📄 শিশুর মাথা কামিয়ে চুলের ওজন পরিমাণ রুপা দান করতেন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোলাম আবু রাফি (রা) বলেন, 'হাসানের (রা) জন্মের পর তার মা ফাতিমা (রা) দুটি ছাগল জবাই করে আকিকা দিতে চাইলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আকিকা কোরো না। এখন তার মাথা মুণ্ডন করে চুলের ওজনের সমান রুপা সাদাকা করো আল্লাহর রাস্তায়।" হুসাইনের (রা) জন্মের পরও ফাতিমা (রা) তেমনই করলেন।'
'আকিকা কোরো না'- বলার কারণ হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে নাতির আকিকা করতে চাইছিলেন।
আনাস (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান-হুসাইনের (রা) জন্মের সপ্তম দিনে তাদের মাথা মুণ্ডন করার আদেশ দিলেন। এরপর মুণ্ডানো চুলের ওজন পরিমাণ রুপা সাদাকা করলেন।'
নবজাতক শিশুর মাথা মুণ্ডন করা অনেক উপকারী। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে, নবজাতকের মাথা কামানোর ফলে মাথার লোমকূপগুলো উন্মুক্ত হয় এবং চুল গজানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়।
মাথা মুণ্ডনের পর জাফরান দিয়ে মাথা মুছে দেওয়া একটি ভুলে যাওয়া সুন্নাত। মানুষ এ সুন্নাহটি পালন করে না বললেই চলে। আয়িশা (রা) বলেন, 'জাহিলি যুগে লোকেরা শিশুর আকিকা করে জন্তুর রক্ত একটি কাপড়ের টুকরোয় নিয়ে মুণ্ডিত মাথায় লেপে দিত। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে বলেন, "তোমরা জন্তুর রক্তের পরিবর্তে নবজাতকের মাথায় খালুক (সুগন্ধি) দাও।"'
টিকাঃ
৩৬৯. মুসনাদু আহমাদ ২৬৬৫৫। হাদিসের মান: হাসান।
৩৭০. আল-বাজ্জার ৬১৯৯। হাদিসের মান: হাসান।
৩৭১. সহিহু ইবনি হিব্বান ৫৩২৮। হাদিসের মান: সহিহ। হাদিসে খালুক শব্দটি এসেছে। খালুক হচ্ছে লাল ও হলুদ বর্ণের সুগন্ধিকে জাফরানের সাথে মিশিয়ে তৈরি বিশেষ ধরনের সুগন্ধি। নিহায়া ২/১৪৪।
📄 শিশুর জন্য সুন্দর নাম নির্বাচন করতেন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের সুন্দর সুন্দর নাম রাখতেন। এই কাজটি ছিল তাঁর স্বভাবজাত। এমনকি বয়স্ক লোকদের মন্দ নামও তিনি পরিবর্তন করে দিতেন। পিতার ওপর সন্তানের অধিকার হচ্ছে, তার সুন্দর একটি নাম রাখা। একটি ভালো নাম বাছাই করে নেওয়া। আজগুবি, দুর্বোধ্য, শ্রুতিকটু ও নিকৃষ্ট অর্থবোধক নাম পরিহার করতে হবে।
টিকাঃ
৩৭২. নামের ব্যাপারে দুটি ঘটনা বলছি: 'একবার বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তার সামনে এল বৃদ্ধ এক নারী মুসাফির। কর্মকর্তা জিজ্ঞেস করল, "আপনার নাম কী?” বৃদ্ধা বলল, الصلاة على النبي নবির ওপর দরুদ পড়ো।" কর্মকর্তা বলল, عليه الصلاة والسلام-সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক নবির ওপর। আপনার নামটা বলুন।" বৃদ্ধা আবারও বলল, "الصلاة على النبي নবির ওপর দরুদ পড়ো।" কর্মকর্তা আবারও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর দরুদ পড়ল। বলল, "عليه الصلاة والسلام - সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক নবির ওপর। আপনার নামটা বলুন।" কিন্তু বৃদ্ধা আগের কথাটাই বলল। শেষে কর্মকর্তা বুঝতে পারল আসলে বৃদ্ধার নামই হচ্ছে, "الصلاة على النبي নবির ওপর দরুদ পড়ো।”' এ রকম আরেক লোককে জিজ্ঞেস করা হলো, 'তোমার উপনাম কী?' أبو عبد الملك الكريم الذي يُمْسِكُ السَّمَاءَ أَن تَقَعَ عَلَى الْأَرْضِ إِلَّا بِإِذْنِهِ -অর্থাৎ সম্মানিত মালিকের বান্দার পিতা যিনি আকাশ স্থির রাখেন, যাতে তাঁর আদেশ ব্যতীত ভূপৃষ্ঠে পতিত না হয়।' জিজ্ঞেসকারী মোবারকবাদ জানিয়ে বলল, 'অর্থ কুরআনের বাপ তুমি, উঁচু হও।'
📄 নাতিরা কোলে পেশাব করলেও রাগাতেন না
লুবাবা বিনতে হারিস (রা) বলেন, 'একবার শিশু হুসাইন (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোলে প্রস্রাব করে দিল।'
