📄 ছেলে-মেয়েদের মৃত্যুতে তিনি শোকাহত হতেন
সন্তান হারিয়ে যারা পরীক্ষায় পড়েছেন, তারা যেন জেনে নেয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পুত্র-কন্যা সব হারিয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পর কেবল ফাতিমা (রা) জীবিত ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি একে একে তাঁর সকল সন্তান হারিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো সন্তান মৃত্যুবরণ করলে তিনি কাঁদতেন। সন্তানের মৃত্যুতে শোকাহত হতেন। তাঁর দুচোখ থেকে গড়িয়ে পড়ত ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু। তবে মুখে কেবল সে কথাই উচ্চারণ করতেন, যে কথায় আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, যে কথা আল্লাহ পছন্দ করেন।
আনাস (রা) উম্মে কুলসুম (রা)-এর মৃত্যু-পরবর্তী সময়ের বর্ণনায় বলেন, 'আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কন্যার জানাজা পড়লাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের পাশে বসে রইলেন। আমি দেখলাম, তাঁর দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চোখের সে অশ্রু অস্থিরতার অশ্রু ছিল না। আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তুষ্টিও এই অশ্রুর কারণ ছিল না। বরং এ অশ্রু ছিল রহমতের, এ অশ্রু ছিল স্নেহের। দয়াবানদের চোখ থেকে এমন অশ্রু বের হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
আনাস বিন মালিক (রা) বলেন, 'একবার আমরা কর্মকার আবু সাইফের (রা) বাড়িতে এলাম। তিনি ছিলেন নবি-তনয় ইবরাহিমের (রা) দুধ-পিতা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবরাহিমকে (রা) চুমু খেলেন, তাকে নাকে-মুখে লাগিয়ে আদর করলেন।'
এরপর আরেকবার আমরা ইবরাহিমের (রা) কাছে এসে দেখি, সে মুমূর্ষু অবস্থায় রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। আব্দুর রহমান বিন আওফ (রা) তখন বলে উঠলেন, "আপনিও হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম?"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "এ অশ্রু রহমতের, হে ইবনে আওফ (রা)।"
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার কাঁদতে থাকলেন। বললেন:
تَدْمَعُ الْعَيْنُ وَيَحْزَنُ الْقَلْبُ وَلَا نَقُولُ إِلَّا مَا يُرْضِي رَبَّنَا، وَاللَّهِ يَا إِبْرَاهِيمُ إِنَّا بِكَ لَمَحْزُونُونَ
"চোখগুলো আজ প্রবহমান, অন্তর বেদনাক্লিষ্ট। তবুও আমরা শুধু তা-ই বলব, যাতে খুশি হন আমাদের রব। আল্লাহর কসম, হে ইবরাহিম, আমরা তোমার বিয়োগব্যথায় শোকাহত।"'
আনাস (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া শিশুদের প্রতি এত বেশি দয়াশীল অন্য কাউকে দেখিনি আমি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক পুত্র ইবরাহিম (রা) মদিনার গ্রামাঞ্চলে দুধপানের সময় পার করছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে যেতেন। আমরাও তাঁর সাথে থাকতাম। সে বাড়িতে প্রবেশ করে দেখা যেত ধোঁয়াচ্ছন্ন পরিবেশ। (অন্য বর্ণনায় আছে, বাড়িটা ধোঁয়ায় ভরে গেছে। আমি তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে দিয়ে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে দুধ-পিতাকে বলতাম, "আবু সাইফ, বন্ধ করো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছেন।")'
