📄 শিশুদের দুষ্টুমিকে বিরক্ত হতেন না
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'একবার আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে ইশার নামাজ পড়ছিলাম। তিনি যখন সিজদায় যেতেন হাসান-হুসাইন (রা) সাথে সাথে লাফ দিয়ে তাঁর পিঠে চড়ে বসত। তিনি যখন সিজদা থেকে মাথা তুলতেন, তখন তাঁর পিঠ থেকে আস্তে করে তাদের নামিয়ে রাখতেন। এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদায় গেলে, তারা আবারও তাঁর পিঠে চড়ে বসত, আর তিনি তাদের নামিয়ে রাখতেন। নামাজ শেষে তিনি তাদেরকে উরুর ওপর বসিয়ে নিলেন। তখন আমি এগিয়ে এসে বললাম, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি কি তাদের ঘরে দিয়ে আসব?" সে সময় আকাশে বিদ্যুৎ চমকের শব্দ শোনা গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "তোমরা মায়ের কাছে যাও।" তারা মায়ের কাছে পৌঁছার আগ পর্যন্ত বিদ্যুৎ চমকের আলো থেমে ছিল।'
আবু বাকরা (রা) বলেন, 'একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ পড়ছিলেন। তিনি যখন সিজদায় যেতেন হাসান (রা) তাঁর পিঠে-কাঁধে উঠে পড়তেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধীরে ধীরে সিজদা থেকে উঠতেন, যাতে হাসান (রা) পড়ে না যায়। একাধিকবার এমনটা করলেন তিনি।'
নামাজ শেষে লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানতে চাইলেন, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমরা দেখলাম আপনি হাসানকে (রা) নিয়ে এমন কিছু করলেন, যা এর আগে কখনো করেননি।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "হাসান (রা) দুনিয়ায় আমার সুগন্ধময় ফুল। আমার এ সন্তান একজন নেতা। আশা করি, আল্লাহ তাআলা তার মাধ্যমে মুসলিমদের দুটি দলের মধ্যকার বিভেদ মিটিয়ে দেবেন।"'
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, শিশুদের মসজিদে আনা জায়িজ।
নাতি-নাতনিদের সাথে তাঁর আচরণের ভিত্তি ছিল দয়া ও স্নেহ। ছোট্ট শিশুর প্রয়োজন ভালোবাসা, স্নেহ, আদর ও মায়ার। শিশুর এ প্রয়োজন পূরণ করবে তার পিতামাতা। খাবার ও পানি যেমন প্রয়োজনীয় তাদের জন্য, তেমনই আদর-স্নেহ-ভালোবাসাও অপরিহার্য। আদর ও ভালোবাসায় ঘেরা একটি পরিবেশ দরকার শিশুর স্থির ও সরল ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য।
টিকাঃ
৩৮৯. মুসনাদু আহমাদ: ১০২৮১। হাদিসের মান: সহিহ।
৩৯০. মুসনাদু আহমাদ: ১৯৯৯৪। হাদিসের মান: সহিহ।
৩৯১. শিশুদের মসজিদে না আনার নিষেধাজ্ঞায় "তোমরা শিশু ও পাগলদের মসজিদ থেকে দূরে রাখো" বর্ণিত হাদিসটি জইফ। সুনানু ইবনি মাজাহ ৭৫০। হাদিসের সনদের রাবি ওয়াসিলা বিন আসকা (রা) জইফ। দেখুন, জইফুল জামি': ২৬৩৬।
📄 নাতিদের অনেক ভালোবাসতেন
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে দিনের বেলা বের হলাম। তিনি আমার সাথে কথা বললেন না। আমিও তাঁর কাছে কিছু জানতে চাইনি। এভাবে আমরা পৌঁছালাম বনু কাইনুকার বাজারে। এরপর তিনি ফিরতি পথ ধরলেন। আমি এলাম তাঁর সাথে। ফাতিমার (রা) ঘরের সামনে এসে "ছোট ছেলেটি কোথায়? ছোট ছেলেটি কোথায়?" বলে তিনি হাসানকে (রা) ডাকছিলেন। আমরা ধারণা করছিলাম, হাসানের (রা) মা তাকে ধরে রেখেছে গোসল করে মালা পরিয়ে তারপর পাঠাবে বলে। কিন্তু একটু পরই হাসান (রা) দ্রুত গতিতে চলে এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও হাসান (রা), দুজন দুজনকে আলিঙ্গন করলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে আল্লাহ, আমি একে ভালোবাসি। তাই আপনিও তাকে ভালোবাসুন। যে একে ভালোবাসবে, আপনি তাকেও ভালোবাসুন।"'
