📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 সন্তানদের আবেগ-অনুভূতির ব্যাপারে সচেতন ছিলেন

📄 সন্তানদের আবেগ-অনুভূতির ব্যাপারে সচেতন ছিলেন


মিসওয়ার বিন মাখরামা (রা) বলেন, 'আলি বিন আবি তালিবের (রা) ঘরে নবি-কন্যা ফাতিমা (রা) থাকা অবস্থায় তিনি আবু জাহেলের কন্যাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। এ কথা শুনে ফাতিমা (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন। বললেন, "আপনার সম্প্রদায়ের লোকেরা বলছে, আপনি নিজ কন্যাদের জন্য রাগবেন না। আলিকে (রা) দেখুন-তিনি আবু জাহেলের কন্যাকে বিয়ে করছেন।"

ফাতিমার (রা) কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে গেলেন। তখন আমি শুনলাম, তিনি শাহাদাহ উচ্চারণ করে বলতে শুরু করলেন, "হামদ ও সালাতের পর। আমি আবুল আস বিন রাবির (রা) কাছে আমার মেয়ে দিয়েছি। সে আমাকে কথা দিয়ে কথা রেখেছে। আমাকে ওয়াদা করে, ওয়াদা পালন করেছে সে। ফাতিমা (রা) আমারই অংশ। যা তাকে কষ্ট দেয়, সেটা আমাকেও কষ্ট দেয়। আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা ও আল্লাহর শত্রুর কন্যা একই ব্যক্তির বিবাহের অধীনে আসতে পারে না কখনো।" এরপর আলি (রা) আবু জাহেলের কন্যাকে দেওয়া বিবাহের প্রস্তাব ফিরিয়ে নিলেন।'

আলি (রা)-কে বিয়ে করতে নিষেধ করার পেছনে আলিমগণ (রহ) অনেক কারণ বর্ণনা করেছেন। সেগুলোকে আমরা মোটামুটি এই চারটি পয়েন্টে একত্রিত করতে পারি:

প্রথমত, এ বিয়ের কারণে ফাতিমা (রা) কষ্ট পেতেন। আর ফাতিমা (রা) কষ্ট পাওয়া মানে স্বয়ং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কষ্ট পাওয়া। আর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কষ্ট দেওয়া কবিরা গুনাহের শামিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট বলেছেন, 'ফাতিমা (রা) আমারই অংশ। যা তাকে অস্থির করে, তা আমাকেও অস্থির করে এবং যা তাকে কষ্ট দেয়, সেটা আমাকেও কষ্ট দেয়।' তবে এ বিষয়টি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যাগণ ব্যতীত অন্য কারও ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

দ্বিতীয়ত, ফাতিমা (রা)-এর ফিতনায় পড়ার আশঙ্কা। যেমনি বুখারির (রহ) (হাদিস : ৩১১০) বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমি আশঙ্কা করছি, ফাতিমা (রা) দ্বীনের ব্যাপারে ফিতনায় পতিত হবে।'

স্বামীর ক্ষেত্রে গায়রত থাকা নারীদের স্বভাব। এ স্বভাব দিয়েই তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশঙ্কা করলেন, ফাতিমার (রা) গায়রত হয়তো তাকে এমন কাজের প্রতি প্ররোচিত করবে, যা মোটেই ফাতিমার (রা) উপযুক্ত হবে না এবং ফাতিমার (রা) মর্যাদার সঙ্গে যাবে না- অথচ ফাতিমা (রা) হচ্ছেন জগতের সকল নারীর সর্দার।

বিশেষ করে, ফাতিমা (রা) তাঁর মাকে হারালেন। হারালেন একে একে তাঁর সকল বোনকে। তাই গায়রতের কারণে ফাতিমার (রা) আত্মমর্যাদাবোধ জেগে উঠলে তাঁকে শান্ত করার মতো কেউ নেই।

ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'এ ঘটনা মক্কা-বিজয়ের পরের। তখন কেবল ফাতিমা (রা) বেঁচে ছিলেন নবি-কন্যাদের মধ্যে। তাঁর মা খাদিজা (রা)-এর মৃত্যুর পর একে একে বোনদের মৃত্যু তাঁকে বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই স্বামীর নতুন বিয়ের কারণে জেগে ওঠা গায়রত তাঁর দুঃখকে আরও বাড়িয়ে দেবে।'

তৃতীয়ত, আল্লাহর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা এবং আল্লাহর শত্রুর কন্যা একই ঘরে একই স্বামীর বিবাহধীন থাকবে-এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ছিল অপছন্দনীয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আল্লাহর কসম, আল্লাহর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা ও আল্লাহর শত্রুর কন্যা একই ব্যক্তির বিবাহধীনে আসতে পারে না কখনো।'

চতুর্থত, ফাতিমা (রা)-এর অধিকারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিয়ে নিষেধ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ক্ষেত্রে ফাতিমা (রা)-এর মর্যাদা ও সম্মানের স্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন।

মোটকথা, সামষ্টিক বা স্বতন্ত্রভাবে এ সকল কারণই সক্রিয় ছিল আলি (রা)-এর এই বিয়ে বাধাগ্রস্ত হওয়ার নেপথ্যে। তবে এই হাদিসে মোটেও বহুবিবাহের বিরোধীদের জন্য কোনো প্রকার প্রমাণ নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং এমন দলিল গ্রহণের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন। কেননা, এ হাদিসেই তিনি নিজেই বলেছেন, 'তবে আমি হালালকে হারামকারী নই-হারামকে হালালকারী নই।'

