📄 স্ত্রীদের সঙ্গে প্রতিদিন অন্তরঙ্গ সময় কাটাতে পছন্দ করতেন
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'ফজরের সালাত আদায়ের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজের স্থানেই বসতেন। তাঁকে ঘিরে বসত সাহাবিদের (রা) জটলা। সূর্য ওঠা অবধি ওখানেই বসে থাকতেন তাঁরা। তারপর একে একে সব কজন স্ত্রীর কাছে যেতেন। তাদের সালাম করতেন। তাদের জন্য দোয়া করতেন। তারপর সেদিন যার পালা হতো তার কাছে চলে যেতেন।'
প্রতিদিন দিবসের প্রথম প্রহরে স্ত্রীদের একজনের সঙ্গে সময় কাটাতেন তিনি। তাকে সালাম করতেন। তার জন্য দোয়া করতেন।
দিনের শেষ প্রহরেও তার কাছে যেতেন। অন্তরঙ্গ হয়ে বসে গল্প করতেন।
আয়িশা (রা) বলেন, 'আসরের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের কাছে আসতেন। সবার সাথে দেখা করে একজনের সাথে একান্তে কাটাতেন।'
একান্তে সময় কাটানো অর্থ হলো, তার সাথে সহবাস করতেন না; তবে আদর করতেন, চুমু খেতেন।
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'সকালবেলা এসে কেবল সালাম দিয়ে ও দোয়া করে যেতেন। আর বিকেলে এসে বসতেন, আদর করতেন এবং গল্প করতেন।'
আয়িশা (রা) বলেন, 'এমন দিন খুব কমই যেত, যেদিন তিনি আমাদের সবার কাছে আসতেন না। সকল স্ত্রীর সঙ্গেই তিনি অন্তরঙ্গ হতেন। তবে সহবাস করতেন না। পরিশেষে সেই দিনটি যে স্ত্রীর সাথে কাটাবার পালা থাকত, সে স্ত্রীর কাছে গিয়ে রাত যাপন করতেন।'
'স্ত্রীদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ সময় কাটানো ছিল তাদের অন্তর প্রশান্তকারী। এ সময়টাতে আদর-সোহাগে তাদের মন ভরে দিতেন। শেষমেশ যার কাছে দিনটা কাটিয়ে দেবেন, তার কাছে গেলেও বাকিদের অন্তর থাকত প্রশান্তিময়।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণ কখনো স্বামী থেকে দূরে থাকতেন না। বরং প্রতিদিন স্বামীর দেখা পেতেন। আর আমাদের অনেকেই তো দিনের পর দিন স্ত্রীর সাথে দেখা করে না। এমনকি অনেক সময় মাস গড়িয়ে যায়।
অনেককে দেখা যায় প্রতিদিন বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা দেয়। গভীর রাত পর্যন্ত গল্পগুজবে মত্ত থাকে। অবশেষে যখন বাড়ি ফেরে, তখন সে ক্লান্ত-শ্রান্ত। ততক্ষণে স্ত্রীও ঘুমিয়ে পড়ে। যথারীতি সে নিজেকেও বিছানায় ছুড়ে দেয় আর তলিয়ে যায় গভীর ঘুমে।
এই হাদিস থেকে প্রমাণিত হলো, একাধিক স্ত্রী থাকলে পালা না থাকলেও যেকোনো স্ত্রীর কাছে যেতে পারবে, তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে পারবে, তাকে স্পর্শ করতে পারবে এবং চুমু খেতে পারবে।
উক্ত হাদিস থেকে আরও বোঝা গেল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। স্ত্রীদের সঙ্গে সুন্দর আচরণেও তিনি ছিলেন সর্বোত্তম।
রাতের বেলায় কখনো কখনো স্ত্রীগণ এক ঘরে সমবেত হতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে এসে একত্রে সময় কাটাতেন। কথা বলতেন।
আনাস বিন মালিক (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নয় জন স্ত্রী ছিল। সবার পালা ভাগ করা ছিল। নয় দিন শেষ হওয়ার পূর্বে প্রথম স্ত্রীর পালা আসত না। যেদিন যে স্ত্রীর পালা থাকত, সেদিন রাতে অন্য সকল স্ত্রী তার ঘরে এসে সমবেত হতেন।'
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মুসতাহাব হলো, স্বামী নিজে স্ত্রীদের ঘরে যাবে, নিজের ঘরে তাদের ডেকে পাঠাবে না।
হাজারো ব্যস্ততা ও দায়িত্বের বিশাল বোঝা থাকা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের সঙ্গে বিনিদ্র রজনী যাপন করেছেন। তাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়েছেন। তাদের সাথে খোশগল্প করেছেন।
