📄 কন্যাদের বিয়ে দিয়েছেন উত্তম পুরুষদের সাথে
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যাদের ভালোবাসতেন এবং সম্মান করতেন। তাদের নিয়ে তিনি অনেক বেশি খুশি ছিলেন।
এখানে কন্যার জনকদের শেখার আছে অনেক কিছু। কন্যা-সন্তান যত বেশিই হোক, পিতার উচিত তাদের নিয়ে খুশি প্রকাশ করা, এই অমূল্য নিয়ামতের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং তাদের যথাযথ তালিম-তরবিয়তের দিকে মনোযোগী হওয়া।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'কাউকে যদি কন্যা-সন্তান দিয়ে পরীক্ষা করা হয়, আর সে যদি তাদের সঙ্গে সদাচরণ করে-তবে তারা জাহান্নাম ও তার মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে।'
কন্যা-সন্তান দিয়ে পরীক্ষা করার অর্থ হলো, আল্লাহ মানুষকে কন্যা-সন্তান দিয়ে যাচাই করেন-সে তার সঙ্গে কেমন আচরণ করে ভালো আচরণ করে, না মন্দ। যে ভালো আচরণ করবে, তার জন্য কন্যা-সন্তান জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হবে। কেননা, কন্যা-সন্তান বেশ দুর্বল হয় এবং অধিক রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের প্রয়োজন পড়ে।
পিতার কর্তব্য হচ্ছে, কুফু দেখে দ্বীনদার ও উত্তম চরিত্রবান ছেলের সাথে কন্যার বিয়ে দেওয়া। এটি পিতার ওপর ওয়াজিব।
জাইনাব (রা)-এর বিয়ে জাইনাবকে (রা) তিনি বিয়ে দিয়েছিলেন আবুল আস বিন রাবি কুরাইশি (রা)-এর সাথে। আবুল আস (রা) ছিলেন জাইনাবের (রা) খালা হালাহ বিনতে খুয়াইলিদের (রা) সন্তান। আবুল আস (রা) মক্কার সেরা পুরুষদের একজন ছিলেন। ব্যবসা, সম্পদ ও আমানতদারিতায় অনন্য ছিলেন তিনি।
জাইনাব (রা) ও তাঁর স্বামী আবুল আসের (রা) মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করে দেয় ইসলাম। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হননি একটা সময় পর্যন্ত। জাইনাব (রা) মুসলিম হয়েও তাঁর স্বামীর সাথে বসবাস করছিলেন। স্বামী তখনও মুশরিক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিয়ে আসতে সমর্থ ছিলেন না। তাই জাইনাব (রা) স্বামীর সাথে মক্কায় রয়ে গেলেন।
বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের সথে আবুল আসও (রা) আসেন। বন্দী ৭০ জনের মধ্যে তিনিও ছিলেন। এরপরের ঘটনা বর্ণনায় আয়িশা (রা) বলেন, 'বদরের বন্দীদের জন্য মুক্তিপণ পাঠাল মক্কাবাসী। আবুল আসের (রা) মুক্তির জন্য জাইনাবও (রা) মুক্তিপণ পাঠালেন। সে মুক্তিপণের একটা অংশ ছিল খাদিজার (রা) হার। আবুল আসের (রা) সাথে জাইনাবের (রা) যখন বিয়ে হয়, তখন এ হারটি খাদিজা (রা) জাইনাবকে (রা) উপহার দিয়েছিলেন।'
এ হারটি দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবেগ-তাড়িত হয়ে পড়েন ভীষণভাবে। সাহাবিদের (রা) উদ্দেশে তিনি বললেন, "যদি তোমরা ভালো মনে করো, তবে জাইনাবের (রা) বন্দীকে মুক্ত করে দাও। সাথে তার মুক্তিপণও ফিরিয়ে দাও।" সাহাবিরা (রা) সায় দিলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবুল আস (রা) থেকে কথা নিলেন, আবুল আস (রা) জাইনাবের (রা) হিজরতের পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাইদ বিন হারিসা (রা) ও এক আনসারকে (রা) পাঠালেন জাইনাবকে (রা) আনার জন্য। তাদের বললেন, "তোমরা ইয়াজিজ পাহাড়ের পাদদেশে অপেক্ষা করবে জাইনাব (রা) আসা পর্যন্ত। জাইনাব (রা) সেখানে আসলে তাকে নিয়ে আসবে।"'