টিকাঃ
৩৪৩. সহিহুল বুখারি: ৩১১০, সহিহু মুসলিম: ২৪৪৯।
৩৪৪. ফাতহুল বারি: ৭/৮৬।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 সন্তানদের হাসি-খুশি ও প্রফুল্ল রাখতে পছন্দ করতেন

📄 সন্তানদের হাসি-খুশি ও প্রফুল্ল রাখতে পছন্দ করতেন


আয়িশা (রা) বলেন, 'একবার ফাতিমা (রা) হাঁটতে হাঁটতে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে) এলেন। তার হাঁটার ভঙ্গি অবিকল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মতো ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এসো এসো আমার মেয়ে।" তাকে নিজের ডানে বা বামে বসালেন। এরপর চুপিচুপি তাকে কী যেন বলতে লাগলেন। শুনে ফাতিমা (রা) কেঁদে ফেললেন। আমি বললাম, "আপনি কাঁদছেন কেন?” তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবারও তার কানে কানে কী যেন বললেন। এবার তিনি হেসে উঠলেন।'

আমি তখন বললাম "আজকের মতো কখনো এভাবে কেঁদে উঠে পরক্ষণেই হেসে ফেলতে দেখেনি আমি।" আমি ফাতিমার (রা) কাছে এর কারণ জানতে চাইলাম। কিন্তু তিনি বললেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোপনে বলা কথা আমি কারও কাছে প্রকাশ করব না।"

এরপর একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তখন আমি আবারও ফাতিমাকে (রা) জিজ্ঞেস করলাম। এবার তিনি বললেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপিচুপি আমাকে বলেছিলেন, "জিবরিল (আ) প্রতি বছর একবার আমাকে পুরো কুরআন শোনাতেন। কিন্তু এ বছর তিনি দুবার তিলাওয়াত করেছেন। মনে হয় আমার বিদায়ের সময় চলে এসেছে। আর আমার পরিবার থেকে তুমিই সবার আগে আমার সাথে যুক্ত হবে।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ কথা শুনে আমি কেঁদে ফেলি। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার বললেন, "তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমিই হচ্ছ জান্নাতি নারী বা মুমিন নারীদের সর্দার?" তাঁর এ কথায় আমি হেসে উঠি।"'

হাদিসের মাঝে একটু দৃষ্টি দিলেই অনায়াসে আমরা বুঝতে পারব যে, ফাতিমা (রা)-এর কান্নায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মন কেঁদে ওঠে। তাই সাথে সাথে নিজ কন্যার দুঃখ সারিয়ে তুলতে তিনি তাকে সুন্দর একটা কথা বলে দিলেন, যাতে তার অন্তর থেকে দুঃখ-কষ্ট চলে গিয়ে অন্তর পুলকিত হয়ে ওঠে।

টিকাঃ
৩৪৫. সহিহুল বুখারি: ২৬২৪।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 সন্তানদের জিকির ও দোয়ার প্রতি উৎসাহ দিতেন

📄 সন্তানদের জিকির ও দোয়ার প্রতি উৎসাহ দিতেন


আনাস বিন মালিক (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমাকে (রা) বলতেন, "ফাতিমা, আমার উপদেশ শুনতে কীসে তোমাকে বাধা দিচ্ছে? সকাল-সন্ধ্যায় তুমি এ দোয়া পড়বে-

يَا حَيْ، يَا قَيُّومُ، بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ، أَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ، وَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ

“হে চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী! তোমারই রহমতের আশ্রয় চাই। আমার জন্য আমার সকল অবস্থা সংশোধন করে দাও। এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে আমার নিজের দায়িত্বে সোপর্দ কোরো না।"'

টিকাঃ
৩৪৬. ইবনুস সুন্নি (রহ) কৃত আমালুল ইয়াওম ওয়াল লাইলাহ: ৪৬। হাদিসের মান: হাসান।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 সন্তানদের হাদিয়া ও তুহফা পাঠাতেন

📄 সন্তানদের হাদিয়া ও তুহফা পাঠাতেন


আলি (রা) বলেন, 'একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে রেশমের তৈরি এক সেট পোশাক দিলেন। আমি সেটি পরে বাইরে বের হলাম। তিনি দেখে বললেন, "আলি, তুমি পরার জন্য তো এটি দিইনি। এটি থেকে ফাতিমাদের (রা) জন্য ওড়না বানাও।"'

ইমাম নববি (রহ) বলেন:

'ফাতিমাদের জন্য-ফাতিমাদের (রা) বলে উদ্দেশ্য তিন ফাতিমা। এক. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কন্যা ফাতিমা (রা)। দুই. আলি (রা)-এর মা ফাতিমা বিনতে আসাদ (রা)। তিন. ফাতিমা বিনতে হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা)।'

টিকাঃ
৩৪৭. সহিহুল বুখারি: ২৬১৪, সহিহু মুসলিম: ২০৭১, মুসনাদু আহমাদ: ৭১২।
৩৪৮. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৪/৫১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00