📄 জন্মের পর নাতিদের কানে আজান দিতেন
যখনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো নাতি জন্ম নিতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজান দিতেন-যাতে শিশুর কর্ণকুহরে গুঞ্জরিত প্রথম রবের বড়ত্ব ও মহত্ত্বব্যঞ্জক আওয়াজ। আবু রাফি (রা) বলেন, 'ফাতিমার (রা) যখন সন্তান হলো আমি দেখলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসানের (রা) ডান কানে নামাজের আজানের মতো করে আজান দিচ্ছেন।'
আলিমগণ (রহ) বলেন, নবজাতক শিশুর কানে আজান দেওয়া মুসতাহাব। এতে শয়তান বিতাড়িত হয়। আর শিশুর কানে প্রবেশ করা প্রথম শব্দ হয় আল্লাহর জিকির।
ইবনে কাইয়িম (রহ) বলেন, 'আজান দেওয়ার মাহাত্ম্য আল্লাহই ভালো জানেন। তবে আজান দেওয়ার কারণে একজন মানুষের কানে প্রবেশ করা প্রথম শব্দ হয় আল্লাহর বড়ত্ব ও মাহাত্ম্যের বাণীর। একজন মানুষের কানে প্রবেশ করে ইসলামে প্রবেশ করার শাহাদাহর বাণী। যেন একরকমের তালকিন এটি। দুনিয়াতে আসার সময় তার কানে ইসলামের একটি শিআরের উচ্চারণ হয়। যেভাবে দুনিয়া থেকে বিদায়ের সময় মানুষের কানে তাওহিদের কালিমার তালকিন দেওয়া হয়।'
যদিও শিশু আজানের বাক্য না বুঝে, তবুও আজানের প্রভাব তার অন্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এ ছাড়াও এর আরও কিছু উপকারিতা রয়েছে। যেমন, আজানের শব্দ শুনে শয়তানের পলায়ন।... শিশুকে মন্ত্রণা দিতে আসা শয়তান আজান শুনে দুর্বল হয়ে পড়ে। শিশুর সাথে সম্পর্ক করতে আসার প্রথম সময়েই শয়তান রেগে যায় আজান শুনে।'
টিকাঃ
৩৫৬. ইমাম বুখারি (রহ) আদাবুল মুফরাদে (৮২৩), ইবনে হিব্বান (রহ) স্বীয় গ্রন্থে (৬৯৮৫), ইমাম আহমাদ (রহ) তাঁর মুসনাদে (৭৬৯) আলি (রা)-এর সূত্রে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, 'যখন হাসানের (রা) জন্ম হলো, আমি তার নাম রাখলাম হারব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে বললেন, "কোথায় আমার সন্তান? আমার কাছে আনো তাকে। কী নাম রেখেছ তার?" আমি বললাম, "হারব।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "না। বরং সে হাসান।" এরপর যখন হুসাইনের (রা) জন্ম হলো, আমি তার নাম রাখলাম হারব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে বললেন, "কোথায় আমার সন্তান? আমার কাছে আনো তাকে। কী নাম রেখেছ তার?" আমি বললাম, "হারব।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "না। বরং সে হুসাইন।" তৃতীয় সন্তান জন্ম হলে তার নাম রাখলাম হারব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে বললেন, "কোথায় আমার সন্তান? আমার কাছে আনো তাকে। কী নাম রেখেছ তার?" আমি বললাম, "হারব।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "না। বরং সে মুহসিন।" এরপর বললেন, "হারুন (আ)-এর সন্তান শাব্বার, শুবাইর ও মুশাব্বিরের নামানুসারে এদের নাম রেখেছি আমি।"'-হানি বিন হানি নামক রাবির জাহালতের কারণে এ হাদিস জইফ। দেখুন, সিলসিলাতুজ জইফা: ৮/১৮২।
৩৫৭. সুনানু আবি দাউদ: ৫১০৫, সুনানুত তিরমিজি: ১৫১৪; ইমাম তিরমিজি (রহ), নববি (রহ) ও ইবনে মুলকিন (রহ) এ হাদিসকে সহিহ বলছেন। তবে ইবনে হিব্বান (রহ) বলেছেন এ হাদিস জইফ। আলবানি (রহ) এ হাদিসকে হাসান বলেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এ হাদিসকে জইফ বলেছেন তিনি।
৩৫৮. তুহফাতুল মাওদুদ: ৩১।
📄 আজানের পর নবজাতক নাতির তাহনিক করতেন তিনি
আয়িশা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কোনো শিশুকে নিয়ে আসা হলে, তিনি প্রথমে দোয়া করতেন শিশুর জন্য, এরপর তাহনিক করতেন।'
তাহনিক
তাহনিক হচ্ছে, খেজুর বা খেজুরজাতীয় কিছু চিবিয়ে শিশুর তালুতে ঘষে দেওয়া। খেজুর ভিন্ন অন্য মিষ্টি দ্রব্য দিয়ে তাহনিক করলেও সুন্নাত আদায় হবে। তবে খেজুর দিয়ে তাহনিক করা উত্তম।
কারণ, খেজুরের মিষ্টতা শিশুর জন্য সবচেয়ে ভালো।
চিকিৎসাবিজ্ঞান তাহনিকের উপকারিতার বিবিধ দিক আবিষ্কার করেছে। ড. মুহাম্মদ আলি আল-বার (রহ) বলেন, 'আধুনিক বিজ্ঞান তাহনিকের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা প্রমাণ করেছে। তাহনিকের ফলে নবজাতকের শরীরে সুপ্রভাব রাখে। শিশুর শরীর বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।'
