📄 সফরে ধীরে উট চালানোর নির্দেশ দিতেন
আনাস (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কোনো এক সফরে ছিলেন। তখন আনজাশা নামক কালো এক কিশোর গান গেয়ে উট চালাচ্ছিল। (ফলে উটগুলো জোরে পা ফেলছিল) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "আনজাশা, উট ধীরে চালাও, তুমি কিছু কাচপাত্র (মহিলা) সাথে নিয়ে সফর করছ।"'
আলিমগণ (রহ) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদের কাচপাত্রের সঙ্গে উপমা দিলেন। কারণ, নারীদের ওপর কোনো কিছুর প্রভাব খুব তাড়াতাড়ি পড়ে যায়। তারা কঠিন কিছুর ধকল সইতে পারে না।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার উদ্দেশ্য হচ্ছে, উটের গতি কমিয়ে মহিলাদের সফর সহজ করা। কারণ, উট যখন উটচালকের গান শুনত, তখন উট জোর গতিতে চলতে শুরু করত। এতে করে কষ্ট পড়ত আরোহী। নারীগণ দুর্বল গড়নের হওয়ার কারণে উটের দ্রুত ধাবমানতার ধকল সইতে না পারার যথেষ্ট আশঙ্কা থাকত। নারীদের কোনো ক্ষতি হওয়ার বা উট থেকে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই আনজাশাকে গান গাইতে নিষেধ করেছিলেন।'
টিকাঃ
২২৫. সহিহুল বুখারি: ৬১৬১, সহিহু মুসলিম: ২৩২৩।
২২৬. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৫/৮১।
📄 স্ত্রীদের পরস্পরের ঠাট্টার অনুমোদন দিতেন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘর যেন শুধু ঘর নয়, এ যে খুশির মহল। আয়িশা (রা) বলেন, 'একদিন সাওদা (রা) আমার ঘরে এল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক পা ছিল আমার কোলে। আরেক পা ছিল সাওদার (রা) কোলে। সাওদার (রা) জন্য "হারিরা" প্রস্তুত করলাম আমি। (হারিরা হলো-আটা, চর্বি ও পানি দিয়ে পাকানো একধরনের স্যুপ)
তাকে বললাম, "নাও, খাও।" সে অস্বীকার করল।
আমি বললাম, "তোমাকে অবশ্যই খেতে হবে, অন্যথা আমি তোমার মুখে খাবার মেখে দেবো।" তারপরও সাওদা (রা) অস্বীকার গেল।'
আয়িশা (রা) বলেন, 'এরপর আমি আমার হাতে খাবার নিয়ে তার মুখে মেখে দিলাম। এ দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসতে লাগলেন।'
তিনি সাওদাকে (রা) বললেন, "তুমিও তার মুখে খাবার মেখে দাও।” সাওদাও (রা) আমার মুখে খাবার মেখে দিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবারও হেসে উঠলেন। এদিকে উমর (রা) তখন ঘরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তিনি ডাক দিলেন, “হে আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা)! হে আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা)!" নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনে করলেন, উমর (রা) বোধ হয় ঘরে প্রবেশ করতে চাইবেন। তাই তিনি বললেন, "যাও তোমরা মুখ ধুয়ে নাও।"'
বর্তমান যুগে যদি মাঝখানে বসা স্বামীর উপস্থিতিতে দুই স্ত্রী এমন খুনসুটি করত, মূর্খতাবশত সে স্ত্রীদের তালাকই দিয়ে বসত। তার তো খবর নেই, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতেন। কীভাবে তাদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করতেন।
আনন্দঘন পরিবেশে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিক্রিয়া বর্ণিত হয়েছে এ হাদিসে। এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ন্যায়পরায়ণতাও লক্ষণীয়। যদিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন আয়িশা (রা)-কে। ভালোবাসা মনের ব্যাপার। কিন্তু প্রকাশ্যে অন্য স্ত্রীদের প্রতি ন্যায়ভিত্তিক আচরণ করতেন। যেমন এখানে আয়িশা (রা)-এর কর্মের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাওদা (রা)-কে বললেন, তিনিও যেন আয়িশার (রা) মুখে খাবার মেখে দেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে বলেছেন, সাওদা (রা)-ও সেভাবে করেছেন। এভাবে সে মজলিস হাসি-খুশি ও আনন্দে ভরে উঠল।
