📄 হায়া ও লজ্জায় তিনি আদর্শ
আবু সাইদ খুদরি (রা) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্তঃপুরের কুমারী মেয়ের চেয়েও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন। কোনো অপছন্দনীয় জিনিস তাঁর চোখে পড়লে ব্যাপারটি আমরা তাঁর চেহারা দেখেই বুঝতে পারতাম।'
টিকাঃ
৩৫. অর্থাৎ অপছন্দনীয় জিনিস দেখলে অত্যধিক হায়া ও শরমের কারণে তিনি মুখে বলতেন না। বরং তাঁর চেহারার রং পরিবর্তিত হয়ে যেত। এতেই আমরা তাঁর অপছন্দের বিষয়টি বুঝতে পারতাম। (আল-মিনহাজ শারহু সহিহি মুসলিম ইবনি হাজ্জাজ)- অনুবাদক।
৩৬. সহিহুল বুখারি: ৬১০২, সহিহু মুসলিম: ২৩২০।
📄 দয়া ও স্নেহে তিনি আদর্শ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
'আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।'
আবু জার (রা) বলেন, 'একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে সালাত আদায় করেন। একটি আয়াত পড়ে পড়ে সুদীর্ঘ রুকু এবং সিজদা করেন। এভাবে সকাল হয়ে যায়। আয়াতটি হলো-
إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
"আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন, তবে তারা তো আপনারই বান্দা। আর যদি তাদের ক্ষমা করেন, তবে আপনি তো পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।”
সকাল হলে আমি তাকে বলি, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি তো এই আয়াত পড়ে পড়ে রুকু ও সিজদা করে সকাল করে ফেললেন! তিনি বলেন:
إِنِّي سَأَلْتُ رَبِّي الشَّفَاعَةَ لِأُمَّتِي، وَهِيَ نَائِلَةٌ لِمَنْ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا
"আমার উম্মতের জন্য আমার রবের কাছে আমি শাফাআত প্রার্থনা করেছি। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে এই শাফাআতের অধিকারী হবে।”'
মালিক বিন হুওয়াইরিস (রা) বলেন, 'একবার আমার গোত্রের একদল লোকের সঙ্গে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসি। আমরা বিশ রাত তাঁর সাহচর্যে থাকি। তিনি খুবই দয়ালু ও বন্ধুবৎসল ছিলেন। আমাদের মধ্যে তিনি যখন পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে যাওয়ার আগ্রহ দেখেন, তখন তিনি বলেন:
ارْجِعُوا فَكُونُوا فِيهِمْ، وَعَلِّمُوهُمْ، وَصَلُّوا، فَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ فَلْيُؤَذِّنُ لَكُمْ أَحَدُكُمْ، وَلْيَؤْمُكُمْ أَكْبَرُكُمْ
"তোমরা পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে যাও। তাদের দ্বীন শেখাও। সালাত আদায় কোরো। যখন সালাতের ওয়াক্ত হবে একজন আজান দেবে এবং তোমাদের মধ্যে বয়সে যে বড় সে ইমামতি করবে।"
টিকাঃ
৩৭. সুরা আল-আম্বিয়া, ২১: ১০৭।
৩৮. সুরা আল-মায়িদা, ৫: ১১৮।
৩৯. মুসনাদু আহমাদ: ২০৮২১। শাইখ শুআইব আরনাউত (রহ) হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
৪০. যখন অন্য সব বৈশিষ্ট্যে সবাই সমান হবে, তখন যে বড় সে-ই ইমাম হবে। ওই দলের সবাই যেহেতু অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে সমান, তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বয়সের কথা বলেছেন। কারণ, তাঁরা একসঙ্গে হিজরত করেছে, ইসলাম গ্রহণ করেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সান্নিধ্য লাভ করেছে এবং বিশ রাত তাঁর সাহচর্যে কাটিয়েছে। সুতরাং তাঁর থেকে ইলম অর্জনে সবাই সমান। এখন বয়স ব্যতীত প্রাধান্য দেওয়ার উপযোগী আর কোনো বৈশিষ্ট্য রইল না।- অনুবাদক।
৪১. সহিহুল বুখারি: ৬২৮, সহিহু মুসলিম ৬৭৪।
📄 বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তিনি আদর্শ
আয়িশা (রা) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো সহধর্মিণীর প্রতি আমি অতটা ঈর্ষা বোধ করিনি, যতটা খাদিজার (রা) প্রতি করেছি; অথচ তাঁকে আমি দেখিনি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা প্রায়শ বলতেন। কখনো বকরি জবাই করে বিভিন্ন অংশে ভাগ করতেন। তারপর খাদিজার (রা) বান্ধবীদের কাছে পাঠাতেন। আমি প্রায়ই বলতাম, দুনিয়াতে খাদিজা (রা) ছাড়া আর কোনো মেয়ে নেই বুঝি!