আয়িশা (রা) একবার উম্মে জার' (রা)-এর গল্পটি পাড়লেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে। গল্পটি হলো, 'এগারো জন মহিলা একজায়গায় আসর জমাল। তারা সবাই মিলে ঠিক করল, তারা আপন আপন স্বামীর সব বৈশিষ্ট্যের কথা খুলে বলবে-কিছুই গোপন করবে না। যথারীতি তারা নিজ নিজ স্বামীর গুণাগুণ বলা শুরু করল। এগারো জনের মধ্যে স্বামীর সবচেয়ে সুন্দর গুণ বর্ণনা করেছিল এবং বেশি সংখ্যক অবদানের কথা বলেছিন উম্মু জার' (রা)।
আয়িশা (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথা শুনে উত্তর দিলেন, "আমি তোমার জন্য তেমন, যেমন উম্মু জার'র (রা) জন্য তার স্বামী আবু জার' (রা)।"
স্বামীকে অবশ্যই একটা সময় নির্দিষ্ট করতে হবে স্ত্রীকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য, তার কথা শোনার জন্য। বর্তমানে অধিকাংশ স্ত্রীই অভিযোগ করেন, স্বামীরা তাদের সময় দেয় না।
অনেক স্বামী তো এমন আছে, সারা দিন অফিসে কাজ করে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরে। একটু ফ্রেশ হয়েই রিমোর্ট নিয়ে বসে টিভি দেখতে। এই অবস্থায় কেটে যায় অর্ধ রাত। এদিকে বিছানায় স্ত্রী অপেক্ষার প্রহর গুনে। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে সে নিজেকে বিছানায় ছুড়ে দেয়। তারপর লাশের মতো বেঘোরে ঘুমায়। কখনো তো এমন হয় যে, রিমোর্ট হাতেই সে ঢলে পড়ে ঘুমের কোলে। বেচারি স্ত্রীর আবেগ-অনুভূতির কোনো পরোয়াই সে করে না।
এমনও কিছু মানুষ আছে, যারা অফিসের ফাইল বাড়িতে নিয়ে আসে। বাড়িতে এসেও ফাইল ঘাঁটতে থাকে। এভাবে তারা বাড়িটাকে অফিস বানিয়ে ফেলে। দিনের বেলা অফিসে এক শিফ্ট। আর রাতের বেলা বাড়ি নামক অফিসে আরেক শিফ্ট। ওদিকে তার জন্য স্ত্রী অপেক্ষা করছে অধীর হয়ে, তার কোনো ভাবান্তর নেই!
আজকাল সবার কাছেই মোবাইল আছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ এখন। চাইলেই একজন স্বামী কাজের ফাঁকেই স্ত্রীর কাছে একটা কল দিয়ে একটু সময়ের জন্য হলেও কথা বলে নিতে পারে। কথা না হোক, অন্তত একটা মেসেজ করলেও তো অনেক। স্বামীর একটা কল বা মেসেজ স্ত্রীর পুরো দিনকে সুশোভিত করে তোলে। একটা কল বা মেসেজ করতে আর কতক্ষণ লাগে! এক মিনিটের ভেতরেই তো সেরে ফেলা যায়। এই একটি মিনিটের যোগাযোগ স্ত্রীর জন্য অনেক কিছু-অনেক কিছু।
টিকাঃ
৯৯. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল আওসাত: ৮৭৬৪।
১০০. সহিহুল বুখারি: ৫২১৬, সহিহু মুসলিম: ১৪৭৪।
১০১. উমদাতুল কারি: ৩০/৯২।
১০২. ফাতহুল বারি: ৯/৩৭৯।
১০৩. সুনানু আবি দাউদ: ২১৩৫। হাদিসের মান: সহিহ।
১০৪. কুরতুবি (রহ) কৃত আল-মুফহিম: ১৩/৯০।
১০৫. আওনুল মাবুদ: ৬/১২২।
১০৬. সহিহু মুসলিম: ১৪৬২।
১০৭. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১০/৪৭।
১০৮. সহিহুল বুখারি ৫১৮৯, সহিহু মুসলিম: ২৪৪৮।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ স্ত্রীদের প্রাপ্য জৈবিক চাহিদা পূরণের হক আদায় করতেন
আনাস (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই রাতে তাঁর সকল স্ত্রীর কাছে যেতেন এবং সবার সঙ্গে মিলিত হতেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নয় স্ত্রী ছিল।' কাতাদা (রহ) আনাস (রা)-কে জিজ্ঞেস করেন, 'একই রাতে নয় স্ত্রীর সঙ্গে মিলনের সক্ষমতা তিনি রাখতেন?' আনাস (রা) উত্তর দিলেন, 'আমরা আলোচনা করতাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরীরে ত্রিশজন যুবকের শক্তি ছিল।'
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের মাঝে সবচেয়ে বেশি তাকওয়ার অধিকারী ছিলেন। আল্লাহ সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন তিনি। তাঁর অধিক বিয়ের কারণ ছিল, নারীসংক্রান্ত বিধানগুলো প্রচারে সহায়ক হওয়া। কারণ, নারীর অনেক সমস্যা পুরুষের আড়ালে থেকে যায়। নারীরা নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিধিবিধান যত সহজে পৌঁছে দিতে পারবে, পুরুষদের জন্য তা সম্ভব ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একাধিক বিবাহের এটি অন্যতম কারণ।
