📄 আত্মীয়-স্বজন ও পরিবার-পরিজন্দের সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দিতেন
জাইদ বিন আরকাম (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন এক জলাশয়ের পাশে খুতবা দেওয়ার জন্য আমাদের সামনে দাঁড়ালেন। মক্কা ও মদিনার মঝামাঝি অবস্থিত এই জলাশয়টি খুম্ম নামে পরিচিত ছিল। তিনি হামদ পড়লেন, আল্লাহর প্রশংসা করলেন, ওয়াজ করলেন, নসিহত করলেন। এভাবে একসময় বললেন, "হে লোকসকল, আমি একজন মানুষ। অচিরেই আমার কাছে প্রভুর ফেরেশতা আসবে। আর আমিও তাঁর ডাকে সাড়া দেবো। আমি তোমাদের নিকট দুটি ভারী জিনিস রেখে যাচ্ছি। একটি হচ্ছে আল্লাহর কিতাব। এতে রয়েছে হিদায়াত ও আলোকবর্তিকা। যে ব্যক্তি এটিকে আঁকড়ে ধরবে, সে সঠিক পথের ওপর থাকবে। আর যে ব্যক্তি এ কিতাব ছেড়ে দেবে, সে পথভ্রষ্ট হবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে আমার আহলে বাইত তথা পরিবার-পরিজন। আমি আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি তোমাদের। আমি আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি তোমাদের। আমি আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি তোমাদের।"
বর্ণনাকারী হুসাইন বিন সাবরাহ (রহ) জাইদ বিন আরকামকে (রা) জিজ্ঞেস করলেন, "জাইদ, আহলে বাইত কারা? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণ কি আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত নন?" জাইদ (রা) উত্তর দিলেন, "হাঁ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আহলে বাইত দ্বারা তারা উদ্দেশ্য, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পর যাদের জন্য সাদাকা-জাকাত গ্রহণ করা জায়িজ নয়।" হুসাইন (রহ) জিজ্ঞেস করলেন, "তারা কারা?" জাইদ (রা) উত্তর দিলেন, "তারা হচ্ছে, আলি (রা), আকিল (রা), জাফর (রা) ও আব্বাসের (রা) পরিবার ও বংশধর।"'
আবু বকর (রা) বলতেন, 'তোমরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবার-পরিজনদের হিফাজত করো।' অর্থাৎ 'তাদের অধিকার আদায় করো। তাদের কষ্ট দিয়ো না। তাদের প্রতি দুর্ব্যবহার কোরো না।'
আয়িশা (রা) বর্ণনা করেন, 'আবু বকর (রা) আলিকে (রা) বললেন, 'সে সত্তার কসম-যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমার আত্মীয়দের প্রতি সদাচরণের চাইতে আল্লাহর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্মীয়দের প্রতি সদাচরণ করাকে আমি অধিক পছন্দ করি।"'
টিকাঃ
৪১৬. সহিহু মুসলিম: ২৪০৮।
৪১৭. সহিহুল বুখারি: ৩৭১৩।
৪১৮. ফাতহুল বারি: ৭/৭৯।
৪১৯. সহিহুল বুখারি: ৩৭১২।
📄 মায়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মায়ের কবর দেখতে গেলেন। সেখানে নিজে কাঁদলেন। অন্যদেরও কাঁদালেন। বললেন, "আমি আল্লাহর কাছে অনুমতি চাইলাম আমার মায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার। কিন্তু আল্লাহ অনুমতি দেননি আমাকে। আল্লাহর কাছে অনুমতি চাইলাম আমার মায়ের কবর জিয়ারত করার। তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন। তাই তোমরা কবর জিয়ারত করো। কারণ, কবরের জিয়ারত মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।"'
তাঁর মা ইসলামের দিনগুলো পেলেন না। ইসলামও গ্রহণ করতে পারলেন না। তাই মায়ের কবরের পাশে গিয়ে তিনি কেঁদেছিলেন।
বুরাইদা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগিয়ে গিয়ে থামলেন চিহ্নিত একটি কবরের পাশে। বসলেন সেখানে। অন্যরাও বসে পড়ল তাঁর পাশে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাথা দোলাতে লাগলেন, যেন কারও কথা শুনছেন। এরপর কেঁদে উঠলেন।'
তখন উমর (রা) এগিয়ে গিয়ে বললেন, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি কাঁদছেন কেন?"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, "এটি আমিনা বিনতে ওয়াহাবের (রহ) কবর। আমি আল্লাহর কাছে অনুমতি চাইলাম আমার মায়ের কবর জিয়ারত করার। তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন। আল্লাহর কাছে অনুমতি চাইলাম আমার মায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার। কিন্তু তিনি অনুমতি দেননি। তাই আমি দুঃখ-ভারাক্রান্ত হয়ে কাঁদছি।" বুরাইদা (রা) বলেন, সেদিনের মতো একসঙ্গে এত বেশি সংখ্যক মানুষকে আমি কখনো কাঁদতে দেখিনি।'
টিকাঃ
৪২০. সহিহু মুসলিম: ৯৭৬।
৪২১. বাইহাকি (রহ) কৃত দালায়িলুন নুবুওওয়াহ: ১/১৮৯। হাদিসের মান: সহিহ।
📄 আত্মীয়দের ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী ছিলেন
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'যখন আল্লাহ নাজিল করলেন : وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ - আপনি নিকটতম আত্মীয়দের সতর্ক করে দিন। (সুরা আশ-শুআরা, ২৬: ২১৪)। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে দাঁড়ালেন। নিজ পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনদের উদ্দেশে বললেন, "কুরাইশ সম্প্রদায়, তোমরা নিজেদের আজাব থেকে রক্ষা করো। আমি আল্লাহর আজাব থেকে তোমাদের বাঁচাতে পারব না। আব্দে মানাফের বংশধরেরা, আমি আল্লাহর আজাব থেকে তোমাদের বাঁচাতে পারব না।"
