📄 নাতিরা কোলে পেশাব করলেও রাগাতেন না
লুবাবা বিনতে হারিস (রা) বলেন, 'একবার শিশু হুসাইন (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোলে প্রস্রাব করে দিল।'
তখন আমি বললাম, "অন্য একটি কাপড় পরে নিন। আপনার এ লুঙ্গিটি আমাকে দিন-আমি ধুয়ে দিচ্ছি।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “কন্যা শিশুর পেশাব লাগলে কাপড় ধুতে হয়। আর ছেলে শিশুর পেশাব লাগলে কাপড়ের ওপর পানি ছিটিয়ে দিলেই হয়।"'
আবুস সামহ্ (রা) বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমত করতাম। যখন তিনি গোসল করতে চাইতেন, তখন আমাকে বলতেন পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়াও। তখন আমি পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁকে আড়াল করতাম। একবার হাসান (রা) বা হুসাইনকে (রা) আনা হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বুকের ওপর পেশাব করে দিল সে। আমি পেশাব ধুয়ে দেওয়ার জন্য এগিয়ে এলাম। তখন তিনি বললেন, "মেয়ে শিশুর পেশাব ধুতে হয়। ছেলে শিশুর পেশাবের ওপর পানি ছিটিয়ে দিলেই হয়।"'
আবু লাইলা (রা) বলেন, 'একদিন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ছিলাম। তাঁর বুক বা পেটের ওপর হাসান (রা) বা হুসাইন (রা) বসে ছিল। সে পেশাব করতে শুরু করছে দেখে আমরা উঠে তাঁর দিকে গেলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা আমার সন্তানকে ছেড়ে দাও। পেশাব করা শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকে তোমরা ভয় দেখিও না।” এরপর পেশাবের ওপর তিনি পানি ছিটিয়ে দিলেন।'
এ হাদিসগুলোতে আমরা স্পষ্টভাবে দেখেছি, নাতিদের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর-স্নেহ, ভালোবাসা ও উত্তম তত্ত্বাবধানের অনুপম কিছু চিত্র।
টিকাঃ
৩৭৩. সুনানু আবি দাউদ: ৩৭৫, সুনানু ইবনি মাজাহ: ৫২২। হাদিসের মান: সহিহ।
৩৭৪. সুনানু আবি দাউদ: ৩৭৬, সুনানুন নাসায়ি ৩০৪, সুনানু ইবনি মাজাহ ৫২৬। হাদিসের মান: সহিহ।
৩৭৫. মুসনাদু আহমাদ: ১৮৫৮০। হাদিসের মান: সহিহ।
📄 নাতিদের জন্য দোয়া করতেন
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান-হুসাইনের (রা) জন্য দোয়া করতেন। তিনি বলতেন:
أُعِيدُ كُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لامة
"আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমাতের অসিলায় আমি তোমাদের দুজনের জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করছি প্রতিটি শয়তান, ক্ষতিকর প্রাণী ও কুদৃষ্টি নিক্ষেপকারী প্রতিটি চোখ থেকে।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলতেন: "ইবরাহিম (আ) এভাবেই ইসহাক (আ) ও ইসমাইল (আ)-এর জন্য আল্লাহর আশ্রয় কামনা করতেন।"'
কারও মতে 'আল্লাহর কালিমাত' মানে কুরআনুল কারিম। আবার কারও মতে আল্লাহর নাম ও গুণসমূহ।
'পরিপূর্ণ' বলার কারণ হলো, আল্লাহর কালামে কোনো অপূর্ণতা বা ত্রুটি নেই, যেমনটি মানুষের কালামে থাকে।
কেউ কেউ বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কালামকে পরিপূর্ণ শব্দ দিয়ে বিশেষায়িত করেছেন, কারণ এ কালামের মাধ্যমে যে আল্লাহর আশ্রয় চায়, সে উপকৃত হয়। এর অসিলায় আল্লাহর আশ্রয় চাইলে আল্লাহ বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন এবং তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান।
প্রতিটি শয়তান থেকে আশ্রয় চাই-এখানে জিন ও ইনসান প্রতিটি শয়তান অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসে ব্যবহৃত هَامَّةٍ শব্দের অর্থ ক্ষতিকর প্রাণী। ওই সব বিষধর প্রাণীকে বলা হয়, যেগুলো প্রাণঘাতী। আর যেসব বিষধর প্রাণী প্রাণঘাতী নয়, সেগুলোকে আরবিতে السامة বলে। যেমন: বিচ্ছু ও ভিমরুল।
কুদৃষ্টি নিক্ষেপকারী প্রতিটি চোখ-অর্থাৎ অনিষ্ট সাধন করে এমন প্রতিটি কুদৃষ্টিসম্পন্ন চোখ।'
খাত্তাবি (রহ) বলেন, 'এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মানসিক বিকৃতি ও বৈকল্য মানুষকে বিপদে ও অসুখে ফেলে যে কষ্ট দেয়, তা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইছি।'
টিকাঃ
৩৭৬. সহিহুল বুখারি: ৩৩৭১, সুনানুত তিরমিজি: ২০৬০। শব্দউৎস: সুনানুত তিরমিজি।
৩৭৭. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৬/১৮৪।
