📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 স্ত্রীদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিতেন

📄 স্ত্রীদের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিতেন


আবু জার গিফারি (রা) বর্ণনা করেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "অচিরেই তোমরা মিসর জয় করবে। এটি এমন একটি দেশ যেখানে "কিরাত” মুদ্রার প্রচলন আছে। তোমরা সেই ভূমি জয় করলে তার অধিবাসীদের সাথে সদাচরণ করবে। কারণ, তারা দায়বদ্ধতা ও আত্মীয়তার হকদার।" অথবা বলেছেন, "কারণ, তাদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা ও বৈবাহিক সম্পর্ক রয়েছে।"'

ইমাম নববি (রহ) বলেন, 'এখানে দায়বদ্ধতা মানে হলো মর্যাদা ও অধিকার। আত্মীয়তার কারণ হলো, ইসমাইল (আ)-এর মা হাজিরা (রা) মিসরের মেয়ে ছিলেন। আর বৈবাহিক সম্পর্কের সূত্র হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহেবজাদা ইবরাহিমের (রা) মা মারিয়া কিবতিয়া (রা) মিসরের মেয়ে ছিলেন।'

টিকাঃ
১৭০. সহিহু মুসলিম: ২৫৪৩।
১৭১. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৬/৯৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 স্ত্রীর অনুভূতির প্রতি সচেতন ছিলেন

📄 স্ত্রীর অনুভূতির প্রতি সচেতন ছিলেন


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতেন তাঁর স্ত্রী কখন অসন্তুষ্ট আর কখন সন্তুষ্ট থাকতেন। একবার তিনি আয়িশা (রা)-কে বলেন, 'আয়িশা, তুমি কখন আমার ওপর খুশি থাকো, আর কখন রেগে থাকো-আমি কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারি।' আয়িশা (রা) জানতে চান, 'কীভাবে আপনি তা টের পান?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'যখন তুমি আমার ওপর খুশি থাকো, তখন বলো, না, মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রবের কসম। আর যখন তুমি রেগে থাকো, তখন বলো, না, ইবরাহিমের (আ) রবের কসম।' আয়িশা (রা) বললেন, 'হাঁ, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমি কেবল আপনার নামটাই মুখে আনি না। (তবে আপনার প্রতি আমার ভালোবাসায় কমতি আসে না)।'

সুতরাং ওই লোকদের দলভুক্ত হওয়া সমীচীন নয়, যারা স্ত্রীর রাগ-অভিমানের কোনো পরোয়াই করে না।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, জিহাদ পরিচালনা, সৈন্যবাহিনী গঠন, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে দাওয়াতের প্রসার করা, কিসরা-কাইসারের মতো বহু রাজা-বাদশাহর কাছে দাওয়াতি পত্র প্রেরণ করাসহ বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকতেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এত এত গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও স্ত্রীদের অনুভূতি, তাদের মান-অভিমানের প্রতি যত্নবান থাকতেন তিনি। বর্তমান যুগের মুমিন-মুসলিমদের মাঝেই এমন স্বামীর অভাব নেই, যারা স্ত্রীর অনুভূতিকে থোড়াই কেয়ার করে। স্ত্রী রুষ্ট না সন্তুষ্ট; স্ত্রী চিন্তিত না প্রফুল্ল-এগুলোর প্রতি ভ্রুক্ষেপই নেই তাদের! অথচ স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শত ব্যস্ততার মাঝেও স্ত্রীর অনুভূতির প্রতি সচেতন ছিলেন।

স্ত্রীদের অনুভূতির প্রতি সচেতন থাকার অন্যতম দৃষ্টান্ত হলো, সাফিয়্যা (রা)-এর ঘটনা। হাফসা (রা) যখন ইহুদির মেয়ে বলে তার নিন্দা করলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পক্ষ হয়ে উত্তর দিলেন। এমন উৎকৃষ্ট কথা বলে তাকে সন্তুষ্ট করলেন, যা হৃদয়কে আনন্দ ও প্রশান্তিতে ভরে দেয়।

আনাস (রা) বলেন, 'একদিন সাফিয়্যা (রা) জানতে পারলেন, হাফসা (রা) তাকে ইহুদির মেয়ে বলেছেন। এ খবর শুনে তিনি কাঁদতে লাগলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে এসে তাকে কাঁদো কাঁদো অবস্থায় দেখে বললেন:

- কী হয়েছে? তুমি কাঁদছ যে?

- হাফসা (রা) আমাকে বলেছে, আমি নাকি ইহুদির মেয়ে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "তুমি একজন নবির মেয়ে। একজন নবি তোমার চাচা। তুমি একজন নবির স্ত্রী। সে কীভাবে তোমার ওপর গৌরব বোধ করে?"'

টিকাঃ
১৭২. সহিহুল বুখারি: ৫২২৮, সহিহু মুসলিম: ২৪৩৯।
১৭৩. হারুন বিন ইমরান (আ)। তুহফাতুল আহওয়াজি: ১০/২৬৮।
১৭৪. মুসা বিন ইমরান (আ)।- তুহফাতুল আহওয়াজি: ১০/২৬৮।
১৭৫. সুনানুত তিরমিজি: ৩৮২৯। হাদিসের মান: সহিহ।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 অসুস্থ ও বিষণ্ণ স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিতেন

📄 অসুস্থ ও বিষণ্ণ স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিতেন


'হজের সময় আয়িশা (রা)-এর হায়িজ শুরু হলো। এ কারণে তিনি কাঁদছিলেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে দেখলেন, আয়িশা (রা) কেঁদে চলেছেন। জিজ্ঞেস করলেন:

কী হয়েছে? তোমার কি হায়িজ শুরু হয়েছে?