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জামাতা আবুল আসের (রা) প্রশংসায় একবার বলেন, "সে আমার সাথে সত্য বলেছে। আমার সঙ্গে কৃত ওয়াদা পূরণ করেছে। ওয়াদা দিয়ে সে ওয়াদা পূরণ করেছে।"'
বদরের পর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াদা নিয়েছিলেন আবুল আস (রা) মক্কায় ফিরে জাইনাবকে (রা) পাঠিয়ে দেবে। আবুল আস (রা) সে ওয়াদা পালন করেছেন। জাইনাবের (রা) প্রতি তার অত্যধিক ভালোবাসা সত্ত্বেও জাইনাবকে (রা) যেতে দিয়েছেন।
রুকাইয়া (রা) ও উম্মে কুলসুম (রা)-এর বিয়ে: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকাইয়াকে (রা) বিয়ে দিয়েছিলেন উসমান (রা)-এর সাথে। উসমান (রা) ছিলেন অনন্য চরিত্রের অধিকারী। লজ্জাশীলতা ছিল তাঁর অনুপম চরিত্রের অন্যতম অংশ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে অনেক ভালোবাসতেন। তিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তদের একজন।
রুকাইয়া (রা) যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকাইয়ার (রা) বোন উম্মে কুলসুমকে (রা) বিয়ে দেন উসমান (রা)-এর সাথে। উম্মে কুলসুমও (রা) মৃত্যু পর্যন্ত উসমান (রা)-এর সাথে দাম্পত্য জীবনযাপন করেছিলেন।
ফাতিমা (রা)-এর বিয়ে ফাতিমা (রা)-এর বিয়ে দেন আলি (রা)-এর সাথে।
আলি (রা) ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চাচাতো ভাই। শিশুদের মধ্যে আলি (রা)-ই প্রথম ইমান আনেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি। ইসলাম-পূর্ব যুগে আলি (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে লালিতপালিত হন। নবুওয়াতের পর পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথেই ছিলেন আলি (রা)। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ভালোবাসতেন, তাকে কাছে টেনে নিতেন। আলি (রা) জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্তদের একজন।
টিকাঃ
৩১৫. সহিহুল বুখারি: ৫৯৯৫, সহিহু মুসলিম: ২৬২৯।
৩১৬. সুনানু আবি দাউদ: ২৬৯২। হাদিসের মান: হাসান।
৩১৭. সহিহুল বুখারি: ৩১১০, সহিহু মুসলিম: ২৪৪৯।
📄 বিয়ের ব্যাপারে কন্যাদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন
আতা বিন রবাহ (রহ) বলেন, 'আলি (রা) যখন ফাতিমাকে (রা) বিয়ে করার প্রস্তাব দিলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমার (রা) কাছে এলেন। বললেন, "আলি (রা) তোমার কথা বলেছে।" ফাতিমা (রা) চুপ হয়ে থাকলেন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে এলেন ফাতিমার (রা) কাছ থেকে। তাকে বিয়ে দিলেন আলি (রা)-এর সাথে।'
ফাতিমা (রা)-এর চুপ থাকাই সম্মতি ছিল। 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের (রা) উদ্দেশে বলেন, "কুমারী মেয়ের সম্মতি ব্যতীত তাকে বিয়ে দেবে না।" সাহাবিগণ (রা) জিজ্ঞেস করলেন, "তার অনুমতি কেমন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম?" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "কুমারী কন্যার চুপ থাকাই সম্মতি।"'
কন্যা পিতার কাছে আমানত। কন্যার অমতে তার বিয়ে দেওয়া বৈধ নয়।
টিকাঃ
৩১৮. ইবনে সাদ (রহ) কৃত তাবাকাত: ৮/২০।
৩১৯. সহিহুল বুখারি: ৫১৩৬, সহিহু মুসলিম: ১৪১৯।
📄 কন্যাদের অত্যধিক মোহর নির্ধারণ করতেন না
