📄 ওলিমার ছিল সাধারণ
বুরাইদা (রা) বলেন, 'আলি (রা) ও ফাতিমা (রা)-এর বিয়ে হলো। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "বিয়েতে অবশ্যই অলিমা হওয়া দরকার।" তখন সাদ (রা) বললেন, "একটি ভেড়া আনার দায়িত্ব আমার।" আরেকজন বললেন, "আমি এ পরিমাণ আটা আনব।"'
অলিমা হচ্ছে, বিয়ের ভোজ। শব্দটি এসেছে ওয়ালাম শব্দ থেকে। যার অর্থ হচ্ছে একত্র করা। যেহেতু বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী একত্রিত হয়, তাই এ ভোজকে অলিমা বলে। জুমহুর আলিমের মতে, এটি মুসতাহাব।
স্বামী-স্ত্রীর বাসরের পরই অলিমা করা উত্তম। যেমনটা হাদিসে দেখেছি আমরা। তবে বাসরের পূর্বে, আব্দ হওয়ার সময় বা পরে করলেও কোনো অসুবিধে নেই।
অলিমার নির্দিষ্ট সময়ের ব্যাপারে শরয়ি কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তাই সমাজের আচার অনুযায়ী যখন অলিমা করলে ভালো হয়, তখন করতে সমস্যা নেই।
টিকাঃ
৩২৩. মুসনাদু আহমাদ: ২২৫২৬; ইবনে হাজার (রহ) ফাতহুল বারিতে বলেন, 'এ হাদিসের সনদ ত্রুটিমুক্ত।' আলবানি (রহ)-এর মতে হাদিসটি হাসান।
৩২৪. লিসানুল আরব: ১২/৬৪৩।
📄 বিয়ের সময় ফাতিমা ও আলি -এর জন্য দোয়া
বিয়ের রাত নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলি (রা)-কে বললেন, 'আমার সাথে দেখা করা ব্যতীত কোনো কিছু কোরো না।' এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে পানি নিয়ে আসতে বললেন। অজু করলেন পানি দিয়ে। অবশিষ্ট পানি আলি (রা)-এর ওপর ছিটিয়ে দিলেন। এবং দোয়া করলেন: اللهُمَّ بَارِكْ فِيهِمَا، وَبَارِكْ لَهُمَا فِي بِنَائِهما : "হে আল্লাহ, আপনি তাদের মাঝে বরকত দান করুন। তাদের দাম্পত্য জীবনে বরকত দান করুন।"'
স্বামী-স্ত্রীর জন্য বরকতের দোয়া করা মুসতাহাব। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুর রহমান বিন আওফের (রা) জন্য দোয়া করে বলেছিলেন, 'بَارَكَ اللهُ لَكَ -আল্লাহ তোমাকে বরকত দিন।'
টিকাঃ
৩২৫. তাবারানি কৃত আল-কাবির: ১১৫৩। হাদিসের মান: হাসান।
৩২৬. সহিহুল বুখারি: ৫১৫৫, সহিহু মুসলিম: ১৪২৭।
📄 বিয়ের পরও মেয়ের দেখাশোনা
বিয়ের পরও নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগের মতোই কন্যাদের খোঁজখবর অব্যাহত রাখেন। কোনো ব্যস্ততাতেই তিনি কন্যাদের তত্ত্বাবধানে পিছপা হতেন না। এমনকি কঠিন থেকে কঠিন অবস্থায়ও কন্যাদের ব্যাপারে চিন্তা করতেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বদর অভিযানে বের হন। তখন তাঁর কন্যা রুকাইয়া (রা) অসুস্থ। একটু পরে তাঁকে কুরাইশ ও কুরাইশের প্রবল নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হবে। ভীষণ এক বাস্তবতা তাঁর সামনে। কিন্তু তবুও তিনি কন্যার অসুস্থতার কথা ভুলে যাননি। রুকাইয়া (রা)-এর স্বামী উসমান বিন আফফান (রা)-কে তিনি মদিনায় থাকার আদেশ করলেন। যাতে রুকাইয়ার (রা) দেখাশোনা করতে পারেন। তিনি তাকে গনিমতের অংশ তো দিলেনই এবং বললেন, আল্লাহর কাছে তিনি জিহাদের সাওয়াবও পাবেন।
বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করার কারণে কেউ একজন উসমান (রা) সম্পর্কে ইঙ্গিতে অসংলগ্ন মন্তব্য করল। জবাবে ইবনে উমর (রা) বলেন, 'বদরের যুদ্ধে অংশ না নেওয়ার কারণ হচ্ছে-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহেবজাদি রুকাইয়া (রা) ছিলেন উসমানের (রা) স্ত্রী। বদরের সময়টাতে রুকাইয়া (রা) বেশ অসুস্থ ছিলেন। তাই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে মদিনায় থেকে যাওয়ার আদেশ করলেন এবং বললেন, "তোমার জন্য বদরে যোগদানকারীর প্রতিদান রয়েছে এবং রয়েছে বদরের গনিমতের অংশও।"'
টিকাঃ
৩২৭. সহিহুল বুখারি: ৩১৩০।
📄 কন্যা ও স্বামীর ছোটখাটো মান-অভিমান হন্তক্ষেপ করতেন না
সাহল বিন সাদ (রা) বলেন, 'একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমার (রা) বাড়িতে এলেন। আলিকে (রা) বাড়িতে না দেখে বললেন, "তোমার চাচাতো ভাই কোথায়?"