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'সেদিন আল্লাহর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে কথা বলার পর থেকে হাসানের (রা) চেয়ে অধিক প্রিয় আর কেউ নেই আমার কাছে।'
ইমাম নববি (রহ) বলেন, 'হাদিসের আলোকে শিশুদের আদর-স্নেহে সিক্ত করা, তাদের সোহাগ করে কথা বলা, তাদের সাথে নম্র ব্যবহার করাসহ এমন অন্যান্য আচরণ মুসতাহাব। হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয়, ছেলে শিশুদেরও মালা ইত্যাদি পরানো জায়িজ। শিশুদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা মুসতাহাব। বিশেষ করে তারা যখন মর্যাদাসম্পন্ন লোকদের নিকট যাবে তখন।'
টিকাঃ
৩৯২. সহিহুল বুখারি ৫৮৮৪, সহিহু মুসলিম: ২৪২১।
৩৯৩. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৫/১৯৩। ঈষৎ পরিমার্জিত।
📄 রাসূল ﷺ-এর দুই নাতি হাসান-হুসাইন ছিলেন তাঁর জন্য বিশেষ উপহার
ইবনে উমর (রা) বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, "হাসান (রা) ও হুসাইন (রা) দুনিয়াতে আমার সুগন্ধময় ফুল।"'
'অর্থাৎ আল্লাহ তাদের দান করেছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে। উপহার দিয়েছেন তাঁকে। মানুষ ফুল দেখলে যেমন চুমু খায়, ফুলকে আদর করে, তেমনই হাসান-হুসাইনও (রা) যেন ফুলের মতো-যাদের আদর করে চুমু খেতেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।'
টিকাঃ
৩৯৪. সহিহুল বুখারি: ৩৭৫৩, সুনানুত তিরমিজি: ৩৭৭০। শব্দউৎস: সুনানুত তিরমিজি।
৩৯৫. ফাতহুল বারি: ১০/৪২৭।
📄 রাসূল ﷺ তাঁর নাতিদের বুকে জড়িয়ে চুমু খেতেন
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান বিন আলিকে (রা) চুমু খেলেন। তখন পাশে বসা আকরা বিন হাবিস (রা) বলল, "আমার দশজন সন্তান। কখনো আমি তাদের কাউকে চুমু দিইনি।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকরার (রা) দিকে তাকিয়ে বললেন, "যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।"'
হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'আকরা (রা)-এর প্রতি বলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার মধ্যে এ ব্যাপারে ইঙ্গিত রয়েছে যে, শিশুদের চুমু খাওয়া স্নেহ, দয়া ও ভালোবাসার পরিচয়। অনুরূপভাবে শিশুদের বুকের সঙ্গে লাগানো, তাদের ঘ্রাণ নেওয়া ইত্যাদিও স্নেহের নিদর্শন।'
নাতিদের কাঁধে চড়াতেন
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে এলেন। তখন তাঁর এক কাঁধে হাসান (রা)। অন্য কাঁধে হুসাইন (রা)। তিনি একবার হাসানকে (রা) চুমু দেন, তো আবার হুসাইনকে (রা) চুমু দেন। এভাবে তিনি আমাদের কাছে এসে পড়লেন। তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি তাদের দুজনকে ভালোবাসেন।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যে এ দুজনকে ভালোবাসল, সে আমাকে ভালোবাসল। আর যে এ দুজনের প্রতি রাগান্বিত হলো, সে আমার প্রতি রাগান্বিত হলো।"'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ থেকে আমরা কত দূরে! আমাদের সমাজের চিত্রের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শকে মিলাতে গেলে আমাকে হতাশা ঘিরে ধরে। আজকাল সন্তানরা মা-বাবার আদর-স্নেহ পায় না বললেই চলে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিশু সন্তান থাকে বুয়ার কোলে। শিশুরা বেড়ে ওঠে আদর-যত্নহীন। তাদের ব্যক্তিত্ব গঠিত হয় না। এমনকি তাদের কথা বলার ভাষা পর্যন্ত বিশুদ্ধ, প্রাঞ্জল ও পরিপুষ্ট হয় না। কারণ বুয়াদের কাছে থেকে এরা অশুদ্ধ ভাষায় আয়ত্ত করে।
টিকাঃ
৩৯৬. সহিহুল বুখারি: ৫৯৯৭, সহিহু মুসলিম: ২৩১৮।
৩৯৭. ফাতহুল বারি: ১০/৪৩০।
৩৯৮. সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৪৩, মুসনাদু আহমাদ: ৯৩৮১। হাদিসের মান: সহিহ।