তখন আমি বললাম, "অন্য একটি কাপড় পরে নিন। আপনার এ লুঙ্গিটি আমাকে দিন-আমি ধুয়ে দিচ্ছি।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “কন্যা শিশুর পেশাব লাগলে কাপড় ধুতে হয়। আর ছেলে শিশুর পেশাব লাগলে কাপড়ের ওপর পানি ছিটিয়ে দিলেই হয়।"'
আবুস সামহ্ (রা) বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমত করতাম। যখন তিনি গোসল করতে চাইতেন, তখন আমাকে বলতেন পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়াও। তখন আমি পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে তাঁকে আড়াল করতাম। একবার হাসান (রা) বা হুসাইনকে (রা) আনা হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বুকের ওপর পেশাব করে দিল সে। আমি পেশাব ধুয়ে দেওয়ার জন্য এগিয়ে এলাম। তখন তিনি বললেন, "মেয়ে শিশুর পেশাব ধুতে হয়। ছেলে শিশুর পেশাবের ওপর পানি ছিটিয়ে দিলেই হয়।"'
আবু লাইলা (রা) বলেন, 'একদিন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ছিলাম। তাঁর বুক বা পেটের ওপর হাসান (রা) বা হুসাইন (রা) বসে ছিল। সে পেশাব করতে শুরু করছে দেখে আমরা উঠে তাঁর দিকে গেলাম। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমরা আমার সন্তানকে ছেড়ে দাও। পেশাব করা শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকে তোমরা ভয় দেখিও না।” এরপর পেশাবের ওপর তিনি পানি ছিটিয়ে দিলেন।'
এ হাদিসগুলোতে আমরা স্পষ্টভাবে দেখেছি, নাতিদের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর-স্নেহ, ভালোবাসা ও উত্তম তত্ত্বাবধানের অনুপম কিছু চিত্র।
টিকাঃ
৩৭৩. সুনানু আবি দাউদ: ৩৭৫, সুনানু ইবনি মাজাহ: ৫২২। হাদিসের মান: সহিহ।
৩৭৪. সুনানু আবি দাউদ: ৩৭৬, সুনানুন নাসায়ি ৩০৪, সুনানু ইবনি মাজাহ ৫২৬। হাদিসের মান: সহিহ।
৩৭৫. মুসনাদু আহমাদ: ১৮৫৮০। হাদিসের মান: সহিহ।
📄 নাতিদের জন্য দোয়া করতেন
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান-হুসাইনের (রা) জন্য দোয়া করতেন। তিনি বলতেন:
أُعِيدُ كُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لامة
"আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমাতের অসিলায় আমি তোমাদের দুজনের জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করছি প্রতিটি শয়তান, ক্ষতিকর প্রাণী ও কুদৃষ্টি নিক্ষেপকারী প্রতিটি চোখ থেকে।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলতেন: "ইবরাহিম (আ) এভাবেই ইসহাক (আ) ও ইসমাইল (আ)-এর জন্য আল্লাহর আশ্রয় কামনা করতেন।"'
কারও মতে 'আল্লাহর কালিমাত' মানে কুরআনুল কারিম। আবার কারও মতে আল্লাহর নাম ও গুণসমূহ।
'পরিপূর্ণ' বলার কারণ হলো, আল্লাহর কালামে কোনো অপূর্ণতা বা ত্রুটি নেই, যেমনটি মানুষের কালামে থাকে।
কেউ কেউ বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কালামকে পরিপূর্ণ শব্দ দিয়ে বিশেষায়িত করেছেন, কারণ এ কালামের মাধ্যমে যে আল্লাহর আশ্রয় চায়, সে উপকৃত হয়। এর অসিলায় আল্লাহর আশ্রয় চাইলে আল্লাহ বিপদাপদ থেকে রক্ষা করেন এবং তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান।
প্রতিটি শয়তান থেকে আশ্রয় চাই-এখানে জিন ও ইনসান প্রতিটি শয়তান অন্তর্ভুক্ত।
হাদিসে ব্যবহৃত هَامَّةٍ শব্দের অর্থ ক্ষতিকর প্রাণী। ওই সব বিষধর প্রাণীকে বলা হয়, যেগুলো প্রাণঘাতী। আর যেসব বিষধর প্রাণী প্রাণঘাতী নয়, সেগুলোকে আরবিতে السامة বলে। যেমন: বিচ্ছু ও ভিমরুল।
কুদৃষ্টি নিক্ষেপকারী প্রতিটি চোখ-অর্থাৎ অনিষ্ট সাধন করে এমন প্রতিটি কুদৃষ্টিসম্পন্ন চোখ।'
খাত্তাবি (রহ) বলেন, 'এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে মানসিক বিকৃতি ও বৈকল্য মানুষকে বিপদে ও অসুখে ফেলে যে কষ্ট দেয়, তা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইছি।'
টিকাঃ
৩৭৬. সহিহুল বুখারি: ৩৩৭১, সুনানুত তিরমিজি: ২০৬০। শব্দউৎস: সুনানুত তিরমিজি।
৩৭৭. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৬/১৮৪।
৩৭৮. ফাতহুল বারি: ৬/৪১০।