📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 ঘটনা বিশ্লেষণ ও শিক্ষা

📄 ঘটনা বিশ্লেষণ ও শিক্ষা


✓ প্রথমেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ থাকার নীতি অবলম্বন করলেন। তাঁর স্ত্রীগণ অতিরিক্ত ভরণপোষণ চাইলেন, কিন্তু তিনি দেবেন কি দেবেন না, তা বললেন না। অন্য কোনো কিছুও বললেন না। বরং নীরব হয়ে থাকলেন।

✓ প্রথমে তিনি বিষয়টি উপেক্ষা করার নীতি অবলম্বন করলেন। কারণ দাম্পত্য জীবনের অনেক সমস্যা ঝগড়া বা তর্ক-বিতর্কে সমাধান হয় না। বরং এমন কিছু বিষয় আছে, যে বিষয়ে তর্ক করলে ঝগড়া আরও শক্ত হয়ে দাঁড়ায়।

✓ দ্বিতীয় যে কর্মপন্থাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রহণ করেছিলেন সেটি হচ্ছে, তিনি স্ত্রীদের বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিলেন। তিনি স্ত্রীদের বেছে নিতে বললেন এ অবস্থায় তাঁর সাথে তারা থাকবেন, না তারা অতিরিক্ত খোরপোশ ও তাঁর থেকে পৃথক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন।

✓ এ পার্থিব সমস্যাটি সমাধানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাখয়ির (تخيير) তথা বাছাই করে নেওয়ার পদ্ধতি ব্যবহার করলেন। অর্থাৎ স্ত্রীদেরকে দুটি অপশনের একটি বাছাই করার স্বাধীনতা দিলেন। দাম্পত্য জীবনের বিবিধ বিষয়ে পরামর্শ করার মূলনীতি দেখিয়ে দিচ্ছে এ পদ্ধতিটি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের ধীরতা অবলম্বন করতে বললেন, তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করলেন। যেমন তিনি আয়িশা (রা)-কে বললেন, 'আমি তোমাকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলি। তুমি তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিয়ো না।'

এ ব্যাপারটি আমাদের সময়ের সংসারগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখি। আমাদের এ সময়ের সংসারগুলো স্বামী-স্ত্রীতে দ্বিমত হলেই স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ধমক দিয়ে যাবে অনবরত। স্ত্রীর কোনো ভুল হলেই বলে উঠবে, 'আমি তোমাকে তালাক দেবো অচিরেই।' স্ত্রী যদি কোনো কিছুতে কমতি করে স্বামী বলে উঠবে, 'আমি তোমাকে তালাক দেবো। যদি তুমি ঘর থেকে বের হও, তবে তুমি তালাক।' স্ত্রী যদি কণ্ঠস্বরটা একটু উঁচু করে সাথে সাথে বলে উঠবে, 'অমুক নারীর সাথে কথা বলেছ তো তুমি তালাক।'

✓ এ ঘটনা থেকে আমরা জানতে পাচ্ছি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের ওপর কঠোরতা করেননি। তাদের গায়ে এতটুকু আঘাতও করেননি। তাদের এতটুকু অপমানও করেননি। বরং তিনি তাদের সাথে এক মহৎ পদ্ধতিতে আচরণ করেছেন।

অন্যদিকে, যখন আবু বকর (রা) ও উমর (রা) আয়িশা (রা) ও হাফসা (রা)-এর দিকে এগিয়ে গেলেন তাদের প্রহার করতে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিবৃত্ত করলেন তাদের। কারণ, মারধর করে সব সমস্যার সমাধান হয় না। বরং অনেক সময় আলাপ-আলোচনা করা, স্ত্রীকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাস্তবতা সম্পর্কে সন্তুষ্ট করার মাধ্যমেই হয় সমাধান।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নারীদের প্রতি একটি পরামর্শ

