📄 আত্মীয়দের সহযোগিতা নিতেন এবং তাদের দায়িত্ব দিতেন
কয়েকটি দৃষ্টান্ত নিম্নরূপ:
হিজরতের রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-তাঁর বিছানায় শোয়ার কঠিন সে দায়িত্ব আলিকে (রা)-কেই দিয়েছিলেন।
খাইবারের যুদ্ধের দিন আলিকে (রা)-কে মুসলিম বাহিনীর আমির নিযুক্ত করেন।
হজের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পক্ষ থেকে কুরবানির জন্য পশুগুলো রেখে অতিরিক্ত জন্তুগুলো আলিকে (রা)-কে দিয়ে দিয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উটগুলোর দায়িত্বও দিলেন তাকে। তার দায়িত্ব ছিল উট জবাইয়ের গোশত, চামড়া ও উটের ঝুল মানুষকে দান করা।
আলি (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদি হিসেবে একশটি উট নিয়েছিলেন সাথে। জবাইয়ের পর আমাকে গোশত বণ্টনের নির্দেশ দিলেন। আমি বণ্টন করে দিলাম। এরপর হুকুম দিলেন উটগুলোর ঝুল বণ্টন করার। আমি করলাম। এরপর নির্দেশ দিলেন উটগুলোর চামড়া বাটোয়ারা করে দেওয়ার। আমি তাও করলাম।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচাতো ভাই জাফরকে (রা) হাবশার মুহাজিরদের নেতৃত্বের দায়িত্ব দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে তিনিই হাবশার বাদশাহর কাছে প্রথম রিসালাতের ফরমান নিয়ে যান। তিনিই নাজ্জাশির (রহ) সামনে ইসলামের পরিচিতিমূলক সংক্ষিপ্ত অথচ সারগর্ভ ভাষণ দেন।
টিকাঃ
৪৪৬. সহিহুল বুখারি: ১৭০৭, সহিহু মুসলিম: ১৩১৭।
৪৪৭. সহিহুল বুখারি: ১৭১৮, সহিহু মুসলিম: ২৩২১।
📄 হাবশা থেকে জাফর -এর প্রত্যাগমনে আনন্দিত হন
খাইবার যুদ্ধের বিজয়ের পরপরই আগমন করে জাফর (রা)। তাকে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগিয়ে এলেন। তার কপালে চুমু খেলেন। তাকে জড়িয়ে ধরলেন। এরপর বললেন, 'আমি জানি না, আজ আমি কীসে বেশি আনন্দিত, জাফরের (রা) আগমনে না খাইবার বিজয়ের কারণে!' এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাফরকে (রা) মসজিদে নববির পাশেই একটি ঘর দিলেন থাকার জন্য। খাইবারের গনিমতের একাংশও দিলেন তাকে।
জাফরকে (রা) মুতার যুদ্ধে জাইদ বিন হারিসা (রা)-এর পরবর্তী সেনাপতি নিযুক্ত করেন।
এই যুদ্ধে তিনি শহিদ হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পরিবারকে সান্ত্বনা জানান এবং তাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন।
জাফরের (রা) ছেলে আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের একদলকে অভিযানে পাঠালেন। যাদের নেতৃত্বে ছিলেন জাইদ বিন হারিসা (রা)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "যদি জাইদ (রা) শহিদ হয়ে যায়, তবে তোমাদের আমির হবে জাফর (রা)। যদি জাফরও (রা) শহিদ হয়ে যায়, তবে তোমাদের আমির হবে আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা (রা)।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে তাদের সংবাদ এল। তিনি মানুষের সামনে এলেন। আল্লাহর প্রশংসা করে কথা শুরু করলেন। বললেন, "তোমাদের ভাইয়েরা শত্রুর মুখোমুখি হয়েছে। জাইদ (রা) পতাকা হাতে নিল। এরপর শহিদ হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করতে থাকল। তারপর পতাকা হাতে নিল জাফর বিন আবু তালিব (রা)। সেও শহিদ হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করতে থাকল। এরপর পতাকা হাতে নিল আব্দুল্লাহ বিন রওয়াহা (রা)। সেও শহিদ হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করতে থাকল। এরপর পতাকা হাতে নিল আল্লাহর তরবারি খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা)। আল্লাহ তার হাতে বিজয় দিলেন মুসলিমদের।"
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন দিন পর্যন্ত জাফরের (রা) পরিবারকে অবকাশ দিলেন জাফরের (রা) জন্য কাঁদা বা শোক প্রকাশের জন্য। তিন দিন পর তিনি এলেন। বললেন, "আজ বা আগামীকালকের পর থেকে তোমরা আমার ভাই জাফরের (রা) জন্য কাঁদবে না। তোমরা আমার ভাইয়ের সন্তানদের ডেকে দাও।"
এরপর আমাদের ডাকা হলো। আমাদের চুল দেখে মনে হচ্ছিল যেন এগুলো পাখির সদ্য গজানো পালক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "নাপিতকে ডাকো।"
