📄 সন্তানদের হাসি-খুশি ও প্রফুল্ল রাখতে পছন্দ করতেন
আয়িশা (রা) বলেন, 'একবার ফাতিমা (রা) হাঁটতে হাঁটতে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে) এলেন। তার হাঁটার ভঙ্গি অবিকল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মতো ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এসো এসো আমার মেয়ে।" তাকে নিজের ডানে বা বামে বসালেন। এরপর চুপিচুপি তাকে কী যেন বলতে লাগলেন। শুনে ফাতিমা (রা) কেঁদে ফেললেন। আমি বললাম, "আপনি কাঁদছেন কেন?” তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবারও তার কানে কানে কী যেন বললেন। এবার তিনি হেসে উঠলেন।'
আমি তখন বললাম "আজকের মতো কখনো এভাবে কেঁদে উঠে পরক্ষণেই হেসে ফেলতে দেখেনি আমি।" আমি ফাতিমার (রা) কাছে এর কারণ জানতে চাইলাম। কিন্তু তিনি বললেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোপনে বলা কথা আমি কারও কাছে প্রকাশ করব না।"
এরপর একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তখন আমি আবারও ফাতিমাকে (রা) জিজ্ঞেস করলাম। এবার তিনি বললেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপিচুপি আমাকে বলেছিলেন, "জিবরিল (আ) প্রতি বছর একবার আমাকে পুরো কুরআন শোনাতেন। কিন্তু এ বছর তিনি দুবার তিলাওয়াত করেছেন। মনে হয় আমার বিদায়ের সময় চলে এসেছে। আর আমার পরিবার থেকে তুমিই সবার আগে আমার সাথে যুক্ত হবে।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথা শুনে আমি কেঁদে ফেলি। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, "তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমিই হচ্ছ জান্নাতি নারী বা মুমিন নারীদের সর্দার?" তাঁর এ কথায় আমি হেসে উঠি।"'
হাদিসের মাঝে একটু দৃষ্টি দিলেই অনায়াসে আমরা বুঝতে পারব যে, ফাতিমা (রা)-এর কান্নায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মন কেঁদে ওঠে। তাই সাথে সাথে নিজ কন্যার দুঃখ সারিয়ে তুলতে তিনি তাকে সুন্দর একটা কথা বলে দিলেন, যাতে তার অন্তর থেকে দুঃখ-কষ্ট চলে গিয়ে অন্তর পুলকিত হয়ে ওঠে।
টিকাঃ
৩৪৫. সহিহুল বুখারি: ২৬২৪।
📄 সন্তানদের জিকির ও দোয়ার প্রতি উৎসাহ দিতেন
আনাস বিন মালিক (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমাকে (রা) বলতেন, "ফাতিমা, আমার উপদেশ শুনতে কীসে তোমাকে বাধা দিচ্ছে? সকাল-সন্ধ্যায় তুমি এ দোয়া পড়বে-
يَا حَيْ، يَا قَيُّومُ، بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ، أَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ، وَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ
“হে চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী! তোমারই রহমতের আশ্রয় চাই। আমার জন্য আমার সকল অবস্থা সংশোধন করে দাও। এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে আমার নিজের দায়িত্বে সোপর্দ কোরো না।"'
টিকাঃ
৩৪৬. ইবনুস সুন্নি (রহ) কৃত আমালুল ইয়াওম ওয়াল লাইলাহ: ৪৬। হাদিসের মান: হাসান।
📄 সন্তানদের হাদিয়া ও তুহফা পাঠাতেন
আলি (রা) বলেন, 'একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে রেশমের তৈরি এক সেট পোশাক দিলেন। আমি সেটি পরে বাইরে বের হলাম। তিনি দেখে বললেন, "আলি, তুমি পরার জন্য তো এটি দিইনি। এটি থেকে ফাতিমাদের (রা) জন্য ওড়না বানাও।"'
ইমাম নববি (রহ) বলেন:
'ফাতিমাদের জন্য-ফাতিমাদের (রা) বলে উদ্দেশ্য তিন ফাতিমা। এক. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কন্যা ফাতিমা (রা)। দুই. আলি (রা)-এর মা ফাতিমা বিনতে আসাদ (রা)। তিন. ফাতিমা বিনতে হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা)।'
টিকাঃ
৩৪৭. সহিহুল বুখারি: ২৬১৪, সহিহু মুসলিম: ২০৭১, মুসনাদু আহমাদ: ৭১২।