এ ছাড়া বহুবিবাহের মাধ্যমে তাঁর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মুজিজার প্রকাশ ঘটে। তৃপ্তিভরে খাওয়ার মতো খাবার তাঁর জুটত না। অতিরিক্ত খাবার পেলে বেশির ভাগই তিনি দান করে দিতেন। তিনি বেশি বেশি সাওম পালন করতেন। এমনকি কখনো সাওমে বিসাল বা টানা রোজা রাখতেন। এত কিছু সত্ত্বেও তিনি একই রাতে নয় স্ত্রীর সঙ্গেই মিলিত হতে পারতেন। শারীরিক শক্তির প্রাচুর্য ছাড়া এটি সম্ভব নয়। বহু বিবাহ আরবে বেশ প্রশংসনীয় ছিল। বেশি স্ত্রী পৌরুষের পরিচয় বলে মনে করা হতো। এত স্ত্রী থাকার পরও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইবাদতে কোনো প্রভাব পড়ত না।'
স্ত্রীর সঙ্গে অন্তরঙ্গতা, কথাবার্তা কিংবা নৈশগল্পের পথে ইবাদত বাধা হয়ে দাঁড়াত না। আয়িশা (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে যখন নামাজ পড়তেন, আমি জেগে থাকলে তিনি আমার সাথে কথা বলতেন। আর যদি আমি না জেগে থাকি, তাহলে কিয়ামুল লাইল শেষ করে ফজরের আজান পর্যন্ত শুয়ে থাকতেন।'
এমনকি সফরে গেলেও স্ত্রীকে নিয়ে তিনি হাঁটাচলা করতেন, তার সাথে কথা বলতেন। আয়িশা (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরে বের হওয়ার সময় স্ত্রীদের মাঝে লটারি করতেন।' একবার আয়িশা (রা) ও হাফসার (রা) পালা এল সফরে যাওয়ার জন্য। রাতের বেলা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশার (রা) সাথে ঘুরে বেড়াতেন। তার সাথে কথা বলতেন।
স্ত্রীদের সঙ্গে মধুর অন্তরঙ্গতাপূর্ণ এ আচরণে কখনো ছেদ পড়েনি-এমনকি যেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুন কোনো স্ত্রীকে ঘরে তুলে আনতেন, সেদিনও নয়। আনাস (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে জাইনাব বিনতে জাহাশের (রা) বিয়ে হলো। অলিমা হিসেবে রুটি ও গোশত তৈরি করা হলো। আমাকে পাঠানো হলো খাবারের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। আমি মানুষদের দাওয়াত করে আনলাম। একদল আসত, তারা খেয়ে বের হয়ে গেলে অপর দল আসত খাওয়ার জন্য। এভাবে সবাই খেয়ে বের হয়ে গেল। আমি আর ডাকার মতো কাউকে পেলাম না। তখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, "আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ডাকার মতো আর কেউই বাকি নেই।" তিনি বললেন, "তাহলে তোমাদের বাকি খাবারটা নিয়ে যাও।"... এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুন স্ত্রীর ঘর থেকে বের হয়ে আয়িশার (রা) ঘরে এলেন। তার উদ্দেশে বললেন : السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ البَيْتِ وَرَحْمَةُ اللهِ "ঘরের অধিবাসীর ওপর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক।"
আয়িশা (রা) জবাব দিলেন, "وَعَلَيْكَ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ - (আপনার প্রতিও আল্লাহ-প্রদত্ত শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক।) আপনার নতুন স্ত্রীকে কেমন পেলেন? আল্লাহ আপনার জন্য বরকত দান করুন।"
এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একে একে তাঁর সকল স্ত্রীর ঘরে যান। আয়িশাকে (রা) যেমন বলেছিলেন, অন্য সবাইকেও সালাম দিয়ে তা-ই বলেন। আর তারাও আয়িশার (রা) মতো উত্তর দেন।'
'স্ত্রীদের অবস্থা জানার জন্য, তাদের অন্তরকে শীতল করার জন্য, তাঁর নতুন বিয়ে নিয়ে তাদের অন্তরের কেমন অবস্থা বিরাজ করছে, তা জানার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সকলের কাছে গেলেন একে একে। তারাও "আপনার নতুন স্ত্রীকে কেমন পেলেন?" বলে সুন্দর করে জবাব দিলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নতুন বিয়ে সত্ত্বেও স্ত্রীদের থেকে এমন সুন্দর আচরণ প্রকাশ পাওয়া তাদের জ্ঞান-বুদ্ধির প্রগাঢ়তা, তাদের সবর, উত্তম আচার-আচরণের প্রমাণ পাওয়া যায়। অন্যথা স্বামীর নতুন বিয়ে তো পূর্বের স্ত্রীর অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেকে সতিনের প্রতি তুচ্ছ মনোভাব প্রকাশ করে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর স্ত্রীগণ হলেন উত্তম পুরুষের জন্য উত্তম স্ত্রীর অনুপম উদাহরণ।'
