📄 ইফকের ঘটনায় স্ত্রীর প্রতি রাসূল ﷺ-এর আচরণনীতি থেকে শিক্ষা
১. অনুসন্ধান নীতি
ইফকের ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তত্ত্ব-তালাশ ও অনুসন্ধানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। অপবাদ রটনার পর কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ধীরে ধীরে অনুসন্ধান করে গেলেন অপবাদ সম্পর্কে। তাড়াহুড়োয় যেন কোনো অন্যায় সিদ্ধান্ত না হয়ে যায়, তাই ধীরে ধীরে এগোতে লাগলেন। অপবাদ রটনার পর থেকে মাসখানেক সময় অতিবাহিত হয়ে যায় অনুসন্ধানে। এ সময়টাতে এ বিষয়ে আয়িশার (রা) সাথে খুলে কথা বলেননি তিনি। বরং অনুসন্ধান করে গেলেন, সত্য তালাশ করতে থাকলেন।
২. আচরণে পরিবর্তন
অপবাদ রটনার পর থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে আচরণে পরিবর্তন আনেন। সাধারণ সময়ে আয়িশা (রা)-এর পাশে এসে বসতেন, তার সাথে কথা বলতেন, আদর-সোহাগে আগলে রাখতেন। কিন্তু এ সময়টাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আচরণে পরিবর্তন আনেন। আয়িশা (রা) স্বয়ং বলেছেন, 'অসুস্থতার সময় আমার সন্দেহ হলো, অসুস্থতার আগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছ থেকে যে আদর-স্নেহ পেতাম, অসুস্থতার পর সেখানে ঘাটতি হচ্ছে।'
এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ঘটনায় পরিপূর্ণ প্রজ্ঞার সাথে আচরণে পরিবর্তন এনেছেন। তিনি আয়িশা (রা)-কে একেবারে ছেড়ে দেননি। কেননা, আয়িশা (রা) থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া এমন এক গুনাহর শাস্তি হয়ে যাবে, যা প্রমাণিত হয়নি তখনো। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রা)-এর খোঁজখবর নিতেন, 'কেমন আছ' বলে তার অবস্থা জানতে চাইতেন।
অন্যদিকে ঘটনার আগে আয়িশার (রা) প্রতি যে স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন তিনি, সে স্নেহে ঘাটতি আনলেন। যাতে আয়িশা (রা) বুঝতে পারেন যে, কিছু একটা ঘটেছে, যার সত্যতা জানার জন্য অনুসন্ধান চলছে।
ইবনে হাজার (রহ) বলেন:
'এ হাদিস থেকে আমরা শিখতে পাই, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর আচরণ হবে স্নেহপূর্ণ ও উত্তম আচরণ। কিন্তু স্বামীর কাছে স্ত্রীর মন্দকর্ম সম্পর্কে কোনো সংবাদ আসলে সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে স্বামী তৎক্ষণাৎ সংবাদের ওপর পরিপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। বরং পূর্বের স্নেহপূর্ণ আচরণ কমিয়ে দেবে। এ রকম আচরণনীতির সুফল হচ্ছে, স্বামীর আচরণে পরিবর্তন দেখে স্ত্রী কারণ অনুসন্ধান করবে, যদি স্ত্রী অপরাধ করে থাকে, তবে স্বামীর কাছে স্বীকার করে ক্ষমা চাইবে।'
ইমাম নববি (রহ) বলেন, 'ইফকের হাদিসে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় আছে। একটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে, যখন স্বামী স্ত্রী সম্পর্কে মন্দ কিছু শুনবে, তখন স্নেহ ও আদরে কমতি করবে। যাতে স্ত্রী স্বামীর সোহাগ কমে যাওয়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করে স্বামীর কাছে এবং স্বামীর মনের সন্দেহ দূর করে দিতে পারে।'
৩. পরামর্শ করা
অপবাদ রটনাকে কেন্দ্র করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুসন্ধান চালিয়ে গেলেন। পরিশেষে পরিপূর্ণ গোপনে তিনি আয়িশা (রা)-এর চরিত্র, তাঁর আচার-আচরণ সম্পর্কে জেনে নিলেন। তার মাঝে কখনো মন্দ কিছু প্রকাশ পেয়েছে কি না, তা জেনে নিলেন।
পরামর্শ করলেন উসামা (রা) ও আলি (রা) এবং বারিরা (রা) ও জাইনাব (রা)-এর সাথে। এ চারজনকে বাছাইয়ের পেছনে প্রজ্ঞা ব্যবহার করেছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এমনি এমনি তিনি এ চার জনের সাথে পরামর্শ করেননি। বরং তাঁদের বাছাইয়ের পেছনে ছিল বিশেষ কারণ।