ফাতিমা (রা) বললেন, "আমার ও তাঁর মাঝে ঝগড়া হয়েছে। আমার সাথে রাগ করে বাইরে চলে গেছেন তিনি। দুপুরের বিশ্রামও করেননি বাড়িতে।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন এক ব্যক্তিকে বললেন, “দেখো তো কোথায় গেল সে?"
লোকটি আলির (রা) সন্ধান করে এসে বললেন, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তিনি মসজিদে শুয়ে আছেন।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে এসে দেখলেন, আলি (রা) শুয়ে আছে। তার শরীরের একাংশ থেকে চাদর পড়ে গিয়ে মাটি লেগে গেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার শরীরের মাটি মুছতে মুছতে বললেন, "উঠো হে মাটিওয়ালা, উঠো হে মাটিওয়ালা!”'
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, মেয়ের জামাইয়ের সাথে খোশামোদ করা যায়। রেগে গেলে শান্তও করা যায়।'
লক্ষণীয় যে, ফাতিমা (রা) ও তাঁর স্বামী আলি (রা)-এর মাঝে কী নিয়ে ঝগড়া হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা জানতে চাননি। তাদের ঝগড়ার বর্ণনাও জিজ্ঞেস করেননি তিনি। বরং পুরো ব্যাপারটাকে এড়িয়ে গেলেন এবং আলি (রা)-কে শান্ত করতে বেরিয়ে পড়লেন।
কন্যা ও তার স্বামীর ঝগড়ার সময় করণীয় কী, তা জানলাম আমরা। কিন্তু আজকাল অনেকেই স্বামী-স্ত্রীর ছোটখাটো ঝগড়ার মাঝে নাক গলিয়ে বসে। ফলে সমস্যা কমার পরিবর্তে উল্টো বেড়ে যায়। কখনো কখনো গুরুতর আকার ধারণ করে।
এ হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উত্তম চরিত্রের আরেকটি চিত্র আমরা দেখতে পেয়েছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা ও তার স্বামীর ঝগড়ার কথা শুনে স্বামীকে খুঁজতে লাগলেন। খুঁজে তাকে শান্ত করতে গেলেন। তার গায়ের মাটি ঝেড়ে দিলেন। মাটিওয়ালা বলে তার সাথে কৌতুক করলেন, যাতে তিনি ইতস্তত বোধ না করে অনায়াসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলতে পারেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মেয়ের সাথে ঝগড়া করার জন্য মেয়ের স্বামী আলি (রা)-কে মোটেই তিরস্কার করেননি। যদিও মেয়ে ফাতিমা (রা)-ই ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অধিক প্রিয়। আলি (রা)-কে এ বিষয়ে কিছুই বলেননি তিনি। এটা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রজ্ঞার নিদর্শন।
বোঝা গেল, জামাইয়ের প্রতি কোমল আচরণ করা, জামাইয়ের রাগ শান্ত করা, হৃদ্যতা অটুট রাখার স্বার্থে জামাইকে তিরস্কার না করা মুসতাহাব।
ইবনে বাত্তাল (রহ) বলেন, 'এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, মর্যাদাবান লোকদেরও স্ত্রীর সঙ্গে রাগারাগি হতে পারে-এতে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই। রাগ একটি মানবিক বৈশিষ্ট্য। রাগের কারণে ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়াও দোষণীয় কিছু নয়।'
রাগারাগির পর আলি (রা) বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন কারণ ফাতিমা (রা)-এর সাথে হয়তো এমন কোনো আচরণ করে ফেলতেন, যা ফাতিমা (রা)-এর মর্যাদার সঙ্গে যায় না। তাই মন্দ কিছু করার সম্ভাবনা একেবারেই শূন্যের কোঠায় আনার জন্য উভয়ের রাগ ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত আলি (রা) ঘরের বাইরে চলে গেলেন।'
এ হাদিস থেকে আরও বোঝা যাচ্ছে, স্বামী যখন অনুভব করবে, স্ত্রীর সাথের রাগারাগিটা আরও গুরুতর সমস্যার দিকে নিয়ে যাবে, তখন স্বামী ঘর থেকে বের হয়ে সে সম্ভাবনা বাতিল করে দেবে। এ অবস্থায় বাড়ি ত্যাগ করার ফলে মানুষ নিজের কথার হিসেব করার সময় পাবে। রাগের সময় কারও ভুল নিজের কাছে ধরা পড়ে না। কিন্তু বাড়ি থেকে বের হয়ে একান্তে চিন্তা করলে নিজের ভুল নিজের কাছে ধরা দেয়। কিন্তু বাড়িতে থাকলে এমনটা হতো না মোটেই। বাড়িতে থাকলে উল্টো তাদের ঝগড়া সীমালঙ্ঘনের পর্যায়ে পৌঁছে যেত।
অন্যদিকে, ফাতিমা (রা) কিন্তু তাদের ঘর থেকে বের হয়ে বাবার বাড়িতে চলে আসেননি। তিনি এমনটা করলে, সমস্যা আরও বেড়ে যেত। কিন্তু তিনি স্বামীর ঘরে থাকার কারণে সমস্যাটি হতে পারেনি।
পরিবারের লোকদের করণীয় হচ্ছে, দম্পতিকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। তাদের নসিহত করা। স্ত্রীকে সবর করতে বলা। স্বামীর সাথে সদাচরণের নির্দেশনা দেওয়া।
টিকাঃ
৩২৮. সহিহুল বুখারি ৪৪১, সহিহু মুসলিম: ২৪০৯।
৩২৯. ফাতহুল বারি: ১/৫৩৬।
৩৩০. ফাতহুল বারি: ১০/৫৮৮।