📄 রাসূল ﷺ নিজ স্ত্রীদের ব্যাপারে সুধারণা রাখতেন
আনাস (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর থেকে ফিরে রাতের বেলা কখনো তাঁর স্ত্রীর কাছে আসতেন না। তিনি সকাল বা গোধূলি বেলায় ঘরে আসতেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরও (রা) নিষেধ করতেন, যেন তারা রাতের বেলা ঘরে না আসে। জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন, কেউ যেন স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতা যাচাই বা তার পদস্খলন যাচাইয়ের জন্য সফর থেকে ফিরে রাতের বেলা নিজ পরিবারের কাছে না আসে।'
'বিশ্বাসঘাতকতা যাচাই'- তথা স্ত্রী স্বামীর পেছনে কী করে, তা যাচাই করা; অনুপস্থিতিতে স্ত্রী তাকে ধোঁকা দেয় কি না, তা যাচাই করা। তাই যার সফর লম্বা হঠাৎ করেই রাতের বেলা ঘরে এসে তার উপস্থিত হওয়া অপছন্দনীয়। অন্যদিকে যার সফর কাছে ধারে কোথাও, স্ত্রীর মনেও স্বামীর শীঘ্র আগমন সম্পর্কে সম্ভাবনা জাগে-এ অবস্থায় রাতের বেলা ঘরে আসতে কোনো বাধা নেই।
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'এ হাদিস মানুষের একে অন্যের মাঝে প্রেম-ভালোবাসার বন্ধন রক্ষার ব্যাপারে জোর উৎসাহ দেয়। আর যখন স্বামী ও স্ত্রীর ব্যাপারটি আসে, তখন তার গুরুত্ব বেড়ে যায় আরও বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, স্বামী-স্ত্রী উভয়ে একে অন্যের সকল বিষয়-আশয় জানে। তাদের পরস্পরের কাছে নিজেদের কোনো দোষ-গুণ ও অভ্যাস লুক্কায়িত থাকে না মোটেও। শরিয়ত নিষেধ করেছে রাতের আগমন বিষয়ে। কারণ রাতের আগমনের ফলে স্ত্রী মনে করতে পারে স্বামী তার ব্যাপারে বিরূপ ধারণা রাখে। ফলে তাদের মধ্যকার মধুর সম্পর্ক পরিণত হবে জটিল সম্পর্কে।'
হঠাৎ করে না আসা এবং ঘরে আসার পূর্বে স্ত্রীকে জানানোর ফলে স্ত্রী তৈরি হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় পেয়ে যায়।
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমাদের কেউ যখন রাতের বেলা সফর থেকে ফিরে আসে, তখন যেন সে স্ত্রীর নিকট ততক্ষণ পর্যন্ত না আসে, যতক্ষণ স্ত্রী তার প্রয়োজনীয় ক্ষৌরকর্ম করতে পারে এবং এলোকেশী নারী তার চুল চিরুনি করে নিতে পারে।"'
এ হুকুম তাদের জন্য প্রযোজ্য, যারা দীর্ঘ দিন ঘর থেকে দূরে সফরে ছিল। কারণ, অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যখন তোমরা দীর্ঘ দিন সফরে থেকে বাড়ি থেকে অনুপস্থিত থাকো, রাতের বেলা সফর থেকে ফিরে আসলে রাতেই ঘরে প্রবেশ করবে না।'
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'এ হাদিসে দীর্ঘ দিন অনুপস্থিতির শর্ত আনার কারণ হচ্ছে, যে কারণে রাতের আগমন নিষেধ করা হয়েছে, সে কারণটি ঘটলে স্বামীর দীর্ঘ দিন অনুপস্থিতির মাঝেই ঘটতে পারে। আর হুকুমও কারণ তথা ইল্লতকে আবর্তন করে হয়।'
অন্যদিকে, কেউ যদি কোনো কাজে দিনের বেলা বের হয় বাড়ি থেকে আর রাত নাগাদ ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে, তবে এ সফরটি দীর্ঘ দিনের অনুপস্থিতির হুকুমে পড়বে না।
দীর্ঘ দিন অনুপস্থিতিতে স্ত্রী ধারণা থাকবে না স্বামী কখন আসে। তাই এ সময়টাতে হয়তো স্ত্রী অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন থাকবে, স্বামীকে স্বাগত জানানোর মতো প্রস্তুতি তার থাকবে না। অথচ স্ত্রীর কাছে স্বামীর চাওয়া থাকে, স্বামীর জন্য স্ত্রী সেজেগুজে থাকে। কিন্তু দীর্ঘ দিনের সফর শেষে স্বামী হঠাৎ এসে যদি স্ত্রীকে এলোমেলো-অগোচালো দেখে, তখন স্বাভাবিকভাবে তাদের মাঝে ঘৃণার উন্মেষ ঘটার আশঙ্কা থাকে।' অন্যদিকে, স্ত্রীকে যে স্বামী আগমনের সময়ের ব্যাপারে জানিয়ে দেবে, সে স্বামীর ক্ষেত্রে রাতের আগমনের ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