📄 নারীদের প্রতি একটি পরামর্শ


স্বল্প আয়ের স্বামীর ঘরের স্ত্রী যখন ধনী কারও বাড়িতে যায়, বিলাসবহুল কোনো বাড়িতে যায়, তখন তার জন্য উচিত নয় স্বামীকে দুষতে থাকা, স্বামীর কাছে বিলাসিতা কামনা করা। কারণ, তার স্বামী ছাত্র হতে পারে, হতে পারে তার চাকরিটায় বেতন স্বল্প। স্ত্রীর উচিত তার স্বামীর সামর্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখা। আর এটাই আল্লাহর ফয়সালা।

نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُم مَّعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُم فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِّيَتَّخِذَ بَعْضُهُم بَعْضًا سُخْرِيًّا

"আমি তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করেছি পার্থিব জীবনে এবং একের মর্যাদাকে অপরের ওপর উন্নীত করেছি, যাতে একে অপরকে সেবকরূপে গ্রহণ করে।"

বাবার বাড়িতে মেয়ে খুব আরামে ছিল, বাবা মেয়েকে প্রতিদিন কিছু না কিছু এনে দিত; এর অর্থ এ নয় যে, স্বামীর বাড়িতে এসে স্বামীকে প্রতিদিন কিছু আনার জন্য বলতে হবে।

অতিরিক্তি খোরপোশ চাওয়া, বেশি বেশি জিনিস চাওয়া স্বামীকে সমস্যায় ফেলে দেওয়ার নামান্তর। বিশেষ করে স্বামী যখন দরিদ্র হয়। কারণ, এভাবেই স্ত্রী দুর্বল ইমানের স্বামীকে ধীরে ধীরে ঠেলে দেয় হারাম উপার্জনের পথে। ফলে স্ত্রী নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্বামীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সাথে সাথে একটি পরিবারকে কল্যাণ ও সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত করে। স্ত্রীর চাপে পড়ে ঘুষ, চুরি ইত্যাদি অপকর্ম করতে প্ররোচিত হয় স্বামী। ফলে কখনো চাকরিহারা হয়, কখনো-বা জেলে গিয়ে শাস্তি ভোগ করতে হয়। ফলে তার দ্বীন-দুনিয়া দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অন্যদিকে, স্বামীর উচিত স্ত্রীকে অবহেলা না করা। স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেওয়া। আদরে-সোহাগে আগলে রাখা। এতে অভাব ও টানাপোড়নের সংসারেও সুখ ও সমৃদ্ধি আসবে। স্বামীর উচিত হবে সাধ্যের মধ্যে স্ত্রীর বৈধ ইচ্ছে পূরণ করা।

টিকাঃ
৩০৪. সুরা আজ-জুখরুফ, ৪৩: ৩২।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 রাসূল ﷺ-এর কয়েকজন স্ত্রীর কূটকৌশল

📄 রাসূল ﷺ-এর কয়েকজন স্ত্রীর কূটকৌশল


আয়িশা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধু-মিষ্টান্ন পছন্দ করতেন। আসরের পর তিনি প্রত্যেক স্ত্রীর নিকট আসতেন। নিকটবর্তী হতেন সবার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধু পান করতেন জাইনাব বিনতে জাহাশের (রা) কাছে। তার কাছে কিছু সময় কাটাতেন এ কারণে। আমি তখন মনে মনে বললাম, আমি কি একটা কৌশলের আশ্রয় নেব না!

এরপর যা ভাবলাম, তা হাফসার (রা) সাথে আলোচনা করলাম। বললাম, 'এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের যার কাছেই আসবে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সে বলবে, "আপনি মাগাফির খেয়েছেন? আমি আপনার শরীর থেকে মাগাফিরের দুর্গন্ধ পাচ্ছি।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হবে-এটা খুব অপছন্দনীয় ছিল তাঁর কাছে।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দুজনের একজনের কাছে আসলেন। সলা-পরামর্শে ঠিক করা কথাটাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলা হলো। উত্তরে তিনি বললেন, "আমি তো জাইনাবের (রা) কাছে মধু পান করেছিলাম। শপথ করছি, আর কখনো আমি তার কাছে মধু পান করব না। এ কথাটি কাউকে বলবে না তুমি।"