ইবরাহিমের (রা) দুধ-পিতা একজন কামার ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শিশুপুত্র ইবরাহিমকে (রা) তুলে নিয়ে চুমু খেতেন। এরপর ফিরে আসতেন।
ইবরাহিম (রা) যখন মারা যায়, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "ইবরাহিম (রা) আমার ছেলে। দুধপানের বয়সে সে মারা গেছে। তার জন্য জান্নাতে দুধ-পিতা ও দুধ-মাতা রয়েছে-তারা তার দুধপানের সময়টুকু পূর্ণ করবে।"'
অর্থাৎ ইবরাহিমের (রা) যখন দুধপানের বয়স, তখন সে মারা গেছে। অথবা দুধপান করা অবস্থায় সে মারা গেছে। জান্নাতের দুধ-পিতা ও দুধ-মাতা তাকে দুধপান করিয়ে দুবছর পূর্ণ করবে। কেননা, ১৬ বা ১৭ মাস বয়সে তার ওফাত হয়ে যায়। তাই বাকি সময়টুকু ওরাই দুধ পান করাবে। কারণ, কুরআনে দুধপানের সময় দুই বছর বলা হয়েছে।
হাদিস থেকে শিক্ষা
ইমাম নববি (রহ) বলেন:
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মহৎ চরিত্র, শিশু ও দুর্বলের প্রতি তাঁর দয়া-স্নেহের অনুপম এক চিত্র দেখেছি আমরা এ হাদিসে।'
এ হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে, শিশু সন্তানের প্রতি দয়া করার ফজিলত। তাদের গালে চুমু এঁকে দেওয়ার ফজিলত।'
সন্তানদের মৃত্যুর পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের গোসল, কাফন, জানাজা ও দাফনের তত্ত্বাবধান করতেন। তাদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন।
উম্মে আতিয়্যাহ আনসারি (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কন্যা উম্মে কুলসুমের (রা) ওফাতের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে এসে বললেন, "তোমরা তাকে তিনবার বা পাঁচবার অথবা প্রয়োজনে তারও অধিকবার গোসল করাবে। বরই পাতা মেশানো পানি দিয়ে গোসল দাও। এরপর কপূর দিয়ে দেবে। অথবা (বলেছেন) খানিকটা কপূর মেখে দেবে। গোসলের কাজ শেষ হলে আমাকে খবর দেবে।"
আমরা গোসল শেষ করে তাঁকে জানালাম। তিনি তাঁর একটি চাদর এগিয়ে দিলেন। বললেন, "এটি পরাও।"'
এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রজ্ঞা লক্ষণীয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমই কাফনের জন্য নিজের চাদর দিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি গোসল শেষে দিয়েছিলেন চাদরটি। যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরীর থেকে কাপড়টি খুলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কন্যার শরীরে পরানোর মাঝখানে সময়ের ব্যবধান বেশি না হয়।
এই ছিল সন্তানদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আচরণের একটি রূপরেখা। এ পরিচ্ছেদ শেষে অবশ্যই আমরা স্পষ্ট ধারণা পেয়েছি সন্তানদের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আচরণের ব্যাপারে-কেমন ছিল তাঁর তরবিয়ত, ভালোবাসা ও ব্যবহার।