হাদিসটি অন্য এক বর্ণনায় এভাবে এসেছে, আনাস (রা) বলেন, 'এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক এক করে সকল স্ত্রীর কাছে এলেন। তাদের সালাম জানিয়ে বললেন, "সালামুন আলাইকুম। কেমন আছেন?” তারা উত্তর দিলেন, "ভালো, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আপনার স্ত্রীকে কেমন পেলেন?" অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, "ভালো..."'
ইমাম নববি (রহ) বলেন, 'এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, যখন কেউ বাড়িতে ফিরে আসে, তখন স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের সালাম দেওয়া মুসতাহাব। কিন্তু অনেক মূর্খ দাম্ভিক অহংকারবশত এ বিধান পালন করে না।
সালাম দেওয়ার সাথে স্ত্রীর কুশলাদি জানতে চাইবে। তার কোনো কিছুর প্রয়োজন আছে কি না জিজ্ঞেস করবে। কারণ, কখনো কখনো স্ত্রীর কোনো প্রয়োজন থাকলেও মুখ ফুটে বলতে লজ্জা পায়। তাই তাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। যাতে স্ত্রী অনায়াসে তার প্রয়োজনের কথা বলতে পারে।'
টিকাঃ
১০৯. সহিহুল বুখারি: ২৬৮, সহিহু মুসলিম: ৩০৯। শব্দউৎস সহিহুল বুখারি।
১১০. ফাতহুল বারি: ৯/১১৫।
১১১. সহিহুল বুখারি: ১১৬১।
১১২. সহিহুল বুখারি: ৫২১১, সহিহু মুসলিম: ২৪৪৫।
১১৩. সহিহুল বুখারি: ৪৭৯২, সহিহু মুসলিম ১৪২৮।
১১৪. কুরতুবি (রহ) কৃত আল-মুফহিম: ১৩/১৫।
১১৫. সহিহু মুসলিম: ১৪২৮।
১১৬. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিরি মসলিম ৯/১১৫।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ স্ত্রীদের প্রতি বিশ্বস্ত, অধিকার-সচেতন এবং কৃতজ্ঞ ছিলেন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদিজা (রা)-এর জীবদ্দশায় তাঁর প্রশংসা করতেন। এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরও তিনি বরাবরই তাঁকে স্মরণ করতেন। তাঁর গুণের কথা বলতেন। তাঁর মর্যাদার কথা তুলে ধরতেন। তাঁর হৃদয়ে খাদিজার (রা) যে ভালোবাসা ছিল, তা অকপটে প্রকাশ করতেন।
আয়িশা (রা) বলেন, 'আমি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের মধ্যে আর কারও প্রতি এতটা ঈর্ষাবোধ করিনি, যতটা করেছি খাদিজা (রা)-এর বেলায়। অথচ তাঁকে আমি দেখিনি পর্যন্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব বেশি তাঁর কথা স্মরণ করতেন। মাঝে মাঝে ছাগল জবাই করে গোশতের কয়েকটি ভাগ করতেন। তারপর সেগুলো খাদিজার (রা) বান্ধবীদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। কখনো আমি (ঈর্ষাবশত) বলতাম, "খাদিজা (রা) ছাড়া তো দুনিয়ায় আর কোনো নারীই নেই!" তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, "খাদিজা (রা) এমন ছিল। এমন গুণবতী ছিল.... তাঁর গর্ভেই আমার সন্তান হয়েছে।"'
বস্তুত, মৃত্যুর পর দাম্পত্য বন্ধন শেষ হয়ে যাওয়ার পরও তিনি প্রিয়তমা খাদিজাকে (রা) স্মরণ করতে ভুলেননি। তাঁর প্রশংসা করতে ভুলেননি। তিনি বলতেন, আমার খাদিজা (রা) এমন গুণবতী ছিল। এমন জ্ঞানী ছিল। এভাবে প্রশংসা করতেই থাকতেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সকল সন্তানের জন্ম খাদিজা (রা)-এর গর্ভেই। কেবল ইবরাহিমের (রা) জন্ম হয়েছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাসী মারিয়ার (রা) গর্ভে।