এরপর নাজিল হলো:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمُ - قَدْ فَرَضَ اللهُ لَكُمْ تَحِلَّةَ أَيْمَانِكُمْ وَاللَّهُ مَوْلَاكُمْ وَهُوَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ - وَإِذْ أَسَرَّ النَّبِيُّ إِلَى بَعْضِ أَزْوَاجِهِ حَدِيثًا فَلَمَّا نَبَّأَتْ بِهِ وَأَظْهَرَهُ اللهُ عَلَيْهِ عَرَّفَ بَعْضَهُ وَأَعْرَضَ عَنْ بَعْضٍ فَلَمَّا نَبَّأَهَا بِهِ قَالَتْ مَنْ أَنْبَأَكَ هَذَا قَالَ نَبَّأَنِي الْعَلِيمُ الْخَبِيرُ - إِنْ تَتُوبَا إِلَى اللهِ فَقَدْ صَغَتْ قُلُوبُكُمَا وَإِنْ تَظَاهَرَا عَلَيْهِ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ مَوْلَاهُ وَجِبْرِيلُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمَلَائِكَةُ بَعْدَ ذَلِكَ ظَهِيرُ - عَسَى رَبُّهُ

"হে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আল্লাহ আপনার জন্য যা হালাল করছেন, আপনি আপনার স্ত্রীদের খুশির জন্য তা নিজের জন্য হারাম করেছেন কেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়।

আল্লাহ তোমাদের শপথ হতে মুক্তিলাভের ব্যবস্থা করেছেন, আল্লাহ তোমাদের সহায়; তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।

যখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের একজনকে গোপনে কিছু বলেছিল, অতঃপর যখন সে তা অন্যকে বলে দিয়েছিল এবং আল্লাহ নবিকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা জানিয়ে দিয়েছিলেন। তখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিষয়ে কিছু ব্যক্ত করল এবং কিছু অব্যক্ত রাখল। যখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা তাঁর সেই স্ত্রীকে জানাল, তখন সে বলল, কে আপনাকে এটা অবহিত করল? নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলল, আমাকে অবহিত করেছেন তিনি যিনি সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।

যেহেতু তোমাদের হৃদয় ঝুঁকে পড়েছে, যদি তোমরা উভয়ে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর নিকট তাওবা করো (তাহলে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন)। কিন্তু তোমরা যদি নবির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরুদ্ধে একে অপরের সহযোগিতা করো, তাহলে জেনে রেখো যে, আল্লাহই তাঁর বন্ধু এবং জিবরাইল (আ) ও সৎ আমলকারী মুমিনগণও। উপরন্তু ফেরেশতারাও তাঁর সাহায্যকারী।

যদি নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করে, তাহলে তাঁর রব সম্ভবত তাঁকে দেবেন তোমাদের অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর স্ত্রী। যারা হবে আত্মসমর্পণকারিণী, বিশ্বাসিনী, আনুগত্যকারিণী, তাওবাকারিণী, ইবাদতকারিণী, সিয়াম পালনকারিণী, অকুমারী এবং কুমারী।"

টিকাঃ
৩০৫. উরফুত নামক এক ধরনের গাছের সুমিষ্ট আঠালো কষ, যাতে একপ্রকার কটু গন্ধ থাকে।
৩০৬. সুরা আত-তাহরিম, ৬৬: ১-৫।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 রাসূল ﷺ-এর গৃহীত পদক্ষেপ

📄 রাসূল ﷺ-এর গৃহীত পদক্ষেপ


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের অতিরিক্ত ভরণপোষণ চাওয়া ও মধুর ঘটনার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মাসের জন্য স্ত্রীদের পরিত্যাগ করেন।

ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'সম্ভবত, কয়েকটি কারণ একত্রিত হওয়ার পরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের পরিত্যাগ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ত্বরাপ্রবণতা দেখাননি। স্রেফ তাদের থেকে পৃথক থাকলেন কিছু সময়ের জন্য। উন্নত চরিত্র, প্রশস্ত হৃদয় ও ক্ষমার মাধুর্যে পূর্ণ অন্তর যাঁর, তাঁর থেকে এ পদক্ষেপই যথার্থ ও কাঙ্ক্ষিত। অযাচিত ঘটনা কয়েকবার ঘটার পরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হলেন।'

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) বলেন যে, তিনি উমর (রা)-এর কাছে জানতে চাইলেন, '"যেহেতু তোমাদের হৃদয় ঝুঁকে পড়েছে, যদি তোমরা উভয়ে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর নিকট তাওবা করো"-আয়াত দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন দুজন স্ত্রী উদ্দেশ্য?'

তিনি বললেন, 'আব্বাস-পুত্র, (এত দেরিতে জিজ্ঞেস করলে বলে) আমি আশ্চর্য হলাম। তারা দুজন হলেন, আয়িশা (রা) ও হাফসা (রা)।'

ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'এরপর উমর (রা) বলে চললেন বাকি ঘটনা, "আমাদের কুরাইশগণের মাঝে নারীরা ততটা স্বাধীনচেতা ছিল না, যতটা না আনসারদের নারীরা ছিল। যখন আমরা আনসারদের নিকটে মদিনায় এলাম, তখন আমাদের নারীরাও তাদের সে স্বাধীনচেতা মনোভাব দ্বারা প্রভাবিত হলো। তাদের আচার-আচরণ শিখতে লাগল আমাদের নারীরা।'

আমার বাড়িটি বনু উমাইয়া বিন জাইদের পাশে ছিল। জায়গাটি ছিল উঁচুতে। একবার আমি কোনো ব্যাপারে আমার স্ত্রীর ওপর একটু গলা চড়িয়ে কথা বলি। তখন আমার স্ত্রীও আমাকে অনুরূপ ফিরিয়ে দেয় এবং আমার সাথে বিতর্ক করে। এটা আমার কাছে অপছন্দনীয় মনে হলো।'

তখন তিনি বললেন, "আপনি আমার এ কথায় অবাক হচ্ছেন? আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীরাও তাঁর সাথে রাগ করে কথা বলেন। তাদের কেউ কেউ তো রাগ করে পুরো দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলেন না।"

তারপর আমি হাফসার (রা) কাছে গেলাম। তাকে বললাম, "হাফসা, তোমরা কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তর্ক করো?"

"হাঁ।" হাফসা (রা) বলল।

"তোমাদের কেউ কি সকাল হতে রাত পর্যন্ত নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে রাগ করে কথা বন্ধ করে থাকে?" জিজ্ঞেস করলাম আমি।

হাফসা (রা) জবাব দিল, "হাঁ।"

আমি বললাম, "তোমাদের মধ্যে যে এ রকম করল, সে তো ধ্বংস হয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রাগানোর কারণে তোমরা কেউ কি আল্লাহর ক্রোধ থেকে রক্ষা পাবে!? সে তো ধ্বংস হয়ে যাবে।"

কখনো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে তর্কে জড়াবে না। তাঁর কাছে কোনো কিছু চাইবে না। তোমার যা প্রয়োজন আমাকে বলবে। তোমার এ প্রতিবেশী তোমার চাইতে সুন্দরী, তোমার চাইতে বেশি প্রিয় সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। তার এমন ব্যবহারে তুমি ধোঁকায় পড়বে না।" উমর (রা) আয়িশা (রা)-এর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন তাঁর কথায়।'

উমর (রা) বলে গেলেন, 'আমার এক আনসারি প্রতিবেশী ছিল। আমরা পালাক্রমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যেতাম। একদিন সে যেত। একদিন আমি যেতাম। যেদিন সে যেত, সেদিন ওহি ও অন্য সব ইলম আমার কাছে নিয়ে আসত। আর আমিও তাকে এসে জানাতাম, যেদিন আমি যেতাম। আমাদের সবার মাঝে গাস্সানদের নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল সে সময়। খবর ছড়িয়েছিল, গাসসানিরা আমাদের ওপর আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।'

যেদিন আমার এ আনসার বন্ধুর পালা ছিল, সেদিন ইশার সময় সে আমার কাছে আসলো। দরোজায় কড়া নেড়ে আমাকে ডাক দিল। আমি বেরিয়ে এলাম তার কাছে। সে বলল, "মারাত্মক কাণ্ড ঘটে গেছে।"

আমি বললাম, "কী হয়েছে? গাসসানিরা এসে গেছে?"

