📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 শয়নে ও জাগরণে তিনি আদর্শ

📄 শয়নে ও জাগরণে তিনি আদর্শ


ঘুমের প্রয়োজন হলে তিনি আল্লাহর নাম নিয়ে ডান দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়তেন। ভরপেটে তিনি শুতেন না। যখন ঘুমানোর ইচ্ছা করতেন, ডান হাত মাথার নিচে রেখে বলতেন:

اللَّهُمَّ قِنِي عَذَابَكَ يَوْمَ تَبْعَثُ عِبَادَكَ

'হে আল্লাহ, যেদিন তুমি তোমার বান্দাদের পুনর্জীবিত করবে, সেদিন আমাকে তোমার আজাব থেকে রক্ষা কোরো।'

ভোর রাতে মোরগ ডাকার আওয়াজের সঙ্গে তিনি জেগে উঠতেন। আল্লাহর প্রশংসা করতেন, তাঁর বড়ত্ব বর্ণনা করতেন। কালিমা পড়তেন এবং দোয়া করতেন। তারপর মিসওয়াক করে অজু সেরে রবের সামনে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। ভয় ও আশা নিয়ে মগ্ন হতেন প্রভুর সঙ্গে নিবিড় আলাপে। প্রশংসা করতেন গভীর মনোযোগে।

কখনো ঘুমাতেন বিছানায়, কখনো চাটাইয়ে, কখনো-বা মাটিতে। আবার কখনো খাটে।

টিকাঃ
৮১. সুনানুত তিরমিজি: ৩৩৯৮। হুজাইফা বিন ইয়ামান (রা) থেকে বর্ণিত। হাদিসের মান: সহিহ।
৮২. দেখুন, জাদুল মাআদ ১/১৫৫ ও ৪/২৪৬।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 উচ্চারণে, মৌনতায়, হাসি-কান্নায় তিনি আদর্শ

📄 উচ্চারণে, মৌনতায়, হাসি-কান্নায় তিনি আদর্শ


কথা বলতেন সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার ভাষায়। কেউ চাইলে শব্দগুলো অনায়াসে গুনে ফেলতে পারবে। এত দ্রুত বলতেন না, যাতে শ্রোতার মনে রাখতে কষ্ট হয়। আবার এত আস্তেও বলতেন না, যাতে কথার মাঝে অসংখ্য বিরক্তিকর ছেদ পড়ে। বরং তাঁর বাকরীতি ছিল পরিপূর্ণ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

বোঝার সুবিধার্থে তিনি একই কথা তিনবার বলতেন। সালাম করলেও তিনবার করতেন।

তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মৌনতা অবলম্বন করতেন। বিনা প্রয়োজনে কথা বলতেন না। কথা বলতেন জাওয়ামিউল কালিম তথা সর্বমর্মী ও সারগর্ভ ভাষায়।

পরিমিত বাক্যে-বেশিও নয়, আবার কমও নয়। অর্থহীন কোনো বিষয়ে তিনি মুখ খুলতেন না। কেবল তা-ই বলতেন, যার দ্বারা তিনি সাওয়াবের আশা করতেন। যখন কোনো কিছু তাঁর অপছন্দ হতো, তাঁর চেহারা দেখেই তা বোঝা যেত।

তাঁর অধিকাংশ হাসিই ছিল মুচকি হাসি। বরং কেবল মুচকি হাসিই তিনি হাসতেন। সর্বোচ্চ এতটুকু হাসতেন যে, তাঁর মাড়ির দাঁত দেখা যেত।

হাসির কথায় কিংবা অস্বাভাবিক ও আশ্চর্যজনক কথায় তিনি হাসতেন।

তাঁর কান্না ছিল হাসির মতোই মৌন। শব্দ নেই, আওয়াজ নেই। অট্টহাসি কিংবা ফুঁপিয়ে কান্না দুটো থেকেই তিনি ছিলেন অনেক দূরে। তবে তাঁর চোখের ধারা বেয়ে অশ্রু গড়াত। সিনা থেকে জাঁতা পেষার শব্দের মতো মৃদু কান্নার আওয়াজ পাওয়া যেত।