তিনি খাদিজার (রা) প্রশংসা করে বলতেন:
إِنَّهَا كَانَتْ، وَكَانَتْ، وَكَانَ لِي مِنْهَا وَلَدٌ
"ও এমন ছিল... এমন ছিল... ওর গর্ভেই আমার সন্তান হয়েছে।"
টিকাঃ
৪২. সহিহুল বুখারি: ৩৮১৮, সহিহু মুসলিম: ২৪৩৫।
📄 বিনয় ও নম্রতায় তিনি আদর্শ
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ
'আর যেসব মুমিন তোমার অনুসরণ করে, তাদের প্রতি বিনয়ী হও।'
অর্থাৎ তাদের প্রতি অমায়িক আচরণ করুন এবং নম্রতা প্রদর্শন করুন। আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গরিব মুমিন ও অন্যদের সঙ্গে বিনয়, নম্রতা ও কোমলতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
শিশুদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি তাদের সালাম দিতেন। একজন সামান্য দাসীও তাঁর হাত ধরে তাঁকে যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যেত। তিনি নিজ হাতে জুতো সেলাই করতেন। কাপড়ে তালি লাগাতেন। ছাগলের দুধ দোহন করতেন। ফকির-মিসকিনদের সঙ্গে ওঠা-বসা করতেন। গরিব ও এতিমদের প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে তাদের সঙ্গে চলাফেরা করতেন। কেউ তাঁকে ডাকলে নির্দ্বিধায় সাড়া দিতেন-তা যত তুচ্ছ কাজে হোক না কেন। তিনি অসুস্থদের খোঁজখবর করতেন। জানাজায় হাজির হতেন। গাধায় সওয়ার হতেন। গোলামের ডাকেও সাড়া দিতেন।
টিকাঃ
৪৩. সুরা আশ-শুআরা, ২৬: ২১৫।
৪৪. সহিহুল বুখারি: ৬২৪৭, সহিহু মুসলিম: ২১৬৮। আনাস বিন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত।
৪৫. হাত ধরা থেকে এখানে উদ্দেশ্য হলো নম্রতা ও আনুগত্য। অর্থাৎ দাসী তাঁকে যেখানেই নিয়ে যেতে চাইত, তিনি তাকে অনুসরণ করে সেখানে চলে যেতেন। (ফাতহুল বারি)-অনুবাদক।
৪৬. মুসনাদু আহমাদ: ১১৫৩০। বিশুদ্ধতার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে ইমাম বুখারি (রহ) কিতাবুল আদাবে এই হাদিসটি তালিকান উল্লেখ করেছেন।
৪৭. মুসনাদু আহমাদ: ২৪২২৮। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। হাদিসের মান: সহিহ।
৪৮. মুসনাদু আহমাদ: ২৫৬৬২। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। হাদিসের মান: সহিহ।
৪৯. দেখুন, সহিহু মুসলিম: ২৪১৩।
৫০. সুনানুন নাসায়ি: ১৪১৪। আব্দুল্লাহ বিন আবু আওফা (রা) থেকে বর্ণিত। হাদিসের মান: সহিহ।
৫১. মাদারিজুস সালিকিন: ২/৩২৮।