সে বলল, "না। তার চেয়ে ভয়ানক ঘটনা ঘটে গেছে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন!"

আমি বললাম, "হাফসা (রা) ধ্বংস হয়ে গেল! আমি ধারণা করছিলাম, এমন কিছু একটা ঘটবে।"

ফজর নামাজ পড়ে আমি কাপড়-চোপড় গায়ে চাপিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাড়িতে এলাম। চলে এলাম হাফসার (রা) কাছে। দেখলাম, সে কেঁদে চলেছে। তাকে বললাম, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি তোমাদের তালাক দিয়েছেন?"

"জানি না আমি। তবে তিনি এ কক্ষে পৃথক হয়ে বাস করছেন।" বলে হাফসা (রা) ইশারা করে দেখিয়ে দিল।'

এরপর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কালো গোলামের কাছে এলাম। তাকে বললাম, "উমরের (রা) জন্য অনুমতি নাও।"

সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে ফিরে আসলো। বলল, "আপনার কথা বলেছি, কিন্তু তিনি নীরব হয়ে আছেন।"

এরপর আমি সেখান থেকে চলে এলাম। মসজিদে মিম্বারের কাছে এসে বসে পড়লাম। দেখলাম, লোকেরা বসে আছে। কয়েকজন কাঁদছে। আমি কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। কিন্তু আমার ওপর প্রভাব বিস্তার করল আমার মনের আবেগ। উঠে এলাম সেখান থেকে।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোলামের কাছে এসে বললাম, "উমরের (রা) জন্য অনুমতি নাও।"

সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে ফিরে আসলো। বলল, "আপনার কথা বলেছি, কিন্তু তিনি নীরব হয়ে আছেন।"

আমি পেছন ফিরে চলে আসছিলাম। ঠিক তখন গোলামটি আমাকে ডাক দিয়ে বলল, "আসুন। আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন তিনি।"

আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম। সালাম দিলাম তাঁকে। দেখলাম, বালিশে হেলান দিয়ে খেজুরের চাটাইয়ের ওপর শুয়ে আছেন তিনি। ফলে তাঁর শরীরে দাগ পড়ে গেছে চাটাইয়ের।

তাঁকে সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বললাম, "আপনি কি আপনার স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন?"

তিনি মাথা তুললেন। জবাব দিলেন, "না।"

আমি তখন বলে উঠলাম, "আল্লাহু আকবার।"

এরপর দাঁড়িয়ে থেকেই বললাম, "আমি আপনার সাথে একান্তে কিছু কথা বলতে চাই। আমাদের কুরাইশগণের মাঝে নারীরা ততটা স্বাধীনচেতা ছিল না, যতটা না আনসারদের নারীরা। যখন আমরা মদিনায় এলাম, তখন আমাদের নারীরাও তাদের সে স্বাধীনচেতা মনোভাব দ্বারা প্রভাবিত হলো। তাদের অভ্যাস রপ্ত করতে লাগল। আমি কোনো ব্যাপারে আমার স্ত্রীর ওপর একটু গলা চড়িয়ে কথা বলি। তখন আমার স্ত্রীও আমাকে অনুরূপ ফিরিয়ে দেয় এবং আমার সাথে বিতর্ক করে। এটা আমার কাছে অপছন্দনীয় মনে হলো।"

