📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাঁর শরীর থেকে কেবলই সুঘ্রাণই বের হতো

📄 তাঁর শরীর থেকে কেবলই সুঘ্রাণই বের হতো


আয়িশা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়া খুবই অপছন্দ ও গুরুতর মনে করতেন।'

ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়াকে খুবই ঘৃণা করতেন।'

সুগন্ধি ব্যবহার করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তিনি সুগন্ধি ভালোবাসতেন। বেশি বেশি সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। দুনিয়াতে তাঁর প্রিয় জিনিসগুলোর একটি ছিল সুগন্ধি। তিনি বলেন, 'দুনিয়াতে তিনটি বস্তুর প্রতি আমার হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেওয়া হয়েছে: স্ত্রী, সুগন্ধি এবং নামাজে আমার চক্ষুর শীতলতা রাখা হয়েছে।'

কিছু বস্তু আছে হালাল। কিন্তু এগুলোর কারণে মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। এ জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেঁয়াজ ও রসুনের মতো জিনিস খাওয়া পরিত্যাগ করেছিলেন।

আজকালকার স্বামীদের মধ্যে কোথায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ! তারা বাড়ির বাইর থেকে আসে ঘামের দুর্গন্ধ নিয়ে। বাড়িতে এসে পরিষ্কার হবে কিন্তু সে চিন্তা তাদের নেই। বিড়ি ফুঁকে, সিগেরেট টেনে তাদের দিন গুজরান হয়। তাদের শরীরের বোটকা দুর্গন্ধে ঘর ভরে যায়। এদিকে স্ত্রী কী সুন্দর সুগন্ধি মেখে তার জন্য অপক্ষো করে।

টিকাঃ
১৯৪. সহিহুল বুখারি: ৬৯৭২, সহিহু মুসলিম: ১৪৭৪।
১৯৫. আল-মুজামুল আওসাত: ৮৭৬৪।
১৯৬. সুনানুন নাসায়ি ৩৯৩৯। হাদিসের মান সহিহ।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 স্ত্রীদের জন্য নিজেকে পরিপাটি রাখতেন

📄 স্ত্রীদের জন্য নিজেকে পরিপাটি রাখতেন


পুরুষরা যেমন চায়, তাদের স্ত্রী তাদের সামনে সেজেগুজে থাকবে। তেমনই নারীদের মনোবাঞ্ছা একই হয়ে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুল আঁচড়াতেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থেকে, সাজসজ্জা করে পারিপাটি থাকতেন। নিজ সাহাবিদেরও (রা) আদেশ দিতেন। তিনি বলেন, 'যার মাথায় চুল আছে, সে যেন তা পরিপাটি রাখে।'

'অর্থাৎ যার মাথায় চুল আছে; সে যেন তা সুন্দর করে পরিষ্কার করে। মাথার চুল ঠিকমতো ধোয়, তেল দেয়, আঁচড়ে নেয়। চুলের যত্নে যেন অবহেলা না করে। কেননা, পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটি থাকা শরিয়তের পছন্দনীয় একটি বিষয়।...'

তাই পুরুষদের উচিত নিজের স্ত্রীর জন্য নিজেকে পরিষ্কার রাখা, সাজসজ্জা করে পরিপাটি থাকা। ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'আমি যেমনি চাই, স্ত্রী আমার জন্য সেজেগুজে থাকবে। আমিও তেমনি তার জন্য সাজতে পছন্দ করি। কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন : وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ [স্ত্রীদেরও তাদের স্বামীর ওপর অনুরূপ ন্যায়সংগত অধিকার আছে]

সাহল বিন সাদ (রা) বলেন, 'একবার একটি লোক দরোজার ফাঁক দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরের ভেতর উঁকি দিল। তখন সে দেখল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিরুনি হাতে চুল আঁচড়াচ্ছেন।'

কখনো তাঁর স্ত্রী তাঁর চুল আঁচড়ে দিতেন। আয়িশা (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইতিকাফ করতেন, মসজিদ থেকে আমার কক্ষের দিকে মাথা বাড়িয়ে দিতেন। আমি তাঁর চুল আঁচড়ে দিতাম।'

