📄 বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তিনি আদর্শ
আয়িশা (রা) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো সহধর্মিণীর প্রতি আমি অতটা ঈর্ষা বোধ করিনি, যতটা খাদিজার (রা) প্রতি করেছি; অথচ তাঁকে আমি দেখিনি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা প্রায়শ বলতেন। কখনো বকরি জবাই করে বিভিন্ন অংশে ভাগ করতেন। তারপর খাদিজার (রা) বান্ধবীদের কাছে পাঠাতেন। আমি প্রায়ই বলতাম, দুনিয়াতে খাদিজা (রা) ছাড়া আর কোনো মেয়ে নেই বুঝি!
তিনি খাদিজার (রা) প্রশংসা করে বলতেন:
إِنَّهَا كَانَتْ، وَكَانَتْ، وَكَانَ لِي مِنْهَا وَلَدٌ
"ও এমন ছিল... এমন ছিল... ওর গর্ভেই আমার সন্তান হয়েছে।"
টিকাঃ
৪২. সহিহুল বুখারি: ৩৮১৮, সহিহু মুসলিম: ২৪৩৫।
📄 বিনয় ও নম্রতায় তিনি আদর্শ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
'আর যেসব মুমিন তোমার অনুসরণ করে, তাদের প্রতি বিনয়ী হও।'
অর্থাৎ তাদের প্রতি অমায়িক আচরণ করুন এবং নম্রতা প্রদর্শন করুন। আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গরিব মুমিন ও অন্যদের সঙ্গে বিনয়, নম্রতা ও কোমলতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
শিশুদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি তাদের সালাম দিতেন। একজন সামান্য দাসীও তাঁর হাত ধরে তাঁকে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেত। তিনি নিজ হাতে জুতো সেলাই করতেন। কাপড়ে তালি লাগাতেন। ছাগলের দুধ দোহন করতেন। ফকির-মিসকিনদের সঙ্গে ওঠা-বসা করতেন। গরিব ও এতিমদের প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে তাদের সঙ্গে চলাফেরা করতেন। কেউ তাঁকে ডাকলে নির্দ্বিধায় সাড়া দিতেন-তা যত তুচ্ছ কাজে হোক না কেন। তিনি অসুস্থদের খোঁজখবর করতেন। জানাজায় হাজির হতেন। গাধায় সওয়ার হতেন। গোলামের ডাকেও সাড়া দিতেন।
টিকাঃ
৪৩. সুরা আশ-শুআরা, ২৬: ২১৫।
৪৪. সহিহুল বুখারি: ৬২৪৭, সহিহু মুসলিম: ২১৬৮। আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত।
৪৫. হাত ধরা থেকে এখানে উদ্দেশ্য হলো নম্রতা ও আনুগত্য। অর্থাৎ দাসী তাঁকে যেখানেই নিয়ে যেতে চাইত, তিনি তাকে অনুসরণ করে সেখানে চলে যেতেন। (ফাতহুল বারি)-অনুবাদক।
৪৬. মুসনাদু আহমাদ: ১১৫৩০। বিশুদ্ধতার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে ইমাম বুখারি (রহ) কিতাবুল আদাবে এই হাদিসটি তালিকান উল্লেখ করেছেন।
৪৭. মুসনাদু আহমাদ: ২৪২২৮। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। হাদিসের মান: সহিহ।
৪৮. মুসনাদু আহমাদ: ২৫৬৬২। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। হাদিসের মান: সহিহ।
৪৯. দেখুন, সহিহু মুসলিম: ২৪১৩।
৫০. সুনানুন নাসায়ি: ১৪১৪। আব্দুল্লাহ বিন আবু আওফা (রা) থেকে বর্ণিত। হাদিসের মান: সহিহ।
৫১. মাদারিজুস সালিকিন: ২/৩২৮।
📄 বীরত্বে তিনি আদর্শ
আলি (রা) বলেন, 'বদরের দিন যখন যুদ্ধ প্রবল আকার ধারণ করল, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে আশ্রয় নিলাম। সেদিন তিনিই ছিলেন আমাদের মাঝে সবচেয়ে তীব্র আক্রমণকারী এবং তিনিই ছিলেন মুশরিকদের সবচেয়ে নিকটে।'