টিকাঃ
২৭৫. সহিহুল বুখারি: ১৮০০, সহিহু মুসলিম: ১৯২৮।
২৭৬. সহিহুল বুখারি: ১৮০১, সহিহু মুসলিম: ৭১৫।
২৭৭. ফাতহুল বারি: ৯/৩৪১।
২৭৮. সহিহুল বুখারি: ৫২৪৬, সহিহু মুসলিম: ৭১৫।
২৭৯. ফাতহুল বারি: ৯/৩৪।
📄 স্ত্রীদের ঈর্ষার বিষয়টি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সামাল দিতেন
স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসার টান থাকে। এর ওপর নির্ভরশীল হয় স্ত্রীদের ঈর্ষাপরায়ণতা। স্ত্রী জাতির মধ্যে এ স্বভাবটি বিদ্যমান। এ স্বভাব দিয়েই তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। একটি বর্ণনায় এসেছে, 'আল্লাহ নারীদের মাঝে ঈর্ষাপরায়ণতা অবধারিত করেছেন।' ঈর্ষাপরায়ণতা নারীদের সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণও এর চেয়ে ভিন্ন ছিলেন না।
আয়িশা (রা) বলেন, 'এক রাতের কথা। সে রাত আমার পালা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে ছিলেন। কিন্তু তিনি বের হয়ে কোথাও গেলেন। আমার তখন ঈর্ষা এসে গেল। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে আমার অবস্থা দেখে বললেন, "আয়িশা, তোমার কী হয়েছে? তুমি কী ঈর্ষা করছ?" আমি তখন বললাম, "আমার মতো এক নারী কেন আপনার মতো এক পুরুষকে নিয়ে ঈর্ষাপরায়ণ হবে না?" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তোমার কাছে কি তোমার শয়তান এসেছে?" আমি বললাম, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমার সাথে কি শয়তান আছে?" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, "হাঁ।" আমি আবার জানতে চাইলাম, "সকল মানুষের সাথেই কি শয়তান থাকে?" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, "হাঁ। তবে আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করেছেন। তাই সে মুসলিম হয়ে গেছে।"'
অন্য ঘটনায় আমরা দেখতে পাই মুমিনদের মা আয়িশা (রা)-এর ঈর্ষা তাকে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছন পেছন যেতে প্ররোচিত করে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোথায় যান, তা-ই দেখা ছিল তার উদ্দেশ্য।
আয়িশা (রা) বলেন, 'যখন আমার পালা আসত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে রাত আমার কাছে থাকতেন, সে রাতে তিনি ঘরে এসে চাদর খুলে রাখতেন। জুতো খুলে পায়ের কাছে রাখতেন। লুঙ্গির এক প্রান্ত বিছিয়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়তেন। এরপর ততক্ষণ পর্যন্ত শুয়ে থাকতেন, যতক্ষণ না আমি ঘুমিয়ে পড়ি। এরপর চুপিচুপি চাদর নিতেন, জুতো পরে ধীরে ধীরে দরোজা খুলে বেরিয়ে যেতেন, এরপর চুপচাপ দরোজা লাগিয়ে দিয়ে চলে যেতেন। কিছু সময় বাইরে থাকতেন।'
এমন এক রাতে আমি আমার জামায় মাথা ঢেকে, উড়না পরে, কোমরবন্ধ পরে বের হয়ে পড়লাম তাঁর পিছু পিছু। দেখলাম, যেতে যেতে তিনি জান্নাতুল বাকিতে পৌঁছে গেছেন। সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন দীর্ঘক্ষণ। এরপর তিনবার হাত তুলে দোয়া করলেন। তারপর তিনি ফিরতি পথ ধরলে আমিও ফিরতি পথে চলতে লাগলাম। তিনি দ্রুত হাঁটলে আমিও দ্রুত হাঁটতে থাকলাম। তিনি আরও দ্রুত হাঁটলে আমিও আরও দ্রুত হাঁটতে থাকলাম। তিনি দৌড়ে এলে আমি দৌড়ে এলাম। এভাবে আমি তাঁর আগে আগেই ঘরে এসে শুয়ে পড়লাম।
তিনি ঘরে এলেন। বললেন, "হে আয়িশ, তুমি হাঁপাচ্ছ কেন?"
