📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 হজের ক্ষেত্রে তিনি আদর্শ

📄 হজের ক্ষেত্রে তিনি আদর্শ


যেসব ইবাদতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য ও অনুসরণের ছাপ সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে, সেগুলোর অন্যতম হলো হজ। হজের ব্যাপারে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আনুগত্যের আদেশ দিয়ে বলেন, 'তোমরা (আমাকে দেখে) হজের নিয়মকানুন শিখে নাও। জানি না, এই হজের পরে আমি আর হজ করতে পারব কি না।'

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কেবল অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যের অনুসরণ করলেই যথেষ্ট হবে না; বরং তাঁর আনুগত্যের পরিধি আরও ব্যাপক-যা তাঁর জীবনের সকল কর্মকাণ্ডকে ধারণ করে। এ ব্যাপারে তাঁর অনুসৃত জীবনপদ্ধতিই মুমিনের জন্য অনুসরণীয়, যা বিশুদ্ধতায় পরিপূর্ণতাকে স্পর্শ করতে পেরেছে।

খাবার ও পানীয়ের ক্ষেত্রে তাঁর নীতি ছিল, তিনি উপস্থিত খাবার ফিরিয়ে দিতেন না। অন্য খাবার আনতে বলতেন না। কোনো হালাল খাদ্য পেশ করা হলেই খেয়ে নিতেন। কখনো খাবারের দোষত্রুটি বের করতেন না। মন চাইলে খেতেন, নইলে বিরত থাকতেন।

এক চাঁদ গিয়ে আরেক চাঁদ আসে। সেটি চলে গিয়ে তৃতীয় চাঁদও উদিত হয় আকাশে। অথচ তাঁর ঘরে চুলোয় আগুন জ্বলে না। খাবার রান্নার কোনো আয়োজন হয় না।

যখন তাঁর সামনে খাবার পরিবেশন করা হতো, বিসমিল্লাহ বলে শুরু করতেন। খাওয়া শেষে বলতেন:

اللهُمَّ أَطْعَمْتَ وَسَقَيْتَ، وَأَغْنَيْتَ، وَأَقْنَيْتَ وَهَدَيْتَ، وَأَحْيَيْتَ، فَلَكَ الْحَمْدُ عَلَى مَا أَعْطَيْتَ

'হে আল্লাহ, আপনি (আমাকে) আহার করালেন, আপনি পান করালেন, আপনি অভাবমুক্ত করেছেন, আপনি সম্পদশালী করেছেন, আপনি পথ দেখালেন, আপনি জীবন দান করেছেন। আপনি যা দান করেছেন, তার জন্য আপনারই প্রশংসা (আদায় করছি)।'

'কারও বাড়িতে মেহমান হলে পানাহার শেষে মেজবানের জন্য দোয়া না করে সেখান থেকে বের হতেন না।'

যখন যা মিলত, তা-ই খেতেন। খাবারের ব্যবস্থা না থাকলে, সবর করতেন। কখনো ক্ষুধার তীব্রতায় পেটে পাথর বাঁধতেন। ছোট হোক বা বড়, আজাদ হোক বা গোলাম, মুহাজির হোক বা গেঁয়ো-কেউ খাওয়াতে চাইলে তিনি অবজ্ঞা করতেন না।

টিকাঃ
৭৫. সহিহু মুসলিম: ১২৯৭।
৭৬. দেখুন, সহিহুল বুখারি: ৩৫৬৩, সহিহু মুসলিম: ২০৬৪।
৭৭. দেখুন, সহিহুল বুখারি ২৫৬৭, সহিহু মুসলিম: ২৯৭২।
৭৮. মুসনাদু আহমাদ: ১৬১৫৯। হাদিসের মান: সহিহ।
৭৯. সহিহু মুসলিম: ২০৪২। আব্দুল্লাহ বিন বুদ্র (রা) থেকে বর্ণিত।
৮০. দেখুন, জাদুল মাআদ: ১/১৪৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 শয়নে ও জাগরণে তিনি আদর্শ

📄 শয়নে ও জাগরণে তিনি আদর্শ


ঘুমের প্রয়োজন হলে তিনি আল্লাহর নাম নিয়ে ডান দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়তেন। ভরপেটে তিনি শুতেন না। যখন ঘুমানোর ইচ্ছা করতেন, ডান হাত মাথার নিচে রেখে বলতেন:

اللَّهُمَّ قِنِي عَذَابَكَ يَوْمَ تَبْعَثُ عِبَادَكَ

'হে আল্লাহ, যেদিন তুমি তোমার বান্দাদের পুনর্জীবিত করবে, সেদিন আমাকে তোমার আজাব থেকে রক্ষা কোরো।'

ভোর রাতে মোরগ ডাকার আওয়াজের সঙ্গে তিনি জেগে উঠতেন। আল্লাহর প্রশংসা করতেন, তাঁর বড়ত্ব বর্ণনা করতেন। কালিমা পড়তেন এবং দোয়া করতেন। তারপর মিসওয়াক করে অজু সেরে রবের সামনে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। ভয় ও আশা নিয়ে মগ্ন হতেন প্রভুর সঙ্গে নিবিড় আলাপে। প্রশংসা করতেন গভীর মনোযোগে।

কখনো ঘুমাতেন বিছানায়, কখনো চাটাইয়ে, কখনো-বা মাটিতে। আবার কখনো খাটে।

টিকাঃ
৮১. সুনানুত তিরমিজি: ৩৩৯৮। হুজাইফা বিন ইয়ামান (রা) থেকে বর্ণিত। হাদিসের মান: সহিহ।
৮২. দেখুন, জাদুল মাআদ ১/১৫৫ ও ৪/২৪৬।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 উচ্চারণে, মৌনতায়, হাসি-কান্নায় তিনি আদর্শ