সর্বসম্মত মতানুযায়ী খাদিজা (রা)-এর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তানগণ হচ্ছেন, পুত্র কাসিম (রা)। চার কন্যা-জাইনাব (রা), রুকাইয়া (রা), উম্মে কুলসুম (রা) ও ফাতিমা (রা)। নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর জন্ম লাভ করেন আব্দুল্লাহ (রা) নামের আরও এক সন্তান। তাকে তাহির ও তাইয়িব নামে ডাকা হতো।'
খাদিজা (রা)-এর কথা এলেই তিনি তাঁর প্রশংসা করতেন। তাঁর জন্য ইসতিগফার করতেন। আয়িশা (রা) বলেন, 'খাদিজা (রা)-এর আলোচনা আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রশংসা করতে থাকতেন এবং তাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। তাঁর প্রশংসা করতে করতে কখনো তিনি বিতৃষ্ণ হননি।'
অথচ বর্তমান সময়ের মানুষের দিকে তাকান। তাদের অবস্থা আজ আশ্চর্য সীমারও বাইরে চলে গেছে। কারও স্ত্রী মারা গেলে সে বিয়ে করে নতুন স্ত্রীর সামনে আগের স্ত্রীর নিন্দার পর নিন্দা করতে থাকে। এতটুকু প্রশংসাও করে না। অথবা স্ত্রীর সাথে তালাক হলে নিন্দা করতে কোনো জায়গা বাদ রাখে না। বলে, 'আমি বেশ ধৈর্য ধরে ছিলাম। কিন্তু আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল তার কুআচরণের কারণে। তাই তালাক দিতে বাধ্য হয়েছি আমি।'
আবার এমন লোকও আছে, যারা কখনো স্ত্রীর প্রশংসা করতে জানে না। অথচ তার স্ত্রী অনেক প্রশংসার উপযুক্ত। স্বামীর ওপর তার অনেক অবদান আছে।
খাদিজা (রা)-এর কথা মনে পড়ে এমন কোনো বস্তু দেখলে কিংবা এমন কোনো আওয়াজ শুনলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন। তাঁর চেহারায় ফুটে উঠত উজ্জ্বল হাসির নির্মল দীপ্তি।
আয়িশা (রা) বলেন, 'একবার খাদিজার (রা) বোন হালাহ (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন খাদিজাই (রা) অনুমতি চাইছেন। দুবোনের কণ্ঠস্বর একই রকমের হওয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মনে খাদিজার (রা) কথা উদিত হলো। তিনি বলে উঠলেন, "ইয়া আল্লাহ, এ যেন হালাহ (রা) হয়!"' আয়িশা (রা) বলেন, 'তখন আমার ঈর্ষা জেগে উঠল। আমি বললাম, "কুরাইশের দাঁত পড়া এক বৃদ্ধ মহিলা, সময়ের আবর্তে যে হারিয়ে গেছে (তার স্মরণেই আপনি পড়ে আছেন!) আল্লাহ তো আপনাকে তার চেয়ে উত্তম বদলা দিয়েছেন।" এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারার রং পরিবর্তিত হয়ে গেল। তা এমন চেহারা, যা আমি কেবল দেখেছি, যখন তাঁর ওপর ওহি নাজিল হতো কিংবা আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যেত। তিনি বললেন, "আল্লাহ তাআলা খাদিজার (রা) চাইতে উত্তম কাউকে দেননি আমায়। যখন মানুষ আমার সাথে কুফরি করেছে, তখন খাদিজাই (রা) আমার প্রতি ইমান এনেছিল। যখন মানুষ আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে, তখন খাদিজাই (রা) আমাকে সত্যায়ন করেছে। মানুষ যখন আমাকে বঞ্চিত করেছে, খাদিজাই (রা) আমাকে তাঁর সম্পদ দিয়ে সাহায্য করেছে। অন্য সব স্ত্রীর মাধ্যমে যেখানে সন্তান পাওয়া থেকে আমি বঞ্চিত; আল্লাহ খাদিজার (রা) মাধ্যমে আমাকে সন্তান দান করেছেন।" এরপর আয়িশা (রা) বললেন, "সে সত্তার শপথ-যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি আর কখনো তাঁর সম্পর্কে মন্দ কিছু বলব না, সব সময় তাঁর প্রশংসাই করব।"'
'এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, কেউ কাউকে ভালোবাসলে ভালোবাসার মানুষের প্রিয় জিনিসগুলোও সে ভালোবাসে। ভালোবাসে প্রিয়তমের সাথে সাদৃশ্য রাখে-এমন সবকিছুকে। ভালোবাসে তার কথা মনে করিয়ে দেয়-এমন সব বস্তুকে।'
'আয়িশা (রা) এমন এক নারীর প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হয়েছেন, যিনি কিনা তাদের বিয়ের আগেই এ ধরা থেকে বিদায় নিয়ে পরপারে চলে গেছেন। বিষয়টা বেশ আশ্চর্যকর।'
