📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 ইফকের ঘটনা

📄 ইফকের ঘটনা


ইফকের ঘটনা আয়িশা (রা)-এর জীবনে ঘটে যাওয়া বিরাট গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। বিশাল মুসিবতে পড়েছিলেন তিনি। পরিশেষে সাত আসমানের ওপর আয়িশা (রা)-এর পবিত্রতার ঘোষণা দিলেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা।

মুমিন-জননী আয়িশা (রা) আমাদের জন্য এ ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন এভাবে:

'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফরে বের হওয়ার ইচ্ছে করতেন, স্ত্রীদের মধ্যে লটারি করতেন। লটারিতে যার নাম আসত, তাকে সাথে নিয়ে সফরে বের হতেন। এ রকমই এক যুদ্ধের সফরের আগে তিনি লটারি করলেন। লটারির ফলাফল এল আমার পক্ষে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বের হলাম। সময়টা পর্দার বিধান নাজিল হওয়ার পরের। উটের হাওদায় চড়ে সফর করতাম আমি। প্রয়োজনে হাওদাসমেত আমাকে নামানো হতো। এভাবেই চলছিল আমাদের সফর। যুদ্ধ শেষ হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধ করে অবসর হলে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হলো। মদিনার নিকটবর্তী এক জায়গায় সফর-বিরতি হলো। সফর-বিরতির ঘোষণা শুনে আমি সৈন্যদের থেকে আলাদা হয়ে প্রয়োজন সারতে গেলাম। প্রয়োজন সেরে এসে হাওদায় প্রবেশ করলাম। কিন্তু হঠাৎ করে বুকে হাত দিয়ে দেখি, ইয়ামানের জাফার থেকে আনা আমার হারটি ভেঙে হারিয়ে গেছে। উপায়ান্তর না দেখে আবার সে স্থানে গিয়ে হারটি কুড়িয়ে আনার জন্য গেলাম। কিন্তু হার খুঁজতে খুঁজতে দেরি হয়ে গেল।'

এমন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাত্রার আদেশ দেন। সাহাবিগণ (রা) হাওদা উঠিয়ে নিলেন আমার উটে। তখনকার মেয়েরা হালকা-পাতলা হতো। কারণ, তাদের খাওয়া হতো কমই। তাই চারজনে মিলে হাওদা উঠানোর কারণে তাঁরা বুঝতে পারেননি যে, আমি ভেতরে আছি কি নেই। আমি তখন কম বয়সী এক তরুণী।

তারা উট হাঁকিয়ে সফর চালিয়ে গেলেন। এদিকে সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর আমি হার খুঁজে পেয়ে বিরতির জায়গায় ফিরে এলাম। কিন্তু সেখানে কাউকে পেলাম না। আমি যেখানে অবস্থান করেছিলাম, সেখানে বসে থাকলাম। আমার মনে আশা জাগল, তারা যখন দেখবে আমি তাদের সাথে নেই, তারা ফিরে আসবে আমাকে খুঁজতে। আমি বসে রইলাম। চোখে ঘুম জড়িয়ে এল। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।

সফওয়ান বিন মুআত্তাল সুলামি (রা) সৈন্যদলের পেছনে পরিদর্শক হিসেবে ছিলেন। সকালবেলা তিনি আমার ঘুমানোর স্থানে এসে পৌঁছালেন। তিনি দেখলেন, একটি ঘুমন্ত মানুষের আকৃতি। তিনি আমার কাছে আসলেন। আমাকে দেখে চিনে ফেললেন তিনি। পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার আগে আমাকে দেখেছিলেন তিনি। আমাকে চিনতে পেরে তিনি "ইন্নালিল্লাহ..." বলে উঠলেন। তার কণ্ঠস্বরে আমি জেগে উঠলাম। মুখের ওপর কাপড় টেনে দিলাম আমার জিলবাবের।

আল্লাহর কসম, তিনি আমার সাথে এক শব্দ কথাও বলেননি। "ইন্নালিল্লাহ” পড়া ছাড়া দ্বিতীয় কোনো শব্দ তার মুখ থেকে শুনিনি আমি। তিনি উট বসালেন। আমি উটে আরোহণ করলাম। এরপর বাহন নিয়ে তিনি সামনে চলতে লাগলেন। পরিশেষে আমরা সৈন্যদলের সাথে মিলিত হলাম জোহরের সময়। তারা তখন বিশ্রামে ছিল।

সে সময় আমার ব্যাপারটি নিয়ে যারা ধ্বংস হওয়ার তারা ধ্বংস হলো। আর এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছিল আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল।

