📄 লেনদেনে তিনি আদর্শ
লেনদেনের বিচারে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সুন্দর মানুষ।
তিনি বেচাকেনা করেছেন, সরঞ্জাম ভাড়া নিয়েছেন, ভাড়ায় খাটিয়েছেন, অন্যের ব্যবসায় অংশীদারও হয়েছেন।
পূর্বের কোনো ব্যবসার অংশীদার তাঁর কাছে এলে তিনি বলতেন, 'আপনি আমাকে চেনেন না?' অংশীদার লোকটি বলত, 'আপনি আমার ব্যবসার অংশীদার ছিলেন না? কত উত্তম অংশীদার ছিলেন আপনি! আমাকে না কখনো ঠকাতেন, না বিবাদ করতেন!'
তিনি হাদিয়া দিতেন। হাদিয়া কবুল করতেন। হাদিয়ার প্রতিদান দিতেন। কোনো কিছু বন্ধক রেখে ধার নিতেন। আবার বন্ধক না রেখেও ধার নিতেন। অন্যের কাছে সরঞ্জাম ধার চাইতেন। নগদে ও বাকিতে ক্রয় করতেন।
যখন কেউ তাঁর কাছ থেকে ধার চাইতেন, তাকে তার চাওয়া থেকে উত্তম কিছু দিতেন। যখন তিনি কারও কাছ থেকে ধার নিতেন, ঠিকমতো পরিশোধ করতেন এবং তার জন্য এই বলে দোয়া করতেন-
بَارَكَ اللهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ وَمَالِكَ، إِنَّمَا جَزَاءُ السَّلَفِ الْحَمْدُ وَالْأَدَاءُ
'আল্লাহ তোমার পরিবার-পরিজনে এবং সম্পদে বরকত দান করুন। কর্জের বিনিময় তো এই যে, কর্জদাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং কর্জ আদায় করা।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মালিকানাধীন ভূমিতে অবস্থান করতেন। তিনি তা আল্লাহর রাস্তায় সাদাকা করে দিয়েছিলেন।
তিনি অপরের জন্য সুপারিশ করতেন। তাঁর কাছেও সুপারিশ করা হতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলা সাহাবি বারিরা (রা)-কে সুপারিশ করেছিলেন, তিনি যেন মুগিস (রা)-কে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে। বারিরা (রা) তাঁর সুপারিশ গ্রহণ না করে মুগিস (রা)-কে ফিরিয়ে দেন। এতে তিনি বারিরার (রা) প্রতি মোটেও রাগান্বিত হননি। তাকে তিরস্কারও করেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন আদর্শ ও দৃষ্টান্ত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৮০টিরও অধিক বিষয়ে কসম খেয়েছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে ৩টি বিষয়ে কসম করার আদেশ দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সময় ইনশাআল্লাহ-সহযোগে কসম করতেন। তিনি কসম পূর্ণ করতেন। কসমের কাফফারা দিতেন।
তিনি মজা করতেন। তবে মজা করতে গিয়ে মিথ্যা বলতেন না। তিনি তাওরিয়া বা দ্ব্যর্থবোধক বাক্য বলে কৌতুক করতেন। তবে মিথ্যা বলতেন না।
দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন। কুস্তি লড়তেন।
নিজ হাতে জুতো সেলাই করতেন। নিজ হাতে জামার তালি লাগাতেন। নিজ হাতেই চামড়ার বালতি মেরামত করতেন। ছাগলের দুধ দোহন করতেন, কাপড় কাচতেন, পরিবারের সেবা করতেন। মসজিদ নির্মাণের সময় সাহাবিদের (রা) সঙ্গে ইট বহন করতেন। তিনি মেহমান হতেন। মেজবানও হতেন।
রোগীদের সেবা করতেন। জানাজায় উপস্থিত হতেন। খাওয়ার দাওয়াতে যেতেন। বিধবা, মিসকিন ও দুর্বলদের অভাব মোচন করতেন। কবিদের প্রশংসাব্যঞ্জক কবিতা শুনতেন এবং তাদের পুরস্কৃত করতেন।
টিকাঃ
৮৯. সুনানু আবি দাউদ: ৪৮৩৬, সুনানু ইবনি মাজাহ: ২২৮৭। হাদিসের মান: সহিহ।
৯০. সুনানুন নাসায়ি: ৪৬৮৩, সুনানু ইbনি মাজাহ: ৪২৪২। হাদিসের মান: সহিহ।
📄 রোগীর সেবায় তিনি আদর্শ
সাহাবিদের (রা) কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি দেখতে যেতেন। সেবা করতেন। জনৈক ইহুদি গোলাম তাঁর সেবা করত। সে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি তার সেবা করতেন। চাচা অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি চাচারও সেবা করতেন, অথচ তিনি ছিলেন মুশরিক। উভয়ের নিকট তিনি ইসলাম পেশ করেন। ইহুদি গোলাম ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু চাচা ইসলাম কবুল করেননি।