আলি (রা) ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটাত্মীয়। পরিবারের একজন। অন্যদিকে উসামা (রা) ছিলেন তাঁর নিকটতমদের একজন। নবি-পরিবারের নৈকট্যে থাকা মানুষ। দুজনই পূর্ণ গোপনীয়তার ব্যাপারে ছিলেন আস্থাভাজন।
ইবনে হাজার (রহ) বলেন:
'আলি (রা) ও উসামা (রা)-কে বাছাই করে নেওয়ার কারণ ছিল, আলি (রা) ছিলেন তাঁর ছেলের মতো। কারণ, বাল্যকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর লালনপালনাধীন ছিলেন আলি (রা)। বড় হয়ে গেলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর থেকে পৃথক হননি তিনি। বরং ফাতিমা (রা)-কে বিয়ে দিয়ে সম্পর্ক আরও গাঢ় হয় উভয়ের। আলি (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবার সম্পর্কে অন্য কারও চাইতে বেশি জ্ঞাত ছিলেন। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বেছে নেন। অন্যথা, সাধারণত ব্যাপক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে আবু বকর (রা) ও উমর (রা)-এর সাথে আলোচনা করতেন তিনি।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে দীর্ঘ সময় কাটানোর ক্ষেত্রে উসামা (রা) আলি (রা)-এর মতোই ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। তিনি তাঁর প্রিয় ও ভালোবাসার পাত্র ছিলেন। এ জন্য তাকে 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয়প্রাত্র' নাম দেওয়া হয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসামার (রা) পিতামাতাকে বেছে নেননি। বেছে নিয়েছেন যুবক উসামাকে (রা)। আলি (রা)-ও যুবক ছিলেন। যদিও উসামা (রা)-এর চাইতে বয়স বেশি ছিল আলি (রা)-এর। দুজন যুবককে বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে, প্রৌঢ় বা বুড়োদের চেয়ে যুবকদের মাথা পরিষ্কার থাকে। যুবকরা অকপটে সত্যটা বলার সাহস রাখে; কিন্তু বয়স্করা পরিণাম বিবেচনায় কখনো জিজ্ঞাসাকারীর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে, কখনো যার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় তার দিকে নজর দিয়ে সত্য বা আংশিক সত্য গোপন রাখে।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরামর্শের জন্য নারীদের মধ্যে দুজনকে নির্বাচন করেছেন।
এক. নবি-পরিবারের মধ্য থেকে একজন। তিনি হচ্ছেন তাঁর স্ত্রী জাইনাব (রা)।
দুই. একজন দাসী। নাম তার বারিরা (রা)। তিনি আয়িশা (রা)-এর নিকটতম ছিলেন। আয়িশা (রা) সম্পর্কে বেশি জানতেন তিনি। তাই তাকে বেছে নেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
নিঃসন্দেহে পরামর্শের জন্য এ ব্যক্তিবর্গের বাছাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুপম প্রজ্ঞার প্রমাণ বহন করে। প্রমাণ বহন করে পরিপূর্ণ প্রজ্ঞার সাথে ঘটনা নিয়ন্ত্রণের।
গোপন অনুসন্ধানের এ কার্যক্রম ফলাফল এনে দেয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে ওঠেন। আর বর্ণনা করেন এ ষড়যন্ত্রের পেছনে মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুলের হাত থাকার কথা। তিনি বলেন, 'মুসলিম জাতি, কে আমাকে সাহায্য করবে এমন এক লোকের বিরুদ্ধে, যে কষ্ট দিতে দিতে এবার আমার পরিবার নিয়েও আমাকে কষ্টে ফেলে দিয়েছে? আল্লাহর কসম, আমার স্ত্রীর মাঝে ভালো বৈ মন্দ কিছু পাইনি আমি। তারা এমন এক ব্যক্তিকে জড়িয়ে কথা রটিয়েছে, যাকে আমি উত্তম বলেই জানি। সে আমার সঙ্গ ব্যতীত আমার ঘরে আসেনি কখনো।'
'কসম, আমার স্ত্রীর মাঝে ভালো বৈ মন্দ কিছু পাইনি আমি' বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ স্ত্রীর পক্ষ থেকে অপবাদের বিরোধিতা করেছেন।
যদিও অনুসন্ধান ও পরামর্শের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রা)-এর নিষ্কলুষতার বিষয়ে নিশ্চিত হলেন। তবুও তিনি ওহি নাজিলের অপেক্ষা করছিলেন। যাতে বিষয়টি সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়।