সফর শেষে আমরা মদিনায় পৌঁছালাম। মদিনায় এসেই এক মাসের মতো আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। মানুষ অপবাদ রটনাকারীদের কথা চর্চা করতে লাগল। কিন্তু তার কিছুই আমি জানতাম না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে অসুস্থ অবস্থায় দেখতেন, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে তার যে স্নেহ পেতাম অসুস্থতার সময়, এ সময়ে সে স্নেহে কমতি হচ্ছিল। তিনি আমার কাছে আসতেন। সালাম দিতেন। এরপর জিজ্ঞেস করতেন, "কেমন আছ?” এতে আমি সন্দেহে পড়ি। কিন্তু মন্দ কিছু আঁচ করতে পারিনি।

কিছুটা সুস্থ হওয়ার পরের কথা। এক রাতে আমি ও উম্মে মিসতাহ (রা) বের হলাম প্রয়োজন সারতে। চাদরে পা জড়িয়ে হোঁচট খেল উম্মে মিসতাহ (রা)। বলে উঠল, "মিসতাহর (রা) জন্য দুর্ভোগ।" আমি তাকে বললাম, "তুমি বড় মন্দ বলেছ। বদরে অংশ নেওয়া মহৎপ্রাণ এক ব্যক্তিকে তুমি গালি দিলে!" উম্মে মিসতাহ (রা) বলল, "সরল নারী, তুমি কি শুনোনি সে কী বলেছে?" আমি বললাম, "কী বলেছে?" এরপর উম্মে মিসতাহ (রা) অপবাদ রটনার সকল কথা আমাকে জানাল। ফলে আমার রোগের প্রকোপ আরও বেড়ে গেল। বাড়িতে ফিরে আসলাম আমি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এসে সালাম দিলেন। বললেন, "কেমন আছ?" আমি বললাম, "আপনি কি আমাকে বাবা-মার কাছে যাওয়ার অনুমতি দেবেন?" আমি চাচ্ছিলাম মা-বাবার কাছ থেকে ব্যাপারটি নিশ্চিত করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতি দিলেন।

বাবা-মার কাছে চলে গেলাম আমি। মাকে বললাম, "মা, মানুষ কী বলাবলি করছে?" মা বললেন, "মেয়ে আমার, বিষয়টা হালকাভাবে নাও। আল্লাহর শপথ, কোনো সুন্দরী মহিলা যদি এমন স্বামীর কাছে থাকে আর স্বামীও তাকে ভালোবাসে, সাথে যদি সে মহিলার কয়েক সতিন থাকে, তবে তারা সে মহিলাকে নিয়ে একটু-আধটু বলেই।" মায়ের কথা শুনে আমি বললাম, “সুবহানাল্লাহ, তাহলে মানুষ ঠিকই এসব রটিয়েছে?!” সে রাতে অনবরত কাঁদতে কাঁদতে কাটিয়ে দিলাম। একটুও ঘুমাইনি। কাঁদতে কাঁদতে রাত ভোর হলো।

ওহি আসতে দেরি হচ্ছে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলি (রা) ও উসামাকে (রা) স্ত্রী পরিত্যাগের ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য ডাকলেন। উসামা বিন জাইদ (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীর নিষ্কলুষতা জানতেন, জানতেন স্ত্রীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা কেমন, এর ওপর ভিত্তি করে তিনি বললেন, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তিনি আপনার স্ত্রী। তাকে আমরা উত্তমই জানি।” অন্যদিকে আলি (রা) বললেন, "আল্লাহ আপনার পথ সংকীর্ণ করে দেননি। তিনি ব্যতীত অন্য অনেক নারীই আছেন। আপনি তার দাসী (বারিরা রা)-কে জিজ্ঞেস করুন। সে সত্যিটা বলতে পারবে।" এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারিরাকে (রা) ডেকে পাঠালেন। তাকে বললেন, "বারিরা, আয়িশার (রা) মাঝে কৌতূহল-উদ্দীপক কিছু দেখেছ?” বারিরা (রা) বলল, "যে সত্তা আপনাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন-তাঁর শপথ, তাঁর মাঝে কখনো আমি দোষের কিছু দেখিনি। তবে তিনি অল্পবয়সী এক কিশোরী। আটা খামির করতে গিয়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন আর ওদিকে ঘরের বকরিটি এসে তা খেয়ে ফেলে।"

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সম্পর্কে জাইনাবের (রা) কাছে জানতে চাইতেন। তিনি বলতেন, "হে জাইনাব (রা) তুমি কী জানো? তুমি কী দেখছ?" জাইনাব (রা) বলত, "হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি আমার কান ও চোখে পর্যবেক্ষণ করে চলি। আল্লাহর কসম, আমি তার মাঝে কেবল কল্যাণই দেখেছি।" আয়িশা (রা) বলেন, "জাইনাব (রা) সর্বদা আমার সাথে প্রতিযোগিতায় লেগে থাকত। কিন্তু এ ব্যাপারটিতে এসে তার ধার্মিকতা-দ্বীনদারিতার কারণে নিজেকে সে রক্ষা করতে পেরেছে।"

এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে দাঁড়ালেন। ইবনে উবাইয়ের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সাহাবিদের (রা) কাছে বললেন। তিনি বললেন, "মুসলিম জাতি, কে আমাকে সাহায্য করবে এমন এক লোকের বিরুদ্ধে, যে কষ্ট দিতে দিতে এবার আমার পরিবার নিয়েও আমাকে কষ্টে ফেলে দিয়েছে? আল্লাহর কসম, আমার স্ত্রীর মাঝে ভালো বৈ মন্দ কিছু পাইনি আমি। তারা এমন এক ব্যক্তিকে জড়িয়ে কথা রটিয়েছে, যাকে আমি উত্তম বলেই জানি। সে আমার সঙ্গ ব্যতীত আমার ঘরে আসেনি কখনো।"

আওস গোত্রের সাদ বিন মুআজ (রা) দাঁড়িয়ে বললেন, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আল্লাহর শপথ, আমি আপনাকে সাহায্য করব তার বিরুদ্ধে। যদি সে আওস গোত্রের কেউ হয়, তবে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেবো। আর যদি সে আমাদের ভাই খাজরাজ গোত্রের কেউ হয়, তবে আপনি যেভাবে আদেশ দেন, সেভাবেই আমরা পালন করব।"

[আয়িশা (রা) বলেন, "খাজরাজ গোত্রের নেতা সাদ বিন উবাদা (রা)-তিনি সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তার গোত্রপ্রীতি তাকে মূর্খামিতে উদ্যত করেছে-তখন দাঁড়িয়ে গেলেন। সাদ বিন মুআজের (রা) উদ্দেশে বললেন, "আল্লাহর শপথ, তুমি মিথ্যে বলছ। তুমি তাকে হত্যা করবে না। তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না।” এবার সাদ বিন মুআজের (রা) চাচাতো ভাই উসাইদ বিন হুজাইর (রা) দাঁড়িয়ে সাদ বিন উবাদাকে (রা) বললেন, "আল্লাহর শপথ, তুমি মিথ্যা বলছ। আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করব। তুমি একজন মুনাফিক, আরেকজন মুনাফিকের পক্ষে তর্ক করছ।"]

আওস ও খাজরাজ একে অপরের বিরুদ্ধে উত্তেজিত হয়ে উঠল। এমনকি তাদের ঝগড়া যুদ্ধের ইচ্ছে পর্যন্ত গড়াল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখনও মিম্বরের ওপর। তিনি নেমে এসে তাদের শান্ত করলেন। তারাও চুপ হয়ে গেলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও আর কিছু বললেন না।

সেদিন কেঁদে কেঁদে পার করলাম আমি। আমার চোখের অশ্রু একটুর জন্যও থামেনি। একটুও ঘুমাইনি সেদিন। কাঁদতে কাঁদতে রাত ভোর হলো।

ওহি নাজিল আসতে দেরি হচ্ছে দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রা)-এর মুখোমুখি হলেন মনকে পরিপূর্ণ শান্ত করার জন্য। নসিহত ও উপদেশের আঙ্গিকে বললেন, 'আয়িশা, তোমার ব্যাপারে আমার কাছে এ এ সংবাদ এসেছে। যদি তুমি নিষ্পাপ হয়ে থাকো, তবে অবশ্যই আল্লাহ তা ঘোষণা করবেন অচিরেই। আর যদি তুমি কোনো পাপ করেই থাকো, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও, তাঁর কাছে তাওবা করো। কোনো বান্দা গুনাহ করে আল্লাহর কাছে তা স্বীকার করে তাওবা করলে তিনি তাওবা কবুল করেন।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা শেষ হলো। আমার চোখ থেকে অশ্রুপ্রবাহ একেবারেই নাই হয়ে গেল। এক ফোঁটা পানিও অনুভব করলাম না চোখে। আমি বাবাকে বললাম, "আমার পক্ষ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উত্তর দিয়ে দিন।" তিনি বললেন, “আল্লাহর শপথ, আমি বুঝে উঠতে পারছি না রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কী উত্তর দেবো!" এরপর মাকে বললাম, "আমার পক্ষ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উত্তর দিয়ে দিন।" তিনিও বললেন, "আল্লাহর শপথ, আমি বুঝে উঠতে পারছি না রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কী উত্তর দেবো!"

তখন আমি অল্প বয়স্কা এক তরুণী। কুরআনও খুব বেশি মুখস্থ হয়নি তখন। তবুও আমি বললাম, "আল্লাহর কসম, আমি জানি, আপনারা এ ব্যাপারে যা শোনার শুনেছেন। সেটাই আপনাদের অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে গেছে এবং তা-ই আপনারা বিশ্বাস করে ফেলেছেন। এখন যদি আমি নিজেকে পবিত্র বলি-আর আল্লাহ জানেন আমি পবিত্র-তবে আপনাদের অন্তর তা মেনে নেবে না। কেননা, আপনারা অপপ্রচারে প্রভাবিত হয়েছেন। আর যদি না-করা পাপটি আমি স্বীকার করে নিই-আর আল্লাহ জানেন আমি পবিত্র-তবে আপনারা আমাকে মিথ্যের ব্যাপারটিতে বিশ্বাস করে নেবেন। এ জন্য আমার ও আপনাদের জন্য সে-ই উদাহরণই যুৎসই, যা ইউসুফ (আ)-এর পিতা ইউসুফ (আ)-এর ভাইদের বলেছিলেন- فَصَبْرُ جَمِيلٌ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ "ধৈর্যধারণই উত্তম। আর তোমরা যা বলছ, তার জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করছি।" এরপর আমি পাশ ফিরে শুয়ে পড়লাম।

