📄 কন্যা পিত্রালয়ে ফিরলে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতেন এবং আগ বাড়িয়ে এগিয়ে নিতেন
আয়িশা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে চরিত্র, ব্যক্তিত্ব ও আদর্শের দিক থেকে ফাতিমার (রা) চাইতে এত মিল অন্য কারও মাঝে দেখিনি। ফাতিমা (রা) যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসতেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসা থেকে উঠে যেতেন, ফাতিমাকে (রা) চুমু খেতেন, নিজের জায়গায় তাকে বসাতেন।'
আবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ফাতিমার (রা) কাছে যেতেন, ফাতিমা (রা) বসা থেকে উঠে এসে স্বাগত জানাতেন। তাঁকে চুমু খেয়ে নিজের স্থানে বসাতেন।'
আবু দাউদের (রহ) এক বর্ণনায় এসেছে, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমার (রা) হাত ধরে তাঁকে চুমু খেলেন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটি ফাতিমা (রা)-এর সম্মানার্থে করতেন।
আয়িশা (রা) বলেন, 'ফাতিমা (রা) হেঁটে ঘরে এলেন। মনে হলো তাঁর হাঁটা অবিকল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাঁটা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে "এসো আমার প্রিয় কন্যা" বলে নিজের ডান বা বাঁ পাশে বসালেন।...'
এ হাদিসে ফাতিমা (রা)-এর প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভালোবাসা ও সম্মানের একটি অনুপম চিত্র দেখতে পেয়েছি আমরা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই তাঁর মেয়ের সাথে সাক্ষাৎ করতেন, তাঁকে স্বাগত জানাতেন।
দেখুন, নববি আদর্শ কেমন। আর ভাবুন ওই সব কঠোর-হৃদয় লোকদের চাঁছাছোলা মনোভঙ্গি নিয়ে, যারা মনে করে সন্তানদের সামনে সব সময় গম্ভীর ও সিরিয়াস চেহারা করে থাকাটা পৌরুষ, কর্তৃত্ব ও দায়িত্বশীলতার আলামত। বিশেষ করে কন্যা-সন্তানদের সামনে এমনটি বেশি করা হয়।
টিকাঃ
৩৩১. সুনানু আবি দাউদ: ৫২১৭, সুনানুত তিরমিজি: ৩৮৭২। হাদিসের মান: সহিহ।
৩৩২. সহিহুল বুখারি: ৩৬২৪, সহিহু মুসলিম: ২৪৫০।
📄 দুনিয়াবিমুখতা ও সাদাকা প্রদানের প্রতি সন্তানদের উদ্বুদ্ধ করতেন
আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) বলেন, 'একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমা (রা)-এর ঘরে যান। গিয়ে দেখেন, তাদের দরোজায় একটি পর্দা ঝুলানো। তিনি ঘরে প্রবেশ না করে ফিরে আসেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো সফর থেকে ফিরলে প্রায়শ সবার আগে ফাতিমার (রা) ঘরে যেতেন।
আলি (রা) ঘরে এসে ফাতিমাকে (রা) চিন্তিত দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে তোমার?"
ফাতিমা (রা) বললেন, "নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ঘরের সামনে এসে ঘরে না ঢুকে ফিরে গেলেন।"
এরপর আলি (রা) এলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। বললেন, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি ফাতিমার (রা) ঘরের সামনে গিয়েও ভেতরে গেলেন না, এটা ফাতিমার (রা) জন্য ভীষণ কষ্টদায়ক হয়েছে।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "দুনিয়ার সাথে আমার সম্পর্ক কী? আমার সাথে কারুকার্যের কী সম্পর্ক? আমি তার ঘরের দরোজায় একটি নকশাদার পর্দা ঝুলতে দেখলাম।"
আলি (রা) ফাতিমার (রা) কাছে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা জানালেন। ফাতিমা (রা) তখন বললেন, তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করুন, ওই পর্দার ব্যাপারে আমরা কী করব?"