দুনিয়াতে খাদিজা (রা)-কে দেওয়া পুরস্কারটি ছিল, তাঁর জীবদ্দশায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয় কাউকে বিয়ে করেননি। আয়িশা (রা) বলেন, 'খাদিজার (রা) মৃত্যু পর্যন্ত নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য কোনো নারীকে বিয়ে করেননি।'
ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কোনো মতভেদ নেই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদিজা (রা)-এর জীবদ্দশায় অন্য কোনো নারীকে বিয়ে করেননি।'
এটি প্রমাণ করে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্তরে খাদিজা (রা) ছিলেন উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। তাঁর মনে খাদিজা (রা)-এর জন্য সম্মান ও ভালোবাসা ছিল অন্য সকল স্ত্রীর চাইতে বেশি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হৃদয়জুড়ে ছিল তার একচ্ছত্র রাজত্ব। অন্য স্ত্রীদের সাথে জীবনের যতটা সময় কাটিয়েছেন তিনি, তার চাইতে দ্বিগুণ সময় কাটিয়েছেন কেবল খাদিজা (রা)-এর সাথে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাম্পত্য জীবন মোট ৩৮ বছর। যার মধ্যে ২৫ বছর কাটিয়েছেন খাদিজা (রা)-এর সাথে। সে হিসেবে দাম্পত্য জীবনের দুই-তৃতীয়াংশ তিনি কাটিয়ে দিয়েছিলেন শুধু খাদিজা (রা)-এর সাথে।
দীর্ঘ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দাম্পত্য বন্ধনে থাকা সত্ত্বেও তাকে কারও প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হতে হয়নি, সতিনের কারণে তাকে একটুও ভাবিত হতে হয়নি। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যে তিনি অন্য সকল স্ত্রীর চেয়ে স্বতন্ত্র।'
খadিজা (রা)-এর প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভালোবাসার আরেকটি বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে, তার মৃত্যুর পরও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্ধবী ও প্রিয়জনদের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। আয়িশা (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক হারে তাকে স্মরণ করতেন। কখনো তিনি ছাগল জবাই করে গোশতের কয়েকটি ভাগ করতেন। তারপর সেগুলো খাদিজার (রা) বান্ধবীদের কাছে পাঠাতেন।'
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাগল জবাই করলে তার গোশত খাদিজার (রা) প্রিয়জনদের কাছে তাদের প্রয়োজনমতো পাঠিয়ে দিতেন।'
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাগল জবাই করলে খাদিজার (রা) বান্ধবীদের খোঁজ করতেন। এরপর তাদের জন্য গোশত হাদিয়া পাঠাতেন।'
'এ হাদিসগুলো প্রমাণ করে স্ত্রীদের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আচরণ ছিল মায়া ও আদরে ভরা, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। স্ত্রীর জীবদ্দশায় তার প্রতি যেমন ভালোবাসা রাখতেন, তেমনই তার মৃত্যুর পরও ভালোবাসার দাবি আদায় করে যেতেন স্ত্রীর বান্ধবী ও প্রিয়জনদের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে।'
আনাস (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কোনো হাদিয়া আসলে তিনি বলতেন, "এটি নিয়ে অমুক নারীর কাছে যাও-সে খাদিজার (রা) বান্ধবী ছিল। এটি নিয়ে অমুক নারীর বাড়িতে যাও-সে খাদিজাকে (রা) ভালোবাসত।"'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদিজা (রা)-এর বান্ধবী ও প্রিয়জনদের বিশেষ সমাদর করতেন। আয়িশা (রা) বলেন, 'একদা এক বৃদ্ধা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলো। তিনি তখন আমার ঘরে ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, "কে তুমি?" মহিলা বলল, "আমি জাসসামা আল-মুজানিয়্যাহ।"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "বরং তুমি হাসসানা আল-মুজানিয়্যাহ। তোমাদের কী খবর? কেমন আছ তোমরা? আমরা চলে আসার পর তোমরা কেমন কাটালে দিনগুলো?"