আমি বললাম, "না, কিছু না।"
তিনি বললেন, "তুমি বলো-না হলে আল্লাহ তো আমাকে বলে দেবেনই।"
"আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনার প্রতি আমার মা-বাবা উৎসর্গ হোক।" বলে আমি সবকিছু তাঁকে জানিয়ে দিলাম।
তিনি বললেন, "তাহলে আমার সামনের কালো ছায়াটি তুমিই ছিলে?"
আমি বললাম, "হাঁ।"
এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকে জোরে আঘাত করলেন। আমি ব্যথা পেলাম। তিনি বললেন, "তুমি কি ধারণা করেছিলে যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার ওপর অবিচার করবেন?" যখন তুমি দেখলে আমি বের হয়েছি, তখন জিবরিল (আ) আমার কাছে এসে ডাক দিলেন। আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিলাম। বিষয়টা তোমার কাছ থেকে গোপন রাখা হয়েছে, তাই আমিও তোমাকে কিছু বলিনি। তুমি যেহেতু কাপড়ে নিজেকে ঢেকে নিয়েছিলে, তাই তিনি তোমার কাছে আসেননি। আমিও ধারণা করেছিলাম, তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ। তোমাকে জাগানো ঠিক মনে করিনি। আশঙ্কা করেছিলাম, তুমি ভয় পাবে। জিবরিল (আ) বললেন, "আপনার প্রভু আপনাকে আদেশ করেছেন বাকি-এর অধিবাসীদের কাছে যাওয়ার জন্য। তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য।" আয়িশা (রা) জিজ্ঞেস করলেন, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি তাদের জন্য কী বলে দোয়া করব?" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তুমি বলো:
السَّلَامُ عَلَى أَهْلِ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ، وَيَرْحَمُ اللَّهُ الْمُسْتَقْدِمِينَ مِنَّا وَالْمُسْتَأْخِرِينَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لَلَاحِقُونَ
"এ জায়গার অধিবাসী মুমিন-মুসলমানের ওপর সালাম বর্ষিত হোক। আমাদের মধ্যে অগ্রগমনকারী ও পশ্চাদ্গমনকারীদের ওপর আল্লাহ রহম করুন। আর আমরাও আল্লাহ চাহে তো অচিরেই তোমাদের সাথে মিলিত হব।"'
আয়িশা (রা) যদিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমুন্নত মনের ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন না কখনো। তবুও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্য স্ত্রীর প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ছিলেন তিনি। জীবিত স্ত্রীরা তো বটেই, তাঁর মৃত স্ত্রী খাদিজার (রা) প্রতিও তিনি ঈর্ষাপরায়ণ ছিলেন। যেমন তিনি বলেছেন, 'খাদিজাকে (রা) যতটা আমি ঈর্ষা করেছি, অন্য কারও প্রতি আমার এত ঈর্ষা জাগেনি।