📄 স্ত্রীদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্যধারণ করতেন
'একবার আবু বকর (রা) এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি তখন আয়িশা (রা)-কে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে জোর গলায় কথা বলতে শুনলেন। অনুমতি পেয়ে আবু বকর (রা) প্রবেশ করলেন। তারপর আয়িশা (রা)-কে "হে উম্মে রুমানের (রা) মেয়ে" বলে সম্বোধন করলেন এবং তাকে ধরে বললেন, "তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলছ!" তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বাপ-মেয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আবু বকরকে (রা) থামালেন। আবু বকর (রা) বের হয়ে গেলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রা)-কে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে বললেন, "দেখলে কীভাবে তোমাকে ওই লোকের হাত থেকে বাঁচালাম?” কিছুক্ষণ পর আবু বকর (রা) আবার এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। ভেতরে এসে তিনি তাঁদের দুজনকে হাসতে দেখলেন। তাঁদের বললেন, "আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনারা যুদ্ধের সময় আমাকে যেভাবে দলে নিয়েছিলেন, সন্ধির সময়ও দলে নিয়ে নিন!”'
কখনো কখনো তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো স্ত্রী রাগ করে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাঁর সাথে কথা বলতেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধৈর্যের সাথে তাদের রাগের মোকাবেলা করতেন। উমর বিন খাত্তাব (রা) বলেন, 'আমরা কুরাইশরা যখন মক্কায় ছিলাম, তখন আমরা নারীদের ওপর কর্তৃত্ব চালাতাম। কিন্তু মদিনায় এসে দেখলাম, আনসারি নারীরা পুরুষদের ওপর ছড়ি ঘোরায়। আনসারি নারীদের দেখাদেখি আমাদের নারীরাও দেখি এখন পুরুষদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে শুরু করেছে। একবার আমি কোনো ব্যাপারে আমার স্ত্রীর ওপর একটু গলা চড়িয়ে কথা বলি। তখন আমার স্ত্রীও আমাকে অনুরূপ ফিরিয়ে দেয় এবং আমার সাথে বিতর্ক করে। এটা আমার কাছে অপছন্দনীয় মনে হলো। তখন তিনি বললেন, "আপনি আমার আচরণে অবাক হচ্ছেন? আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীরাও তাঁর সাথে রাগ করে কথা বলেন। তাদের কেউ কেউ তো রাগ করে পুরো দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলেন না।" তার কথায় আশ্চর্য হলাম আমি। আমি হাফসার (রা) কাছে গেলাম। তাকে বললাম, "হাফসা, তোমাদের কেউ কি সকাল হতে রাত পর্যন্ত নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে রাগ করে কথা বন্ধ করে রাখে?" তিনি বললেন, "হাঁ।” আমি বললাম, "তাহলে সে তো ধ্বংস! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রাগানোর কারণে তুমি কি আল্লাহর ক্রোধ থেকে রক্ষা পাবে? তুমি তো ধ্বংস হয়ে যাবে!..."'
হাদিস থেকে শিক্ষা
'নারীদের সাথে কঠোর আচরণ করা, তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা নিন্দনীয়। কেননা, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ গোত্র কুরাইশের আচরণ ছেড়ে আনসারদের আচরণ গ্রহণ করেছেন এ ক্ষেত্রে।'
স্ত্রীদের মন্দ আচরণে সবর করা, তাদের ছোটখাটো ভুল এড়িয়ে যাওয়া, স্বামীর অধিকার আদায়ে ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে গেলে তাদের ক্ষমা করে দেওয়ার শিক্ষা পাওয়া যায় হাদিসটিতে। তবে কখনো আল্লাহর অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে তাদের শিথিলতা গ্রহণীয় নয়।'
টিকাঃ
১৮২. মুসনাদু আহমাদ: ১৭৯২৭। নুমান বিন বশির (রা) থেকে বর্ণিত। হাদিসের মান সহিহ।
১৮৩. সহিহুল বুখারি ৮৯, সহিহু মুসলিম: ১৪৭৯।
১৮৪. ফাতহুল বারি: ৯/২৯১।
📄 বাড়ির কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন
আসওয়াদ (রহ) বলেন, 'আমি আয়িশা (রা)-এর কাছে জানতে চাইলাম, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে এসে কী করতেন?" তিনি উত্তর দিলেন, "ঘরে এসে তিনি ঘরের কাজ করতেন। যখন নামাজের সময় হতো, নামাজের জন্য বের হয়ে যেতেন।"'
প্রশ্ন হতে পারে, তিনি ঘরের কোন কাজটি করতেন? এ প্রশ্নের উত্তর আরেকটি হাদিসে এসেছে এভাবে, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও আর দশজন মানুষের মতো ঘরে এসে কাপড় কাচতেন। ছাগলের দুধ ধুতেন। নিজের কাজ করতেন।'
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'ঘরে তিনি নিজের কাপড় সেলাই করতেন। জুতো মেরামত করতেন। পুরুষরা ঘরের যে কাজগুলো করে, তিনিও তা-ই করতেন।'
অথচ এ সময়ের মানুষগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা স্ত্রীদের ওপর অসহ্য বোঝা দিয়ে রাখে। স্ত্রী কখনো অসুস্থ থাকে, শারীরিককভাবে দুর্বল থাকে। এ সময়ে বাড়ির কাজে তাদের একটু সাহায্য করলেই চলে। কিন্তু নবাবজাদা তা করবে কেন!