আল্লাহর কসম, আমি তখনও জানতাম আমি নিষ্পাপ। আর আল্লাহ আমাকে নিষ্পাপ ঘোষণা করবেন। কিন্তু আমি ধারণা করতে পারিনি যে, আমার ব্যাপারে নাজিলকৃত ওহি কুরআনের পাঠ হিসেবে তিলাওয়াত করা হবে। আমার ব্যাপারে আমার ধারণা ছিল, আমি এতটা উপযুক্ত নই যে, আল্লাহ আমার সম্পর্কে কথা বলবেন এবং তা তিলাওয়াত করা হবে। বরং আমি আশা করছিলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিষ্কলুষতার বিষয়ে স্বপ্নে দেখবেন, আল্লাহ আমাকে নিষ্পাপ ঘোষণা করছেন।

আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বসা থেকে ওঠেননি। ঘরের কেউই বের হয়নি। তখনই সেখানে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর ওহি নাজিল হওয়া শুরু হলো। ওহির সময় তাঁর ওপর যে কঠিন অবস্থা উপস্থিত হয়, তখন তা শুরু হলো। এমনকি সে শীতের দিনেও তিনি ধর ধর করে ঘেমে নেয়ে যেতেন তিনি। তাঁর শরীর থেকে মুক্তোর মতো ঘামের ফোঁটা ঝরত।

ওহি নাজিলের কষ্ট শেষ হয়ে গেলে দেখলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসছেন। তিনি প্রথম যে শব্দটি বলেছিলেন সেটি হচ্ছে, "সুসংবাদ নাও আয়িশা, আল্লাহ তাআলা তোমাকে নিষ্পাপ ঘোষণা করেছেন।" তখন আমার মা আমাকে বললেন, "যাও, উঠে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যাও। (তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করো।)" আমি বললাম, "আল্লাহর শপথ, না, আমি উঠে তাঁর কাছে যাব না। আমি কেবল আল্লাহরই প্রশংসা করব। তিনিই আমাকে নিষ্পাপ ঘোষণা করলেন।"

আল্লাহ নাজিল করেছেন-

إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِنْكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ مَا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ - لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكُ مُبِينٌ .

"যারা এ অপবাদ রটিয়েছে, তারা তোমাদেরই একটি দল; এটাকে তোমাদের জন্য ক্ষতিকর মনে কোরো না। বরং এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। তাদের প্রত্যেকের জন্য আছে প্রতিফল যতটুকু পাপ সে করেছে। আর এ ব্যাপারে যে নেতৃত্ব দিয়েছে, তার জন্য আছে মহাশাস্তি।

তোমরা যখন এ কথা শুনলে, তখন ইমানদার নারী-পুরুষরা কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করোনি? কেন বলোনি যে, এটা তো নির্জলা অপবাদ?"... (সুরা আন-নুর, ২৪: ১১-২০)

সুরা নুরের দশ আয়াত। আল্লাহ তাআলা এ সকল আয়াত আমার নিষ্কলুষতা ঘোষণায় নাজিল করেছেন।'

টিকাঃ
২৯৬. সুরা ইউসুফ, ১২: ১৮
২৯৭. সহিহুল বুখারি: ২৬৬১, সহিহু মুসলিম: ২৭৭০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 ইফকের ঘটনায় স্ত্রীর প্রতি রাসূল ﷺ-এর আচরণনীতি থেকে শিক্ষা

📄 ইফকের ঘটনায় স্ত্রীর প্রতি রাসূল ﷺ-এর আচরণনীতি থেকে শিক্ষা


১. অনুসন্ধান নীতি
ইফকের ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তত্ত্ব-তালাশ ও অনুসন্ধানের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। অপবাদ রটনার পর কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ধীরে ধীরে অনুসন্ধান করে গেলেন অপবাদ সম্পর্কে। তাড়াহুড়োয় যেন কোনো অন্যায় সিদ্ধান্ত না হয়ে যায়, তাই ধীরে ধীরে এগোতে লাগলেন। অপবাদ রটনার পর থেকে মাসখানেক সময় অতিবাহিত হয়ে যায় অনুসন্ধানে। এ সময়টাতে এ বিষয়ে আয়িশার (রা) সাথে খুলে কথা বলেননি তিনি। বরং অনুসন্ধান করে গেলেন, সত্য তালাশ করতে থাকলেন।

