📄 স্ত্রী অসুস্থ হলে তিনি রুকইয়া করতেন
আয়িশা (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুরা ফালাক ও নাস পড়ে জনৈক অসুস্থ স্ত্রীর গায়ে ডান হাত বুলিয়ে দোয়া করলেন-
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ البَاسَ، اشْفِهِ وَأَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءٌ لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
"হে আল্লাহ, মানুষের প্রভু, কষ্ট দূর করুন, সুস্থ করে দিন। আপনিই আরোগ্যদানকারী। আপনি ছাড়া কেউই রোগমুক্ত করতে পারে না। এমনভাবে আরোগ্য দান করুন, যার পরে কোনো রোগ অবশিষ্ট থাকে না।"'
স্বামী যখন স্ত্রীর গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়, স্ত্রীর ব্যথার জায়গাতে স্বামীর স্নেহের পরশ লাগে-তখন স্পর্শের এক বিরাট প্রভাব পড়ে। যদিও এতে শরীরের রোগ সেরে না যায়। তবুও অন্তরের বিরাট একটি বোঝা যেন নেমে যায় রুণ স্ত্রীর। স্বামীর স্নেহের পরশ পেয়ে প্রশান্ত হয় তার মন। কেননা, সে বুঝতে পারে তার প্রিয়তম স্বামী তার কষ্টটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছেন।
উম্মে জার' (রা)-এর হাদিসে এসেছে, 'এগারো জনের একজন নারী তার স্বামীর দোষ বর্ণনা করে এভাবে-সে দুঃখ বোঝার জন্য হাতটাও প্রসারিত করে না।'
'অর্থাৎ স্ত্রী কোনো চিন্তায় আছে কি না, তা বোঝার ও দূর করার চেষ্টা করে না। হাদিসে ব্যবহৃত শব্দটির অর্থ পেরেশানি। অভিযোগ ও অসুস্থতা বোঝানোর জন্যও এটি ব্যবহৃত হয়। "দুঃখ বোঝার জন্য হাতটিও প্রসারিত করে না”-এই বাক্য বলে মহিলা বোঝাতে চাইছে, স্ত্রীর কাছে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সেসব বিষয় নিয়ে তার স্বামী মাথা ঘামায় না। এটিকে সে ভালোবাসার শৈথিল্য বলে অভিহিত করেছে।'
দুঃখ-কষ্টে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের হাত ধরবে, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক স্বামী আছে, স্ত্রীর অসুস্থতাকে মোটেও পাত্তা দেয় না। তারা চায় স্ত্রী সব সময় সুস্থ ও সবল থাকুক। একটু অসুস্থ হলেই স্ত্রীকে বাপের বাড়ি রেখে আসে। যতদিন সুস্থ না হয় বাসায় আনে না। তার কাছে অসুস্থ স্ত্রী হচ্ছে বোঝা-একটা উটকো ঝামেলা।
আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "হে আল্লাহ, এতিম ও নারী-এই দুই দুর্বলের অধিকার হরণ করা আমি হারাম ঘোষণা করছি।"'
টিকাঃ
১৭৭. সহিহুল বুখারি: ৫৭৪৩, সহিহু মুসলিম: ২১৯১।
১৭৮. সহিহুল বুখারি ৫১৮৯, সহিহু মুসলিম: ২৪৪৮।
১৭৯. ফাতহুল বারি: ৯/২৬৩।
১৮১. সুনানু ইবনি মাজাহ ৩৬৭৮। হাদিসের মান সহিহ।
📄 স্ত্রীর প্রতি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সহমর্মিতা
সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই (রা) থেকে বর্ণিত আছে, 'একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের নিয়ে হজের সফরে রওনা হন। পথিমধ্যে এক ব্যক্তি বাহন থেকে নেমে উটগুলো হাঁকিয়ে চলল। উটগুলো দ্রুত চলতে শুরু করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, "মহিলাদের নিয়ে সাবধানে চলো।" এভাবে তারা সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করে সাফিয়্যা (রা)-এর উট হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সাফিয়্যা (রা)-এর উটটি সবচেয়ে সুন্দর ছিল। উটকে হাঁটু গেড়ে বসতে দেখে তিনি কেঁদে উঠলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালে তিনি এগিয়ে এলেন সাফিয়্যা (রা)-এর দিকে। সাফিয়্যা (রা)-এর অশ্রু মুছে দিলেন নিজ হাতে।'
নিজ হাত দিয়ে স্ত্রীর চোখের জল মুছে দেওয়া স্ত্রীর প্রতি যথার্থ সমবেদনা। এ সমবেদনার মাঝে লুকিয়ে থাকে স্ত্রীর প্রতি নিখাদ আদর ও ভালোবাসা। সাফিয়্যা (রা)-এর কান্নার কারণ যদিও তেমন গুরুতর ছিল না। তার সুন্দর উটটি বসে পড়েছিল বলে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। তবুও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে তার সহমর্মী হলেন চোখের জল মুছে। তিনি তার অনুভূতিকে তুচ্ছ মনে করলেন না।
সময়ের আবর্তে নারীরা বিভিন্ন বিপদ ও সমস্যার মধ্য দিয়ে যায়। এ সময়ে তাদের প্রবোধ দিতে হয়, তাদের অন্তর প্রশান্ত করতে হয়। এ জন্য স্বামীকে এগিয়ে আসতে হয়। স্ত্রীকে সমবেদনা জানাতে হয়। যেন স্ত্রী বুঝতে পারে যে, সে একা নয়। তার সাথে তার স্বামী আছে।
মা, বাবা, ভাই, বোন সবাইকে ছেড়ে স্ত্রী স্বামীর বাড়িতে পাড়ি জমায়। এখানে বড়ই একা সে। কষ্টের সময় তার এমন কাউকে দরকার যে তাকে ধৈর্যধারণ করতে সহায়তা করবে, সবরের ফজিলত স্মরণ করিয়ে দেবে। অনেক লোক এমন আছে, যাদের চরিত্রে এই গুণ নেই। স্ত্রীর বিপদাপদের কোনো পরোয়াই তাদের কাছে নেই। কিছু জঘন্য লোক তো এমন আছে, যারা স্ত্রীর বিপদকে পাত্তাই দেয় না: বরং স্ত্রীর মুসিবত নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে।
টিকাঃ
১৮০. মুসনাদু আহমাদ ২৬৩২৫। হাদিদের মান: সহিহ।
📄 স্ত্রীদের দেওয়া কষ্টে ধৈর্যধারণ করতেন
'একবার আবু বকর (রা) এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি তখন আয়িশা (রা)-কে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে জোর গলায় কথা বলতে শুনলেন। অনুমতি পেয়ে আবু বকর (রা) প্রবেশ করলেন। তারপর আয়িশা (রা)-কে "হে উম্মে রুমানের (রা) মেয়ে" বলে সম্বোধন করলেন এবং তাকে ধরে বললেন, "তুমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলছ!" তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বাপ-মেয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আবু বকরকে (রা) থামালেন। আবু বকর (রা) বের হয়ে গেলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রা)-কে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে বললেন, "দেখলে কীভাবে তোমাকে ওই লোকের হাত থেকে বাঁচালাম?” কিছুক্ষণ পর আবু বকর (রা) আবার এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। ভেতরে এসে তিনি তাঁদের দুজনকে হাসতে দেখলেন। তাঁদের বললেন, "আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনারা যুদ্ধের সময় আমাকে যেভাবে দলে নিয়েছিলেন, সন্ধির সময়ও দলে নিয়ে নিন!”'
