📄 বড় গুনাহের মতো ছোট গুনাহ থেকেও বেঁচে থাকার তাকিদ দিতেন
আয়িশা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে উপদেশ দেন, "আয়িশা, তুচ্ছ গুনাহ থেকেও বিরত থাকো। কারণ, সেগুলোর জন্যও আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন নিযুক্ত আছে।"'
'তুচ্ছ গুনাহ'-তথা যে গুনাহ মানুষ করতে পরোয়া করে না। একজন নিযুক্ত আছে-তথা একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা আছে, যে এসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গুনাহ লিখে রাখে। মানুষের কাছে গুনাহগুলো ক্ষুদ্র মনে হলেও আল্লাহর কাছে এ গুনাহগুলো গুরুতর।'
টিকাঃ
২৭০. সুনানু ইবনি মাজাহ: ৪২৪৩। হাদিসের মান: সহিহ।
২৭১. হাশিয়াতুস সিনদি আলা সুনানি ইবনি মাজাহ: ৮/৫৯।
📄 মাসআলা দুর্বোধ্য মনে হলে স্ত্রীগণ বারবার জিজ্ঞেস করে স্পষ্ট হয়ে নিতেন
ইবনে আবি মুলাইকা (রহ) বলেন, 'আয়িশা (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো কথা না বুঝলে বারবার জিজ্ঞেস করে বুঝে নিতেন। একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "যে হিসাবের সম্মুখীন হলো, তাকে শাস্তি পেতে হবেই হবে।" আয়িশা (রা) বলেন, "তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, আল্লাহ কি বলেননি? فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يُسِيرًا - "হিসাব সহজভাবেই নেওয়া হবে। (সুরা আল-ইনশিকাক, ৮৭: ৮)" উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এটা তো কেবল প্রকাশ করা। কিন্তু পুঙ্খনাপুঙ্খরূপে যার হিসেব নেওয়া হবে, সে ধ্বংস হবে।"'
টিকাঃ
২৭২. সহিহুল বুখারি: ১০৩, সহিহ মুসলিম: ২৮৭৬।
📄 স্ত্রীদের ব্যাপারে তিনি ছিলেন গায়রতের অধিকারী
আয়িশা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের কাছে একজন মুখান্নাস (মেয়েলি পুরুষ) আসত। সবাই তাকে পুরুষত্বহীন মনে করত। একদিন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে উপবিষ্ট। মুখান্নাসটি তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো স্ত্রীর ঘরে (উম্মে সালামা (রা)-এর ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে আবি উমাইয়া (রা)-কে) এক মহিলার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলল, "কেননা, সে এতই কমনীয় যে, যদি সে সম্মুখপানে আসে, তবে তার পেটের সামনের দিকে চার ভাঁজ পড়ে। আর পেছন ফিরে গেলে আট ভাঁজ পড়ে।" তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এ তো বেশ বর্ণনা দিতে পারে। তোমরা একে তোমাদের কাছে আর আসতে দেবে না।" এরপর থেকে তার সাথে পর্দা করা হতো।'
'প্রথমে সবাই মনে করেছিল এ ব্যক্তিটি পুরুষত্বহীন, তার যৌনকামনা নেই। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের কাছে আসার ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। কিন্তু যখন তার কাছ থেকে এমন বিবরণ শোনা গেল, তখন জানা গেল যে, আসলে সে তাড়নাহীন নয়। একজন নারীর এমন কামনাসক্তকারী বর্ণনা যে দিতে পারে, তার মাঝে নারীর প্রতি আকর্ষণ অবশ্যই আছে। তা ছাড়া, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভয় করলেন, এ লোক বাইরে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের বর্ণনা দেবে। এটা পর্দার অর্থের একরকম বিপরীত হবে। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে স্ত্রীদের ঘরে আসতে নিষেধ করে দিলেন।'
এ হাদিস প্রমাণ করে, যে ব্যক্তি নারীর বর্ণনা প্রকাশ করে আদতে তাকে দেখা দেওয়া জায়িজ হলেও এ দোষটির কারণে তার থেকে দূরে থাকতে হবে।'
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন গায়রতের অধিকারী। ছিলেন নিজ স্ত্রী-কন্যাদের ব্যাপারে প্রবল আত্মসম্মানের অধিকারী। কিন্তু আজকালকার পুরুষরা যেন তাদের পৌরুষই হারিয়ে বসেছে! তারা নিজেদের স্ত্রী, বোন ও মেয়েদের পরপুরুষদের সাথে ছেড়ে দিচ্ছে। 'জাস্ট ফ্রেন্ড', 'ফ্রেন্ড লাইক এ ব্রাদার' ইত্যাদির বেড়াজালে পড়ে যাচ্ছে। তার ঘরের নারী অন্যের সাথে ঘুরছে; অথচ তার আত্মসম্মানে ঘা লাগে না এতটুকুও। এ কেমন পুরুষ?