মহিলাটি বলল, "ভালো। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনার প্রতি আমার বাবা-মা উৎসর্গ হন।"
মহিলাটি চলে গেলে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি এ বৃদ্ধ মহিলার প্রতি এত সুন্দর আচরণ করলেন কেন?"
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "আয়িশা, খাদিজা (রা) যখন বেঁচে ছিল, তখন এ নারী আমাদের কাছে আসত। আর পুরোনো বন্ধুদের প্রতি সদাচরণ করা ইমানের অংশ।"'
হাদিস থেকে শিক্ষা
মহিলা বৃদ্ধ হলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাসসামা নামটি পাল্টে সুন্দর একটি নাম রাখলেন তার। নির্বোধ, অলস ও অকর্মণ্যকে জাসসামা বলা হয়। অন্যদিকে হাসসানা শব্দটি সৌন্দর্যের অর্থ দেয়। হাসনা শব্দের চেয়েও হাসসানা শব্দটিতে ভাবের আধিক্য রয়েছে। হাসসানা একটি সুন্দর নাম। কিন্তু বর্তমান সময়ে এ নামটির প্রচলন কমে গেছে।
সুন্দর ব্যবহার, বিশ্বস্ততা ও কৃতজ্ঞতা মুমিন-চরিত্রের অপরিহার্য অঙ্গ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই অনুপম আচরণ মূলত খাদিজার (রা) প্রতি তাঁর উৎকৃষ্ট প্রতিদান, সদ্ব্যবহার, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ-যিনি দুর্দিনে তাঁর হাত ধরেছিলেন, তাঁর কষ্ট লাঘব করেছিলেন এবং তাঁর সুখ-দুঃখের একান্ত ভাগীদার হয়েছিলেন।
বর্তমান যুগে স্বামীদের দেখা যায়, তারা শেষ বয়সে স্ত্রীদের অবহেলা করে। যে স্ত্রী জীবনের ঝলমলে সময়গুলো তার জন্য ব্যয় করেছিল, তার হাতে হাত রেখেছিল, তার সংসার বিনির্মাণে সহায়তা করেছিল- তাকে কীভাবে অবজ্ঞা করা যায়! এটি কখনো ওয়াফাদারি হতে পারে না।
স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো অস্বস্তিতে ভুগতেন না। তিনি স্পষ্ট ভাষায় তাঁর আবেগ প্রকাশ করতেন। খাদিজা (রা) সম্পর্কে তিনি বলতেন, 'আমার অন্তরে তার ভালোবাসা ঢেলে দেওয়া হয়েছে।'
এখান থেকে বোঝা যায়, খাদিজার (রা) ভালোবাসা একটি মর্যাদা, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অর্জিত হয়েছে।
আয়িশা সিদ্দিকা (রা)-এর প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভালোবাসার কথা এতটাই প্রসিদ্ধ যে, তা আর খুলে বলার অপেক্ষা রাখে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়িশা (রা)-কে যতটা ভালোবেসেছেন অন্য কাউকে বাসেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একমাত্র কুমারী স্ত্রী আয়িশা (রা)। তাকে ছাড়া অন্য কোনো কুমারী নারীকে তিনি বিয়ে করেননি।
আয়িশা (রা)-এর প্রতি তাঁর এই অনুরাগের কথা তিনি গোপন করতেন না। বরং সবার সামনে বলতেন, তিনি আয়িশা (রা)-কে ভালোবাসেন। একবার আমর বিন আস (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করলেন, 'আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, 'আয়িশা (রা)।' আমর (রা) এরপর জানতে চাইলেন, 'পুরুষদের মধ্য থেকে?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, 'আয়িশার (রা) বাবা (আবু বকর রা)।'
বলা বাহুল্য, বর্তমানে স্বামীদের মধ্যে এ বৈশিষ্ট্যটি একেবারে নেই বললেই চলে। আপনার আশপাশে চোখ ফেরালেই অসংখ্য নজির পাবেন। জীবনের দীর্ঘ একটা সময় যে স্ত্রীর সাথে কাটিয়ে এসেছে, তাকে কখনো বলা হয়নি-'আমি তোমাকে ভালোবাসি।' এভাবে স্পষ্ট ভাষায় স্ত্রীর ভালোবাসা প্রকাশ করাকে তারা ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী মনে করে। অনেকেই আবার বলতে পারে না লজ্জায়।
অনেকে তো জানেই না, স্ত্রীকে ভালোবাসার কথা প্রকাশ করলে উভয়ের দাম্পত্য বন্ধন মজবুত হয়। জীবনটা আগের চেয়ে সুখকর হয়। উভয়ের মাঝে বিশ্বস্ততা বেড়ে যায় বহুগুণে। স্ত্রীরা চায়, স্বামীর ভালোবাসা সে উপলব্ধি করতে পারুক। স্বামী মুখ ফুটে ভালোবাসার কথা বলুক। কিন্তু স্বামী তো গোবেচারা। এতটুকু জ্ঞান তার থাকলে তো!