কখনো কখনো তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো স্ত্রী রাগ করে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাঁর সাথে কথা বলতেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধৈর্যের সাথে তাদের রাগের মোকাবেলা করতেন। উমর বিন খাত্তাব (রা) বলেন, 'আমরা কুরাইশরা যখন মক্কায় ছিলাম, তখন আমরা নারীদের ওপর কর্তৃত্ব চালাতাম। কিন্তু মদিনায় এসে দেখলাম, আনসারি নারীরা পুরুষদের ওপর ছড়ি ঘোরায়। আনসারি নারীদের দেখাদেখি আমাদের নারীরাও দেখি এখন পুরুষদের ওপর ছড়ি ঘোরাতে শুরু করেছে। একবার আমি কোনো ব্যাপারে আমার স্ত্রীর ওপর একটু গলা চড়িয়ে কথা বলি। তখন আমার স্ত্রীও আমাকে অনুরূপ ফিরিয়ে দেয় এবং আমার সাথে বিতর্ক করে। এটা আমার কাছে অপছন্দনীয় মনে হলো। তখন তিনি বললেন, "আপনি আমার আচরণে অবাক হচ্ছেন? আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীরাও তাঁর সাথে রাগ করে কথা বলেন। তাদের কেউ কেউ তো রাগ করে পুরো দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে কথা বলেন না।" তার কথায় আশ্চর্য হলাম আমি। আমি হাফসার (রা) কাছে গেলাম। তাকে বললাম, "হাফসা, তোমাদের কেউ কি সকাল হতে রাত পর্যন্ত নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে রাগ করে কথা বন্ধ করে রাখে?" তিনি বললেন, "হাঁ।” আমি বললাম, "তাহলে সে তো ধ্বংস! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রাগানোর কারণে তুমি কি আল্লাহর ক্রোধ থেকে রক্ষা পাবে? তুমি তো ধ্বংস হয়ে যাবে!..."'
হাদিস থেকে শিক্ষা
'নারীদের সাথে কঠোর আচরণ করা, তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা নিন্দনীয়। কেননা, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ গোত্র কুরাইশের আচরণ ছেড়ে আনসারদের আচরণ গ্রহণ করেছেন এ ক্ষেত্রে।'
স্ত্রীদের মন্দ আচরণে সবর করা, তাদের ছোটখাটো ভুল এড়িয়ে যাওয়া, স্বামীর অধিকার আদায়ে ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে গেলে তাদের ক্ষমা করে দেওয়ার শিক্ষা পাওয়া যায় হাদিসটিতে। তবে কখনো আল্লাহর অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে তাদের শিথিলতা গ্রহণীয় নয়।'
টিকাঃ
১৮২. মুসনাদু আহমাদ: ১৭৯২৭। নুমান বিন বশির (রা) থেকে বর্ণিত। হাদিসের মান সহিহ।
১৮৩. সহিহুল বুখারি ৮৯, সহিহু মুসলিম: ১৪৭৯।
১৮৪. ফাতহুল বারি: ৯/২৯১।
📄 বাড়ির কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন
আসওয়াদ (রহ) বলেন, 'আমি আয়িশা (রা)-এর কাছে জানতে চাইলাম, “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে এসে কী করতেন?" তিনি উত্তর দিলেন, "ঘরে এসে তিনি ঘরের কাজ করতেন। যখন নামাজের সময় হতো, নামাজের জন্য বের হয়ে যেতেন।"'
প্রশ্ন হতে পারে, তিনি ঘরের কোন কাজটি করতেন? এ প্রশ্নের উত্তর আরেকটি হাদিসে এসেছে এভাবে, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও আর দশজন মানুষের মতো ঘরে এসে কাপড় কাচতেন। ছাগলের দুধ ধুতেন। নিজের কাজ করতেন।'
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'ঘরে তিনি নিজের কাপড় সেলাই করতেন। জুতো মেরামত করতেন। পুরুষরা ঘরের যে কাজগুলো করে, তিনিও তা-ই করতেন।'
অথচ এ সময়ের মানুষগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা স্ত্রীদের ওপর অসহ্য বোঝা দিয়ে রাখে। স্ত্রী কখনো অসুস্থ থাকে, শারীরিককভাবে দুর্বল থাকে। এ সময়ে বাড়ির কাজে তাদের একটু সাহায্য করলেই চলে। কিন্তু নবাবজাদা তা করবে কেন!
টিকাঃ
১৮৫. সহিহুল বুখারি: ৬৭৬।
১৮৬. আদাবুল মুফরাদ ৫৪১, শামায়িল: ৩৪৩। হাদিসের মান সহিহ।
১৮৭. মুসনাদু আহমাদ: ২৪৩৮২। হাদিসের মান: সহিহ।