📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নাতিদের মসজিদে নিয়ে আসতেন

📄 নাতিদের মসজিদে নিয়ে আসতেন


আবু বাকরাহ (রা) বলেন, 'একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি মিম্বারের ওপর উপবিষ্ট দেখতে পাই। পাশে হাসান বিন আলি (রা)। সে একবার মানুষের দিকে তাকায় আরেকবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে তাকায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলছিলেন, “আমার এ নাতি একজন মহান নেতা। আল্লাহ তাআলা তার মাধ্যমে মুসলিমদের দুটি বড় দলের মধ্যে মীমাংসা করবেন।”'

বুরাইদা বিন হুসাইব (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন হাসান (রা) ও হুসাইনকে (রা) দেখা গেল তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। গায়ে তাদের লাল জামা। হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খাওয়ার উপক্রম করছে, আবার সোজা হয়ে পা ফেলছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বার থেকে নেমে এসে তাদের কোলে নিয়ে মিম্বারে উঠে গেলেন। এবং বললেন, “আল্লাহ সত্যি বলেছেন: إِنَّا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ - “তোমাদের সম্পদ ও সন্তানসন্ততি তোমাদের জন্য পরীক্ষার বস্তু।” (সুরা আত-তাগাবুন, ৬৪ ১৫) আমি এ দুজনকে দেখে আর স্থির থাকতে পারলাম না।" এতটুকু বলার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবায় ফিরে গেলেন আবার।'

'হোঁচট খাওয়ার উপক্রম করছে অর্থাৎ শিশুসুলভ দুর্বলতার কারণে কচি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে একবার এদিকে ঝুঁকে যাচ্ছে তো আবার ওদিকে টলে পড়তে চাইছে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দুজনকে কোলে তুলে নিলেন। আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন এ পৃথিবীতে। এ ঘটনায় আমরা তারই একখণ্ড চিত্র দেখতে পাই।'

ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'আর আল্লাহর বাণী : إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, সম্পদ ও সন্তান মানুষের মন আচ্ছন্ন করে রাখে, ফলে মানুষ আল্লাহর ইবাদতে অগ্রগামী হতে পারে না। হাদিসের মাঝে আমরা দেখেছি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা দেওয়া বন্ধ করে নেমে এসেছেন তাঁর দুই নাতির জন্য। সন্তানের প্রতি হৃদয়ে লালিত ভালোবাসাই তাঁকে এ কাজ করতে বাধ্য করেছে। সন্তানের কারণে আসা ফিতনা বা পরীক্ষা কয়েক স্তরের হয়। হাদিসে বর্ণিত এ পরীক্ষার স্তরটি ছিল নিম্ন একটি স্তর। কখনো কখনো কারও কারও ক্ষেত্রে ভয়াবহ স্তরে এসে দাঁড়ায়। তাই সাবধান থাকতে হবে সম্পদ ও সন্তানের ফিতনার ব্যাপারে।'

টিকাঃ
৩৮০. সহিহুল বুখারি: ২৭১৪।
৩৮১. সুনানু আবি দাউদ ১১০৯, সুনানুত তিরমিজি: ৩৭৭৪, সুনানুন নাসায়ি ১৪১৩, সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩৬০০। হাদিসের মান: সহিহ।
৩৮২. হাশিয়াতুস সিনদি আলা সুনানিন নাসায়ি: ৩/১০৮।
৩৮৩. ফাতহুল বারি: ১১/২৫৪। ঈষৎ পরিমার্জিত।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নামাজের সময় তাদের কাউকে কাঁধে উঠিয়ে নিতেন

📄 নামাজের সময় তাদের কাউকে কাঁধে উঠিয়ে নিতেন


আবু কাতাদা আনসারি (রা) বলেন, 'আমি দেখলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষদের সাথে নিয়ে নামাজে ইমামতি করছেন। আবুল আস (রা) ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কন্যা জাইনাবের (রা) মেয়ে, রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাতনি উমামা (রা) তখন রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁধে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রুকুতে যেতেন, তাকে নামিয়ে রাখতেন। আবার যখন সিজদায় যেতেন, তাকে উঠিয়ে নিতেন।'

টিকাঃ
৩৮৪. সহিহুল বুখারি: ৫১৬, সহিহু মুসলিম ৫৪৩। শব্দউৎস সহিহু মুসলিম।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নামাজের মাঝে নাতিদের শিশুসুলভ আচরণ সহ্য করতেন

📄 নামাজের মাঝে নাতিদের শিশুসুলভ আচরণ সহ্য করতেন


শাদ্দাদ (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন মাগরিব বা ইশার সময় মসজিদে এলেন হাসান (রা) বা হুসাইনকে (রা) কোলে করে। তারপর উভয়কে একপাশে রেখে তাকবির বলে নামাজ শুরু করলেন। একসময় সিজদায় গেলেন। কিন্তু আর উঠছিলেন না তিনি। সিজদা দীর্ঘ হতে দেখে আমি সিজদা থেকে মাথা তুললাম। দেখলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিঠে বসে আছে শিশু নাতি। অবস্থা দেখে আমি আবার সিজদায় চলে গেলাম।'

