📄 বীরত্বে তিনি আদর্শ
আলি (রা) বলেন, 'বদরের দিন যখন যুদ্ধ প্রবল আকার ধারণ করল, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে আশ্রয় নিলাম। সেদিন তিনিই ছিলেন আমাদের মাঝে সবচেয়ে তীব্র আক্রমণকারী এবং তিনিই ছিলেন মুশরিকদের সবচেয়ে নিকটে।'
বারা বিন আজিব (রা) বলেন, 'যখন যুদ্ধের প্রচণ্ডতা চলে আসত, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে আত্মরক্ষা করতাম। আর আমাদের মাঝে তারাই ছিল বীর, যারা তাঁর সাথে সামনে এগিয়ে যেতেন।'
আনাস বিন মালিক (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবচেয়ে সুন্দর। সবচেয়ে বেশি মহানুভব। সবার চেয়ে বেশি বীরত্বের অধিকারী। একরাতে মদীনাবাসী বিকট একটি আওয়াজ শুনল। সবাই আওয়াজের উৎসের দিকে দৌড়াতে লাগল। পথেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে সাক্ষাৎ করলেন, তিনি তখন ওদিক থেকে ফিরছিলেন, সবার আগেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তখন তিনি আবু তালহার (রা) পালানবিহীন একটি ঘোড়ার পিঠে সওয়ার ছিলেন। তাঁর ঘাড়ে তলোয়ার। তিনি বলছিলেন, "ভয়ের কিছু নেই। তোমরা নির্ভয় হও।” এরপর বললেন, "এ ঘোড়াটিকে আমি সাগরের (স্রোতের) মতো গতিশীল পেয়েছি।” অথচ স্বাভাবিকভাবে ঘোড়াটির গতি ছিল ধীর।'
এটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি মুজিজা। স্বাভাবিকভাবে ঘোড়াটি ধীরগতির হলেও তিনি চড়ার পর সেটি দ্রুতগামী হয়ে গেল। এমনকি সমুদ্রের স্রোতের চেয়েও দ্রুত চলতে লাগল। যে ঘোড়াটি সবার পেছনে থাকত, সে ঘোড়ায় চড়েই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবার আগে, সবার অগোচরে সবকিছু যাচাই করলেন-আবার ফিরেও এলেন।
টিকাঃ
৫২. মুসনাদু আহমাদ: ১০৪৫। হাদিসের মান: সহিহ।
৫৩. সহিহু মুসলিম: ১৭৭৬।
৫৪. সহিহুল বুখারি: ২৯০৮, সহিহু মুসলিম: ২৩০৭।
📄 দান ও মহানুভবতায় তিনি আদর্শ
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বাধিক দানশীল। রমাজান মাসে তাঁর দানশীলতা অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেড়ে যেত। তখন জিবরাইল (আ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন। আর জিবরাইল (আ) রমাজান মাসের প্রত্যেক রাতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। তাঁরা একে অপরকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন প্রবহমান বায়ুর চেয়েও অধিক দানশীল।'
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কোনো কিছু চাওয়া হলে তিনি কখনো না বলতেন না।'
আনাস বিন মালিক (রা) বলেন, 'ইসলামের নাম করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কিছু চাওয়া হলেই তিনি দিয়ে দিতেন। এক ব্যক্তি তাঁর নিকট আসলো। দুপাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান ভরে যায়-এ পরিমাণ ছাগল তিনি তাকে দান করলেন। সে তার কওমের নিকট ফিরে গিয়ে বলল, "হে আমার গোত্র, তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত বেশি দান করেন যে, তাঁর অভাবের কোনো ভয় নেই।"'
টিকাঃ
৫৫. সহিহুল বুখারি: ৬, সহিহু মুসলিম: ২৩০৮।
৫৬. সহিহুল বুখারি: ৬০৩৪, সহিহু মুসলিম: ২৩১১।
৫৭. সহিহু মুসলিম: ৩৩১২।
📄 আল্লাহভীতিতে তিনি আদর্শ
মুতাররিফ (রহ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখলাম, তিনি নামাজ পড়ছেন আর তাঁর সিনা থেকে জাঁতা পেষার শব্দের মতো কান্নার আওয়াজ আসছে।'
ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, 'আবু বকর (রা) বললেন, "হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে গেছেন!" রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "আমাকে হুদ, ওয়াকিয়া, মুরসালাত, আম্মা ইয়াতা সা-আলুন এবং ইযাশ শামছু কুওয়্যিরাত বুড়ো বানিয়ে ফেলেছে।"' (অর্থাৎ এসব সুরায় বর্ণিত কিয়ামত ও আজাবের আলোচনা আমাকে বুড়ো বানিয়ে ফেলেছে।)
টিকাঃ
৫৮. সুনানু আবি দাউদ: ৯০৪। হাদিসের মান: সহিহ।
৫৯. সুনানুত তিরমিজি: ৩২১৯। হাদিসের মান: সহিহ।
📄 দুনিয়াবিমুখতায় তিনি আদর্শ
একবার উমর (রা) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসেন। তিনি তখন চাটাইয়ের ওপর শায়িত। তাঁর শরীর ও চাটাইয়ের মাঝখানে কিছুই ছিল না। মাথার নিচে আঁশভর্তি চামড়ার একটি বালিশ। মাথার কাছে ঝুলছে কয়েকটি কাঁচা চামড়া। উমর (রা) বলেন, 'আমি দেখলাম, তাঁর পার্শ্বদেশে চাটাইয়ের দাগ পড়ে গেছে। এ অবস্থা দেখে আমি কেঁদে ফেললাম।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 'কাঁদছ কেন?' আমি বলি, 'হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, কাইসার ও কিসরা কত আরামে আছে! অথচ আপনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।' তিনি বললেন, 'তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তাদের জন্য দুনিয়া এবং আমাদের জন্য আখিরাত।'
যখন তিনি সাহাবিদের দুনিয়া ত্যাগের প্রতি উৎসাহিত করছেন এবং আখিরাতের সাথে সম্পর্ক গড়ার প্রতি অনুপ্রাণিত করছেন, তখনও তিনি হজ করছিলেন (উটের পিঠে) একটি পুরাতন জিন ও পালানে বসে; পশমি একটি চাদর ছিল তাঁর গায়ে, যার মূল্য চার দিরহামের মতো।
টিকাঃ
৬০. সহিহুল বুখারি: ৪৯১৩, ৫৮৪৩; সহিহু মুসলিম: ১৪৭৯।
৬১. সুনানু ইবনি মাজাহ: ২৮৯০। আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। হাদিসের মান: সহিহ।