, ১৬: ১২৬)
এ আয়াত নাজিলের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মনের ইচ্ছা দমন করলেন। আর কসমের কাফফারা আদায় করলেন।
টিকাঃ
৪৫২. মুসতাদরাকুল হাকিম ৪৮৯৪, তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির ৩/১৪৩। তাবারানির সনদে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। বিষয়টা হাফিজ ইবনে হাজার (রহ) উল্লেখ করেছেন ফাতহুল বারি ৭ম খণ্ড, ৩৭১ পৃষ্ঠায়।
📄 আত্মীয়দের জন্য বেশি বেশি দোয়া করতেন
আব্বাস (রা) ও তাঁর সন্তানদের জন্য দোয়া
ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, 'একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্বাসকে (রা) বললেন, "আগামীকাল সোমবার তুমি তোমার সন্তানকে নিয়ে আসবে। আমি তোমাদের জন্য এমন এক দোয়া করব, যার মাধ্যমে আল্লাহ তোমার সন্তানকে উপকৃত করবেন।"
পরের দিন আমরাও আব্বাসের (রা) সাথে চলে এলাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। তিনি দোয়া করলেন, "হে আল্লাহ, আব্বাসকে (রা) ক্ষমা করে দিন, আপনি তার সন্তানদেরও ক্ষমা করে দিন। তাদের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিন। সকল গুনাহ ধুয়ে মুছে সাফ করে দিন। হে আল্লাহ, আপনি তাকে তার সন্তানদের বিষয়াদিতে নিরাপদ রাখুন।"'
অর্থাৎ তাকে সন্তানদের মাধ্যমে সম্মানিত করুন এবং সন্তানদের নিয়ে যেন তিনি কষ্টে না পড়েন।
আলি (রা)-এর জন্য দোয়া
আলি (রা) বলেন, 'আবু তালিবের (রহ) মৃত্যুর পর আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম। বললাম, "আপনার বৃদ্ধ চাচা মৃত্যুবরণ করেছেন।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যাও, তাকে দাফন করো। তারপর কিছু না করে আমার কাছে আসো।"
আমি তাকে দাফন করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম। তিনি বললেন, "যাও, গোসল করে নাও, তারপর কিছু না করে আমার কাছে আসো।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথামতো আমি গোসল করে তাঁর কাছে আসলাম। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার জন্য এমন সব দোয়া করলেন, যার কারণে আমি এতটা খুশি হলাম, যদি আমাকে এর বদলে লাল ও কালো উটও দেওয়া হতো, তবুও আমি এতটা খুশি হতাম না।'
* ইবনে আব্বাস (রা)-এর জন্য দোয়া
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তাঁর বুকের সাথে মিলালেন। এরপর দোয়া করলেন, "হে আল্লাহ, আপনি তাকে হিকমাহ শিক্ষা দিন।"'
অন্য বর্ণনায় এসেছে ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শৌচাগারে প্রবেশ করলেন। আমি তখন তাঁর জন্য অজুর পানি রাখলাম। পরে তিনি জানতে চাইলেন, "এ পানি কে রাখল?" তাঁকে জানানো হলো, পানি আমি রেখেছি।'
তখন তিনি দোয়া করলেন, "হে আল্লাহ, আপনি তাকে দ্বীনের ফিকহ দান করুন।"'
মুসনাদে আহমাদের (রহ) বর্ণনায় (হাদিস: ৩০২৪) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দোয়ায় আরেকটু যুক্ত হয়ে এসেছে, 'তাকে কুরআনের ব্যাখ্যা শিখিয়ে দিন।'
টিকাঃ
৪৫৩. সুনানুত তিরমিজি: ২৭৬২। হাদিসের মান: হাসান।
৪৫৪. মুসনাদু আহমাদ: ৮০৯। হাদিসের মান: সহিহ।
৪৫৫. সহিহুল বুখারি: ৩৭৫৬।
৪৫৬. সহিহুল বুখারি: ১৪৩, সহিহু মুসলিম: ২৪৭৭।
📄 তাদের উপকারী দোয়া শেখাতেন
আব্বাস (রা) বলেন, 'একবার আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, "হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দিন, যা আমি আল্লাহর কাছে চাইতে পারি।" তিনি বললেন, "আপনি আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করুন।" কিছুদিন পর আমি পুনরায় একই কথা বললাম, "হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমাকে এমন কিছু শিক্ষা দিন, যা আমি আল্লাহর কাছে চাইতে পারি।" তিনি বললেন: يَا عَبَّاسُ يَا عَمَّ رَسُوْلِ اللهِ سَلِ اللَّهَ الْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
“হে আব্বাস, হে আল্লাহর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচা, আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের নিরাপত্তা প্রার্থনা করুন।"
আব্বাস (রা) বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমাকে দোয়া শিখিয়ে দিন। সে দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাব আমি।" তিনি বললেন, "আল্লাহর কাছে (আফিয়াত) সুস্থতা ও নিরাপত্তার প্রার্থনা করুন।"'
'আব্বাস (রা) আবেদন জানালেন, তাকে এমন একটি দোয়া শিখিয়ে দিতে, যার মাধ্যমে তিনি আল্লাহর কাছে চাইবেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার একই দোয়া করতে বললেন তাকে। এখান থেকে বোঝা যায় সুস্থতা ও নিরাপত্তার দোয়া হলো সর্বশ্রেষ্ঠ দোয়া। অন্য কোনো দোয়া এর সমকক্ষ নয়।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচা আব্বাসকে (রা) তাঁর বাবার সমান মর্যাদা দিতেন। একজন সন্তানের ওপর পিতার যে অধিকার থাকে, আব্বাস (রা)-এর প্রতি তিনি সেরূপ আচরণই করতেন।
আব্বাসের (রা) মতো এমন প্রিয় মানুষকে বিশেষভাবে এই দোয়া শেখানো এবং বারবার এই দোয়া করতে বলা-এই দুটি আচরণ থেকে আমরা বুঝতে পারি, আমাদের উচিত বেশি বেশি সুস্থতা ও নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা এবং এই দোয়ার মাধ্যমে বিপদাপদ থেকে নিজেদের রক্ষা করা।'
টিকাঃ
৪৫৭. সুনানুত তিরমিজি: ৩৫১৪। হাদিসের মান: সহিহ।
৪৫৮. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৯/৩৪৮।
📄 অসুস্থ আত্মীয়দের দেখতে যেতেন
উম্মে ফজল (রা) বলেন, 'আব্বাসের (রা) অসুস্থতার সময় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে এলেন। আব্বাস (রা) তখন রোগের তাড়নায় মৃত্যু কামনা করছিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "আব্বাস, আল্লাহর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাচা, মৃত্যু কামনা করবেন না। যদি আপনি নেক আমলকারী হয়ে থাকেন, তবে বেঁচে থাকলে আপনি আরও বেশি নেক আমল করতে পারবেন। আর যদি আপনি গুনাহগার হয়ে থাকেন, তবে বেঁচে থাকলে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমল করতে পারবেন। তাই মৃত্যু কামনা করবেন না।"'
টিকাঃ
৪৫৯. মুসনাদু আহমাদ: ২৬৩৩৩। হাদিসের মান: সহিহ।