📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 স্ত্রীরা পরস্পরের ব্যাপারে অযাচিত শব্দ ব্যবহার করলে শুধরে দিতেন

📄 স্ত্রীরা পরস্পরের ব্যাপারে অযাচিত শব্দ ব্যবহার করলে শুধরে দিতেন


আয়িশা (রা) বলেন, 'একবার আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, "সাফিয়্যা (রা) এমন এমন (খাটো), সে-ই আপনার জন্য যথেষ্ট।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বললেন, "তুমি এমন একটি কথা বললে, যদি এ কথাকে সমুদ্রের পানির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়, তবে তার রং পরিবর্তন হয়ে যাবে।"'

অর্থাৎ 'যদিও সমুদ্রের পানি অনেক। কিন্তু তোমার এ কথাটা এতটাই মারাত্মক যে, সমুদ্রের পানির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হলে পানির প্রাচুর্য সত্ত্বেও সে পানির রং পরিবর্তন হয়ে যাবে। সমুদ্রের পানির তুলনায় একজন মানুষের পুণ্য-আমল অনেক অনেক কম। তাই অযাচিত কথাটি যদি একজন মানুষের আমলের সাথে একত্রিত হয়, তবে সে আমলের কী অবস্থা হবে?'

টিকাঃ
২৯১. সুনanu আবি দাউদ: ৪৮৭৫, সুনanুত তিরমিজি: ২৫০২। হাদিসের মান: সহিহ।
২৯২. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৭/১৭৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 স্ত্রীদের পরস্পরের কাছ থেকে সমান বদলা নেওয়ার অনুমতি দিতেন

📄 স্ত্রীদের পরস্পরের কাছ থেকে সমান বদলা নেওয়ার অনুমতি দিতেন


আয়িশা (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণ দুভাগে বিভক্ত ছিলেন। এক দলে ছিলেন আয়িশা (রা), হাফসা (রা), সাফিয়্যা (রা), সাওদা (রা)। অন্য দলে ছিলেন উম্মে সালামা (রা) ও অন্য স্ত্রীগণ। আয়িশা (রা)-এর প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অধিক ভালোবাসার কথা জানতেন সাহাবিরা (রা)। তাই যদি কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হাদিয়া দেওয়ার ইচ্ছে করতেন, তবে আয়িশার (রা) পালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেদিন আয়িশার (রা) ঘরে থাকতেন, সেদিন গিয়ে দিয়ে আসতেন হাদিয়া।'

উম্মে সালামা (রা) ও তাঁর দলে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা উঠল। তারা বলল, "তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলে দেখো, তিনি যেন মানুষদের জানিয়ে দেন যে, কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হাদিয়া দিতে চাইলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে স্ত্রীর ঘরেই থাকুক না কেন সে যেন সে ঘরেই হাদিয়া দিয়ে যায়।"

পরামর্শ অনুযায়ী উম্মে সালামা (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে কথাটা তুললেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে কিছুই বলেননি। এদিকে দলের বাকি সদস্যরা এসে জিজ্ঞেস করল উম্মে সালামাকে (রা)। তিনি বললেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো আমাকে কিছুই বলেননি।" তারা আবারও বলল, "তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আবার কথা বলো।" যেদিন উম্মে সালামার (রা) ঘরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গেলেন, তিনি আবারও কথাটা পাড়লেন। এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো উত্তর দিলেন না। দলের বাকিরা জিজ্ঞেস করলে তিনি আগের মতোই বললেন, "না, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কিছুই বলেননি।” বাকিরা বললেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু বলা পর্যন্ত তুমি বলতে থাকো।” এরপর যেদিন উম্মে সালামার (রা) পালা এল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঘরে এলে তিনি কথাটা তুললেন আবার। এবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আয়িশার (রা) ব্যাপারে আমাকে কষ্ট দিয়ো না। কেননা, আয়িশা (রা) ব্যতীত অন্য কোনো স্ত্রীর চাদরে থাকা অবস্থায় আমার প্রতি ওহি নাজিল হয়নি।"

উম্মে সালামা (রা) বললেন, "আপনাকে কষ্ট দেওয়া থেকে আমি আল্লাহর নিকট তাওবা করছি।"

এরপর তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কন্যা ফাতিমাকে (রা) ডাকল। ফাতিমা (রা) এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অনুমতি চাইলেন। তখন তিনি আমার সাথে এক চাদরে শুয়ে ছিলেন।