৩৭৮. ফাতহুল বারি: ৬/৪১০।
📄 রাসূল ﷺ তাঁর নাতিদের দোয়া শেখাতেন
হাসান (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে কিছু বাক্য শিখিয়েছিলেন, সেগুলো আমি বিতরে পড়তাম। বাক্যগুলো হচ্ছে:
اللَّهُمَّ اهْدِنِي فِيمَنْ هَدَيْتَ، وَعَافِنِي فِيمَنْ عَافَيْتَ، وَتَوَلَّنِي فِيمَنْ تَوَلَّيْتَ، وَبَارِكْ لِي فِيمَا أَعْطَيْتَ، وَقِنِي شَرَّ مَا قَضَيْتَ، فَإِنَّكَ تَقْضِي وَلَا يُقْضَى عَلَيْكَ، وَإِنَّهُ لَا يَذِلُّ مَنْ وَالَيْتَ، تَبَارَكْتَ رَبَّنَا وَتَعَالَيْتَ
“হে আল্লাহ যাদের আপনি হিদায়াত দিয়েছেন, আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। যাদের প্রতি আপনি উদারতা দেখিয়েছেন, আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নিন। আপনি যাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছেন, তাদের মতো আমাকেও আপনার অভিভাবকত্বে গ্রহণ করে নিন। আমাকে দানকৃত প্রতিটি বস্তুর মাঝে বরকত দিন। আপনার নির্ধারিত অনিষ্ট থেকে আমাকে রক্ষা করুন। কারণ, আপনিই নির্দেশ দিতে পারেন, আপনার ওপর কারও নির্দেশ চলে না। আপনি যাকে বন্ধু ভাবেন, সে কখনো অপমানিত হয় না। আপনি কল্যাণময়, আপনার মর্যাদা সুউচ্চ।"'
টিকাঃ
৩৭৯. সুনানুত তিরমিজি: ৪৬৪। হাদিসের মান: সহিহ।
📄 নাতিদের মসজিদে নিয়ে আসতেন
আবু বাকরাহ (রা) বলেন, 'একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি মিম্বারের ওপর উপবিষ্ট দেখতে পাই। পাশে হাসান বিন আলি (রা)। সে একবার মানুষের দিকে তাকায় আরেকবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে তাকায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলছিলেন, “আমার এ নাতি একজন মহান নেতা। আল্লাহ তাআলা তার মাধ্যমে মুসলিমদের দুটি বড় দলের মধ্যে মীমাংসা করবেন।”'
বুরাইদা বিন হুসাইব (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে খুতবা দিচ্ছিলেন। তখন হাসান (রা) ও হুসাইনকে (রা) দেখা গেল তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। গায়ে তাদের লাল জামা। হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খাওয়ার উপক্রম করছে, আবার সোজা হয়ে পা ফেলছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বার থেকে নেমে এসে তাদের কোলে নিয়ে মিম্বারে উঠে গেলেন। এবং বললেন, “আল্লাহ সত্যি বলেছেন: إِنَّا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ - “তোমাদের সম্পদ ও সন্তানসন্ততি তোমাদের জন্য পরীক্ষার বস্তু।” (সুরা আত-তাগাবুন, ৬৪ ১৫) আমি এ দুজনকে দেখে আর স্থির থাকতে পারলাম না।" এতটুকু বলার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবায় ফিরে গেলেন আবার।'
'হোঁচট খাওয়ার উপক্রম করছে অর্থাৎ শিশুসুলভ দুর্বলতার কারণে কচি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে একবার এদিকে ঝুঁকে যাচ্ছে তো আবার ওদিকে টলে পড়তে চাইছে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দুজনকে কোলে তুলে নিলেন। আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন এ পৃথিবীতে। এ ঘটনায় আমরা তারই একখণ্ড চিত্র দেখতে পাই।'
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'আর আল্লাহর বাণী : إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, সম্পদ ও সন্তান মানুষের মন আচ্ছন্ন করে রাখে, ফলে মানুষ আল্লাহর ইবাদতে অগ্রগামী হতে পারে না। হাদিসের মাঝে আমরা দেখেছি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা দেওয়া বন্ধ করে নেমে এসেছেন তাঁর দুই নাতির জন্য। সন্তানের প্রতি হৃদয়ে লালিত ভালোবাসাই তাঁকে এ কাজ করতে বাধ্য করেছে। সন্তানের কারণে আসা ফিতনা বা পরীক্ষা কয়েক স্তরের হয়। হাদিসে বর্ণিত এ পরীক্ষার স্তরটি ছিল নিম্ন একটি স্তর। কখনো কখনো কারও কারও ক্ষেত্রে ভয়াবহ স্তরে এসে দাঁড়ায়। তাই সাবধান থাকতে হবে সম্পদ ও সন্তানের ফিতনার ব্যাপারে।'
টিকাঃ
৩৮০. সহিহুল বুখারি: ২৭১৪।
৩৮১. সুনানু আবি দাউদ ১১০৯, সুনানুত তিরমিজি: ৩৭৭৪, সুনানুন নাসায়ি ১৪১৩, সুনানু ইবনি মাজাহ: ৩৬০০। হাদিসের মান: সহিহ।
৩৮২. হাশিয়াতুস সিনদি আলা সুনানিন নাসায়ি: ৩/১০৮।
৩৮৩. ফাতহুল বারি: ১১/২৫৪। ঈষৎ পরিমার্জিত।