তাঁর স্ত্রী তাঁর মাথাও ধুয়ে দিতেন। আয়িশা (রা) বলেন, 'হায়িজ অবস্থায়ও আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথা ধুয়ে দিতাম।'

পরিষ্কার-পরিপাটি থাকার গুরুত্ব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিরাত থেকে স্পষ্ট জানতে পারি আমরা। তিনি উৎসাহ দিতেন মানুষ যেন পরিচ্ছন্নতার সুন্নাহগুলো যথাযথভাবে আদায় করে। যেন মানুষ তার সবচেয়ে সুন্দর রূপ ও আকৃতিতে দৃশ্যমান হয়।

টিকাঃ
১৯৭. সুনানু আবি দাউদ: ৪১৬৩। হাদিসের মান: সহিহ।
১৯৮. আওনুল মাবুদ: ৯/১১৮৩।
১৯৯. সুরা আল-বাকারা: ২২৮।
২০০. ইবনে জারির আত-তাবারি (রহ) কৃত তাফসিরুত তাবারি ৪/৫৩২।
২০১. সহিহুল বুখারি ৫৯২৪, সহিহু মুসলিম: ২১৫৬।
২০২. সহিহুল বুখারি: ২০২৯, সহিহু মুসলিম: ২৯৭।
২০৩. সহিহুল বুখারি: ৩০১, সহিহু মুসলিম: ২৯৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 স্ত্রীর বৈধ ইচ্ছে পূরণ করতেন

📄 স্ত্রীর বৈধ ইচ্ছে পূরণ করতেন


জাবির (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হজের বর্ণনায় বলেন, 'আয়িশা (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমার অবস্থা এই যে, হজ না করা পর্যন্ত আমি (উমরার জন্য) বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করতে পারিনি। কিন্তু হজ আদায় করে নিয়েছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন আব্দুর রহমানকে (রা) ডেকে আয়িশাকে (রা) নিয়ে উমরা করিয়ে আনার আদেশ দিলেন।' জাবির (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সহজ একজন মানুষ। স্ত্রীর বৈধ ইচ্ছে পূরণ করতেন তিনি।'

'অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সহজ চরিত্রের অধিকারী, উন্নত গুণের অধিকারী একজন মানুষ। যাঁর মাঝে আদর ও ভালোবাসা পূর্ণমাত্রায় বিদ্যমান ছিল। وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيم : নিশ্চয় তুমি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।'

অথচ আজকাল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কেবল ঝগড়া, ফাসাদ ও বাড়াবাড়িই দেখা যায়।

টিকাঃ
২০৪. সহিহু মুসলিম: ১২১৩।
২০৫. সুরা আল-কলাম, ৬৮: ৪।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 স্ত্রীদের বৈধ খেলাধুলা দেখতে দিতেন

📄 স্ত্রীদের বৈধ খেলাধুলা দেখতে দিতেন


আয়িশা (রা) বলেন, 'একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের ভেতর বসে ছিলেন। এমন সময় বাইরে শিশুদের কণ্ঠ ও কোলাহল শুনতে পেলাম আমরা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উঠে গিয়ে দেখলেন, কিছু হাবশি তাদের বল্লম নিয়ে খেলছে। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, "আয়িশা, এদিকে আসো। দেখে যাও।" আমি এগিয়ে আসলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাঁধের ওপর দিয়ে মুখ নিয়ে আমি বালকদের খেলা দেখতে লাগলাম। একটু পর তিনি বললেন, "খেলা দেখা হয়েছে? তুষ্ট হয়েছ?” আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আমার মর্যাদা কতটুকু তা জানতে চাইলাম, তাই বললাম, "না।"'

ইবনে বাত্তাল (রহ) বলেন, 'এ হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুপম চরিত্রের অন্যতম একটি দিক বর্ণিত হয়েছে। প্রতিটি পুরুষের উচিত তার স্ত্রীকে এমন ভালোবাসায় আগলে রাখা। স্ত্রীর আনন্দের জন্য বৈধতার সীমানায় বিনোদনের ব্যবস্থা করে দেওয়া।'

অন্য বর্ণনায় এসেছে, আয়িশা (রা) বলেন, 'আমি যেন তাদের খেলা দেখতে পারি, সে জন্য তিনি আমাকে তাঁর চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেন। তিনি আমার জন্য সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। শেষ পর্যন্ত আমিই সেখান থেকে সরে আসি।'