২. আচরণে পরিবর্তন
অপবাদ রটনার পর থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীর সাথে আচরণে পরিবর্তন আনেন। সাধারণ সময়ে আয়িশা (রা)-এর পাশে এসে বসতেন, তার সাথে কথা বলতেন, আদর-সোহাগে আগলে রাখতেন। কিন্তু এ সময়টাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আচরণে পরিবর্তন আনেন। আয়িশা (রা) স্বয়ং বলেছেন, 'অসুস্থতার সময় আমার সন্দেহ হলো, অসুস্থতার আগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছ থেকে যে আদর-স্নেহ পেতাম, অসুস্থতার পর সেখানে ঘাটতি হচ্ছে।'

এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ঘটনায় পরিপূর্ণ প্রজ্ঞার সাথে আচরণে পরিবর্তন এনেছেন। তিনি আয়িশা (রা)-কে একেবারে ছেড়ে দেননি। কেননা, আয়িশা (রা) থেকে পৃথক হয়ে যাওয়া এমন এক গুনাহর শাস্তি হয়ে যাবে, যা প্রমাণিত হয়নি তখনো। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রা)-এর খোঁজখবর নিতেন, 'কেমন আছ' বলে তার অবস্থা জানতে চাইতেন।

অন্যদিকে ঘটনার আগে আয়িশার (রা) প্রতি যে স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন তিনি, সে স্নেহে ঘাটতি আনলেন। যাতে আয়িশা (রা) বুঝতে পারেন যে, কিছু একটা ঘটেছে, যার সত্যতা জানার জন্য অনুসন্ধান চলছে।

ইবনে হাজার (রহ) বলেন:

'এ হাদিস থেকে আমরা শিখতে পাই, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর আচরণ হবে স্নেহপূর্ণ ও উত্তম আচরণ। কিন্তু স্বামীর কাছে স্ত্রীর মন্দকর্ম সম্পর্কে কোনো সংবাদ আসলে সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে স্বামী তৎক্ষণাৎ সংবাদের ওপর পরিপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। বরং পূর্বের স্নেহপূর্ণ আচরণ কমিয়ে দেবে। এ রকম আচরণনীতির সুফল হচ্ছে, স্বামীর আচরণে পরিবর্তন দেখে স্ত্রী কারণ অনুসন্ধান করবে, যদি স্ত্রী অপরাধ করে থাকে, তবে স্বামীর কাছে স্বীকার করে ক্ষমা চাইবে।'

ইমাম নববি (রহ) বলেন, 'ইফকের হাদিসে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় আছে। একটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে, যখন স্বামী স্ত্রী সম্পর্কে মন্দ কিছু শুনবে, তখন স্নেহ ও আদরে কমতি করবে। যাতে স্ত্রী স্বামীর সোহাগ কমে যাওয়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করে স্বামীর কাছে এবং স্বামীর মনের সন্দেহ দূর করে দিতে পারে।'

৩. পরামর্শ করা
অপবাদ রটনাকে কেন্দ্র করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুসন্ধান চালিয়ে গেলেন। পরিশেষে পরিপূর্ণ গোপনে তিনি আয়িশা (রা)-এর চরিত্র, তাঁর আচার-আচরণ সম্পর্কে জেনে নিলেন। তার মাঝে কখনো মন্দ কিছু প্রকাশ পেয়েছে কি না, তা জেনে নিলেন।

পরামর্শ করলেন উসামা (রা) ও আলি (রা) এবং বারিরা (রা) ও জাইনাব (রা)-এর সাথে। এ চারজনকে বাছাইয়ের পেছনে প্রজ্ঞা ব্যবহার করেছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এমনি এমনি তিনি এ চার জনের সাথে পরামর্শ করেননি। বরং তাঁদের বাছাইয়ের পেছনে ছিল বিশেষ কারণ।

আলি (রা) ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটাত্মীয়। পরিবারের একজন। অন্যদিকে উসামা (রা) ছিলেন তাঁর নিকটতমদের একজন। নবি-পরিবারের নৈকট্যে থাকা মানুষ। দুজনই পূর্ণ গোপনীয়তার ব্যাপারে ছিলেন আস্থাভাজন।

ইবনে হাজার (রহ) বলেন:

'আলি (রা) ও উসামা (রা)-কে বাছাই করে নেওয়ার কারণ ছিল, আলি (রা) ছিলেন তাঁর ছেলের মতো। কারণ, বাল্যকালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর লালনপালনাধীন ছিলেন আলি (রা)। বড় হয়ে গেলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর থেকে পৃথক হননি তিনি। বরং ফাতিমা (রা)-কে বিয়ে দিয়ে সম্পর্ক আরও গাঢ় হয় উভয়ের। আলি (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবার সম্পর্কে অন্য কারও চাইতে বেশি জ্ঞাত ছিলেন। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বেছে নেন। অন্যথা, সাধারণত ব্যাপক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে আবু বকর (রা) ও উমর (রা)-এর সাথে আলোচনা করতেন তিনি।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে দীর্ঘ সময় কাটানোর ক্ষেত্রে উসামা (রা) আলি (রা)-এর মতোই ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। তিনি তাঁর প্রিয় ও ভালোবাসার পাত্র ছিলেন। এ জন্য তাকে 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রিয়প্রাত্র' নাম দেওয়া হয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসামার (রা) পিতামাতাকে বেছে নেননি। বেছে নিয়েছেন যুবক উসামাকে (রা)। আলি (রা)-ও যুবক ছিলেন। যদিও উসামা (রা)-এর চাইতে বয়স বেশি ছিল আলি (রা)-এর। দুজন যুবককে বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে, প্রৌঢ় বা বুড়োদের চেয়ে যুবকদের মাথা পরিষ্কার থাকে। যুবকরা অকপটে সত্যটা বলার সাহস রাখে; কিন্তু বয়স্করা পরিণাম বিবেচনায় কখনো জিজ্ঞাসাকারীর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে, কখনো যার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় তার দিকে নজর দিয়ে সত্য বা আংশিক সত্য গোপন রাখে।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরামর্শের জন্য নারীদের মধ্যে দুজনকে নির্বাচন করেছেন।

এক. নবি-পরিবারের মধ্য থেকে একজন। তিনি হচ্ছেন তাঁর স্ত্রী জাইনাব (রা)।

দুই. একজন দাসী। নাম তার বারিরা (রা)। তিনি আয়িশা (রা)-এর নিকটতম ছিলেন। আয়িশা (রা) সম্পর্কে বেশি জানতেন তিনি। তাই তাকে বেছে নেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

নিঃসন্দেহে পরামর্শের জন্য এ ব্যক্তিবর্গের বাছাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুপম প্রজ্ঞার প্রমাণ বহন করে। প্রমাণ বহন করে পরিপূর্ণ প্রজ্ঞার সাথে ঘটনা নিয়ন্ত্রণের।

গোপন অনুসন্ধানের এ কার্যক্রম ফলাফল এনে দেয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে ওঠেন। আর বর্ণনা করেন এ ষড়যন্ত্রের পেছনে মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুলের হাত থাকার কথা। তিনি বলেন, 'মুসলিম জাতি, কে আমাকে সাহায্য করবে এমন এক লোকের বিরুদ্ধে, যে কষ্ট দিতে দিতে এবার আমার পরিবার নিয়েও আমাকে কষ্টে ফেলে দিয়েছে? আল্লাহর কসম, আমার স্ত্রীর মাঝে ভালো বৈ মন্দ কিছু পাইনি আমি। তারা এমন এক ব্যক্তিকে জড়িয়ে কথা রটিয়েছে, যাকে আমি উত্তম বলেই জানি। সে আমার সঙ্গ ব্যতীত আমার ঘরে আসেনি কখনো।'

'কসম, আমার স্ত্রীর মাঝে ভালো বৈ মন্দ কিছু পাইনি আমি' বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ স্ত্রীর পক্ষ থেকে অপবাদের বিরোধিতা করেছেন।

যদিও অনুসন্ধান ও পরামর্শের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রা)-এর নিষ্কলুষতার বিষয়ে নিশ্চিত হলেন। তবুও তিনি ওহি নাজিলের অপেক্ষা করছিলেন। যাতে বিষয়টি সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়।

অন্যদিকে ওহি নাজিলে বিলম্ব করার মাঝে আল্লাহর বিশেষ প্রজ্ঞা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা চাইছিলেন একজন মুসলিম কীভাবে এ রকম ঘটনাতে সিদ্ধান্ত নেবে, তা স্পষ্ট হয়ে যাক। স্পষ্ট হয়ে যাক, কীভাবে স্ত্রীর সাথে এ সময়ে আচরণ করতে হবে। যাতে সংসার না ভেঙে অটুট থাকে। আর ভালোবাসায় ভরপুর থাকে সব সময়।

৪. স্ত্রীর মুখোমুখি হওয়া
পরিশেষে সমস্যার সমাধান করার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রা)-এর মুখোমুখি হলেন মনকে পরিপূর্ণ শান্ত করার জন্য। নসিহত ও উপদেশের আঙ্গিকে বললেন, 'আয়িশা, তোমার ব্যাপারে আমার কাছে এ এ সংবাদ এসেছে। যদি তুমি নিষ্পাপ হয়ে থাকো, তবে অবশ্যই আল্লাহ তা ঘোষণা করবেন অচিরেই। আর যদি তুমি কোনো পাপ করেই থাকো, তবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও, তাঁর কাছে তাওবা করো। কোনো বান্দা গুনাহ করে আল্লাহর কাছে তা স্বীকার করে তাওবা করলে তিনি তাওবা কবুল করেন।'