বারা বিন আজিব (রা) বলেন, 'যখন যুদ্ধের প্রচণ্ডতা চলে আসত, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেছনে আত্মরক্ষা করতাম। আর আমাদের মাঝে তারাই ছিল বীর, যারা তাঁর সাথে সামনে এগিয়ে যেতেন।'
আনাস বিন মালিক (রা) বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবচেয়ে সুন্দর। সবচেয়ে বেশি মহানুভব। সবার চেয়ে বেশি বীরত্বের অধিকারী। একরাতে মদীনাবাসী বিকট একটি আওয়াজ শুনল। সবাই আওয়াজের উৎসের দিকে দৌড়াতে লাগল। পথেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে সাক্ষাৎ করলেন, তিনি তখন ওদিক থেকে ফিরছিলেন, সবার আগেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তখন তিনি আবু তালহার (রা) পালানবিহীন একটি ঘোড়ার পিঠে সওয়ার ছিলেন। তাঁর ঘাড়ে তলোয়ার। তিনি বলছিলেন, "ভয়ের কিছু নেই। তোমরা নির্ভয় হও।” এরপর বললেন, "এ ঘোড়াটিকে আমি সাগরের (স্রোতের) মতো গতিশীল পেয়েছি।” অথচ স্বাভাবিকভাবে ঘোড়াটির গতি ছিল ধীর।'
এটি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি মুজিজা। স্বাভাবিকভাবে ঘোড়াটি ধীরগতির হলেও তিনি চড়ার পর সেটি দ্রুতগামী হয়ে গেল। এমনকি সমুদ্রের স্রোতের চেয়েও দ্রুত চলতে লাগল। যে ঘোড়াটি সবার পেছনে থাকত, সে ঘোড়ায় চড়েই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবার আগে, সবার অগোচরে সবকিছু যাচাই করলেন-আবার ফিরেও এলেন।
টিকাঃ
৫২. মুসনাদু আহমাদ: ১০৪৫। হাদিসের মান: সহিহ।
৫৩. সহিহু মুসলিম: ১৭৭৬।
৫৪. সহিহুল বুখারি: ২৯০৮, সহিহু মুসলিম: ২৩০৭।
📄 দান ও মহানুভবতায় তিনি আদর্শ
ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বাধিক দানশীল। রমাজান মাসে তাঁর দানশীলতা অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেড়ে যেত। তখন জিবরাইল (আ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন। আর জিবরাইল (আ) রমাজান মাসের প্রত্যেক রাতে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। তাঁরা একে অপরকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন প্রবহমান বায়ুর চেয়েও অধিক দানশীল।'
জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) বলেন, 'নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কোনো কিছু চাওয়া হলে তিনি কখনো না বলতেন না।'
আনাস বিন মালিক (রা) বলেন, 'ইসলামের নাম করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কিছু চাওয়া হলেই তিনি দিয়ে দিতেন। এক ব্যক্তি তাঁর নিকট আসলো। দুপাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান ভরে যায়-এ পরিমাণ ছাগল তিনি তাকে দান করলেন। সে তার কওমের নিকট ফিরে গিয়ে বলল, "হে আমার গোত্র, তোমরা ইসলাম গ্রহণ করো। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত বেশি দান করেন যে, তাঁর অভাবের কোনো ভয় নেই।"'
টিকাঃ
৫৫. সহিহুল বুখারি: ৬, সহিহু মুসলিম: ২৩০৮।
৫৬. সহিহুল বুখারি: ৬০৩৪, সহিহু মুসলিম: ২৩১১।
৫৭. সহিহু মুসলিম: ৩৩১২।