أَوْلَادُنَا أَكْبَادُنَا تَمْشِي * فِي الْأَرْضِ تَحْتَ السَّمْعِ وَالْبَصْرِ بِالْحُبِّ وَالْإِحْسَانِ نُنْشِئُهُمْ *** حَتَّى يَكُوْنُوْا قَادَةَ الْبَشَرِ الْعَطَاءُ لَآخِرِ الْعُمُرِ أَعْمَارُنَا بَذَلَتْ لَهُمْ كَرَما * * * يَبْقَى |
'পৃথিবীর বাগানে কচি কচি পা ফেলে বিচরণ করে আমাদের কলিজার টুকরো সন্তানরা। আমাদের নিখুঁত তত্ত্বাবধান নিরাপদ রাখে তাদের পথচলা। নির্মল স্নেহ আর ভালোবাসায় আমরা তাদের গড়ে তুলি আগামী পৃথিবীর কর্ণধার হিসেবে। আমাদের জীবন তাদের সরবরাহ করে নিরবচ্ছিন্ন প্রাণশক্তি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জারি থাকে আমাদের এই দান।'
نَفْسِي لِخَيْرِ الْمُرْسَلِينَ فِدَى *** انْظُرْ لَهُ بَشَرًا مِنَ الْبَشَرِ نِعْمَ الْأَبُ الْحَانِي لِمَنْ وَلَدًا *** لِيْنُ النَّسِيمِ يَهُبُّ فِي السَّحَرِ
لِبَنَاتِهِ يَخْتَارُ مُحْتَرِمًا *** رَغَبَاتِهِنَّ مُرَاعِيَ الصَّغَرِ الْمَهْرَ وَالتَّجْهِينَ يَسُرُّهُ *** وَحَلَاوَةُ التَّزْوِيجِ فِي اليُسرِ
'প্রিয় নবির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কদমে কুরবান হোক আমার জীবন! কোথায় পাবে তুমি এমন অনুপম মানব। কত চমৎকার পিতা তিনি! সন্তানদের প্রতি তাঁর স্নেহ যেন ভোরে মৃদুমন্দ হিমেল হাওয়া। গুরুত্বের সঙ্গে পূরণ করতেন মেয়েদের কচিমনের চাওয়াগুলো। মোহর ও উপহার তাকে আনন্দিত করত। বস্তুত সহজ বিয়েগুলোতেই আছে সুখের মিষ্টতা।'
مِنْ غَيْرِ تَنْغِيْصٍ وَلَا كَدَرِ مُوْصٍ لَهَا بِالزَّوْجِ تُكْرِمُهُ *** .
لَيْسَتْ تُكَلِّفُ مَا يُثَقِّلُهُ *** والصَّبْرُ خَيْرُ عَطًا لِمُصْطَبِرٍ يُغْضِيْ إِذَا مَا كَانَ بَيْنَهَا *** شَيْءٌ فَتِلْكَ طَبِيعَةُ الْبَشَرِ
'কন্যাদের তিনি উপদেশ দিতেন-মেয়ে আমার, স্বামীকে সম্মান করো। স্বচ্ছ ও নির্মল রাখো তার জীবন। কঠিন কোনো ভার চাপাতেন না তাদের ওপর। আর সবরই হলো ধৈর্যশীলের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার। কন্যা ও স্বামীর সাধারণ রাগ-অভিমানগুলো এড়িয়ে যেতেন। বস্তুত এটিই তো প্রজ্ঞার পরিচয়।'
كَفَاهُ نَحْوَ بَنَاتِهِ جَرَنَا *** بِالْجُوْدِ مِثْلَ تَدَفُقَ النَّهْرِ
وَإِذَا دَهَا حَدَثُ يُصَبِّرُهَا *** وَعْظًا لَهَا بِتَحَتُمِ الْقَدَرِ
مَا زَالَ يَرْعَاهَا بِرَحْمَتِهِ *** وَحَنَانِهِ لِنِهَايَةِ الْعُمُرِ
فَبَكَى لِأَجْلٍ فِرَاقِهَا أَسَفًا *** بِاللَّهِ إِنَّكَ أَرْحَمُ الْبَشَرِ
'বহতা নদীর চঞ্চল স্রোতের মতো তাঁর মুবারক হাত হতে প্রবাহিত হতো দয়া ও করুণার অবিরল ধারা-যা প্লাবিত করত আদরের কন্যাদের হৃদয়-মন। কখনো মুসিবতের আঁধার নেমে এলে, তাদের হৃদয়ে জ্বালাতেন সবরের দীপ। তাকদিরের অমোঘ বিধানের কথা বলতেন উপদেশের স্বরে। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তাদের পরিচর্যা করতেন পরম স্নেহ ও ভালোবাসায়। তাদের বিয়োগে হতেন পরম শোকাতুর। আল্লাহর কসম, মানুষের মাঝে তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।'
টিকাঃ
৩৫১. সহিহুল বুখারি: ১২৮৫।
৩৫২. সহিহুল বুخারি: ১৩০৩, সহিহু মুসলিম: ২৩১৫।
৩৫৩. সহিহু মুসলিম: ২৩১৬।
৩৫৪. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৫/৭৬।
৩৫৫. সহিহুল বুخারি: ১১৭৫, সহিহু মুসলিম: ৯৩৯।