অন্যদিকে ওহি নাজিলে বিলম্ব করার মাঝে আল্লাহর বিশেষ প্রজ্ঞা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা চাইছিলেন একজন মুসলিম কীভাবে এ রকম ঘটনাতে সিদ্ধান্ত নেবে, তা স্পষ্ট হয়ে যাক। স্পষ্ট হয়ে যাক, কীভাবে স্ত্রীর সাথে এ সময়ে আচরণ করতে হবে। যাতে সংসার না ভেঙে অটুট থাকে। আর ভালোবাসায় ভরপুর থাকে সব সময়।
৪. স্ত্রীর মুখোমুখি হওয়া
পরিশেষে সমস্যার সমাধান করার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রা)-এর মুখোমুখি হলেন মনকে পরিপূর্ণ শান্ত করার জন্য। নসিহত ও উপদেশের আঙ্গিকে বললেন, 'আয়িশা, তোমার ব্যাপারে আমার কাছে এ এ সংবাদ এসেছে। যদি তুমি নিষ্পাপ হয়ে থাকো, তবে অবশ্যই আল্লাহ তা ঘোষণা করবেন অচিরেই। আর যদি তুমি কোনো পাপ করেই থাকো, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও, তাঁর কাছে তাওবা করো। কোনো বান্দা গুনাহ করে আল্লাহর কাছে তা স্বীকার করে তাওবা করলে তিনি তাওবা কবুল করেন।'
৫. ওহি নাজিলের পর স্ত্রীর অভিমানে সহনশীলতা
ওহি নাজিল হলো। আয়িশা (রা)-এর নিষ্কলুষতা ঘোষণা করলেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। তখন আয়িশা (রা)-এর মা বললেন, 'যাও, উঠে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যাও। (তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করো।)' আয়িশা (রা) বললেন, 'আল্লাহর শপথ, না, আমি উঠে তাঁর কাছে যাব না। আমি কেবল আল্লাহরই প্রশংসা করব। তিনিই আমাকে নিষ্পাপ ঘোষণা করলেন।'
ইমাম নববি (রহ) বলেন, 'ইফকের ঘটনা ছিল মুনাফিকদের নিরেট ষড়যন্ত্র। ওহির মাধ্যমে কুরআন মাজিদের নস দিয়ে আয়িশা (রা)-এর পবিত্রতার ঘোষণা এসেছে। ইমামদের ঐকমত্যে, এরপরও কোনো মানুষ যদি এ নিয়ে সন্দেহ করে-নাউজুবিল্লাহ-সে কাফির মুরতাদ হয়ে যাবে।'
টিকাঃ
২৯৮. ফাতহুল বারি: ২/৪৭৯।
২৯৯. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৭/১১৭।
৩০০. ফাতহুল বারি: ৮/৪৬৯।
৩০১. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৭/১১৭।
📄 ভরণপোষণ চাওয়ার ঘটনা
এ ঘটনা থেকে বোঝা যাবে, আর্থিক দুরবস্থার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্মপন্থা কেমন ছিল। কেমন ছিল তাঁর আচরণ পরিবারের সদস্যদের প্রতি, যখন তাঁরা অতিরিক্ত ভরণপোষণ চেয়েছিলেন।
ঘটনাটি জাবির (রা)-এর মুখেই শুনা যাক। তিনি বলেন:
'আবু বকর (রা) এলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। দেখলেন, অনেক মানুষ তাঁর দরোজায় বসে আছে। কিন্তু কাউকেই প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। আবু বকর (রা) এগিয়ে গিয়ে অনুমতি চাইলেন। তাকে অনুমতি দেওয়া হলে তিনি প্রবেশ করলেন ভেতরে। এরপর এলেন উমর (রা)। অনুমতি চাইলেন প্রবেশের। তাকেও অনুমতি দেওয়া হলো। উমর (রা) দেখলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে তাঁর স্ত্রীরা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব। তাঁর চেহারায় চিন্তার ছাপ। আবু বকর (রা) বললেন, "আমি এমন কিছু বলব, যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দেন।"
আবু বকর (রা) বললেন, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমার কাছে খোরপোশ চাইলে বিনতে খারিজার (তার স্ত্রী) সাথে কেমন আচরণ করি, আপনি যদি দেখতেন! এ অবস্থায় আমি তার কাছে যাই এবং তার ঘাড়ে আঘাত করি।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন। বললেন, "আমার পাশে যারা বসে আছে, তারাও আমার কাছে খোরপোশ চাচ্ছে।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা শুনে আবু বকর (রা) উঠে গেলেন আয়িশার (রা) দিকে। আঘাত করলেন তার ঘাড়ে। ওদিকে উমরও (রা) এগিয়ে গেলেন হাফসার (রা) দিকে। আঘাত করলেন তার ঘাড়ে। উভয়ে বলে উঠলেন, "তোমরা এমন কিছু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে চাইছ, যা তাঁর কাছে নেই।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের দুজনকে নিবৃত্ত করলেন।
তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী দুজন বললেন, "আল্লাহর শপথ, আমরা এমন কিছু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে চাইব না, যা তাঁর কাছে নেই।"
(এরপর ত্রিশ কি উনত্রিশ দিন কেটে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের থেকে পৃথক রইলেন।) এরপর আল্লাহ নাজিল করলেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأُسَبِّحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا - وَإِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ فَإِنَّ اللهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَاتِ مِنكُنَّ أَجْرًا عَظِيمًا
“হে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনার স্ত্রীগণকে বলুন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার বিলাসিতা কামনা করো, তবে আসো, আমি তোমাদের ভোগের ব্যবস্থা করে দিই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় দিই। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আখিরাত কামনা করো, তাহলে তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল আল্লাহ তাদের জন্য মহাপ্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।"
আয়াত নাজিলের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে আয়িশার (রা) নিকট আসলেন। বললেন, "আমি তোমাকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলি। তুমি তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিয়ো না। তোমার বিষয়ে তোমার বাবা-মার সাথে পরামর্শ করো।"
আয়িশা (রা) বললেন, “কোন বিষয়ে হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম?" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়াত পাঠ করে শোনালেন।
আয়িশা (রা) বললেন, 'আমি আপনার ব্যাপারে আমার পিতামাতার সাথে পরামর্শ করব? (তার কোনো প্রয়োজন নেই) আমি আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আখিরাতকে বেছে নেব। আমি আপনার কাছে আরেকটি আবদার রাখছি। আপনি আমার বলা কথা আপনার অন্য স্ত্রীর কাউকে বলবেন না।'
উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাদের যে-ই আমার কাছে জানতে চাইবে, আমি তাকে জানিয়ে দেবো তোমার কথা। কারণ আমাকে জেদি ও কঠোরতাকারীরূপে পাঠানো হয়নি। বরং আমাকে পাঠানো হয়েছে সহজপন্থায় শিক্ষাদানকারী হিসেবে।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রত্যেক স্ত্রী তাঁকেই বেছে নিলেন। আয়িশার (রা) যে জবাব ছিল, তাদেরও একই জবাব ছিল।'
টিকাঃ
৩০২. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ২৮।
৩০৩. সহিহু মুসলিম: ১৪৭৮।
📄 ঘটনা বিশ্লেষণ ও শিক্ষা
✓ প্রথমেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ থাকার নীতি অবলম্বন করলেন। তাঁর স্ত্রীগণ অতিরিক্ত ভরণপোষণ চাইলেন, কিন্তু তিনি দেবেন কি দেবেন না, তা বললেন না। অন্য কোনো কিছুও বললেন না। বরং নীরব হয়ে থাকলেন।
✓ প্রথমে তিনি বিষয়টি উপেক্ষা করার নীতি অবলম্বন করলেন। কারণ দাম্পত্য জীবনের অনেক সমস্যা ঝগড়া বা তর্ক-বিতর্কে সমাধান হয় না। বরং এমন কিছু বিষয় আছে, যে বিষয়ে তর্ক করলে ঝগড়া আরও শক্ত হয়ে দাঁড়ায়।
✓ দ্বিতীয় যে কর্মপন্থাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রহণ করেছিলেন সেটি হচ্ছে, তিনি স্ত্রীদের বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিলেন। তিনি স্ত্রীদের বেছে নিতে বললেন এ অবস্থায় তাঁর সাথে তারা থাকবেন, না তারা অতিরিক্ত খোরপোশ ও তাঁর থেকে পৃথক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন।