তিনি রোগীর কাছে যেতেন। মাথার পাশে বসতেন। অবস্থা জানতে চাইতেন। বলতেন, 'কেমন বোধ করছ?' ডান হাতখানি শরীরে বুলিয়ে দিতেন এবং বলতেন:
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَاسَ وَاشْفِهِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءٌ لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
'হে আল্লাহ, মানুষের প্রভু, কষ্ট দূর করুন, সুস্থ করে দিন। আপনিই আরোগ্যদানকারী। আপনি ছাড়া কেউই রোগমুক্ত করতে পারে না। এমনভাবে আরোগ্য দান করুন, যার পরে কোনো রোগ অবশিষ্ট থাকে না।'
টিকাঃ
৯১. জাদুল মাআদ: ১/৪৯৪।
📄 স্বভাবজাত রীতিনীতিতে তিনি আদর্শ
জুতো পরা, চুল আঁচড়ানো, পবিত্র হওয়া, গ্রহণ করা, প্রদান করা ইত্যাদি কাজে তিনি ডান দিক থেকে শুরু করা পছন্দ করতেন। খাওয়া, পান করা, পবিত্র হওয়ার ক্ষেত্রে ডান হাতকে প্রাধান্য দিতেন। আর শৌচকার্যে এবং বিভিন্ন কষ্টদায়ক বস্তু সরাতে তিনি বাম হাত ব্যবহার করতেন।
মাথা কামানোর ক্ষেত্রে তাঁর নিয়ম ছিল, হয় মাথার সবগুলো চুল রাখতেন নতুবা পুরোটা কামাতেন বা ছাঁটতেন। কিছু অংশ কামিয়ে বাকিটা ছেড়ে দেওয়া কিংবা কোথাও ছেঁটে ছোট করে, কোথাও বড় করে রাখা-এমনটা করতেন না।
মিসওয়াক করতে ভালোবাসতেন তিনি। সাওম অবস্থায় মিসওয়াক করতেন। সাওম না থাকা অবস্থায়ও মিসওয়াক করতেন। ঘুম থেকে জাগার পর মিসওয়াক করতেন। অজু করার সময় মিসওয়াক করতেন। নামাজের সময় মিসওয়াক করতেন। এমনকি বাড়িতে প্রবেশ করার সময়ও মিসওয়াক করতেন।
তিনি অধিক সুগন্ধি লাগাতেন। সুগন্ধি ভালোবাসতেন। সুগন্ধি হাদিয়া এলে ফিরিয়ে দিতেন না।
তিনি চুল পরিপাটি রাখতে পছন্দ করতেন। কখনো নিজে চুল আঁচড়াতেন। কখনো আম্মাজান আয়িশা (রা) আঁচড়ে দিতেন।
মুসলিমদের আপন আপন অবস্থার প্রতি নজর দেওয়া উচিত। তারা যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিদের (রা) অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। তথাকথিত কোনো তারকা, অভিনেতা, অভিনেত্রী কিংবা পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের নিজেদের মডেল হিসেবে গ্রহণ করার কোনো সুযোগ মুসলমানদের নেই।
📄 নবিজি ﷺ-এর আমল চারটি ভাগে বিভক্ত
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলার ব্যাপারে কথা বলা আবশ্যক। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন আমলগুলোর অনুসরণ করতে হবে?
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আমল চারটি ভাগে বিভক্ত
* প্রথম প্রকার: স্বভাবজাত কাজ
মানবজাতির একজন সদস্য হিসেবে যেসব কাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছ থেকে প্রকাশ পেয়েছে, তা স্বভাবজাত কাজের অন্তর্ভুক্ত। যেমন: ওঠাবসা, নড়াচড়া, হাঁটা-চলা, আহার-নিদ্রা ইত্যাদি। এসবের সঙ্গে তাঁর রিসালাত কিংবা শরিয়াহর আদেশ বা নিষেধের কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি স্বভাবজাত কোনো কাজকে বিশেষ কোনো আঙ্গিকে নিয়মিত সম্পাদন করেন, তবে তা মুবাহ থেকে মুসতাহাবের পর্যায়ে উন্নীত হবে। যেমন: ডান কাত হয়ে ঘুমানো।
অনুরূপভাবে কোনো স্বভাবজাত কাজকে যদি তিনি বিশেষ কোনো পদ্ধতিতে করার প্রতি উৎসাহিত করেন, তবে সেটাও মুসতাহাব পর্যায়ে উন্নীত হবে। যেমন: তিন শ্বাসে পান করা এবং ডান হাতে খাওয়া।