📄 উচ্চারণে, মৌনতায়, হাসি-কান্নায় তিনি আদর্শ


কথা বলতেন সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার ভাষায়। কেউ চাইলে শব্দগুলো অনায়াসে গুনে ফেলতে পারবে। এত দ্রুত বলতেন না, যাতে শ্রোতার মনে রাখতে কষ্ট হয়। আবার এত আস্তেও বলতেন না, যাতে কথার মাঝে অসংখ্য বিরক্তিকর ছেদ পড়ে। বরং তাঁর বাকরীতি ছিল পরিপূর্ণ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।

বোঝার সুবিধার্থে তিনি একই কথা তিনবার বলতেন। সালাম করলেও তিনবার করতেন।

তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মৌনতা অবলম্বন করতেন। বিনা প্রয়োজনে কথা বলতেন না। কথা বলতেন জাওয়ামিউল কালিম তথা সর্বমর্মী ও সারগর্ভ ভাষায়।

পরিমিত বাক্যে-বেশিও নয়, আবার কমও নয়। অর্থহীন কোনো বিষয়ে তিনি মুখ খুলতেন না। কেবল তা-ই বলতেন, যার দ্বারা তিনি সাওয়াবের আশা করতেন। যখন কোনো কিছু তাঁর অপছন্দ হতো, তাঁর চেহারা দেখেই তা বোঝা যেত।

তাঁর অধিকাংশ হাসিই ছিল মুচকি হাসি। বরং কেবল মুচকি হাসিই তিনি হাসতেন। সর্বোচ্চ এতটুকু হাসতেন যে, তাঁর মাড়ির দাঁত দেখা যেত।

হাসির কথায় কিংবা অস্বাভাবিক ও আশ্চর্যজনক কথায় তিনি হাসতেন।

তাঁর কান্না ছিল হাসির মতোই মৌন। শব্দ নেই, আওয়াজ নেই। অট্টহাসি কিংবা ফুঁপিয়ে কান্না দুটো থেকেই তিনি ছিলেন অনেক দূরে। তবে তাঁর চোখের ধারা বেয়ে অশ্রু গড়াত। সিনা থেকে জাঁতা পেষার শব্দের মতো মৃদু কান্নার আওয়াজ পাওয়া যেত।

কখনো তিনি কাঁদতেন মৃতের প্রতি অন্তহীন করুণায়। কখনো উম্মতের কল্যাণচিন্তায় কিংবা সুগভীর মায়ায়। কখনো কাঁদতেন আল্লাহর ভয়ে। কুরআন তিলাওয়াত শোনার সময়ও কাঁদতেন তিনি। শঙ্কা ও ভয়ের পাশাপাশি কালামুল্লাহর প্রতি অত্যধিক অনুরাগ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধের কারণে তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারতেন না।

আদরের সন্তান ইবরাহিমের (রা) মৃত্যুতে তিনি জারজার কেঁদেছিলেন। এটি ছিল পুত্রের প্রতি হৃদয়ে সঞ্চিত রহমতের বহিঃপ্রকাশ। আপন এক নাতনির মুমূর্ষু অবস্থা দেখেও তাঁর চোখে অশ্রু প্রবাহিত হয়েছিল।

ইবনে মাসউদ (রা)-এর সুরা নিসার তিলাওয়াত শুনে তিনি অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন। উসমান বিন মাজউন (রা)-এর মৃত্যুতে তিনি কেঁদেছিলেন। একবার সূর্যগ্রহণ হলে তিনি কান্না করেছিলেন। সালাতুল কুসুফ পড়াতে গিয়ে তিনি ফুলে ফুলে কেঁদেছিলেন।

একবার তাঁর জনৈক মেয়ের কবরে বসেও তিনি কাঁদেন। কখনো কখনো রাতের নামাজেও তিনি কাঁদতেন।

টিকাঃ
৮৩. সহিহুল বুখারি: ৯৪। আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত।
৮৪. জাদুল মাআদ: ১/১৮২।
৮৫. মুসনাদু আহমাদ: ২১২৭২। সে নাতনি ছিলেন উমামা বা উমাইমা বিনতে জাইনাব (রা)।
৮৬. সহিহুল বুখারি: ৪৫৮৭২, মুসলিম: ৮০০। ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণিত।
৮৭. জাদুল মাআদ: ১/১৮৩।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 বক্তৃতায় তিনি আদর্শ

📄 বক্তৃতায় তিনি আদর্শ


যখন তিনি বক্তৃতা দিতেন, তাঁর চোখদুটি লাল হয়ে উঠত। স্বর উঁচু হয়ে যেত। তাঁর ক্রোধ প্রবল আকার ধারণ করত। অবস্থা এমন হতো যেন তিনি কোনো সৈন্যদলকে হুঁশিয়ার করছেন। তিনি আল্লাহর হামদ ও প্রশংসা না করে বক্তৃতা শুরু করতেন না।

তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয়বস্তু ছিল আল্লাহর হামদ, নিয়ামতের প্রশংসা, আল্লাহর গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্য, ইসলামের আহকাম, আখিরাতের কথা, জান্নাত-জাহান্নাম, আল্লাহর ভয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টির কারণ ইত্যাদি।

শ্রোতাদের কল্যাণ ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেই তিনি বক্তব্য রাখতেন। মানুষের অবস্থার দিকে লক্ষ করে কখনো বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করতেন-কখনো দীর্ঘ করতেন।

টিকাঃ
৮৮. জadুল মাআদ: ১/১৯১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00