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আয়িশা (রা) বলেন, 'আমি খেলারত বালকদের দেখছিলাম আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশে একটু পর পর বলছিলাম, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাড়াহুড়ো করবেন না।" তিনি আমার কথামতো দাঁড়িয়ে রইলেন। একটু পর বললেন, "হয়েছে?" আমি আবারও বললাম, "তাড়াহুড়ো করবেন না।" আয়িশা (রা) বলেন, 'খেলা দেখা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। বরং আমি চাচ্ছিলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মনে আমার কতটুকু সমাদর ও সম্মান রয়েছে, সে কথা অন্যান্য স্ত্রীদের কাছে পৌঁছাক।'

'এ হাদিস থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, স্ত্রীর সাথে সুন্দর আচরণের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, স্ত্রীর বৈধ ইচ্ছার প্রতিপালন করা। সদাচরণের আরেকটি অংশ হচ্ছে, স্ত্রী হালাল বিনোদনে আগ্রহী হলে সে সুযোগ করে দেওয়া। যদিও স্বামীর জন্য কষ্টকর হয়-এ ক্ষেত্রে সবর করাই তার কর্তব্য।'

ইদের সময় বৈধ কবিতা-গান শুনতে স্ত্রীদের নিষেধ করতেন না
আয়িশা (রা) বলেন, 'একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে এলেন। তখন দুজন বালিকা আমার পাশে বসে বুআসের দিনের গান গাইছিল। (যেদিন আওস ও খাজরাজের মাঝে যুদ্ধ হয়েছিল, সেদিনটি হচ্ছে বুআসের দিন)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে এলেন। মুখ ঘুরিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। তখন আবু বকর (রা) ঘরে এলেন। তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে শয়তানের বাদ্যযন্ত্র!" আবু বকর (রা)-এর কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর দিকে ফিরে বললেন, "তাদের কিছু বোলো না।" আবু বকর (রা) অন্যদিকে মনোযোগ ফেরালে আমি বালিকা-দুটোকে ইশারা করলাম। তারা বের হয়ে গেল। আর সেদিন ছিল ইদের দিন।'

ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'এ হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি, ইদের দিন বিভিন্নভাবে পরিবারের মনোরঞ্জন ও বিনোদনের ব্যবস্থা করে দেওয়া, দীর্ঘ দিন ইবাদতের কষ্ট করার পর শারীরিক আরামের ব্যবস্থা করার বৈধতা সাব্যস্ত আছে।...এ হাদিসে নারীদের প্রতি কোমল আচরণ করা এবং তাদের আদর-সোহাগে আগলে রাখার বিষয়টিও বিবৃত হয়েছে।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইদ ও বিবাহের ন্যায় আনন্দের দিনগুলোতে দফ বাজিয়ে ওই ধরনের বা সমার্থক গান করার অনুমতি দিয়েছেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগের পর বিজিত হলো পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্য। সাহাবিরা (রা) দেখলেন, পারস্য ও রোমানদের গান বাদ্যযন্ত্র সহযোগে পরিবেশিত হয়। তাদের গীতিকথায় মদ ও নারীদের নিয়ে উত্তেজনামূলক কথাবার্তার মতো হারাম বর্ণনা থাকে।

এসব গান মানুষের মনের ভেতরের কামনাকে জাগ্রত করে। সাহাবিগণ (রা) এসব গান নিষিদ্ধ করেন শক্তভাবে।

সাহাবিদের (রা) এ নিষেধাজ্ঞা প্রমাণ করে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৈধতা দিয়েছিলেন, তা এসব গান ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছিলেন, সে বাদ্যযন্ত্র এমন ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ধরনের বাদ্যযন্ত্রের অনুমতি দিয়েছিলেন। সাহাবিদেরকে (রা) যে গানের যে বাদ্যযন্ত্রের বৈধতা কেবল আরবে প্রচলিত।

