📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 পরিবার-পরিজনদের ইবাদতের ভুল শুধরে দিতেন

📄 পরিবার-পরিজনদের ইবাদতের ভুল শুধরে দিতেন


ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'একদিন আমি (আমার খালা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী) মাইমুনার (রা) ঘরে ঘুমিয়েছিলাম। দেখলাম, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে উঠে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সেরে মুখ ও হাত ধুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। এরপর আবার তিনি ঘুম থেকে উঠে পানির মশকের কাছে এসে তার ঢাকনা খুললেন। তারপর মাঝারি রকমের অজু করলেন-অধিক পানি ব্যবহার করলেন না। অথচ পরিপূর্ণ অজুই সেরে ফেললেন। এরপর নামাজে দাঁড়ালেন।'

এরপর আমিও জেগে উঠলাম। আড়মোড়া ভেঙে এমন ভান করলাম যেন তিনি বুঝতে না পারেন, আমি শুরু থেকেই তাঁকে লক্ষ করছি। আমি উঠে এসে অজু করে তাঁর বাঁ পাশে নামাজে দাঁড়ালাম। তিনি আমার কান ধরে ঘুরিয়ে এনে আমাকে ডান পাশে দাঁড় করিয়ে দিলেন।...'

টিকাঃ
৪৩৩. সহিহুল বুখারি: ৬৩১৬, সহিহু মুসলিম: ৭৬৪।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 আত্মীয়দের মন্দ কাজে বাধা দিতেন

📄 আত্মীয়দের মন্দ কাজে বাধা দিতেন


আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) বলেন, 'একদিনের কথা। ফজল (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে একই বাহনের পেছনে বসা ছিল। তখন সেখানে খাসআম গোত্রের এক মহিলা আসলো। ফজল (রা) ও সে মহিলা একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগল। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজলের (রা) মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিলেন।'

এরপর মহিলাটি বলল, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আল্লাহ বান্দাদের ওপর হজ ফরজ করেছেন। আমার বাবা একেবারেই বয়োবৃদ্ধ মানুষ। বাহনে চড়তে অক্ষম তিনি। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ আদায় করতে পারব?"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হাঁ।" আর ঘটনাটি বিদায় হজের সময়কার।'

টিকাঃ
৪৩৪. সহিহুল বুخারি: ১৫১৩, সহিহু মুসলিম: ১৩৩৪।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বিশেষ মুহূর্তে আপন আত্মীয়দের সাহায্য চাইতেন

📄 বিশেষ মুহূর্তে আপন আত্মীয়দের সাহায্য চাইতেন


আকাবার ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচা আব্বাসকে (রা) নিয়ে এসেছিলেন। ঘটনাটি কাব বিন মালিক (রা)-এর মুখে শোনা যাক। তিনি বলেন, 'আমরা হজে এলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ওয়াদা দিলেন তাশরিকের দিনগুলোর মধ্যবর্তী এক দিনে আসবেন তিনি। আমরা সময়মতো সাক্ষাতের স্থানে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অপেক্ষা করছিলাম। শেষ পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত হলেন। সাথে ছিলেন তাঁর চাচা আব্বাস (রা)। তখনো তিনি মুসলমান হননি। তবে তিনি চাচ্ছিলেন যে, ভাতিজার বিষয়টিতে তিনি হাজির থাকেন এবং আলোচনাটি সুদৃঢ় করেন।'

আমরা সবাই বসে পড়লাম। আব্বাস (রা) প্রথমে কথা আরম্ভ করেন। বলেন, "খাজরাজ গোত্র, তোমরা জানো মুহাম্মাদকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমরা আমাদের গোত্রের ভেতরের শত্রুদের থেকে নিরাপদে রেখেছি। তিনি আপন গোত্রের মাঝে সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে আছেন। কিন্তু তোমাদের সাথে গিয়ে মিলিত হওয়ার ব্যাপারে তিনি সংকল্পবদ্ধ। তোমরা যদি তোমাদের ওয়াদামাফিক তাঁকে সাহায্য করো এবং তাঁর শত্রুদের অনিষ্ট থেকে তাঁকে রক্ষা করতে সচেষ্ট থাকো, তবে ঠিক আছে। তোমরা যে জিম্মাদারি গ্রহণ করতে যাচ্ছ, আশা করি তার গুরুত্ব সম্পর্কে তোমাদের জানা আছে।"

কিন্তু যদি বিষয়টি এমন হয় যে, তোমাদের কাছে যাওয়ার পর তোমরা তাঁকে শত্রুদের হাতে সোপর্দ করবে, বিপদে তাঁর সাহায্য থেকে হাত গুটিয়ে নেবে, তবে এখনি তাঁকে পরিত্যাগ করো। কেননা, তিনি আপন গোত্রে সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তার সাথে আছেন।"

কাব (রা) বললেন, "আমরা আপনার কথা মেনে নিয়েছি।" তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে লক্ষ করে বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি কথাবার্তা বলুন। আপনি নিজের জন্য এবং আপনার রবের জন্য যা শর্ত নির্ধারণ করতে চান করুন।" এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা বললেন। কুরআন তিলাওয়াত করলেন; আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন এবং সমবেত লোকদের ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করলেন....'