৫. ওহি নাজিলের পর স্ত্রীর অভিমানে সহনশীলতা
ওহি নাজিল হলো। আয়িশা (রা)-এর নিষ্কলুষতা ঘোষণা করলেন স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। তখন আয়িশা (রা)-এর মা বললেন, 'যাও, উঠে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যাও। (তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করো।)' আয়িশা (রা) বললেন, 'আল্লাহর শপথ, না, আমি উঠে তাঁর কাছে যাব না। আমি কেবল আল্লাহরই প্রশংসা করব। তিনিই আমাকে নিষ্পাপ ঘোষণা করলেন।'

ইমাম নববি (রহ) বলেন, 'ইফকের ঘটনা ছিল মুনাফিকদের নিরেট ষড়যন্ত্র। ওহির মাধ্যমে কুরআন মাজিদের নস দিয়ে আয়িশা (রা)-এর পবিত্রতার ঘোষণা এসেছে। ইমামদের ঐকমত্যে, এরপরও কোনো মানুষ যদি এ নিয়ে সন্দেহ করে-নাউজুবিল্লাহ-সে কাফির মুরতাদ হয়ে যাবে।'

টিকাঃ
২৯৮. ফাতহুল বারি: ২/৪৭৯।
২৯৯. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৭/১১৭।
৩০০. ফাতহুল বারি: ৮/৪৬৯।
৩০১. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৭/১১৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 ভরণপোষণ চাওয়ার ঘটনা

📄 ভরণপোষণ চাওয়ার ঘটনা


এ ঘটনা থেকে বোঝা যাবে, আর্থিক দুরবস্থার সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্মপন্থা কেমন ছিল। কেমন ছিল তাঁর আচরণ পরিবারের সদস্যদের প্রতি, যখন তাঁরা অতিরিক্ত ভরণপোষণ চেয়েছিলেন।

ঘটনাটি জাবির (রা)-এর মুখেই শুনা যাক। তিনি বলেন:

'আবু বকর (রা) এলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। দেখলেন, অনেক মানুষ তাঁর দরোজায় বসে আছে। কিন্তু কাউকেই প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। আবু বকর (রা) এগিয়ে গিয়ে অনুমতি চাইলেন। তাকে অনুমতি দেওয়া হলে তিনি প্রবেশ করলেন ভেতরে। এরপর এলেন উমর (রা)। অনুমতি চাইলেন প্রবেশের। তাকেও অনুমতি দেওয়া হলো। উমর (রা) দেখলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশে তাঁর স্ত্রীরা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব। তাঁর চেহারায় চিন্তার ছাপ। আবু বকর (রা) বললেন, "আমি এমন কিছু বলব, যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দেন।"

আবু বকর (রা) বললেন, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমার কাছে খোরপোশ চাইলে বিনতে খারিজার (তার স্ত্রী) সাথে কেমন আচরণ করি, আপনি যদি দেখতেন! এ অবস্থায় আমি তার কাছে যাই এবং তার ঘাড়ে আঘাত করি।"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেসে দিলেন। বললেন, "আমার পাশে যারা বসে আছে, তারাও আমার কাছে খোরপোশ চাচ্ছে।"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা শুনে আবু বকর (রা) উঠে গেলেন আয়িশার (রা) দিকে। আঘাত করলেন তার ঘাড়ে। ওদিকে উমরও (রা) এগিয়ে গেলেন হাফসার (রা) দিকে। আঘাত করলেন তার ঘাড়ে। উভয়ে বলে উঠলেন, "তোমরা এমন কিছু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে চাইছ, যা তাঁর কাছে নেই।"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের দুজনকে নিবৃত্ত করলেন।

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী দুজন বললেন, "আল্লাহর শপথ, আমরা এমন কিছু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে চাইব না, যা তাঁর কাছে নেই।"

(এরপর ত্রিশ কি উনত্রিশ দিন কেটে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের থেকে পৃথক রইলেন।) এরপর আল্লাহ নাজিল করলেন:

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأُسَبِّحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا - وَإِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ فَإِنَّ اللهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَاتِ مِنكُنَّ أَجْرًا عَظِيمًا

“হে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনার স্ত্রীগণকে বলুন, তোমরা যদি পার্থিব জীবন ও তার বিলাসিতা কামনা করো, তবে আসো, আমি তোমাদের ভোগের ব্যবস্থা করে দিই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় দিই। আর যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং আখিরাত কামনা করো, তাহলে তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল আল্লাহ তাদের জন্য মহাপ্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।"

আয়াত নাজিলের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে আয়িশার (রা) নিকট আসলেন। বললেন, "আমি তোমাকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলি। তুমি তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিয়ো না। তোমার বিষয়ে তোমার বাবা-মার সাথে পরামর্শ করো।"

আয়িশা (রা) বললেন, “কোন বিষয়ে হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম?" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়াত পাঠ করে শোনালেন।