কখনো তিনি কাঁদতেন মৃতের প্রতি অন্তহীন করুণায়। কখনো উম্মতের কল্যাণচিন্তায় কিংবা সুগভীর মায়ায়। কখনো কাঁদতেন আল্লাহর ভয়ে। কুরআন তিলাওয়াত শোনার সময়ও কাঁদতেন তিনি। শঙ্কা ও ভয়ের পাশাপাশি কালামুল্লাহর প্রতি অত্যধিক অনুরাগ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধের কারণে তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারতেন না।

আদরের সন্তান ইবরাহিমের (রা) মৃত্যুতে তিনি জারজার কেঁদেছিলেন। এটি ছিল পুত্রের প্রতি হৃদয়ে সঞ্চিত রহমতের বহিঃপ্রকাশ। আপন এক নাতনির মুমূর্ষু অবস্থা দেখেও তাঁর চোখে অশ্রু প্রবাহিত হয়েছিল।

ইবনে মাসউদ (রা)-এর সুরা নিসার তিলাওয়াত শুনে তিনি অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন। উসমান বিন মাজউন (রা)-এর মৃত্যুতে তিনি কেঁদেছিলেন। একবার সূর্যগ্রহণ হলে তিনি কান্না করেছিলেন। সালাতুল কুসুফ পড়াতে গিয়ে তিনি ফুলে ফুলে কেঁদেছিলেন।

একবার তাঁর জনৈক মেয়ের কবরে বসেও তিনি কাঁদেন। কখনো কখনো রাতের নামাজেও তিনি কাঁদতেন।

টিকাঃ
৮৩. সহিহুল বুখারি: ৯৪। আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত।
৮৪. জাদুল মাআদ: ১/১৮২।
৮৫. মুসনাদু আহমাদ: ২১২৭২। সে নাতনি ছিলেন উমামা বা উমাইমা বিনতে জাইনাব (রা)।
৮৬. সহিহুল বুখারি: ৪৫৮৭২, মুসলিম: ৮০০। ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণিত।
৮৭. জাদুল মাআদ: ১/১৮৩।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বক্তৃতায় তিনি আদর্শ

📄 বক্তৃতায় তিনি আদর্শ


যখন তিনি বক্তৃতা দিতেন, তাঁর চোখদুটি লাল হয়ে উঠত। স্বর উঁচু হয়ে যেত। তাঁর ক্রোধ প্রবল আকার ধারণ করত। অবস্থা এমন হতো যেন তিনি কোনো সৈন্যদলকে হুঁশিয়ার করছেন। তিনি আল্লাহর হামদ ও প্রশংসা না করে বক্তৃতা শুরু করতেন না।

তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয়বস্তু ছিল আল্লাহর হামদ, নিয়ামতের প্রশংসা, আল্লাহর গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য, ইসলামের আহকাম, আখিরাতের কথা, জান্নাত-জাহান্নাম, আল্লাহর ভয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির কারণ ইত্যাদি।

শ্রোতাদের কল্যাণ ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেই তিনি বক্তব্য রাখতেন। মানুষের অবস্থার দিকে লক্ষ করে কখনো বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করতেন-কখনো দীর্ঘ করতেন।

টিকাঃ
৮৮. জadুল মাআদ: ১/১৯১।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 লেনদেনে তিনি আদর্শ

📄 লেনদেনে তিনি আদর্শ


লেনদেনের বিচারে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সুন্দর মানুষ।

তিনি বেচাকেনা করেছেন, সরঞ্জাম ভাড়া নিয়েছেন, ভাড়ায় খাটিয়েছেন, অন্যের ব্যবসায় অংশীদারও হয়েছেন।

পূর্বের কোনো ব্যবসার অংশীদার তাঁর কাছে এলে তিনি বলতেন, 'আপনি আমাকে চেনেন না?' অংশীদার লোকটি বলত, 'আপনি আমার ব্যবসার অংশীদার ছিলেন না? কত উত্তম অংশীদার ছিলেন আপনি! আমাকে না কখনো ঠকাতেন, না বিবাদ করতেন!'