ফাতিমা (রা) বলল, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনার স্ত্রীরা আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন যেন আমি আবু বকরের (রা) মেয়ের ব্যাপারে ইনসাফের কথা বলি আপনাকে।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "মেয়ে আমার, তুমি কি তা-ই ভালোবাসো না, যা আমি ভালোবাসি?" ফাতিমা (রা) উত্তর দিলেন, "অবশ্যই।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তবে তুমিও একে (আয়িশাকে রা) ভালোবাসো।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা শুনে ফাতিমা (রা) উঠে গেলেন। ফিরে গেলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের কাছে। তাদের জানালেন তার কথা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা। তারা বলল, "তুমি আমাদের কোনো উপকার করতে পারলে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আবার যাও।" তাদের কথা শুনে ফাতিমা (রা) বললেন, "আল্লাহর কসম, আয়িশার (রা) ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কখনো আমি কথা বলতে যাব না।"

এবার তারা জাইনাব বিনতে জাহাশকে (রা) পাঠাল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের মধ্যে জাইনাবই (রা) তাঁর কাছে আমার মতোই সমান মর্যাদার অধিকারী ছিল। আমি জাইনাবের (রা) মতো উত্তম দ্বীনদার, মুত্তাকি, সত্যভাষী, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী, অধিক সাদাকাকারী, যে কাজ করে তিনি সাদাকা করতেন সে কাজে আত্মনিবেদনকারী, আল্লাহর নৈকট্য তালাশকারী কোনো নারী দেখিনি। কিন্তু তার মাঝে কেবল একটি দুর্বলতা ছিল। তিনি তাড়াতাড়ি রেগে যেতেন, আবার দ্রুতই ঠান্ডা হয়ে যেতেন।

জাইনাব (রা) এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আয়িশার (রা) সাথে একই চাদরে শোয়া আগের মতো। জাইনাব (রা) বললেন, “আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনার স্ত্রীরা আমাকে পাঠিয়েছেন আপনার কাছে। যেন আপনার কাছে আবু বকরের (রা) মেয়ের ব্যাপারটিতে ইনসাফের আবেদন করি।" আয়িশা (রা) বলেন, "এরপর জাইনাব (রা) আমাকে নিয়ে কথা বলতে লাগল। আমাকে কয়েক কথা শুনিয়ে দিল। আর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তিনি আমাকে অনুমতি দেবেন কি না। জাইনাব (রা) তখন বলেই যাচ্ছিল। আমি বুঝতে পারলাম, আমি যদি জাইনাবকে (রা) কিছু বলি, তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা অপছন্দ করবেন না।" এরপর আয়িশা (রা) জাইনাব (রা)-এর কথার উত্তর দিতে থাকলেন। জাইনাব (রা)-এর মোক্ষম জবাব দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে ছাড়লেন।

আয়িশা (রা) বলেন, 'আমি যখন তাকে নিয়ে বলা শুরু করলাম, তাকে একেবারে লা-জাওয়াব করে ছাড়লাম।' নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আয়িশার (রা) দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, "এই না হলো আবু বকরের (রা) মেয়ে।"'

আয়িশা (রা) বেশ সুন্দর পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন এখানে। এতে বোঝা যায়, তিনি বেশ বুদ্ধিমতী ও প্রত্যুৎপন্নমতি ছিলেন। অপরপক্ষ যখন বলেই যাচ্ছিলেন, তখন তিনি ধৈর্য ধরে শুনতে থাকলেন, যতক্ষণ না প্রতিপক্ষ সীমাতিরিক্ত না করেছে। এরপর তিনি শুরু করলেন, পাল্টা জবাবে প্রতিপক্ষকে লা-জাওয়াব করে দিলেন।

ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'এ হাদিস থেকে বুঝতে পারি, স্বামীকে নিয়ে সতিনে সতিনে ঈর্ষা ও প্রতিযোগিতা হতে পারে। স্ত্রীদের পরস্পরের আলাপ-আলোচনায় স্বামী চুপ থাকতে পারে। তবে স্বামী কারও প্রতি অন্যায় সমর্থন দিতে পারে না।'

টিকাঃ
২৯৩. সহিহুল বুখারি: ২৫৮১, সহিহু মুসলিম: ২৪৪২।
২৯৪. ফাতহুল বারি: ৫/২০৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00