কুলসুম (রা) বর্ণনা করেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রী জাইনাব (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথায় উকুন দেখছিলেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে উসমান বিন মাজউন (রা) ও কিছু মুহাজির নারী উপস্থিত। তারা তাঁর কাছে তাদের বাসস্থান নিয়ে অভিযোগ দায়ের করছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর ঘরটা অন্য ওয়ারিশরা নিয়ে যেত। স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে হতো প্রয়াত স্বামীর ঘর। এটা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়াত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথার উকুন দেখা ছেড়ে মহিলাদের আলাপে জাইনাবও (রা) জুড়ে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন কৌতুক করে বললেন, "চোখ দিয়ে তো আর কথা বলছ না। চোখ চোখের কাজ করুক। মুখ মুখের কাজ করুক।" এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাজির নারীদের ঘরের ওয়ারিশ বানানোর আদেশ দিলেন।'
টিকাঃ
২২৭. সুনানুন নাসায়ি ৮৯১৭, আবু বকর শাফিয়ি (রহ) কৃত আল-ফাওয়ায়িদ: ১১২। ইহইয়া উলুমিদ্দিনের হাদিসের তাখরিজে হাফিজ ইরাকি (রহ) (৪/১৬৮২) বলেন, 'এ হাদিসের সনদ জাইয়িদ।'
২২৮. মুসনাদু আহমাদ ২৬৫১০। হাদিসের মান হাসান। এ হাদিসের সংক্ষিপ্ত একটি রূপ এসেছে, 'সুনানু আবি দাউদ'-এর ৩০৮০ নং হাদিসে; এ হাদিসের সনদ সহিহ।
📄 রাসূল ﷺ স্ত্রীদের কৌতুক শুনতেন
আয়িশা (রা) বলেন, 'আমি একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশে বললাম, “আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, মনে করুন, আপনি একটি উপত্যকায় অবতরণ করলেন আপনার উটকে খাবার খাওয়াবেন বলে। উপত্যকায় একটি গাছ আছে, যার পাতা খাওয়া। অন্য আরেকটি গাছ থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি। আপনি কোনটা থেকে উটকে খাওয়াবেন?" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, "যে গাছ থেকে কিছুই খাওয়া হয়নি।" আয়িশা (রা) এ কথার মাধ্যমে নিজেকেই বোঝাতে চাচ্ছিলেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল তাকেই কুমারি অবস্থায় বিয়ে করেছেন।'
আরেকবারের ঘটনা। আয়িশা (রা) বলেন, 'বাকি কবরস্থানে একটা জানাজা ছিল। জানাজা থেকে ফিরে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখলেন, আমি মাথা ব্যথায় কাতরাচ্ছি। আমি বলছিলাম, "ওহ! আমার মাথা!" আমার কথা শুনে তিনি বললেন, "বরং মাথা ব্যথা আমার। তুমি যদি মাথা ব্যথায় মারা যাও, তবে তোমার তো কোনো কষ্ট নেই। সব কষ্ট তো আমাকেই করতে হবে। তোমাকে গোসল দিতে হবে, কাফন পরাতে হবে, এরপর জানাজা পড়ে দাফন করতে হবে না!" আমি বললাম, "হাঁ, আপনি তো তা-ই চান। আমি মারা যাই, আর সেদিনই আপনি অন্য স্ত্রী আমার ঘরে এনে তার সাথে সময় কাটান।" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কথা শুনে মুচকি হাসলেন। এ ঘটনার কিছু সময় পরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর অসুস্থতা শুরু হয়।'
টিকাঃ
২২৯. সহিহুল বুখারি: ৫০৭৭।
২৩০. মুসনাদু আহমাদ: ২৪৭২০, সুনানু ইবনি মাজাহ ১৪৬৫। হাদিসের মান: হাসান। ঘটনার সংক্ষিপ্তসার বর্ণিত হয়েছে বুখারিতে: ৫৬৬৬।