৩৪৮. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/৫১।
📄 বিপদের সময় সন্তানদের সবরের উপদেশ দিতেন
উসামা বিন জাইদ (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জনৈক কন্যা (জাইনাব রা) তাঁর কাছে এই খবর দিয়ে লোক পাঠালেন-আমার এক পুত্র মরণাপন্ন; আপনি আমাদের কাছে চলে আসুন। তিনি বলে পাঠালেন, (তাঁকে) আমার সালাম দেবে এবং বলবে:
إِنَّ لِلَّهِ مَا أَخَذَ وَلَهُ مَا أَعْطَى وَكُلُّ عِنْدَهُ بِأَجَلٍ مُسَمًّى فَلْتَصْبِرْ وَلْتَحْتَسِبْ
"আল্লাহ যা কেড়ে নেন আর যা দান করেন-সব তাঁরই অধিকারে। তাঁর কাছে সবকিছুরই একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ আছে। কাজেই সে যেন ধৈর্যধারণ করে এবং সাওয়াবের প্রত্যাশা রাখে।"
তিনি (জাইনাব রা) আল্লাহর কসম দিয়ে আবার লোক পাঠালেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন তার কাছে অবশ্যই আগমন করেন। এবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর সাথে ছিলেন সাদ বিন উবাদা (রা), মুআজ বিন জাবাল (রা), উবাই বিন কাব (রা), জাইদ বিন সাবিত (রা)-সহ আরও কতিপয় সাহাবি (রা)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে শিশুটিকে তুলে দেওয়া হলো। সে তখন অস্থির হয়ে হাত-পা ছুড়ছিল। তার শ্বাস পুরাতন মশকে পানি ঢালার মতো শব্দ করছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়াচ্ছিল। সাদ (রা) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, এ কী? আপনি কাঁদছেন!” তিনি বললেন:
هَذِهِ رَحْمَةٌ جَعَلَهَا اللهُ فِي قُلُوبِ عِبَادِهِ وَإِنَّمَا يَرْحَمُ اللَّهُ مِنْ عِبَادِهِ الرحماء
"এ হলো রহমত! যা আল্লাহ তাঁর বান্দার অন্তরে গচ্ছিত রাখেন। আর আল্লাহ তো কেবল তাঁর দয়ালু বান্দাদেরই রহম করেন।"'
ইমাম নববি (রহ) হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, "আল্লাহ যা কেড়ে নেন আর যা দান করেন-সব তাঁরই অধিকারে। তাঁর কাছে সবকিছুরই একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ আছে। কাজেই, সে যেন ধৈর্যধারণ করে এবং সাওয়াবের প্রত্যাশা রাখে।”-এই কথাগুলো বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাইনাবকে (রা) সবরের প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন, আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার মর্মার্থ হচ্ছে, 'তোমাদের থেকে যা নেওয়া হয়েছে, তা মূলত তোমাদের নয়। তাই আল্লাহর নিয়ামত আল্লাহ নিয়ে নিয়েছেন। তাই কারও কাছে রাখা আমানত বা ধারের বস্তু মূল মালিক ফেরত চাইলে দুঃখবোধ করা বা অধৈর্য হওয়ার কিছু নেই।'
'আর তিনি যা দিয়েছেন, তাও তাঁর অধিকারে'- অর্থাৎ আল্লাহ যা দেন, তা তাঁরই মালিকানাধীন। তাঁর দানকৃত বস্তুর ক্ষেত্রে তিনি যা ইচ্ছে করতে পারেন।
'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়াচ্ছিল। সাদ (রা) বললেন, "ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এ কী? আপনি কাঁদছেন।"'-সাদ (রা) ধারণা করেছিলেন, (মৃত ব্যক্তির শোকে) সকল প্রকার কান্না হারাম। চোখে অশ্রু প্রবাহিত হওয়াও হারাম। তিনি মনে করেছিলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টা ভুলে গেছেন। তাই 'এ কী, আপনি কাঁদছেন!' বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে স্মরণ করিয়ে দিলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানালেন, কান্না করা, চোখে অশ্রু আসা হারাম নয়, মাকরুহও নয়। বরং অনেক কান্না আছে রহমত ও ফজিলতের। বিলাপ ও আর্তনাদ ইত্যাদি সহযোগে কান্না করাই হারাম।'
টিকাঃ
৩৪৯. সহিহুল বুখারি ১২৩৮, সহিহ মুসলিম: ৯২৩।
৩৫০. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৬/২২৫।