আয়িশা (রা) বললেন, 'আমি আপনার ব্যাপারে আমার পিতামাতার সাথে পরামর্শ করব? (তার কোনো প্রয়োজন নেই) আমি আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আখিরাতকে বেছে নেব। আমি আপনার কাছে আরেকটি আবদার রাখছি। আপনি আমার বলা কথা আপনার অন্য স্ত্রীর কাউকে বলবেন না।'

উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তাদের যে-ই আমার কাছে জানতে চাইবে, আমি তাকে জানিয়ে দেবো তোমার কথা। কারণ আমাকে জেদি ও কঠোরতাকারীরূপে পাঠানো হয়নি। বরং আমাকে পাঠানো হয়েছে সহজপন্থায় শিক্ষাদানকারী হিসেবে।"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রত্যেক স্ত্রী তাঁকেই বেছে নিলেন। আয়িশার (রা) যে জবাব ছিল, তাদেরও একই জবাব ছিল।'

টিকাঃ
৩০২. সুরা আল-আহজাব, ৩৩: ২৮।
৩০৩. সহিহু মুসলিম: ১৪৭৮।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 ঘটনা বিশ্লেষণ ও শিক্ষা

📄 ঘটনা বিশ্লেষণ ও শিক্ষা


✓ প্রথমেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ থাকার নীতি অবলম্বন করলেন। তাঁর স্ত্রীগণ অতিরিক্ত ভরণপোষণ চাইলেন, কিন্তু তিনি দেবেন কি দেবেন না, তা বললেন না। অন্য কোনো কিছুও বললেন না। বরং নীরব হয়ে থাকলেন।

✓ প্রথমে তিনি বিষয়টি উপেক্ষা করার নীতি অবলম্বন করলেন। কারণ দাম্পত্য জীবনের অনেক সমস্যা ঝগড়া বা তর্ক-বিতর্কে সমাধান হয় না। বরং এমন কিছু বিষয় আছে, যে বিষয়ে তর্ক করলে ঝগড়া আরও শক্ত হয়ে দাঁড়ায়।

✓ দ্বিতীয় যে কর্মপন্থাটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গ্রহণ করেছিলেন সেটি হচ্ছে, তিনি স্ত্রীদের বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিলেন। তিনি স্ত্রীদের বেছে নিতে বললেন এ অবস্থায় তাঁর সাথে তারা থাকবেন, না তারা অতিরিক্ত খোরপোশ ও তাঁর থেকে পৃথক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন।

✓ এ পার্থিব সমস্যাটি সমাধানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাখয়ির (تخيير) তথা বাছাই করে নেওয়ার পদ্ধতি ব্যবহার করলেন। অর্থাৎ স্ত্রীদেরকে দুটি অপশনের একটি বাছাই করার স্বাধীনতা দিলেন। দাম্পত্য জীবনের বিবিধ বিষয়ে পরামর্শ করার মূলনীতি দেখিয়ে দিচ্ছে এ পদ্ধতিটি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের ধীরতা অবলম্বন করতে বললেন, তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিতে নিষেধ করলেন। যেমন তিনি আয়িশা (রা)-কে বললেন, 'আমি তোমাকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলি। তুমি তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিয়ো না।'

এ ব্যাপারটি আমাদের সময়ের সংসারগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখি। আমাদের এ সময়ের সংসারগুলো স্বামী-স্ত্রীতে দ্বিমত হলেই স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ধমক দিয়ে যাবে অনবরত। স্ত্রীর কোনো ভুল হলেই বলে উঠবে, 'আমি তোমাকে তালাক দেবো অচিরেই।' স্ত্রী যদি কোনো কিছুতে কমতি করে স্বামী বলে উঠবে, 'আমি তোমাকে তালাক দেবো। যদি তুমি ঘর থেকে বের হও, তবে তুমি তালাক।' স্ত্রী যদি কণ্ঠস্বরটা একটু উঁচু করে সাথে সাথে বলে উঠবে, 'অমুক নারীর সাথে কথা বলেছ তো তুমি তালাক।'

✓ এ ঘটনা থেকে আমরা জানতে পাচ্ছি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের ওপর কঠোরতা করেননি। তাদের গায়ে এতটুকু আঘাতও করেননি। তাদের এতটুকু অপমানও করেননি। বরং তিনি তাদের সাথে এক মহৎ পদ্ধতিতে আচরণ করেছেন।

অন্যদিকে, যখন আবু বকর (রা) ও উমর (রা) আয়িশা (রা) ও হাফসা (রা)-এর দিকে এগিয়ে গেলেন তাদের প্রহার করতে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিবৃত্ত করলেন তাদের। কারণ, মারধর করে সব সমস্যার সমাধান হয় না। বরং অনেক সময় আলাপ-আলোচনা করা, স্ত্রীকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাস্তবতা সম্পর্কে সন্তুষ্ট করার মাধ্যমেই হয় সমাধান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00