নামাজ শেষে মানুষজন বলল, "আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি নামাজে অনেক দীর্ঘ সিজদা করেছেন! আমরা ভেবেছিলাম, আপনার কোনো সমস্যা হয়েছিল কিংবা আপনার ওপর ওহি নাজিল হচ্ছিল।"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, "এমন কিছুই হয়নি। বরং আমার সন্তানটি পিঠে চড়ে বসে। তাই আমি দ্রুত উঠতে চাইনি। চাইছিলাম, সে তার খেলা শেষ করুক এরপর সিজদা থেকে উঠি।"

টিকাঃ
৩৮৫. যদি কোনো মুসল্লি আশঙ্কা করে যে ইমামের কিছু হয়েছে, তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সিজদা থেকে মাথা তোলা জায়িজ আছে। আর নামাজও শুদ্ধ হবে তার। তেমনিভাবে ইমাম তাকবির দিয়েছে ধারণা করে যদি কেউ মাথা তুলে দেখে, আসলে ইমাম এখনও সিজদায় আছে, তাকবির দেয়নি-এ মাথা তোলার কারণেও নামাজের কোনো ক্ষতি হবে না। তার নামাজও শুদ্ধ হবে।
৩৮৬. মৃত্যু বা অসুস্থতা।
৩৮৭. পিঠে চড়ে বাহনে চড়ার খেলাটি খেলছিল।
৩৮৮. সুনানুন নাসায়ি ১১৪১। হাদিসের মান: সহিহ।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 শিশুদের দুষ্টুমিকে বিরক্ত হতেন না

📄 শিশুদের দুষ্টুমিকে বিরক্ত হতেন না


আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'একবার আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে ইশার নামাজ পড়ছিলাম। তিনি যখন সিজদায় যেতেন হাসান-হুসাইন (রা) সাথে সাথে লাফ দিয়ে তাঁর পিঠে চড়ে বসত। তিনি যখন সিজদা থেকে মাথা তুলতেন, তখন তাঁর পিঠ থেকে আস্তে করে তাদের নামিয়ে রাখতেন। এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদায় গেলে, তারা আবারও তাঁর পিঠে চড়ে বসত, আর তিনি তাদের নামিয়ে রাখতেন। নামাজ শেষে তিনি তাদেরকে উরুর ওপর বসিয়ে নিলেন। তখন আমি এগিয়ে এসে বললাম, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি কি তাদের ঘরে দিয়ে আসব?" সে সময় আকাশে বিদ্যুৎ চমকের শব্দ শোনা গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "তোমরা মায়ের কাছে যাও।" তারা মায়ের কাছে পৌঁছার আগ পর্যন্ত বিদ্যুৎ চমকের আলো থেমে ছিল।'

আবু বাকরা (রা) বলেন, 'একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ পড়ছিলেন। তিনি যখন সিজদায় যেতেন হাসান (রা) তাঁর পিঠে-কাঁধে উঠে পড়তেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধীরে ধীরে সিজদা থেকে উঠতেন, যাতে হাসান (রা) পড়ে না যায়। একাধিকবার এমনটা করলেন তিনি।'

নামাজ শেষে লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জানতে চাইলেন, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমরা দেখলাম আপনি হাসানকে (রা) নিয়ে এমন কিছু করলেন, যা এর আগে কখনো করেননি।"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "হাসান (রা) দুনিয়ায় আমার সুগন্ধময় ফুল। আমার এ সন্তান একজন নেতা। আশা করি, আল্লাহ তাআলা তার মাধ্যমে মুসলিমদের দুটি দলের মধ্যকার বিভেদ মিটিয়ে দেবেন।"'

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, শিশুদের মসজিদে আনা জায়িজ।

নাতি-নাতনিদের সাথে তাঁর আচরণের ভিত্তি ছিল দয়া ও স্নেহ। ছোট্ট শিশুর প্রয়োজন ভালোবাসা, স্নেহ, আদর ও মায়ার। শিশুর এ প্রয়োজন পূরণ করবে তার পিতামাতা। খাবার ও পানি যেমন প্রয়োজনীয় তাদের জন্য, তেমনই আদর-স্নেহ-ভালোবাসাও অপরিহার্য। আদর ও ভালোবাসায় ঘেরা একটি পরিবেশ দরকার শিশুর স্থির ও সরল ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য।

টিকাঃ
৩৮৯. মুসনাদু আহমাদ: ১০২৮১। হাদিসের মান: সহিহ।
৩৯০. মুসনাদু আহমাদ: ১৯৯৯৪। হাদিসের মান: সহিহ।
৩৯১. শিশুদের মসজিদে না আনার নিষেধাজ্ঞায় "তোমরা শিশু ও পাগলদের মসজিদ থেকে দূরে রাখো" বর্ণিত হাদিসটি জইফ। সুনানু ইবনি মাজাহ ৭৫০। হাদিসের সনদের রাবি ওয়াসিলা বিন আসকা (রা) জইফ। দেখুন, জইফুল জামি': ২৬৩৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00