📄 বক্তৃতায় তিনি আদর্শ
যখন তিনি বক্তৃতা দিতেন, তাঁর চোখদুটি লাল হয়ে উঠত। স্বর উঁচু হয়ে যেত। তাঁর ক্রোধ প্রবল আকার ধারণ করত। অবস্থা এমন হতো যেন তিনি কোনো সৈন্যদলকে হুঁশিয়ার করছেন। তিনি আল্লাহর হামদ ও প্রশংসা না করে বক্তৃতা শুরু করতেন না।
তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয়বস্তু ছিল আল্লাহর হামদ, নিয়ামতের প্রশংসা, আল্লাহর গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য, ইসলামের আহকাম, আখিরাতের কথা, জান্নাত-জাহান্নাম, আল্লাহর ভয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির কারণ ইত্যাদি।
শ্রোতাদের কল্যাণ ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেই তিনি বক্তব্য রাখতেন। মানুষের অবস্থার দিকে লক্ষ করে কখনো বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করতেন-কখনো দীর্ঘ করতেন।
টিকাঃ
৮৮. জadুল মাআদ: ১/১৯১।
📄 লেনদেনে তিনি আদর্শ
লেনদেনের বিচারে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সুন্দর মানুষ।
তিনি বেচাকেনা করেছেন, সরঞ্জাম ভাড়া নিয়েছেন, ভাড়ায় খাটিয়েছেন, অন্যের ব্যবসায় অংশীদারও হয়েছেন।
পূর্বের কোনো ব্যবসার অংশীদার তাঁর কাছে এলে তিনি বলতেন, 'আপনি আমাকে চেনেন না?' অংশীদার লোকটি বলত, 'আপনি আমার ব্যবসার অংশীদার ছিলেন না? কত উত্তম অংশীদার ছিলেন আপনি! আমাকে না কখনো ঠকাতেন, না বিবাদ করতেন!'
তিনি হাদিয়া দিতেন। হাদিয়া কবুল করতেন। হাদিয়ার প্রতিদান দিতেন। কোনো কিছু বন্ধক রেখে ধার নিতেন। আবার বন্ধক না রেখেও ধার নিতেন। অন্যের কাছে সরঞ্জাম ধার চাইতেন। নগদে ও বাকিতে ক্রয় করতেন।
যখন কেউ তাঁর কাছ থেকে ধার চাইতেন, তাকে তার চাওয়া থেকে উত্তম কিছু দিতেন। যখন তিনি কারও কাছ থেকে ধার নিতেন, ঠিকমতো পরিশোধ করতেন এবং তার জন্য এই বলে দোয়া করতেন-
بَارَكَ اللهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ وَمَالِكَ، إِنَّمَا جَزَاءُ السَّلَفِ الْحَمْدُ وَالْأَدَاءُ
'আল্লাহ তোমার পরিবার-পরিজনে এবং সম্পদে বরকত দান করুন। কর্জের বিনিময় তো এই যে, কর্জদাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং কর্জ আদায় করা।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মালিকানাধীন ভূমিতে অবস্থান করতেন। তিনি তা আল্লাহর রাস্তায় সাদাকা করে দিয়েছিলেন।
তিনি অপরের জন্য সুপারিশ করতেন। তাঁর কাছেও সুপারিশ করা হতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলা সাহাবি বারিরা (রা)-কে সুপারিশ করেছিলেন, তিনি যেন মুগিস (রা)-কে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে। বারিরা (রা) তাঁর সুপারিশ গ্রহণ না করে মুগিস (রা)-কে ফিরিয়ে দেন। এতে তিনি বারিরার (রা) প্রতি মোটেও রাগান্বিত হননি। তাকে তিরস্কারও করেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন আদর্শ ও দৃষ্টান্ত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৮০টিরও অধিক বিষয়ে কসম খেয়েছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে ৩টি বিষয়ে কসম করার আদেশ দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সময় ইনশাআল্লাহ-সহযোগে কসম করতেন। তিনি কসম পূর্ণ করতেন। কসমের কাফফারা দিতেন।
তিনি মজা করতেন। তবে মজা করতে গিয়ে মিথ্যা বলতেন না। তিনি তাওরিয়া বা দ্ব্যর্থবোধক বাক্য বলে কৌতুক করতেন। তবে মিথ্যা বলতেন না।
দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন। কুস্তি লড়তেন।
নিজ হাতে জুতো সেলাই করতেন। নিজ হাতে জামার তালি লাগাতেন। নিজ হাতেই চামড়ার বালতি মেরামত করতেন। ছাগলের দুধ দোহন করতেন, কাপড় কাচতেন, পরিবারের সেবা করতেন। মসজিদ নির্মাণের সময় সাহাবিদের (রা) সঙ্গে ইট বহন করতেন। তিনি মেহমান হতেন। মেজবানও হতেন।
রোগীদের সেবা করতেন। জানাজায় উপস্থিত হতেন। খাওয়ার দাওয়াতে যেতেন। বিধবা, মিসকিন ও দুর্বলদের অভাব মোচন করতেন। কবিদের প্রশংসাব্যঞ্জক কবিতা শুনতেন এবং তাদের পুরস্কৃত করতেন।
টিকাঃ
৮৯. সুনানু আবি দাউদ: ৪৮৩৬, সুনানু ইবনি মাজাহ: ২২৮৭। হাদিসের মান: সহিহ।
৯০. সুনানুন নাসায়ি: ৪৬৮৩, সুনানু ইbনি মাজাহ: ৪২৪২। হাদিসের মান: সহিহ।
📄 রোগীর সেবায় তিনি আদর্শ
সাহাবিদের (রা) কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি দেখতে যেতেন। সেবা করতেন। জনৈক ইহুদি গোলাম তাঁর সেবা করত। সে অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি তার সেবা করতেন। চাচা অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি চাচারও সেবা করতেন, অথচ তিনি ছিলেন মুশরিক। উভয়ের নিকট তিনি ইসলাম পেশ করেন। ইহুদি গোলাম ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু চাচা ইসলাম কবুল করেননি।
তিনি রোগীর কাছে যেতেন। মাথার পাশে বসতেন। অবস্থা জানতে চাইতেন। বলতেন, 'কেমন বোধ করছ?' ডান হাতখানি শরীরে বুলিয়ে দিতেন এবং বলতেন:
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَاسَ وَاشْفِهِ أَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءٌ لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
'হে আল্লাহ, মানুষের প্রভু, কষ্ট দূর করুন, সুস্থ করে দিন। আপনিই আরোগ্যদানকারী। আপনি ছাড়া কেউই রোগমুক্ত করতে পারে না। এমনভাবে আরোগ্য দান করুন, যার পরে কোনো রোগ অবশিষ্ট থাকে না।'
টিকাঃ
৯১. জাদুল মাআদ: ১/৪৯৪।
📄 স্বভাবজাত রীতিনীতিতে তিনি আদর্শ
জুতো পরা, চুল আঁচড়ানো, পবিত্র হওয়া, গ্রহণ করা, প্রদান করা ইত্যাদি কাজে তিনি ডান দিক থেকে শুরু করা পছন্দ করতেন। খাওয়া, পান করা, পবিত্র হওয়ার ক্ষেত্রে ডান হাতকে প্রাধান্য দিতেন। আর শৌচকার্যে এবং বিভিন্ন কষ্টদায়ক বস্তু সরাতে তিনি বাম হাত ব্যবহার করতেন।
মাথা কামানোর ক্ষেত্রে তাঁর নিয়ম ছিল, হয় মাথার সবগুলো চুল রাখতেন নতুবা পুরোটা কামাতেন বা ছাঁটতেন। কিছু অংশ কামিয়ে বাকিটা ছেড়ে দেওয়া কিংবা কোথাও ছেঁটে ছোট করে, কোথাও বড় করে রাখা-এমনটা করতেন না।
মিসওয়াক করতে ভালোবাসতেন তিনি। সাওম অবস্থায় মিসওয়াক করতেন। সাওম না থাকা অবস্থায়ও মিসওয়াক করতেন। ঘুম থেকে জাগার পর মিসওয়াক করতেন। অজু করার সময় মিসওয়াক করতেন। নামাজের সময় মিসওয়াক করতেন। এমনকি বাড়িতে প্রবেশ করার সময়ও মিসওয়াক করতেন।
তিনি অধিক সুগন্ধি লাগাতেন। সুগন্ধি ভালোবাসতেন। সুগন্ধি হাদিয়া এলে ফিরিয়ে দিতেন না।
তিনি চুল পরিপাটি রাখতে পছন্দ করতেন। কখনো নিজে চুল আঁচড়াতেন। কখনো আম্মাজান আয়িশা (রা) আঁচড়ে দিতেন।
মুসলিমদের আপন আপন অবস্থার প্রতি নজর দেওয়া উচিত। তারা যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিদের (রা) অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। তথাকথিত কোনো তারকা, অভিনেতা, অভিনেত্রী কিংবা পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের নিজেদের মডেল হিসেবে গ্রহণ করার কোনো সুযোগ মুসলমানদের নেই।