✓ এ পার্থিব সমস্যাটি সমাধানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাখয়ির (تخيير) তথা বাছাই করে নেওয়ার পদ্ধতি ব্যবহার করলেন। অর্থাৎ স্ত্রীদেরকে দুটি অপশনের একটি বাছাই করার স্বাধীনতা দিলেন। দাম্পত্য জীবনের বিবিধ বিষয়ে পরামর্শ করার মূলনীতি দেখিয়ে দিচ্ছে এ পদ্ধতিটি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের ধীরতা অবলম্বন করতে বললেন, তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করলেন। যেমন তিনি আয়িশা (রা)-কে বললেন, 'আমি তোমাকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলি। তুমি তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিয়ো না।'
এ ব্যাপারটি আমাদের সময়ের সংসারগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখি। আমাদের এ সময়ের সংসারগুলো স্বামী-স্ত্রীতে দ্বিমত হলেই স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ধমক দিয়ে যাবে অনবরত। স্ত্রীর কোনো ভুল হলেই বলে উঠবে, 'আমি তোমাকে তালাক দেবো অচিরেই।' স্ত্রী যদি কোনো কিছুতে কমতি করে স্বামী বলে উঠবে, 'আমি তোমাকে তালাক দেবো। যদি তুমি ঘর থেকে বের হও, তবে তুমি তালাক।' স্ত্রী যদি কণ্ঠস্বরটা একটু উঁচু করে সাথে সাথে বলে উঠবে, 'অমুক নারীর সাথে কথা বলেছ তো তুমি তালাক।'
✓ এ ঘটনা থেকে আমরা জানতে পাচ্ছি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের ওপর কঠোরতা করেননি। তাদের গায়ে এতটুকু আঘাতও করেননি। তাদের এতটুকু অপমানও করেননি। বরং তিনি তাদের সাথে এক মহৎ পদ্ধতিতে আচরণ করেছেন।
অন্যদিকে, যখন আবু বকর (রা) ও উমর (রা) আয়িশা (রা) ও হাফসা (রা)-এর দিকে এগিয়ে গেলেন তাদের প্রহার করতে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিবৃত্ত করলেন তাদের। কারণ, মারধর করে সব সমস্যার সমাধান হয় না। বরং অনেক সময় আলাপ-আলোচনা করা, স্ত্রীকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাস্তবতা সম্পর্কে সন্তুষ্ট করার মাধ্যমেই হয় সমাধান।
📄 নারীদের প্রতি একটি পরামর্শ
স্বল্প আয়ের স্বামীর ঘরের স্ত্রী যখন ধনী কারও বাড়িতে যায়, বিলাসবহুল কোনো বাড়িতে যায়, তখন তার জন্য উচিত নয় স্বামীকে দুষতে থাকা, স্বামীর কাছে বিলাসিতা কামনা করা। কারণ, তার স্বামী ছাত্র হতে পারে, হতে পারে তার চাকরিটায় বেতন স্বল্প। স্ত্রীর উচিত তার স্বামীর সামর্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখা। আর এটাই আল্লাহর ফয়সালা।
نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُم مَّعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُم فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِّيَتَّخِذَ بَعْضُهُم بَعْضًا سُخْرِيًّا
"আমি তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করেছি পার্থিব জীবনে এবং একের মর্যাদাকে অপরের ওপর উন্নীত করেছি, যাতে একে অপরকে সেবকরূপে গ্রহণ করে।"
বাবার বাড়িতে মেয়ে খুব আরামে ছিল, বাবা মেয়েকে প্রতিদিন কিছু না কিছু এনে দিত; এর অর্থ এ নয় যে, স্বামীর বাড়িতে এসে স্বামীকে প্রতিদিন কিছু আনার জন্য বলতে হবে।
অতিরিক্তি খোরপোশ চাওয়া, বেশি বেশি জিনিস চাওয়া স্বামীকে সমস্যায় ফেলে দেওয়ার নামান্তর। বিশেষ করে স্বামী যখন দরিদ্র হয়। কারণ, এভাবেই স্ত্রী দুর্বল ইমানের স্বামীকে ধীরে ধীরে ঠেলে দেয় হারাম উপার্জনের পথে। ফলে স্ত্রী নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্বামীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সাথে সাথে একটি পরিবারকে কল্যাণ ও সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত করে। স্ত্রীর চাপে পড়ে ঘুষ, চুরি ইত্যাদি অপকর্ম করতে প্ররোচিত হয় স্বামী। ফলে কখনো চাকরিহারা হয়, কখনো-বা জেলে গিয়ে শাস্তি ভোগ করতে হয়। ফলে তার দ্বীন-দুনিয়া দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে, স্বামীর উচিত স্ত্রীকে অবহেলা না করা। স্ত্রীকে সান্ত্বনা দেওয়া। আদরে-সোহাগে আগলে রাখা। এতে অভাব ও টানাপোড়নের সংসারেও সুখ ও সমৃদ্ধি আসবে। স্বামীর উচিত হবে সাধ্যের মধ্যে স্ত্রীর বৈধ ইচ্ছে পূরণ করা।
টিকাঃ
৩০৪. সুরা আজ-জুখরুফ, ৪৩: ৩২।