জি।

এতে কাঁদার তো কোনো কারণ নেই। আল্লাহ এটি প্রত্যেক আদম-কন্যার জন্য নির্ধারণ করেছেন। তুমি বাইতুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত হজের বাকি আমলগুলো করতে থাকো।

আয়িশা (রা) বলেন, "হজ আদায়ের পর তিনি আব্দুর রহমানকে (রা) আদেশ দিলেন আমাকে তানয়িম থেকে উমরা করিয়ে আনতে-যেখান থেকে আমি উমরার ইহরাম বেঁধেছিলাম।"'

স্বামীদের উচিত স্ত্রীদের প্রতি খেয়াল রাখা। তাদের অবস্থাদি বোঝার চেষ্টা করা। নারীরা কখনো চিন্তিত থাকে। কখনো হায়িজ, নিফাস, জন্মদানের কারণে অসুস্থতা বোধ করে। এ সময়টাতে স্বামীর কর্তব্য হচ্ছে স্ত্রীর পাশে থাকা। তার কষ্ট লাঘবের চেষ্টা করা।

স্বামী যখন স্ত্রীর কষ্টগুলো উপলব্ধি করে এবং তা দূর করতে সচেষ্ট হয়, স্ত্রী কখনো এই অনুপম আচরণ ভুলতে পারে না। সে সারা জীবনের জন্য নিজেকে স্বামীর কাছে ঋণী মনে করে।

টিকাঃ
১৭৬. সহিহুল বুখারি: ৩১৬, সহিহু মুসলিম: ১২১১।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 স্ত্রী অসুস্থ হলে তিনি রুকইয়া করতেন

📄 স্ত্রী অসুস্থ হলে তিনি রুকইয়া করতেন


আয়িশা (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুরা ফালাক ও নাস পড়ে জনৈক অসুস্থ স্ত্রীর গায়ে ডান হাত বুলিয়ে দোয়া করলেন-

اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ البَاسَ، اشْفِهِ وَأَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءٌ لَا يُغَادِرُ سَقَمًا

"হে আল্লাহ, মানুষের প্রভু, কষ্ট দূর করুন, সুস্থ করে দিন। আপনিই আরোগ্যদানকারী। আপনি ছাড়া কেউই রোগমুক্ত করতে পারে না। এমনভাবে আরোগ্য দান করুন, যার পরে কোনো রোগ অবশিষ্ট থাকে না।"'

স্বামী যখন স্ত্রীর গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়, স্ত্রীর ব্যথার জায়গাতে স্বামীর স্নেহের পরশ লাগে-তখন স্পর্শের এক বিরাট প্রভাব পড়ে। যদিও এতে শরীরের রোগ সেরে না যায়। তবুও অন্তরের বিরাট একটি বোঝা যেন নেমে যায় রুণ স্ত্রীর। স্বামীর স্নেহের পরশ পেয়ে প্রশান্ত হয় তার মন। কেননা, সে বুঝতে পারে তার প্রিয়তম স্বামী তার কষ্টটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছেন।

উম্মে জার' (রা)-এর হাদিসে এসেছে, 'এগারো জনের একজন নারী তার স্বামীর দোষ বর্ণনা করে এভাবে-সে দুঃখ বোঝার জন্য হাতটাও প্রসারিত করে না।'

'অর্থাৎ স্ত্রী কোনো চিন্তায় আছে কি না, তা বোঝার ও দূর করার চেষ্টা করে না। হাদিসে ব্যবহৃত শব্দটির অর্থ পেরেশানি। অভিযোগ ও অসুস্থতা বোঝানোর জন্যও এটি ব্যবহৃত হয়। "দুঃখ বোঝার জন্য হাতটিও প্রসারিত করে না”-এই বাক্য বলে মহিলা বোঝাতে চাইছে, স্ত্রীর কাছে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সেসব বিষয় নিয়ে তার স্বামী মাথা ঘামায় না। এটিকে সে ভালোবাসার শৈথিল্য বলে অভিহিত করেছে।'

দুঃখ-কষ্টে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের হাত ধরবে, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক স্বামী আছে, স্ত্রীর অসুস্থতাকে মোটেও পাত্তা দেয় না। তারা চায় স্ত্রী সব সময় সুস্থ ও সবল থাকুক। একটু অসুস্থ হলেই স্ত্রীকে বাপের বাড়ি রেখে আসে। যতদিন সুস্থ না হয় বাসায় আনে না। তার কাছে অসুস্থ স্ত্রী হচ্ছে বোঝা-একটা উটকো ঝামেলা।

আবু হুরাইরা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "হে আল্লাহ, এতিম ও নারী-এই দুই দুর্বলের অধিকার হরণ করা আমি হারাম ঘোষণা করছি।"'

টিকাঃ
১৭৭. সহিহুল বুখারি: ৫৭৪৩, সহিহু মুসলিম: ২১৯১।
১৭৮. সহিহুল বুখারি ৫১৮৯, সহিহু মুসলিম: ২৪৪৮।
১৭৯. ফাতহুল বারি: ৯/২৬৩।
১৮১. সুনানু ইবনি মাজাহ ৩৬৭৮। হাদিসের মান সহিহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00