আলি (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে ফাতিমার (রা) কথা বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "তাকে বলো, সে যেন অমুক গোত্রের কাছে এটি পাঠিয়ে দেয়। তাদের প্রয়োজন রয়েছে এটির।"'
মুহাল্লিব (রহ) প্রমুখ আলিমগণ (রহ) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জন্য যা অপছন্দ করতেন, আপন মেয়ের জন্যও তা অপছন্দ করতেন। আখিরাতের পূর্বেই দুনিয়াতে সুখ-শান্তি ভোগ করার বিষয়টি তিনি পছন্দ করতেন না। অন্যথায়, ঘরের দরোজায় পর্দা ঝোলানো হারাম নয়। এই ঘটনাটি খাদিম চাওয়ার ঘটনাটির মতো। একবার ফাতিমা (রা) ঘরের কাজগুলো করানোর জন্য একজন খাদিম চেয়েছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। তখন তিনি বলেছিলেন, "আমি কি খাদিমের চেয়েও উত্তম কিছু তোমাকে দেবো না?” এই বলে তিনি ঘুমানোর সময়ের জিকির শিখিয়ে দিলেন।'
টিকাঃ
৩৩৩. সহিহুল বুখারি: ২৬১৩, সুনানু আবি দাউদ: ৪১৪৯।
৩৩৪. ফাতহুল বারি: ৫/২২৯।
📄 দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণময় কাজের নির্দেশনা দিতেন
আলি (রা) বলেন, 'একবার ফাতিমা (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে এলেন তাঁর আটা পেষার কষ্টের কথা জানিয়ে একটি খাদিম চাওয়ার জন্য। কিন্তু ঘরে এসে তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পেলেন না। তাই বিষয়টি আয়িশা (রা)-কে বলে চলে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে এলে আয়িশা (রা) তাঁকে ফাতিমার (রা) খাদিম চাওয়ার কথা জানালেন।' আলি (রা) বলেন, 'এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে আসলেন। ততক্ষণে আমরা শুয়ে পড়েছিলাম। তাঁকে দেখে আমরা উঠে বসতে চাইলাম। কিন্তু তিনি "তোমরা আপন জায়গায় থাকো" বলে আমাদের মাঝখানে এসে বসলেন। আমি তখন আমার বুকে তাঁর দুপায়ের শীতল স্পর্শ অনুভব করলাম। তিনি বললেন, "আমি কি তোমাদের খাদিমের চেয়ে উত্তম কিছুর সন্ধান দেবো না? যখন তোমরা ঘুমানোর জন্য বিছানায় আসবে অথবা শুয়ে পড়বে, তখন ৩৩ বার "আল্লাহু আকবার", ৩৩ বার "সুবহানাল্লাহ”, ৩৩ বার "আলহামদুলিল্লাহ" পড়বে। এটা তোমাদের জন্য খাদিমের চাইতেও বেশি উত্তম।"'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ কন্যাকে খাদিম না দেওয়ার কারণ হচ্ছে, তিনি আহলে সুফফার দরিদ্রদের কষ্ট লাঘব করাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। নিজের পরিবারের জন্য সবর করাই শ্রেয় মনে করেছিলেন। কারণ, এতে তারা অধিক সাওয়াবের অধিকারী হয়।
হাদিস থেকে শিক্ষা
এই হাদিসে কন্যা ও জামাতার প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর-স্নেহের আধিক্য এবং সংকোচ ও দূরত্ব ঘুচিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে তাঁদের চূড়ান্ত অন্তরঙ্গতার একটি চিত্র উঠে এসেছে আমাদের সামনে। তাঁদের দুজনকে তিনি আপন জায়গা থেকে সরতে দেননি। উভয়কেই আপন অবস্থায় রেখে তিনি মাঝখানে ঢুকে পড়লেন-উভয়ের মাঝে ঢুকিয়ে দিলেন নিজের পা। এভাবে মাঝখানে বসে তাঁদের এমন একটি জিকির শেখালেন, যা তাঁদের কাঙ্ক্ষিত গোলাম থেকে উত্তম। এটি মূলত কাউকে এমন কিছু দান করা, যা সে চায়নি। এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের বোঝালেন যে, তাঁরা যা পেতে চাচ্ছে, তার চেয়ে উত্তম বস্তু হলো: আখিরাতের পাথেয় জোগাড় করা, দুনিয়ার কষ্টে ধৈর্যধারণ করা এবং ধোঁকার রাজ্য দুনিয়া থেকে যথাসম্ভব দূরে অবস্থান করা।'