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের ঈর্ষাপরায়ণতার ক্ষেত্রে তাদের সাথে প্রজ্ঞার ভিত্তিতে আচরণ করতেন। কিন্তু বর্তমান সময়ের অনেক মানুষকেই আমরা দেখি, স্ত্রীদের ঈর্ষাপরায়ণতার কারণে জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের জবাব তো তারা দেয়-ই না; উল্টো স্ত্রীকে ধমক দেয়। মারধর পর্যন্ত করে। ফলে ঈর্ষা থেকে যে সমস্যার উৎপত্তি সেটা বিরাটাকার ধারণ করে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের এমন ঈর্ষার জবাব দিতেন কখনো মুচকি হেসে, কখনো নরম ভাষায় জবাব দিয়ে, কিন্তু যখন বিষয়টি পরিব্যাপ্তিতে বেশি হতো, তখন কখনো তিরস্কার করতেন।
আনাস (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোনো স্ত্রীর নিকটে ছিলেন। এ সময় তাঁর অন্য এক স্ত্রী একটি থালাতে খাবার পুরে পাঠালেন। কিন্তু যার ঘরে তিনি অবস্থান করছিলেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সে স্ত্রী খাদিমের হাতে আঘাত করলে থালাটি মাটিতে পড়ে ভেঙে যায়। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থালার টুকরোগুলো একত্র করতে লাগলেন। তারপর তাতে খাবার উঠাতে লাগলেন। এবং বললেন, "তোমাদের মায়ের ঈর্ষা এসে গেছে।" তিনি খাদিমকে সেখানে দাঁড় করিয়ে রাখলেন এবং তাকে সে স্ত্রীর একটি থালা দিয়ে দিলেন, যার কাছ থেকে খাবার এসেছে তার জন্য। যার থালাটি ভেঙেছিল, তাকে ভালো থালাটি দেওয়া হলো এবং যে ভেঙেছিলেন, তার কাছে ভাঙা থালাটি রয়ে গেল।'
এ হাদিসে স্ত্রীর প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দয়ার বিষয়টি ফুটে উঠেছে। যে স্ত্রী থালা ভাঙলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু ধমকও দিলেন না তাকে। তার প্রতি রাগও হলেন না। তাকে একটি শব্দও শুনালেন না। তার ওজর কবুল করলেন। একই সময়ে অন্য স্ত্রীর অধিকারেও কমতি করলেন না তিনি। সে স্ত্রীর থালা ভাঙার জরিমানা নিয়ে দিলেন যে স্ত্রী ভেঙেছেন তার কাছ থেকে।
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'এ হাদিসে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ঈর্ষায় বিহ্বল স্ত্রীর ভুল ধরা উচিত নয়। কেননা, এ সময়টাতে ঈর্ষায় রাগের মাথায় স্ত্রীর মস্তিষ্ক অকেজো হয়ে যায়।'
টিকাঃ
২৮০. তাবারানি: ১০০৪০। ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত।
২৮১. হাদিসে বর্ণিত শব্দটি হচ্ছে । মাজির সিগায় শব্দটির অর্থ হবে, সে মুসলিম হয়ে গেছে। তাই এখন আর আমাকে মন্দ কিছুর প্ররোচনা দিতে পারে না। আবার শব্দটি মুজারে'ও হতে পারে। যার অর্থ হচ্ছে, আমি তার অনিষ্টতা থেকে মুক্ত। হাশিয়াতুস সিনদি আলান নাসায়ি: ৭/৭৩।
২৮২. সহিহু মুসলিম: ২৮১৫।
২৮৩. কুধারণার কারণে তিনি এ আঘাতটি করেছেন; যাতে আয়িশা (রা)-এর শিক্ষা হয়।
২৮৪. অবিচার করে তোমার পালায় থাকা এ দিনটিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অন্য স্ত্রীর কাছে যাবেন?