* দ্বিতীয় প্রকার: সমাজ ও গোত্রে প্রচলিত কাজ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোত্রে এবং সমাজে প্রচলিত রীতিনীতি ও কাজকর্ম যেগুলোর সঙ্গে শরিয়তের সম্পর্ক থাকার ব্যাপারে কোনো দলিল পাওয়া যায় না-এই ধরনের কাজগুলো এই প্রকারের অন্তর্গত। যেমন পোশাকের সাথে জড়িত বিষয়গুলো। কেননা, পোশাকের বিষয়টি নগরবাসীর চর্চিত অভ্যাস ও প্রচলিত রীতিনীতির ওপর নির্ভর করে। নবুওয়াতের পূর্বে তিনি যে পোশাক পরতেন, নবি হওয়ার পর তা পাল্টাননি। অবশ্য পুরুষ ও মহিলাদের বেশভূষার জন্য বিশেষ কিছু শর্ত ও নিয়ম বেঁধে দিয়েছেন। অনুরূপভাবে তাঁর লম্বা চুল রাখার বিষয়টি প্রচলিত সংস্কৃতির অংশ ছিল। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে তাঁকে অনুসরণ করাকে সুন্নাত বলা হবে না। কেননা, এসব কাজ শরিয়তভুক্ত করার ইচ্ছা তাঁর ছিল না এবং এসব আমলকে তিনি ইবাদতের অন্তর্ভুক্তও করেননি।
তবে এই প্রকারের কোনো কাজের ব্যাপারে যদি তাঁর আদেশ কিংবা উৎসাহ পাওয়া যায় অথবা অভ্যাসগত আমলটির সঙ্গে শরিয়াহর সম্পৃক্ততার ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তবে তা আর এই প্রকারে থাকবে না। যেমন: সাদা পোশাক পরা, লুঙ্গিকে নিসফে সাক বা অর্ধজঙ্ঘা পর্যন্ত উঠিয়ে পরিধান করা ইত্যাদি।
* তৃতীয় প্রকার: নবিসত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্বতন্ত্র কাজ
নবিসত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন স্বতন্ত্র আমল, যা উম্মতের জন্য অনুসরণীয় নয়। যেমন: সাওমে বিসাল বা টানা সাওম পালন, একসঙ্গে চারের অধিক স্ত্রী রাখা, বিনা মোহরে বিবাহ করা ইত্যাদি।
* চতুর্থ প্রকার: ইবাদতসংক্রান্ত কাজ
যে কাজগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইবাদত হিসেবে সম্পাদন করেছেন। এসব কাজই উম্মতের জন্য অনুসরণীয়। এই ধরনের কাজ কখনো মুসতাহাব হয়, কখনো সুন্নাত হয়, কখনো-বা ফরজ হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বর্জিত কাজসমূহ বর্জন করাও অনুসরণের আওতায় পড়ে। কোন কাজগুলো তিনি বর্জন করেছেন, তা জানার পদ্ধতি দুটি:
১. কোনো কাজ বর্জনের ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যাওয়া-তিনি এই এই কাজ করেননি। যেমন ইদের নামাজের ক্ষেত্রে এক সাহাবির (রা) বর্ণনা : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইদের নামাজ আদায় করতেন আজান ও ইকামত ব্যতীত।
২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এমন কোনো কাজ সম্পাদন করার ব্যাপারে বর্ণনা পাওয়া না যাওয়া, যদি তিনি তা করতেন, তবে সাহাবিরা (রা) অবশ্যই তা উম্মতের জন্য বর্ণনা করতেন-সাহাবিদের (রা) হিম্মত ও প্রকৃতির দাবি এটিই।
যেহেতু বিষয়টি তাঁদের কেউই বর্ণনা করেননি; এমনকি কোনো বৈঠকেও কেউ এ নিয়ে আলোচনা করেননি-সেহেতু বোঝা গেল, কাজটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেননি। যেমন: নামাজ শুরু করার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়ত মুখে উচ্চারণ করতেন না। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি কোনো কাজ বর্জন করেন, তবে তা আমাদের জন্য দলিল হয়ে যায়; আমাদেরকেও তা বর্জন করতে হবে। তবে যদি কোনো কাজ বর্জন করার মধ্যে এমন কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকে, যার সাথে স্বয়ং তিনি সংশ্লিষ্ট-সে ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। যেমন: তিনি জামাআতে তারাবিহ পড়া বর্জন করেছিলেন। তিনি ভয় পাচ্ছিলেন এতে তারাবিহ উম্মতের ওপর ফরজ করে দেওয়া হতে পারে। এই ধরনের বিষয়ে কোনো আমল বর্জনের প্রশ্নে তিনি অনুসরণীয় নন। অর্থাৎ কোনো আমল তিনি পরিত্যাগ করেছেন বলে আমরাও পরিত্যাগ করব, বিষয়টা এমন নয়। বরং যে প্রতিবন্ধকতার কারণে তিনি আমলটি করেননি, সেটি যেহেতু এখন বিদ্যমান নেই, তাই আমাদের আমল করতে হবে।
টিকাঃ
৯২. 'মুবাহ'-এর অর্থ হলো, কোনো কাজ করা ও না করা উভয়ই বৈধ হওয়া।
৯৩. হাঁটু থেকে পায়ের গিঠ পর্যন্ত অংশকে জঙ্ঘা বলে। জঙ্ঘার মাঝামাঝি অংশকে অর্ধজঙ্ঘা বলা হয়েছে। আরবিতে বলা হয়: নিসফুস সাক।
৯৪. সহিহুল বুখারি: ৯৫৯, সহিহু মুসলিম: ৮৮৬, সুনানু আবি দাউদ: ১১৪৭। শব্দউৎস: সুনানু আবি দাউদ।