স্বামীর কাছে ভালোবাসার কথাটা শুনতে পায় না। কিন্তু একই নারী যখন পরপুরুষের কাছে মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনে, স্বাভাবিকভাবেই সে গলে যায়। বিভ্রান্ত হয়ে লিপ্ত হয় পরকীয়ায়।
টিকাঃ
১১৭. সহিহুল বুখারি: ৩৮১৮, সহিহু মুসলিম: ২৪৩৫।
১১৮. ফাতহুল বারি: ৭/১৩৭।
১১৯. তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ১৬/৩১৯। হাদিসের মান তাসান।
১২০. মুসনাদু আহমাদ: ২৪৩৪৩, তাবারানি কৃত আল-মুজামুল কাবির: ২৩/১৪। হাদিসটির সনদ সহিহ।
১২১. ফাতহুল বারি: ৭/১৪০।
১২২. সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/১১২।
১২৩. সহিহ মুসলিম: ২৪৩৬।
১২৪. ফাতহুল বারি: ৭/১৩৭।
১২৫. সহিহুল বুখারি: ৩৫৩৪, সহিহু মুসলিম: ২৪৩৫।
১২৬. সহিহুল বুখারি: ৩৮১৬।
১২৭. সুনানুত তিরমিজি: ১৯৪০।
১২৮. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু মুসলিম আলা সহিহ মুসলিম: ১৫/২০২।
১২৯. বুখারি কৃত আদাবুল মুফরাদ: ২৩২। হাদিসের মান: হাসান।
১৩০. মুসতাদরাকুল হাকিম ১/১৭। হাদিসের মান: সহিহ।
১৩১. শাইখ আলবানি (রহ) এ হাদিসের অনুসরণ করে তার এক মেয়ের নাম 'হাসসানাহ' রেখেছিলেন। দেখুন, সিলসিলাতুস সহিহাহ: ১/২১৫।
১৩২. সহিহু মুসলিম: ২৪৩৫। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত।
১৩৩. ইমাম নববি (রহ) কৃত শারহু সহিহি মুসলিম: ১৫/২০১।
১৩৪. সহিহুল বুখারি: ৩৬৬২, সহিহু মুসলিম: ২৩৮৪।
📄 ঘর থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রীদের চুমু খেতেন
উরওয়া (রহ) থেকে বর্ণিত, 'আয়িশা (রা) বলেন, "রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জনৈক স্ত্রীকে চুমু খেয়ে অজু না করেই বের হলেন নামাজের উদ্দেশ্যে।" উরওয়া (রহ) বলেন, "সে স্ত্রী আপনি ছাড়া আর কে!" আয়িশা (রা) আমার কথা শুনে হেসে দিলেন।'
রোজা অবস্থায়ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের চুমু খেতেন। আয়িশা (রা) বলেন, 'রোজা অবস্থায়ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্ত্রীদের চুমু খেতেন। তাদের আলিঙ্গন করতেন। প্রবৃত্তির ওপর তিনি তোমাদের চেয়ে বেশি সংযমী ছিলেন।'
টিকাঃ
১৩৫. সুনানুত তিরমিজি: ৭৯, সুনানু আবি দাউদ: ১৭৮, সুনানুন নাসায়ি: ১৭০, সুনানু ইবনি মাজাহ: ৫০২। হাদিসের মান: সহিহ।
১৩৬. সহিহুল বুখারি: ১৯২৭, সহিহ মুসলিম: ১১০৬।