২৮৫. সহিহু মুসলিম: ৯৭৪।
২৮৬. সহিহুল বুখারি: ৩৮১৬, সহিহু মুসলিম: ২৪৩৫।
২৮৭. আয়িশা (রা)।
২৮৮. জাইনাব বিনতে জাহাশ (রা)। কেউ বলেন, তিনি ছিলেন উম্মে সালামা (রা)।
২৮৯. সহিহুল বুখারি: ৫২৩৫।
২৯০. ফাতহুল বারি: ৯/৩২৫।
📄 স্ত্রীরা পরস্পরের ব্যাপারে অযাচিত শব্দ ব্যবহার করলে শুধরে দিতেন
আয়িশা (রা) বলেন, 'একবার আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, "সাফিয়্যা (রা) এমন এমন (খাটো), সে-ই আপনার জন্য যথেষ্ট।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বললেন, "তুমি এমন একটি কথা বললে, যদি এ কথাকে সমুদ্রের পানির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়, তবে তার রং পরিবর্তন হয়ে যাবে।"'
অর্থাৎ 'যদিও সমুদ্রের পানি অনেক। কিন্তু তোমার এ কথাটা এতটাই মারাত্মক যে, সমুদ্রের পানির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হলে পানির প্রাচুর্য সত্ত্বেও সে পানির রং পরিবর্তন হয়ে যাবে। সমুদ্রের পানির তুলনায় একজন মানুষের পুণ্য-আমল অনেক অনেক কম। তাই অযাচিত কথাটি যদি একজন মানুষের আমলের সাথে একত্রিত হয়, তবে সে আমলের কী অবস্থা হবে?'
টিকাঃ
২৯১. সুনanu আবি দাউদ: ৪৮৭৫, সুনanুত তিরমিজি: ২৫০২। হাদিসের মান: সহিহ।
২৯২. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৭/১৭৭।
📄 স্ত্রীদের পরস্পরের কাছ থেকে সমান বদলা নেওয়ার অনুমতি দিতেন
আয়িশা (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণ দুভাগে বিভক্ত ছিলেন। এক দলে ছিলেন আয়িশা (রা), হাফসা (রা), সাফিয়্যা (রা), সাওদা (রা)। অন্য দলে ছিলেন উম্মে সালামা (রা) ও অন্য স্ত্রীগণ। আয়িশা (রা)-এর প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অধিক ভালোবাসার কথা জানতেন সাহাবিরা (রা)। তাই যদি কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হাদিয়া দেওয়ার ইচ্ছে করতেন, তবে আয়িশার (রা) পালা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেদিন আয়িশার (রা) ঘরে থাকতেন, সেদিন গিয়ে দিয়ে আসতেন হাদিয়া।'
উম্মে সালামা (রা) ও তাঁর দলে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা উঠল। তারা বলল, "তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলে দেখো, তিনি যেন মানুষদের জানিয়ে দেন যে, কেউ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হাদিয়া দিতে চাইলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে স্ত্রীর ঘরেই থাকুক না কেন সে যেন সে ঘরেই হাদিয়া দিয়ে যায়।"
পরামর্শ অনুযায়ী উম্মে সালামা (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে কথাটা তুললেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে কিছুই বলেননি। এদিকে দলের বাকি সদস্যরা এসে জিজ্ঞেস করল উম্মে সালামাকে (রা)। তিনি বললেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো আমাকে কিছুই বলেননি।" তারা আবারও বলল, "তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে আবার কথা বলো।" যেদিন উম্মে সালামার (রা) ঘরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গেলেন, তিনি আবারও কথাটা পাড়লেন। এবারও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো উত্তর দিলেন না। দলের বাকিরা জিজ্ঞেস করলে তিনি আগের মতোই বললেন, "না, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কিছুই বলেননি।” বাকিরা বললেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু বলা পর্যন্ত তুমি বলতে থাকো।” এরপর যেদিন উম্মে সালামার (রা) পালা এল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ঘরে এলে তিনি কথাটা তুললেন আবার। এবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আয়িশার (রা) ব্যাপারে আমাকে কষ্ট দিয়ো না। কেননা, আয়িশা (রা) ব্যতীত অন্য কোনো স্ত্রীর চাদরে থাকা অবস্থায় আমার প্রতি ওহি নাজিল হয়নি।"
উম্মে সালামা (রা) বললেন, "আপনাকে কষ্ট দেওয়া থেকে আমি আল্লাহর নিকট তাওবা করছি।"