স্ত্রী আমাকে বলল, "আপনি আমার এ কথায় অবাক হচ্ছেন? আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীরাও তাঁর সাথে রাগ করে কথা বলেন। তাদের কেউ কেউ তো রাগ করে পুরো দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলেন না।" এটা আমাকে আশ্চর্যান্বিত করল। আমি তাকে বললাম, "তাদের মধ্যে যে এ রকম করল সে তো ধ্বংস। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রাগানোর কারণে তাদের কেউ কি আল্লাহর ক্রোধ থেকে রক্ষা পাবে? সে তো ধ্বংস হয়ে যাবে।"'

উমর (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মুচকি হাসলেন।'

উমর (রা) বলেন, 'এরপর আমি বললাম, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি কী মনে করেন এ ব্যাপারে যে, আমি হাফসাকে (রা) বলে এলাম, তোমার এ প্রতিবেশী তোমার চেয়ে সুন্দরী, তোমার চাইতে বেশি প্রিয় সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। তার এমন ব্যবহারে তুমি ধোঁকায় পড়বে না?"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেকবার মুচকি হাসলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে মুচকি হাসতে দেখে আমি বসলাম।

বললাম, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি আপনাকে কিছু বলতে চাই একান্তে।"

তিনি বললেন, “হাঁ, বলো।"

আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলতে থাকলাম। একসময় দেখলাম, তাঁর চেহারা থেকে রাগের চাপ একেবারেই মুছে গেছে। এমনকি তিনি হেসে দিলে তাঁর দাঁত দেখা গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবার চেয়ে সুন্দর দাঁতের অধিকারী।

আমি বসলাম তাঁর পাশে। মাথা তুলে ঘরের আশপাশ দেখলাম। আল্লাহর কসম, আমি সেখানে তিনটি কাঁচা চামড়া ছাড়া আর কিছুই দেখিনি। আমি বললাম, "আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। তিনি যেন আপনার উম্মাহকে সম্পদশালী করেন। রোম-পারস্যকে আল্লাহ ধনসম্পদ দিয়েছেন, কিন্তু তারা আল্লাহর ইবাদত করে না।"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার সোজা হয়ে বসলেন। বললেন, "খাত্তাব-পুত্র, তুমি কি সন্দেহের ঘোরে আছ? তারা তো সে জাতি, যাদের দুনিয়ায় ক্ষণিকের জন্য ধনসম্পদ দেওয়া হয়েছে।"

আমি বললাম, “আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, আসতাগফিরুল্লাহ।"

স্ত্রীদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কসম করেছিলেন এক মাস পর্যন্ত তিনি তাদের কাছে যাবেন না। পরে আল্লাহ এ আচরণের কারণে তাঁর সমালোচনা করেন।'

আনাস (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের সাথে ইলা করলেন। এরপর ঘরের ওপরের একটি কক্ষে অবস্থান করলেন ২৯ রাত। এরপর তিনি নেমে এলেন। তখন সাহাবিরা (রা) জিজ্ঞেস করল, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি তো এক মাসের জন্য ইলা করেছিলেন।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "মাস তো উনত্রিশেও হয়।"'

নববি (রহ) বলেন, 'ইলা অর্থ স্ত্রীর কাছে এক মাস প্রবেশ না করার শপথ। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইলা ফিকাহের পরিভাষার ইলার মতো ছিল না; ফিকাহর ভাষায় ইলার যে হুকুম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই ইলার সে হুকুমও প্রযোজ্য ছিল না।'

ইলা শব্দের আভধানিক অর্থ হচ্ছে, কোনো কিছু নিয়ে শপথ করা। কিন্তু ফিকাহর পরিভাষায় স্ত্রী-সঙ্গ থেকে বিরত থাকার শপথ করাকে ইলা বলে।'

টিকাঃ
৩০৭. বোঝা যাচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ক্ষেত্রে নিজ গোত্রের রীতির পরিবর্তে আনসারদের রীতিটি গ্রহণ করেছেন।
৩০৮. সহিহুল বুখারি: ২৪৬৮, সহিহু মুসলিম: ১৪৭৯।
৩০৯. সহিহুল বুখারি: ১৯১১।
৩১০. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১০/৮৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00