অন্যদিকে বাদ্যযন্ত্রসহ অনারবদের যে গান প্রচলিত আছে, সে গানের অনুমতি নেই শরিয়তে। যদিও হাদিসে গান শব্দটি এসেছে আর এগুলোকেও গান বলা হয়, তবুও তা নিষিদ্ধ। হাদিসে বর্ণিত গান শব্দটি যে ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে আর অনারবদের মাঝে গান শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হয়-উভয়ের মাঝে স্পষ্ট প্রভেদ আছে। একজন সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন লোক অনায়াসে তা বুঝতে পারবেন। কারণটা হচ্ছে, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গাওয়া অনারবদের গান প্রবৃত্তিকে উত্তেজিত করে তোলে, স্বভাবে বিকৃতি আনে, গুনাহর দিকে আহ্বান করে। এ গানগুলো জিনার দিকে সম্মোহন করে। আর আরবদের যে গান শরিয়তে বৈধ বলা হয়েছে, তাতে আদৌ কোনো ক্ষতি নেই।

অতএব, যে ব্যক্তি প্রচলিত গানের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমোদিত গানের সাদৃশ্য স্থাপনের চেষ্টা করে, সে মারাত্মক ভ্রান্তিতে নিপতিত হয়। কেউ যদি অনুমোদিত গান ও নিষিদ্ধ গানের সার্বিক ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদিতে স্পষ্ট পার্থক্য থাকার পরও উভয়কে এক প্রমাণ করার চেষ্টা করে, তার এই অপচেষ্টা কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না।'

স্ত্রীর বিনোদন এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ করেননি তিনি। বরং আয়িশা (রা)-এর কাছে বালিকাদের গমনাগমনের অনুমতি ছিল। তারা ছিলেন আয়িশা (রা)-এর খেলার সাথি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সতর্ক থাকতেন যেন আয়িশার (রা) খেলার সাথি এসব মেহমান চলে না যায়।

আয়িশা (রা) বলেন, 'আমি পুতুল নিয়ে খেলতাম। আমার কিছু খেলার সাথিও ছিল। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে আসতেন, তারা আড়ালে চলে যেত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের আবার আমার কাছে নিয়ে আসতেন। আমরা আবার আগের মতো খেলতে থাকতাম।'

ইমাম নববি (রহ) বলেন, 'এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রগাঢ় স্নেহ ও উৎকৃষ্ট আচরণের পরিচয়।'

আয়িশা (রা) পুতুল নিয়ে খেলতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ নিয়ে তার সাথে রসিকতা করতেন।

আয়িশা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুক বা খাইবার যুদ্ধ থেকে ফিরে এলেন। আমার খেলনাগুলোর ওপর একটি পর্দা ছিল। হঠাৎ বাতাস এসে তার এক প্রান্ত উড়িয়ে নিয়ে গেল। আমার কিছু পুতুল দেখা গেল।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "এগুলো কী?"

আমি বললাম, "আমার পুতুল।"

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুতুলের মাঝ দু'ডানাবিশিষ্ট কাপড়ের তৈরি একটি ঘোড়া দেখিয়ে বললেন, "মাঝখানের এটা কী?"

ঘোড়া।

ঘোড়ার পিঠে এ দুটো কী?

এ দুটো ঘোড়ার ডানা।

ঘোড়ার পিঠে দুটো ডানা?!

- কেন? আপনি কী শুনেননি-সুলাইমান (আ)-এর ঘোড়ার পিঠে বেশ কয়েকটি ডানা ছিল?

এ শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন হাসলেন যে, তার মাড়ির দাঁত দেখা গেল।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সে হাসি তাঁর স্ত্রীর মনকে কতটা প্রফুল্ল করেছিল-সেটার পরিমাপ কি আমরা করতে পারব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক রসিকতা তাঁর স্ত্রীর মনকে যে রকম পুলকিত করেছিল, নিশ্চয় সে রকম পুলকই স্ত্রী পেতে চায় তাঁর স্বামীর কাছ থেকে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে (রা) স্ত্রীর সাথে হাসি-কৌতুক করার প্রতি উৎসাহিত করতেন। কারণ, এতে তাদের অন্তর পুলকিত হয়, হৃদয় হয় প্রফুল্ল। 'জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বিয়ে করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "তুমি কিশোরী কেন বিয়ে করলে না-তুমি তার সাথে খেলতে, আর সেও তোমার সাথে খেলত। অথবা তুমি তাকে হাসাতে আর সেও তোমাকে হাসাত।"'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, 'আল্লাহর জিকির ছাড়া অন্যসব কাজ অনর্থক। তবে চারটি ব্যতীত। এক. দুই লক্ষ্যস্থলের মাঝে ছুটে চলা। দুই. ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। তিন. স্ত্রীর সাথে হাসি-কৌতুক করা। চার. সাঁতার শেখা।'