টিকাঃ
৪৩৫. মুসনাদু আহমাদ: ১৫৩৭১। হাদিসের মান: সহিহ।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 আত্মীয়দের প্রতি অনুগ্রহ করতেন

📄 আত্মীয়দের প্রতি অনুগ্রহ করতেন


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেকভাবে আত্মীয়দের প্রতি দয়া করতেন। তার মধ্যে একটি হচ্ছে, অবিবাহিত আত্মীয়দের বিয়ের ব্যবস্থা করা। এ ব্যাপারে হাদিসে এসেছে, আব্দুল মুত্তালিব বিন রাবিআ বিন হারিস (রা) বলেন, 'রাবিআ বিন হারিস (রা) (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচাতো ভাই) ও আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা) পরস্পর বলছিলেন, "আল্লাহর শপথ, যদি আমরা এ দুজনকে (আব্দুল মুত্তালিব বিন রাবিআ (রা) ও ফজল বিন আব্বাস (রা)) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে পাঠাই। তারা দুজন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দুজনকে সাদাকা আদায়ের কাজে লাগিয়ে দেবেন। তারা অন্যদের মতো সাদাকা উত্তোলন করে দেবে। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরও তা-ই দেবেন, যা অন্য সাদাকা উত্তোলনকারীদের দিয়ে থাকেন।"

তাদের কথা বলার সময় আলি (রা) এসে উপস্থিত হলেন। তারা দুজন আলিকে (রা) বললেন ব্যাপারটা। আলি (রা) বললেন, "এমনটা করবে না। আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো এমনটা করবেন না। (তথা সাদাকা উত্তোলনের পারিশ্রমিক দেবেন না।)"

আলির (রা) কথায় রাবিআ বিন হারিস (রা) রাগান্বিত হয়ে বললেন, "আল্লাহর শপথ, তুমি আমাদের প্রতি হিংসাবশতই এমন বলছ। আল্লাহর কসম, তুমি তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জামাই হয়েছ, আমরা তো তোমার প্রতি হিংসা পোষণ করি না।"

এরপর আলি (রা) "ঠিক আছে। তাদের পাঠিয়ে দাও।" বলে নিজের গায়ের চাদর বিছিয়ে সেখানে শুয়ে পড়লেন। বললেন, "আমি সাইয়িদ হাসানের (রা) পিতা। আল্লাহর কসম, তোমরা যে উদ্দেশ্যে তোমাদের ছেলেদের পাঠালে তার (বিফলতার) জবাব না আসা পর্যন্ত আমি এখান থেকে নড়ছি না।"

আব্দুল মুত্তালিব (রা) বলেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জোহর পড়ে আসার আগেই আমরা তাঁর ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। তিনি এসে আমাদের দুজনের কান ধরে স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন, "কী উদ্দেশ্যে এসেছ, না লুকিয়ে বলে ফেলো।"

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশ করলেন। আমরাও তাঁর সাথে এলাম ঘরের ভেতর। সেদিন তিনি জাইনাব বিনতে জাহাশের (রা) ঘরে ছিলেন। কথা বলার জন্য আমরা একে অন্যকে বলছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমাদের একজন কথাটা তুলল। বলল, “আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি মানুষের প্রতি সর্বোচ্চ অনুগ্রহকারী। সর্বোত্তম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী। আমরা বিয়ের উপযুক্ত হয়েছি। তাই আপনার কাছে এসেছি, যদি আপনি আমাদের সাদাকা উত্তোলনের কাজ দেন, তবে আমরা অন্যদের মতো সাদাকা তুলে দেবো, আপনি অন্যদের যে রকম পারিশ্রমিক দেন, আমাদেরও তেমন দেবেন।"

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত আমরাই কথা বলার জন্য উদ্যত হচ্ছিলাম এমন সময় জাইনাব (রা) পর্দার আড়াল থেকে ইশারা করে আমাদের চুপ থাকতে বললেন।

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবার-পরিজনের জন্য সাদাকা ভক্ষণ করা সমীচীন নয়। সাদাকা মানুষের (সম্পদের) ময়লা। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরিবারের জন্য এটা হালাল নয়। তোমরা মাহমিয়া বিন জাজ' (রা) ও নাওফাল বিন হারিস বিন আব্দুল মুত্তালিবকে (রা) ডেকে আনো।" বনু আসাদের এক লোকের নাম ছিল মাহমিয়া (রা)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে খুমুসের কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত করেছিলেন।

তারা দুজন এলে মাহমিয়াকে (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'এ ছেলের কাছে তোমার মেয়েকে বিয়ে দাও'-এই বলে তিনি ফজল বিন আব্বাসের (রা) দিকে ইশারা করলেন। মাহমিয়া (রা) তাকে তার মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দিল।

তারপর আমার (আব্দুল মুত্তালিব রা) দিকে ইশারা করে নাওফাল বিন হারিসকে (রা) বললেন, "এ ছেলের সাথে তোমার মেয়ের বিয়ে দাও।" নাওফাল (রা) তার মেয়ের সাথে আমার বিয়ে দিলেন।

এরপর তিনি মাহমিয়াকে (রা) বললেন, "খুমুসের সম্পদ থেকে এত এত পরিমাণ এদের দুজনকে দাও।"'

ইমাম নববি (রহ) বলেন:

'খুমুসের ভান্ডার থেকে এদের দাও-হতে পারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটাত্মীয় হওয়ার কারণে খুমুস থেকে তারা দুজন একটা অংশ পেয়েছিলেন। কারণ, তারা দুজন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটাত্মীয় ছিলেন। আবার এও হতে পারে যে, খুমুসের যে অংশ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেতেন, সেখান থেকেই তাদের দুজনকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।'

টিকাঃ
৪৩৬. জিহাদে মুজাহিদরা যে গনিমত লাভ করে, তার এক-পঞ্চমাংশকে খুমুস বলা হচ্ছে। (অনুবাদক)
৪৩৭. সহিহু মুসলিম: ১০৭২।
৪৩৮. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৭/১৮০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00