তিনি হাদিয়া দিতেন। হাদিয়া কবুল করতেন। হাদিয়ার প্রতিদান দিতেন। কোনো কিছু বন্ধক রেখে ধার নিতেন। আবার বন্ধক না রেখেও ধার নিতেন। অন্যের কাছে সরঞ্জাম ধার চাইতেন। নগদে ও বাকিতে ক্রয় করতেন।

যখন কেউ তাঁর কাছ থেকে ধার চাইতেন, তাকে তার চাওয়া থেকে উত্তম কিছু দিতেন। যখন তিনি কারও কাছ থেকে ধার নিতেন, ঠিকমতো পরিশোধ করতেন এবং তার জন্য এই বলে দোয়া করতেন-

بَارَكَ اللهُ لَكَ فِي أَهْلِكَ وَمَالِكَ، إِنَّمَا جَزَاءُ السَّلَفِ الْحَمْدُ وَالْأَدَاءُ

'আল্লাহ তোমার পরিবার-পরিজনে এবং সম্পদে বরকত দান করুন। কর্জের বিনিময় তো এই যে, কর্জদাতার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং কর্জ আদায় করা।'

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের মালিকানাধীন ভূমিতে অবস্থান করতেন। তিনি তা আল্লাহর রাস্তায় সাদাকা করে দিয়েছিলেন।

তিনি অপরের জন্য সুপারিশ করতেন। তাঁর কাছেও সুপারিশ করা হতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলা সাহাবি বারিরা (রা)-কে সুপারিশ করেছিলেন, তিনি যেন মুগিস (রা)-কে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করে। বারিরা (রা) তাঁর সুপারিশ গ্রহণ না করে মুগিস (রা)-কে ফিরিয়ে দেন। এতে তিনি বারিরার (রা) প্রতি মোটেও রাগান্বিত হননি। তাকে তিরস্কারও করেননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন আদর্শ ও দৃষ্টান্ত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৮০টিরও অধিক বিষয়ে কসম খেয়েছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে ৩টি বিষয়ে কসম করার আদেশ দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সময় ইনশাআল্লাহ-সহযোগে কসম করতেন। তিনি কসম পূর্ণ করতেন। কসমের কাফফারা দিতেন।

তিনি মজা করতেন। তবে মজা করতে গিয়ে মিথ্যা বলতেন না। তিনি তাওরিয়া বা দ্ব্যর্থবোধক বাক্য বলে কৌতুক করতেন। তবে মিথ্যা বলতেন না।

দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন। কুস্তি লড়তেন।

নিজ হাতে জুতো সেলাই করতেন। নিজ হাতে জামার তালি লাগাতেন। নিজ হাতেই চামড়ার বালতি মেরামত করতেন। ছাগলের দুধ দোহন করতেন, কাপড় কাচতেন, পরিবারের সেবা করতেন। মসজিদ নির্মাণের সময় সাহাবিদের (রা) সঙ্গে ইট বহন করতেন। তিনি মেহমান হতেন। মেজবানও হতেন।

রোগীদের সেবা করতেন। জানাজায় উপস্থিত হতেন। খাওয়ার দাওয়াতে যেতেন। বিধবা, মিসকিন ও দুর্বলদের অভাব মোচন করতেন। কবিদের প্রশংসাব্যঞ্জক কবিতা শুনতেন এবং তাদের পুরস্কৃত করতেন।

টিকাঃ
৮৯. সুনানু আবি দাউদ: ৪৮৩৬, সুনানু ইবনি মাজাহ: ২২৮৭। হাদিসের মান: সহিহ।
৯০. সুনানুন নাসায়ি: ৪৬৮৩, সুনানু ইbনি মাজাহ: ৪২৪২। হাদিসের মান: সহিহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00