হে আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা), আমি আল্লাহর আজাব থেকে তোমাদের বাঁচাতে পারব না। হে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফুফু সাফিয়্যা (রা), আমি আল্লাহর আজাব থেকে তোমাদের বাঁচাতে পারব না। হে মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা ফাতিমা (রা), তুমি আমার সম্পদ থেকে যা দরকার চেয়ে নাও; কিন্তু আমি আল্লাহর আজাব থেকে তোমাদের বাঁচাতে পারব না।"'
মুসলিমের (রহ) এক রিওয়ায়াতে (হাদিস: ২০৪) এসেছে, এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'তবে আমি তোমাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করব।'
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'প্রথমেই নিকটাত্মীয়দের দাওয়াত দেওয়ার আদেশের মর্ম হচ্ছে, যদি ইসলামের সত্যতা আত্মীয়দের ওপর প্রতিষ্ঠা পায়, তবে অন্যদের ওপরও এটি অনায়াসে কার্যকর হবে।'
টিকাঃ
৪২৩. সহিহুল বুখারি: ২৭৫৪, সহিহু মুসলিম: ২০৬।
৪২৪. ফাতহুল বারি: ৮/৫০৩।
📄 আত্মীয়দের দাওয়াত প্রদানে
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিকটাত্মীয়দের অন্যতম আলি (রা)-কে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তিনি তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে মুসলিম হয়ে গেলেন। আলি (রা) ছিলেন ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম কিশোর।
তিরমিজি (রহ) বলেন, 'কতক আলিম (রহ) বলেন, পুরুষদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী আবু বকর (রা)। আলি (রা) আট বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন। নারীদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন খাদিজা (রা)।'
চাচা আবু তালিবের (রহ) ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে বেশ সচেষ্ট ছিলেন
সাইদ বিন মুসাইয়িব (রহ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, 'যখন আবু তালিবের (রহ) মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন তার কাছে। এসে দেখলেন, আবু তালিবের (রহ) পাশে আবু জাহেল (রহ) ও আব্দুল্লাহ বিন আবু উমাইয়া বিন মুগিরা (রহ) বসা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচার উদ্দেশে বললেন, "চাচা, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ুন। এ বাক্যটি পড়ুন। আমি এর মাধ্যমে আল্লাহর সামনে প্রমাণ পেশ করব।” অন্য বর্ণনায় এসেছে, "এর মাধ্যমে আমি আল্লাহর সামনে সাক্ষ্য পেশ করব।"
আবু জাহেল (রহ) ও ইবনে আবু উমাইয়া (রহ) আবু তালিবের (রহ) উদ্দেশে বলতে লাগল, "তুমি কি আব্দুল মুত্তালিবের (রহ) ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে?"
ওদিকে আবু তালিবের (রহ) শেষ কথা বলা পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে কথাটি বলতে থাকলেন তার সামনে। আবু তালিবের (রহ) শেষ কথা ছিল, তিনি আব্দুল মুত্তালিবের (রহ) ধর্মের ওপর থাকবেন। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতে তিনি অস্বীকার করলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, "আল্লাহর কসম, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে নিষেধ না করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে যাব।"
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ "নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুমিনদের জন্য সংগত নয় মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। (সুরা আত-তাওবা, ৯ ১১৩)" আল্লাহ তাআলা إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ - "আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। (সুরা আল-কাসাস, ২৮: ৫৬)"'
ইমাম আহমাদের (রহ) বর্ণনায় আছে, 'আবু তালিব (রহ) তার শেষ কথায় বলেছিলেন, "মৃত্যুর ভয়ে আমি ইসলাম গ্রহণ করছি" এ কথা বলে কুরাইশরা আমাকে লজ্জা দেওয়ার আশঙ্কা না থাকলে আমি এ কালিমা পাঠ করে তোমার অন্তর শীতল করতাম।"'
যদিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচা কাফির অবস্থায় মারা গেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনবরত তার জন্য শাফাআত করতে থাকার কারণে আল্লাহ তার আজাব কম করে দিয়েছেন।
আবু তালিব (রহ) সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ের আজাব পাবে। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য সুপারিশ করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "জাহান্নামের সর্বনিম্ন আজাব হবে আবু তালিবের (রহ)। আগুনের দুটি জুতো পরিয়ে দেওয়া হবে তাকে। এতে তার মস্তিষ্ক ফুটতে থাকবে।"'
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আরেক চাচা আব্বাস (রা) জিজ্ঞেস করলেন, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি কি আবু তালিবের (রহ) কোনো উপকার করতে পেরেছেন? সে তো আপনার হিফাজত করেছেন, আপনার হয়ে অন্যদের বিরোধিতা করেছেন।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "হাঁ, তার পায়ের গোছা পর্যন্ত আগুনে রয়েছে। যদি আমি উপকারে না আসতাম, তবে জাহান্নামের নিম্নস্থলে জায়গা হতো তার।"'
টিকাঃ
৪২৫. সুনানুত তিরমিজি: ৫/৬৪২।
৪২৬. সহিহুল বুখারি: ৩৮৮৮৪, সহিহু মুসলিম: ২৪।
৪২৭. মুসনাদু আহমাদ: ৯৩২৭।
৪২৮. সহিহু মুসলিম: ২১১।
৪২৯. সহিহু মুসলিম: ২০৯।