এরপর তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কন্যা ফাতিমাকে (রা) ডাকল। ফাতিমা (রা) এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অনুমতি চাইলেন। তখন তিনি আমার সাথে এক চাদরে শুয়ে ছিলেন।
ফাতিমা (রা) বলল, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনার স্ত্রীরা আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন যেন আমি আবু বকরের (রা) মেয়ের ব্যাপারে ইনসাফের কথা বলি আপনাকে।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "মেয়ে আমার, তুমি কি তা-ই ভালোবাসো না, যা আমি ভালোবাসি?" ফাতিমা (রা) উত্তর দিলেন, "অবশ্যই।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "তবে তুমিও একে (আয়িশাকে রা) ভালোবাসো।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা শুনে ফাতিমা (রা) উঠে গেলেন। ফিরে গেলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের কাছে। তাদের জানালেন তার কথা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা। তারা বলল, "তুমি আমাদের কোনো উপকার করতে পারলে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আবার যাও।" তাদের কথা শুনে ফাতিমা (রা) বললেন, "আল্লাহর কসম, আয়িশার (রা) ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কখনো আমি কথা বলতে যাব না।"
এবার তারা জাইনাব বিনতে জাহাশকে (রা) পাঠাল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের মধ্যে জাইনাবই (রা) তাঁর কাছে আমার মতোই সমান মর্যাদার অধিকারী ছিল। আমি জাইনাবের (রা) মতো উত্তম দ্বীনদার, মুত্তাকি, সত্যভাষী, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকারী, অধিক সাদাকাকারী, যে কাজ করে তিনি সাদাকা করতেন সে কাজে আত্মনিবেদনকারী, আল্লাহর নৈকট্য তালাশকারী কোনো নারী দেখিনি। কিন্তু তার মাঝে কেবল একটি দুর্বলতা ছিল। তিনি তাড়াতাড়ি রেগে যেতেন, আবার দ্রুতই ঠান্ডা হয়ে যেতেন।
জাইনাব (রা) এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আয়িশার (রা) সাথে একই চাদরে শোয়া আগের মতো। জাইনাব (রা) বললেন, “আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনার স্ত্রীরা আমাকে পাঠিয়েছেন আপনার কাছে। যেন আপনার কাছে আবু বকরের (রা) মেয়ের ব্যাপারটিতে ইনসাফের আবেদন করি।" আয়িশা (রা) বলেন, "এরপর জাইনাব (রা) আমাকে নিয়ে কথা বলতে লাগল। আমাকে কয়েক কথা শুনিয়ে দিল। আর আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তিনি আমাকে অনুমতি দেবেন কি না। জাইনাব (রা) তখন বলেই যাচ্ছিল। আমি বুঝতে পারলাম, আমি যদি জাইনাবকে (রা) কিছু বলি, তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা অপছন্দ করবেন না।" এরপর আয়িশা (রা) জাইনাব (রা)-এর কথার উত্তর দিতে থাকলেন। জাইনাব (রা)-এর মোক্ষম জবাব দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে ছাড়লেন।
আয়িশা (রা) বলেন, 'আমি যখন তাকে নিয়ে বলা শুরু করলাম, তাকে একেবারে লা-জাওয়াব করে ছাড়লাম।' নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আয়িশার (রা) দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, "এই না হলো আবু বকরের (রা) মেয়ে।"'
আয়িশা (রা) বেশ সুন্দর পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন এখানে। এতে বোঝা যায়, তিনি বেশ বুদ্ধিমতী ও প্রত্যুৎপন্নমতি ছিলেন। অপরপক্ষ যখন বলেই যাচ্ছিলেন, তখন তিনি ধৈর্য ধরে শুনতে থাকলেন, যতক্ষণ না প্রতিপক্ষ সীমাতিরিক্ত না করেছে। এরপর তিনি শুরু করলেন, পাল্টা জবাবে প্রতিপক্ষকে লা-জাওয়াব করে দিলেন।
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'এ হাদিস থেকে বুঝতে পারি, স্বামীকে নিয়ে সতিনে সতিনে ঈর্ষা ও প্রতিযোগিতা হতে পারে। স্ত্রীদের পরস্পরের আলাপ-আলোচনায় স্বামী চুপ থাকতে পারে। তবে স্বামী কারও প্রতি অন্যায় সমর্থন দিতে পারে না।'
টিকাঃ
২৯৩. সহিহুল বুখারি: ২৫৮১, সহিহু মুসলিম: ২৪৪২।
২৯৪. ফাতহুল বারি: ৫/২০৮।