নাপিতকে ডেকে আনা হলো। আমাদের সকলের মাথা মুণ্ডন করা হলো। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "মুহাম্মাদ বিন জাফর (রা) হচ্ছে আমাদের চাচা আবু তালিবের (রহ) মতো। আর আব্দুল্লাহর (রা) অবয়ব ও চরিত্র আমার মতো।" এতটুকু বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত উঁচু করে ধরে বললেন, "হে আল্লাহ আব্দুল্লাহকে (রা) পরিবারে জাফরের (রা) স্থলাভিষিক্ত করুন। তাকে ব্যবসায় বরকত দিন।" এ কথা তিনি তিনবার বললেন।
এরপর আমাদের মা এলেন। আমাদের এতিম হয়ে যাওয়ার কথা তুলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দুঃখভারাক্রান্ত করে দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি তাদের অভাবের ব্যাপারে ভয় করছ? তবে শুনে নাও, দুনিয়া-আখিরাতে আমিই তাদের অভিভাবক।"'
টিকাঃ
৪৪৮. মুসতাদরাকুল হাকিম: ৪২৪৯। হাদিসের মান: হাসান।
৪৪৯. জাফর (রা)-এর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস (রা) স্বামীর শোকে কাতর ছিলেন। তাই ছোট ছেলে-মেয়েদের মাথা চিরুনি করা, তাদের পরিপাটি রাখার প্রতি নজর দিতে পারেননি। ফলে তাদের মাথায় উকুন হয়ে যায়। তাই নাপিত ডেকে তাদের মাথা মুণ্ডন করে উকুনমুক্ত করা হয়।
৪৫০. মুসনাদু আহমাদ: ১৭৬৩। হাদিসের মান: হাসান।
📄 শিশুদের বাহনে তুলে নিতেন এবং মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন
আব্দুল্লাহ বিন জাফর (রা) বলেন, 'আমি, কুসাম (রা) ও উবাইদুল্লাহ (রা) বালক বয়সের ছিলাম। আমরা খেলতাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহনে চড়ে যাওয়ার সময় যদি আমাদের দেখতেন। বলতেন, "একে উঠিয়ে দাও।” কেউ আমাকে উঠিয়ে দিলে তিনি আমাকে বাহনে তাঁর সামনে বসিয়ে নিতেন। কুসামকে (রা) দেখিয়ে বলতেন, "একেও উঠিয়ে দাও।" কুসামকে (রা) উঠিয়ে দেওয়া হলে তাকে পেছনে বসিয়ে নিতেন।'
এরপর আমার মাথায় তিনবার হাত বুলিয়ে তিনবার এ দোয়া করতেন, "হে আল্লাহ, আপনি জাফরের (রা) সন্তানকে তার স্থলাভিষিক্ত করুন।"'
টিকাঃ
৪৫১. মুসনাদু আহমাদ: ১৭৫৩। হাদিসের মান: সহিহ।
📄 আত্মীয়দের প্রতি ভালোবাসা ও সহমর্মিতার কতিপয় নির্দেশ
আত্মীয়দের কারও সাথে মন্দ কিছু ঘটে গেলে, দুঃখ ও চিন্তা এসে তাঁকে গ্রাস করত। হামজা (রা) যখন শহিদ হলেন এবং তার লাশ বিকৃত করা হলো-তিনি অত্যন্ত শোকাতুর হয়ে পড়েন। একে তো প্রিয় চাচার বিয়োগব্যথা। তার ওপর চাচার লাশ বিকৃত করার বিষয়টি তাঁকে খুবই কষ্ট দেয়।
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'হামজার (রা) শাহাদাতের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পাশে এসে দাঁড়ালেন। হামজার (রা) শরীর বিকৃত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকালেন। প্রিয় চাচার বিকৃত শরীর দেখা ছিল তাঁর কাছে চরম বেদনাদায়ক। এর আগে কোনো আচরণে এতটা ব্যথা পাননি কখনো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন। তুমি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করতে। তুমি কল্যাণময় কাজে অগ্রগামী ছিলে। তোমার রেখে যাওয়া আত্মীয়রা যদি মনে কষ্ট না পেত, তবে আমি তোমার লাশ এখানেই ছেড়ে যেতাম আর হাশরের দিন তোমার দেহ জোড়া নিত বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে। আল্লাহর শপথ, তোমার স্থলে আমি তাদের ৭০ জনের দেহ বিকৃত করব।"
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানেই দাঁড়িয়েছিলেন। তখন জিবরাইল (আ) সুরা নাহলের শেষ দিকের অংশ নিয়ে আসলেন। আল্লাহ নাজিল করলেন:
وَإِنْ عَاقَبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْلِ مَا عُوقِبْتُم بِهِ وَلَئِن صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ
"যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চাও, তবে ততটুকু প্রতিশোধ গ্রহণ করো যতটুকু অন্যায় তোমাদের ওপর করা হয়েছে। আর যদি তোমরা ধৈর্যধারণ করো, তবে ধৈর্যধারণকারীদের জন্য অবশ্যই তা উত্তম।” (সুরা আন-নাহল, ১৬: ১২৬)
এ আয়াত নাজিলের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মনের ইচ্ছা দমন করলেন। আর কসমের কাফফারা আদায় করলেন।
টিকাঃ
৪৫২. মুসতাদরাকুল হাকিম ৪৮৯৪, তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির ৩/১৪৩। তাবারানির সনদে কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। বিষয়টা হাফিজ ইবনে হাজার (রহ) উল্লেখ করেছেন ফাতহুল বারি ৭ম খণ্ড, ৩৭১ পৃষ্ঠায়।