📄 ইবাদতে তিনি আদর্শ
আয়িশা (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাত জেগে এত বেশি নামাজ পড়তেন যে তাঁর পা ফুলে যেত।' আয়িশা (রা) তাঁকে বলতেন, 'আপনি কেন এমন করেন হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম? আপনার তো আগে-পরের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।' তিনি বলতেন, 'আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হতে চাইব না!'
উবাইদ বিন উমাইর (রহ) হতে বর্ণিত আছে, একবার তিনি আয়িশা (রা)-কে বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোন বিষয়টি আপনার সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য লেগেছে?' এই প্রশ্ন শুনে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, 'এক রাতে তিনি আমাকে বললেন, "হে আয়িশা, আমাকে ছাড়ো। এ রাতে আমি আল্লাহর ইবাদত করব।” আমি বললাম, "আল্লাহর শপথ, আমি আপনার নৈকট্য ভালোবাসি এবং ওই জিনিসকেও ভালোবাসি, যা আপনাকে আনন্দিত করে।” তারপর তিনি উঠে পবিত্র হয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। নামাজে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তাঁর চিবুক ভিজে গেল। তিনি কাঁদতে থাকলেন। একসময় তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। তিনি আরও কাঁদতে লাগলেন। এমনকি একসময় মাটি পর্যন্ত ভিজে গেল। তারপর বিলাল (রা) ফজরের আজান দিতে এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কাঁদতে দেখে বিলাল (রা) বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি কাঁদছেন কেন? আপনার তো আগে-পরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।” তিনি বললেন, "আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না? আজ রাতে আমার ওপর একটি আয়াত নাজিল হয়েছে, যে এ আয়াত তিলাওয়াত করল, কিন্তু এর মর্ম নিয়ে চিন্তা করল না, তার জন্য ধ্বংস।
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ
"নিশ্চয় আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য। (সুরা আলি ইমরান : ১৯০)"'
রমাজান এলে তাঁর নিয়ম ছিল ইবাদতের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া। এই মাসে তিনি অধিক পরিমাণে সাদাকা করতেন। অধিক তিলাওয়াত, সালাত, জিকির ও ইতিকাফ করতেন।
টিকাঃ
৬৫. সহিহুল বুখারি: ৪৮৩৭, সহিহু মুসলিম: ২৮২০।
৬৬. সহিহু ইবনি হিব্বান ৬২০। হাদিসের মান: হাসান।
📄 নফল আমল
কখনো তিনি এত অধিক পরিমাণে নফল সাওম পালন করতে থাকতেন যে, সাহাবিরা বলাবলি করতেন, তিনি মনে হয় আর কোনো দিন সাওম ছাড়বেন না। আবার কখনো তিনি এত দীর্ঘ সময় ধরে নফল সাওম তরক করতেন যে, বলা হতো, তিনি মনে হয় আর নফল সাওম পালন করবেন না। রমাজান ব্যতীত কখনো পূর্ণ মাস রোজা রাখতেন না তিনি। অন্য মাসগুলোর তুলনায় শাবান মাসে বেশি রোজা রাখতেন। সর্বদা সোমবার ও বৃহস্পতিবারে নফল সাওম পালন করতেন।
টিকাঃ
৬৭. সহিহুল বুখারি: ১৬৬৯, সহিহু মুসলিম: ১১৫৬।
৬৮. সুনানুত তিরমিজি: ৭৪৫, সুনানুন নাসায়ি ২৩৬১, সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৭৩৯। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। হাদিসের মান: সহিহ।
📄 কুরআন তিলাওয়াত
তারতিলের সাথে কুরআন তিলাওয়াত করতেন তিনি। বেশি জোরেও নয় আবার একেবারে ধীরেও নয়। বরং প্রতিটি অক্ষর স্পষ্ট করে পড়তেন। প্রতিটি আয়াত পৃথক পৃথক করে তিলাওয়াত করতেন। মাদের হরফ টেনে পড়তেন। اَلرَّحْمٰن আর-রাহমান টান দিয়ে পড়তেন। الرَّحِيمِ আর-রাহীম টান দিয়ে পড়তেন। তিলাওয়াত শুরুর আগে তিনি أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّحِيمِ مِنْ هَمْزِهِ وَنَفْخِهِ وَنَفْتِهِ পাঠ করতেন। তাঁর নির্দিষ্ট একটি হিজব ছিল। যা তিনি নিয়মিত তিলাওয়াত করতেন।
দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে, অজু অবস্থায় এমনকি অজু না থাকা অবস্থায়ও তিনি কুরআন তিলাওয়াত করতেন। কেবল গোসল ফরজ হলেই কুরআন তিলাওয়াত থেকে বিরত থাকতেন।
টিকাঃ
৬৯. সহিহুল বুখারি: ৫০৪৬।
৭০. সুনানু আবি দাউদ: ৭৭৫, সুনানুত তিরমিজি: ২৪২, সুনানুন নাসায়ি ৮৯৯। আবু সাইদ আল-খুদরি (রা)। হাদিসের মান: সহিহ।
৭১. হিজব মানে কুরআনের নির্দিষ্ট একটি পরিমাণ, যা প্রতিদিন তিলাওয়াত করা হয়।
৭২. জাদুল মাআদ: ১/৪৮২।
📄 আল্লাহর জিকিরে তিনি আদর্শ
সৃষ্টিজগতের মধ্যে তিনিই পূর্ণাঙ্গ জিকিরকারী ছিলেন। সর্বদা তিনি আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতেন। বসে, দাঁড়িয়ে, হাঁটতে হাঁটতে, আরোহী অবস্থায়, ভ্রমণকালে, যাত্রাবিরতিতে-এককথায় তাঁর কোনো সময়ই জিকির ছাড়া কাটত না।