টিকাঃ
২৭৩. সহিহুল বুখারি: ৪৩২৪, সহিহু মুসলিম: ২১৮১।
২৭৪. ফাতহুল বারি: ৯/৩৩৬।
📄 রাসূল ﷺ নিজ স্ত্রীদের ব্যাপারে সুধারণা রাখতেন
আনাস (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর থেকে ফিরে রাতের বেলা কখনো তাঁর স্ত্রীর কাছে আসতেন না। তিনি সকাল বা গোধূলি বেলায় ঘরে আসতেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরও (রা) নিষেধ করতেন, যেন তারা রাতের বেলা ঘরে না আসে। জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন, কেউ যেন স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতা যাচাই বা তার পদস্খলন যাচাইয়ের জন্য সফর থেকে ফিরে রাতের বেলা নিজ পরিবারের কাছে না আসে।'
'বিশ্বাসঘাতকতা যাচাই'- তথা স্ত্রী স্বামীর পেছনে কী করে, তা যাচাই করা; অনুপস্থিতিতে স্ত্রী তাকে ধোঁকা দেয় কি না, তা যাচাই করা। তাই যার সফর লম্বা হঠাৎ করেই রাতের বেলা ঘরে এসে তার উপস্থিত হওয়া অপছন্দনীয়। অন্যদিকে যার সফর কাছে ধারে কোথাও, স্ত্রীর মনেও স্বামীর শীঘ্র আগমন সম্পর্কে সম্ভাবনা জাগে-এ অবস্থায় রাতের বেলা ঘরে আসতে কোনো বাধা নেই।
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'এ হাদিস মানুষের একে অন্যের মাঝে প্রেম-ভালোবাসার বন্ধন রক্ষার ব্যাপারে জোর উৎসাহ দেয়। আর যখন স্বামী ও স্ত্রীর ব্যাপারটি আসে, তখন তার গুরুত্ব বেড়ে যায় আরও বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, স্বামী-স্ত্রী উভয়ে একে অন্যের সকল বিষয়-আশয় জানে। তাদের পরস্পরের কাছে নিজেদের কোনো দোষ-গুণ ও অভ্যাস লুক্কায়িত থাকে না মোটেও। শরিয়ত নিষেধ করেছে রাতের আগমন বিষয়ে। কারণ রাতের আগমনের ফলে স্ত্রী মনে করতে পারে স্বামী তার ব্যাপারে বিরূপ ধারণা রাখে। ফলে তাদের মধ্যকার মধুর সম্পর্ক পরিণত হবে জটিল সম্পর্কে।'
হঠাৎ করে না আসা এবং ঘরে আসার পূর্বে স্ত্রীকে জানানোর ফলে স্ত্রী তৈরি হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় পেয়ে যায়।
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমাদের কেউ যখন রাতের বেলা সফর থেকে ফিরে আসে, তখন যেন সে স্ত্রীর নিকট ততক্ষণ পর্যন্ত না আসে, যতক্ষণ স্ত্রী তার প্রয়োজনীয় ক্ষৌরকর্ম করতে পারে এবং এলোকেশী নারী তার চুল চিরুনি করে নিতে পারে।"'
এ হুকুম তাদের জন্য প্রযোজ্য, যারা দীর্ঘ দিন ঘর থেকে দূরে সফরে ছিল। কারণ, অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'যখন তোমরা দীর্ঘ দিন সফরে থেকে বাড়ি থেকে অনুপস্থিত থাকো, রাতের বেলা সফর থেকে ফিরে আসলে রাতেই ঘরে প্রবেশ করবে না।'
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'এ হাদিসে দীর্ঘ দিন অনুপস্থিতির শর্ত আনার কারণ হচ্ছে, যে কারণে রাতের আগমন নিষেধ করা হয়েছে, সে কারণটি ঘটলে স্বামীর দীর্ঘ দিন অনুপস্থিতির মাঝেই ঘটতে পারে। আর হুকুমও কারণ তথা ইল্লতকে আবর্তন করে হয়।'
অন্যদিকে, কেউ যদি কোনো কাজে দিনের বেলা বের হয় বাড়ি থেকে আর রাত নাগাদ ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে, তবে এ সফরটি দীর্ঘ দিনের অনুপস্থিতির হুকুমে পড়বে না।
দীর্ঘ দিন অনুপস্থিতিতে স্ত্রী ধারণা থাকবে না স্বামী কখন আসে। তাই এ সময়টাতে হয়তো স্ত্রী অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন থাকবে, স্বামীকে স্বাগত জানানোর মতো প্রস্তুতি তার থাকবে না। অথচ স্ত্রীর কাছে স্বামীর চাওয়া থাকে, স্বামীর জন্য স্ত্রী সেজেগুজে থাকে। কিন্তু দীর্ঘ দিনের সফর শেষে স্বামী হঠাৎ এসে যদি স্ত্রীকে এলোমেলো-অগোচালো দেখে, তখন স্বাভাবিকভাবে তাদের মাঝে ঘৃণার উন্মেষ ঘটার আশঙ্কা থাকে।' অন্যদিকে, স্ত্রীকে যে স্বামী আগমনের সময়ের ব্যাপারে জানিয়ে দেবে, সে স্বামীর ক্ষেত্রে রাতের আগমনের ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
টিকাঃ
২৭৫. সহিহুল বুখারি: ১৮০০, সহিহু মুসলিম: ১৯২৮।
২৭৬. সহিহুল বুখারি: ১৮০১, সহিহু মুসলিম: ৭১৫।
২৭৭. ফাতহুল বারি: ৯/৩৪১।
২৭৮. সহিহুল বুখারি: ৫২৪৬, সহিহু মুসলিম: ৭১৫।
২৭৯. ফাতহুল বারি: ৯/৩৪।