স্বামী-স্ত্রীর মাঝে একটু খুনসুটি, একটু হাস্যরস, একটুখানি রসিকতা আনন্দে ভরে তোলে পরিবারকে। ঘর হয় শান্তির আবাস। দাম্পত্য বন্ধন হয় শক্তিশালী। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার হৃদ্যতা ও ভালোবাসা গভীর হতে থাকে ক্রমশ।

'রসিকতা, কৌতুক ও খেলাধুলা স্ত্রীর মন জয় করার তিনটি মোক্ষম উপায়।'

'উমর (রা) কঠোর মানুষ হওয়া সত্ত্বেও দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে বলেন, "একজন পুরুষের উচিত স্ত্রীর সাথে শিশুর মতো আচরণ করা। কিন্তু বাড়ির বাইরে যখনই দরকার হবে, তখন বীর পুরুষের মতো আবির্ভূত হওয়া।"'

সাবিত বিন উবাইদ (রহ) বলেন, 'জাইদ বিন সাবিত (রা) বাড়িতে শিশুর মতো হাস্যরস করতেন। আবার বাড়ির বাইরে তিনি ছিলেন বীর-বাহাদুরদের একজন।'

'একবার এক বেদুইন নারী সদ্যপ্রয়াত স্বামীর বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় বলেন, "আল্লাহর কসম, তিনি যখন বাড়িতে প্রবেশ করতেন, তখন হাসোজ্জ্বল থাকতেন। বাড়ির বাইরে গম্ভীর সুপুরুষ হয়ে যেতেন। বাড়িতে যা থাকত, তা খেতেন। বাড়িতে নেই এমন খাবার খেতে মন চাইলেও কখনো চাইতেন না।"'

মানুষজন এখন বিপরীতমুখী আচরণ করছে। বন্ধুবান্ধব বা কর্মক্ষেত্রের সঙ্গীদের সাথে হাসি-খুশি আচরণ। কিন্তু বাড়িতে এলেই গুরু-গম্ভীর। গোমড়া হয়ে যায় তার মুখ। বিরক্তিতে কুঁচকে থাকে কপাল।

টিকাঃ
২০৬. সুনanুত তিরমিজি: ৩৬৯১। হাদিসের মান: সহিহ।
২০৭. শারহু সহিহিল বুখারি: ২/৫৪৮।
২০৮. সহিহু মুসলিম: ৮৯২।
২০৯. নাসায়ি কৃত আস-সুনanুল কুবরা ৮৯৫১। হাদিসের মান: সহিহ।
২১০. ইবনে বাত্তাল (রহ) কৃত শারহু সহিহিল বুখারি: ৭/২৯৮।
২১১. সহিহুল বুখারি: ৯৫০, সহিহু মুসলিম: ৮৯২।
২১২. ফাতহুল বারি: ২/৪৪৩।
২১৩. ইবনে রজব (রহ) কৃত ফাতহুল বারি: ৬/৭৮।
২১৪. সহিহুল বুখারি: ৬১৩০, সহিহু মুসলিম: ২৪৪০।
২১৫. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১০/২০৫।
২১৬. সুনanu আবি দাউদ: ৪৯৩২। হাদিসের মান: সহিহ।
২১৭. সহিহুল বুখারি: ২০৯৭, সহিহু মুসলিম: ৭১৫।
২১৮. তাবারানি কৃত আল-কাবির ১৭৮৫। হাদিসের মান: সহিহ।
২১৯. মাওইজাতুল মুমিনিন: ১৬৮।
২২০. আল-মাজালিসাহ ওয়া জাওয়াহিরুল ইলম: ৩/৪৩০।
২২১. ইমাম বাগাবি (রহ) কৃত শারহুস সুন্নাহ: ১৩/১৮৩।
২২২. মাওইজাতুল মুমিনিন: ১০৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00