টিকাঃ
১৮৫. সহিহুল বুখারি: ৬৭৬।
১৮৬. আদাবুল মুফরাদ ৫৪১, শামায়িল: ৩৪৩। হাদিসের মান সহিহ।
১৮৭. মুসনাদু আহমাদ: ২৪৩৮২। হাদিসের মান: সহিহ।
📄 স্ত্রীকে বাহনে চড়তে সাহায্য করতেন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খাদিম আনাস (রা) বলেন, 'আমি দেখলাম, সাফিয়্যা (রা) উটে আরোহণের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কাপড়ে ঢেকে দিচ্ছেন। এরপর উটের কাছে বসে হাঁটু উঁচু করে রাখছেন। সাফিয়্যা (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাঁটুর ওপর পা রেখে বাহনে চড়ছেন।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাঁটু দাঁড় করে রাখছেন আর সাফিয়্যা (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাঁটুর ওপর পা রেখে বাহনে চড়ছেন। এটা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিনম্রতা, স্ত্রীর প্রতি প্রেম-ভালোবাসার এক আশ্চর্য বহিঃপ্রকাশ।
টিকাঃ
১৮৮. সহিহুল বুখারি: ২৮৯৩, সহিহু মুসলিম: ১৩৬৫।
📄 রাসূল ﷺ স্ত্রীদের জন্য নিজেকে পরিচ্ছন্ন ও সুরভিত রাখতেন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই ঘরে আসতেন, মিসওয়াক করতেন প্রথমে। যাতে কোনো মতেই স্ত্রী তাঁর মুখ থেকে গন্ধ না পান। শুরাইহ (রহ) বলেন, 'আমি আয়িশা (রা)-এর কাছে জানতে চাইলাম, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে ঢুকে প্রথমে কী করতেন?" উত্তরে আয়িশা (রা) বলেন, "প্রথমে এসে তিনি মিসওয়াক করতেন।"'
'ঘরে এসে প্রথমেই মিসওয়াক করার রহস্য হচ্ছে, অনেক সময় মানুষের সাথে কথা বলতে বলতে মুখের ঘ্রাণ পাল্টে যায়। তাই বাড়িতে ঢুকে প্রথমেই মুখের গন্ধ দূর করাই উত্তম আচরণের অংশ।'
যখনই ঘুম থেকে জাগতেন, মুখ ও দাঁত পরিষ্কার করে নিতেন তিনি। আয়িশা (রা) বলেন, 'রাতে দিনে যখনই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জাগতেন, তখনই অজুর আগে মিসওয়াক করে নিতেন।'
'এ থেকে বোঝা যায়, মুখে যখন দুর্গন্ধ আসে, খাবারের পরে বা অন্য সময়ে মুখের ঘ্রাণ পাল্টে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হলে তখন মিসওয়াক করে নেওয়া মুসতাহাব।'
ইবনুল কাইয়িম (রহ) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিসওয়াক পছন্দ করতেন। রোজাহীন অবস্থায় যেমন রোজা অবস্থায়ও তিনি মিসওয়াক করতেন। ঘুম থেকে উঠলে মিসওয়াক করতেন। মিসওয়াক করতেন অজুর সময়, নামাজের সময়, বাড়িতে প্রবেশের সময়। ব্যবহার করতেন আরাক গাছের মিসওয়াক।'
স্ত্রী স্বামীর জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখবে। তেমনই স্বামীও স্ত্রীর জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখবে। এ বিষয়টি ছোটখাটো মনে হলেও আদতে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অপরিষ্কার চালচলনের কারণে বিবাহ বন্ধনে চিড় ধরতে পারে। এমনকি তালাকও হতে পারে।
টিকাঃ
১৮৯. সহিহু মুসলিম: ২৫৩।
১৯০. হাশিয়াতুস সুযুতি আলা সুনানিন নাসায়ি: ১/১০।
১৯১. সুনানু আবি দাউদ: ৫৭। হাদিসের মান: হাসান।
১৯২. আল-মুফহিম: ৩/১৩৬।
১৯৩. জাদুল মাআদ ১/১৬৭।