খাদিম দেওয়ার পরিবর্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমা (রা)-কে আরও একটি দোয়া শিখিয়েছিলেন। আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'ফাতিমা (রা) নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে একটি খাদিম চাইলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "তুমি বরং এ দোয়া পড়ো-
اللهُمَّ رَبَّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ وَرَبَّ الْأَرْضِ وَرَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، رَبَّنَا وَرَبَّ كُلِّ شَيْءٍ، فَالِقَ الْحَبِّ وَالنَّوَى، وَمُنْزِلَ التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْفُرْقَانِ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ شَيْءٍ أَنْتَ آخِذُ بِنَاصِيَتِهِ، اللهُمَّ أَنْتَ الْأَوَّلُ فَلَيْسَ قَبْلَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْآخِرُ فَلَيْسَ بَعْدَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الظَّاهِرُ فَلَيْسَ فَوْقَكَ شَيْءٌ، وَأَنْتَ الْبَاطِنُ فَلَيْسَ دُونَكَ شَيْءٌ، اقْضِ عَنَّا الدَّيْنَ، وَأَغْنِنَا مِنَ الْفَقْرِ
“হে আল্লাহ, হে সপ্ত আকাশের রব, জমিনের রব, মহান আরশের রব, আমাদের রব ও প্রত্যেক বস্তুর রব, হে শস্য-বীজ ও আঁটি বিদীর্ণকারী! হে তাওরাত, ইনজিল ও কুরআন নাজিলকারী! আমি প্রত্যেক এমন বস্তুর অনিষ্ট থেকে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি, যার (মাথার) অগ্রভাগ আপনি ধরে রেখেছেন (নিয়ন্ত্রণ করছেন)। হে আল্লাহ, আপনিই প্রথম-আপনার পূর্বে কিছুই ছিল না, আপনি সর্বশেষ-আপনার পরে কোনো কিছু থাকবে না, আপনি সবকিছুর ওপরে-আপনার ওপরে কিছুই নেই, আপনি সর্বনিকটে-আপনার চেয়ে নিকটবর্তী কিছু নেই, আপনি আমাদের সমস্ত ঋণ পরিশোধ করে দিন এবং আমাদেরকে অভাবগ্রস্ততা থেকে অভাবমুক্ত করুন।"'
টিকাঃ
৩৩৫. সহিহুল বুখারি: ৩৭০৫, সহিহু মুসলিম: ২৭২৭।
৩৩৬. ফাতহুল বারি: ১১/১২৪।
৩৩৭. সহীহ মুসলিম: ২৭২৬ (৪/২০৮৪)
📄 সন্তানদের দায়িত্বশীলতা শেখাতেন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'ফাতিমা (রা), নিজেকে তুমি জাহান্নাম থেকে বাঁচাও। কারণ, আল্লাহর আজাব হতে রক্ষা করার ব্যাপারে আমি তোমার এতটুকু উপকারেও আসব না।'
ইমাম বুখারির (রহ) বর্ণনায় এসেছে, 'হে ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমার সম্পদের যা চাও চেয়ে নাও। কিন্তু আল্লাহর সামনে আমি তোমার কোনো উপকার করতে পারব না।'
ইমাম নববি (রহ) বলেন, 'হাদিসের মর্মার্থ হচ্ছে-"ফাতিমা, তুমি রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা, এই আত্মীয়তার ওপর ভরসা কোরো না। কেননা, আল্লাহ যদি তোমার বদ আমলের কারণে তোমাকে কোনো শাস্তি দিতে চান, তবে আমি সে শাস্তি রোধ করতে পারব না।"'
টিকাঃ
৩৩৮. সহিহুল বুখারি: ২৭৫৩, সহিহু মুসলিম: ২০৪।
৩৩৯. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ৩/৮০।