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কম মোহরে বিয়ে দিয়েছেন তাঁর কন্যাদের। ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, 'আলি (রা) বলেন, "আমি ফাতিমাকে (রা) বিয়ে করলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাকে কিছু দাও।" আমি বললাম, "আমার কাছে তো দেওয়ার মতো কিছু নেই।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমার হুতামি বর্মটি কোথায়?" আমি বললাম, "সেটি আমার কাছে আছে।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "সেটিই দিয়ে দাও।"'
এটাই ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছোট কন্যা, আদরের দুলালি, জান্নাতি নারীদের সর্দার ফাতিমার (রা) মোহর-একটি হুতামি বর্ম।
হুতামি বর্ম কাকে বলে? 'হুতামি শব্দটি হুতামা বিন মুহারিব নামক এক গোত্র থেকে এসেছে। এ গোত্রটি আব্দুল কাইস গোত্রের একটি শাখা। তারা বর্ম তৈরির কাজ করত। আবার বলা হয়, হুতামি শব্দটির অর্থ التي تحطم السيوف তথা যে বর্ম তলোয়ার ভেঙে দেয়।'
অথচ আমাদের এ যুগের কিছু মানুষ মোহর নির্ধারণে সীমালঙ্ঘন করে ফেলে। এমনটা মোটেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ নয়। যদি বেশি মোহর নির্ধারণ করা সম্মানের বিষয় হতো, তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা-ই করতেন।
টিকাঃ
৩২০. সুনানু আবি দাউদ: ২১২৫, সুনানুন নাসায়ি: ৩৩৭৫। হাদিসের মান: সহিহ।
৩২১. নিহায়া: ১/৯৯৪।
📄 কন্যার সংসারের আসবাবপত্র
আলি (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফাতিমাকে (রা) তার সাথে বিয়ে দিলেন। একটি পশমি চাদর, চামড়ার আবেষ্টনে খেজুর পাতার আঁশভর্তি একটি বালিশ, দুটি পেষণযন্ত্র, পানি রাখার একটি মশক এবং দুটি পানি রাখার মৃৎপাত্র দিয়ে ফাতিমাকে (রা) আমার ঘরে পাঠান।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য একটি ঘর ঠিক করে দেন। ঘরটি ছিল মুমিন-জননী আয়িশা (রা)-এর ঘরের পেছনে উত্তর দিকে, বাবে জিবরিলের বিপরীতে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে একটি ছোট ঘুলঘুলি ছিল-যা দিয়ে আলি-ফাতিমার (রা) ঘর দেখা যেত।
হাদিস থেকে শিক্ষা
বিয়েকে সহজ করাই নববি আদর্শ। এটিই সুন্নাহ। বরের সামর্থ্য অনুযায়ী বিয়ের আয়োজন হবে। দাম্পত্য জীবন কাটানোর ঘর তৈরির ব্যাপারে স্বামী বা স্ত্রীর সামর্থ্যের বাইরে কারও ওপরই চাপ দেওয়া যাবে না।
এই হাদিস থেকে আরও বোঝা যায়, পাত্রীর পিতার উচিত বিবাহের ব্যয় ও দায়িত্ব বহনে পাত্রের সহযোগী হওয়া। এভাবে বলা ঠিক নয় যে, সবকিছু পাত্রকেই দিতে হবে। বর্তমান সময়ে অধিকাংশ বিয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, পাত্র সদ্য পাস করা ছাত্র বা নতুন চাকুরে-যার বেতন কম, বিয়েতে যাকে সাহায্য না করলেই নয়। অন্যদিকে অধিকাংশ পিতা হন অবস্থাসম্পন্ন। তাদের দীর্ঘ দিনের চাকরি বা ব্যবসা। হাতের কাছে জমানো টাকা থাকে। তাই পাত্রীর পিতা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে পাত্রকে সাহায্য করতে পারে অনায়াসে। তাই পিতার উচিত জামাইয়ের সাহায্যে এগিয়ে আসা। হতে পারে, ঘরের কিছু আসবাব কিনে দেওয়া বা রান্নাঘরের কিছু সরঞ্জাম ক্রয় করে দেওয়া, যেমনটা আমরা হাদিসে দেখেছি।
টিকাঃ
৩২২. মুসনাদু আহমাদ: ৮২১। হাদিসের মান: সহিহ।