তাহনিকের ব্যাপারে বর্ণিত হাদিস থেকে আমরা জেনেছি যে, খেজুর বা মিষ্টিজাতীয় কোনো খাবার শিশুর উদরে যাওয়া উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ বিবৃত হওয়ার ১৪০০ বছর পর চিকিৎসাবিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে তাহনিকের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা।
সদ্যপ্রসূত শিশু দুকারণে মারা যেতে পারে। এক. রক্তের মধ্যে সুগার লেবেল কমে যাওয়া। দুই. ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে শিশু-শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়া।
শিশুর রক্তে সুগার লেবেল (গ্লুকোজ) কমে যাওয়ার ফলে কয়েকটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি সামনে আসতে পারে-
শিশুর দুধপানে অনীহা।
শিশুর পেশি ঢিলে হয়ে যাওয়া।
বারবার শ্বাসকষ্ট হওয়া।
শরীর নীলচে হয়ে যাওয়া।
এ ছাড়াও আরও অনেক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন: কখনো কখনো শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় কিংবা মানসিকভাবে শিশু অপরিণত হয়।
এ ক্ষেত্রে চিকিৎসা খুবই সহজ। আর সেটা হচ্ছে, পানিতে গ্লুকোজ গুলে মুখে দেওয়া বা ইনজেকশনের মাধ্যমে গ্লুকোজ দেওয়া। যখন তাহনিক করা হয়, তখন তাহনিকের মাধ্যমে গ্লুকোজ প্রবেশ করে শিশুর শরীরে। ফলে শিশু মারাত্মক বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পায়।
গবেষণায় আরও প্রমাণিত হয়েছে, তাহনিকের সময় তালুতে দেওয়া খেজুর চেটে খেতে শিশু যখন জিব ও মুখের হাড়গোড় নাড়ায়, তখন পেশিগুলো শক্তিশালী হয়। আর শিশু দুধপান করতে পারে অনায়াসে।'
অন্যদিকে আজওয়া খেজুর তাহনিকের জন্য উত্তম ও বরকতময়। কারণ, আজওয়া খেজুর জান্নাত থেকে নাজিল হয়েছে। আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আজওয়া জান্নাতের খেজুর। এতে বিষের প্রতিষেধক আছে।"'
তবে আজওয়া খেজুর পৃথিবীতে আসার পর নিঃসন্দেহে তার স্বাদ ও গুণে পরিবর্তন এসে গেছে। তাই দুনিয়ার আজওয়া খেজুর হুবহু জান্নাতের সে আজওয়া আর থাকেনি।
টিকাঃ
৩৫৯. সহিহু মুসলিম: ২৮৬।
৩৬০. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/১২৪।
৩৬১. ইসলাম ওয়েবে লিখিত আর্টিকেল। http://www.islamweb.net/media/index.php?page=article&lang=A&id=143055
৩৬২. সুনানুত তিরমিজি: ২০৬৬, সুনানু ইবনি মাজাহ ৩৪৫৫। হাদিসের মান সহিহ।
📄 শিশু নাতিদের আকিকা দিতেন
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান (রা) ও হুসাইনের (রা) আকিকা দিয়েছিলেন জোড়া জোড়া ভেড়া জবাই করে।'
শিশুর জন্মের পর যে পশু জবাই করা হয়, তাকে আকিকা বলে। ছেলে শিশুর জন্য দুটি ছাগল। আর মেয়ে শিশুর জন্য একটি ছাগল।
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'আকিকার অনেক উপকারিতা। আকিকা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। এতে আছে মর্যাদা ও দয়া। এতে শিশু সন্তানের প্রতি (পিতামাতার) দায় সেরে যায়। এ ছাড়াও আকিকা শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও স্থায়ী সুস্থতার কারণ হয় এবং শিশুকে শয়তানের অনিষ্ট থেকে হিফাজত করে।'
টিকাঃ
৩৬৩. সুনানুন নাসায়ি ৪২১৯। হাদিসের মান: সহিহ।
৩৬৪. তুহফাতুল মাওদুদ বি আহকামিল মাওলুদ: ৬৯।
📄 শিশু জন্মের পর সপ্তম দিন পর্যন্ত আকিকা বিলম্বিত করতেন
আয়িশা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান (রা) ও হুসাইনের (রা) জন্মের পর সপ্তম দিনে আকিকা ও নামকরণ করেছিলেন।'
'শিশুর জন্ম শনিবারে হলে তার আকিকা হবে সপ্তম দিন হিসেবে শুক্রবারে। অর্থাৎ জন্মগ্রহণের দিনের আগের দিন। এটাই হচ্ছে নিয়ম। তাই শিশু যদি বৃহস্পতিবারে জন্ম নেয়, তবে আকিকা হবে বুধবারে। এভাবে হবে হিসাবটা।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, 'শিশু আকিকার ওপর বন্ধক (দায়বদ্ধ) থাকে। জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা দিতে হবে এবং তার নাম রাখতে হবে।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এক সন্তানের নাম রেখেছিলেন শিশুর জন্মের দিনেই। যেমন তিনি বলেছিলেন, 'গত রাতে আমার একটি সন্তান জন্ম নিয়েছে। আমি তার নাম রেখেছি আমার বাবা ইবরাহিমের (রা) নামে।'
টিকাঃ
৩৬৫. সহিহু ইবনি হিব্বান: ৫৩১১; এ হাদিসকে ইবনে হাজার (রহ) সহিহ বলেছেন। দেখুন, ফাতহুল বারি: ৯/৫৮৯।
৩৬৬. আশ-শারহুল মুমতি': ৭/৪৯৩।
৩৬৭. সুনানু আবি দাউদ: ২৮৩৮, সুনানুত তিরমিজি: ১৫২২। হাদিসের মান: সহিহ।
৩৬৮. সহিহু মুসলিম: ৩১২৬।