📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 সচ্চরিত্রের আদর্শ নমুনা

📄 সচ্চরিত্রের আদর্শ নমুনা


আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ

'নিশ্চয় তুমি মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।'

কুরআনই ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চরিত্র। যে বিষয়ে কুরআন সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে, তিনিও করতেন আর যে বিষয়ে কুরআন কঠোর হয়েছে, তিনিও হতেন। তিনি স্বভাবগতভাবেই অশালীন ছিলেন না; আবার স্বেচ্ছায়ও অশালীন কথা ও কর্মে লিপ্ত হতেন না। হাটবাজারে গিয়ে তিনি কখনো হট্টগোল করতেন না। তিনি অনিষ্টের বদলা অনিষ্ট দিয়ে দিতেন না; বরং অনিষ্টকারীকে অন্তর থেকে মাফ করে দিতেন এবং প্রকাশ্যেও তার প্রতি ক্ষমাসুলভ আচরণ করতেন।

উম্মুল মুমিনিন সাফিয়্যা বিনতে হুয়াই (রা) বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেয়ে উত্তম চরিত্রের কাউকে দেখিনি।'

আনাস (রা) বলেন, 'আল্লাহর কসম, আমি নয় বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমত করেছি। এই দীর্ঘ সময়ে কোনো দিন এমন হয়নি-আমি কোনো কাজ করেছি আর তিনি আমাকে বলেছেন, "এই কাজ কেন করেছ?" কিংবা আমি কোনো কাজ করিনি আর তিনি বলেছেন, "এই কাজ কেন করোনি?"'

আনাস (রা) আরেক হাদিসে বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। একবার তিনি আমাকে একটি কাজে পাঠান। আমি বলি, আল্লাহর কসম, আমি যাব না। কিন্তু আমার অন্তরে ছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কাজে আমাকে পাঠাচ্ছেন আমি যাব। তারপর আমি বের হয়ে হাঁটতে থাকি। একসময় বাজারে খেলাধুলারত কিছু ছেলেদের পাশ দিয়ে যাই। হঠাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেছন থেকে আমার ঘাড় ধরেন। আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি তিনি হাসছেন। তিনি বলেন:

يَا أُنَيْسُ أَذَهَبْتَ حَيْثُ أَمَرْتُكَ؟

"আদরের আনাস, আমি যেখানে যেতে বলেছিলাম, তুমি কি সেখানে গিয়েছ?"

আমি বলি, "হাঁ, আমি যাচ্ছি হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম !"'

টিকাঃ
২৪. সুরা আল-কলাম, ৬৮:৪।
২৫. সহিহু মুসলিম: ৭৪৬। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত।
২৬. সহিহুল বুখারি: ৩৫৫৯, সহিহু মুসলিম: ২৩২১। আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা) থেকে বর্ণিত।
২৭. সুনানুত তিরমিজি: ২০১৬। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। ইমাম তিরমিজি (রহ) বলেছেন, 'হাদিসটি হাসান সহিহ।' থেকে বর্ণিত। ইমাম তিরমিজি (রহ) বলেছেন, 'হাদিসটি হাসান সহিহ।'
২৮. আল-মুজামুল আওসাত লিত তাবারানি: ২৫৭৮। ইবনে হাজার (রহ) বলেন, 'হাদিসটির সনদ হাসান।' (ফাতহুল বারি: ৫৭৫/৬)
২৯. সহিহুল বুখারি: ২৭৬৮, সহিহু মুসলিম: ২৩১০।
৩০. এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, আনাস (রা) কীভাবে প্রকাশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হুকুম অমান্য করলেন এবং মিথ্যা কসম খেলেন? আবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই-বা কেন কসম করার পরও তাঁকে ওই কাজে পাঠালেন? এর উত্তরে বলা হবে, তিনি তখন ছোট ছিলেন। শরিয়তের আহকাম তার ওপর প্রযোজ্য ছিল না। (আওনুল মাবুদ) -অনুবাদক।
৩১. সহিহু মুসলিম: ২৩১০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 ক্ষমা ও সহিষ্ণুতায় তিনি আদর্শ

📄 ক্ষমা ও সহিষ্ণুতায় তিনি আদর্শ


আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ

'আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি কোমল-হৃদয় হয়েছিলে। যদি তুমি রূঢ় ও কঠিনচিত্ত হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ হতে সরে পড়ত।'

আনাস বিন মালিক (রা) বলেন, 'একবার আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে যাচ্ছিলাম। তখন তাঁর গায়ে মোটা পাড়ের একটি নাজরানিং চাদর ছিল। এক বেদুইন তাঁর কাছে এসে চাদর ধরে হেঁচকা টান দেয়। আমি দেখি, এই প্রচণ্ড টানের ফলে তাঁর কাঁধ ও ঘাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে চাদরের পাড়ের দাগ বসে যায়। তারপর সে বলে, "তোমার কাছে আল্লাহর যে সম্পদ আছে, তা থেকে আমাকে কিছু দিতে বলো।" রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে হাসেন এবং তাকে কিছু দেওয়ার আদেশ দেন।'

টিকাঃ
৩২. সুরা আলি-ইমরান, ৩: ১৫৯।
৩৩. 'নাজরান' সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত ইয়ামানের সীমান্তবর্তী একটি প্রদেশ।- অনুবাদক।
৩৪. সহিহুল বুখারি: ৩১৪৯, সহিহু মুসলিম: ১০৫৭।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 হায়া ও লজ্জায় তিনি আদর্শ

📄 হায়া ও লজ্জায় তিনি আদর্শ


আবু সাইদ খুদরি (রা) বলেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্তঃপুরের কুমারী মেয়ের চেয়েও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন। কোনো অপছন্দনীয় জিনিস তাঁর চোখে পড়লে ব্যাপারটি আমরা তাঁর চেহারা দেখেই বুঝতে পারতাম।'

টিকাঃ
৩৫. অর্থাৎ অপছন্দনীয় জিনিস দেখলে অত্যধিক হায়া ও শরমের কারণে তিনি মুখে বলতেন না। বরং তাঁর চেহারার রং পরিবর্তিত হয়ে যেত। এতেই আমরা তাঁর অপছন্দের বিষয়টি বুঝতে পারতাম। (আল-মিনহাজ শারহু সহিহি মুসলিম ইবনি হাজ্জাজ)- অনুবাদক।
৩৬. সহিহুল বুখারি: ৬১০২, সহিহু মুসলিম: ২৩২০।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 দয়া ও স্নেহে তিনি আদর্শ

📄 দয়া ও স্নেহে তিনি আদর্শ


আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ

'আমি তো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।'

আবু জার (রা) বলেন, 'একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে সালাত আদায় করেন। একটি আয়াত পড়ে পড়ে সুদীর্ঘ রুকু এবং সিজদা করেন। এভাবে সকাল হয়ে যায়। আয়াতটি হলো-

إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

"আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন, তবে তারা তো আপনারই বান্দা। আর যদি তাদের ক্ষমা করেন, তবে আপনি তো পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।”

সকাল হলে আমি তাকে বলি, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি তো এই আয়াত পড়ে পড়ে রুকু ও সিজদা করে সকাল করে ফেললেন! তিনি বলেন:

إِنِّي سَأَلْتُ رَبِّي الشَّفَاعَةَ لِأُمَّتِي، وَهِيَ نَائِلَةٌ لِمَنْ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا

"আমার উম্মতের জন্য আমার রবের কাছে আমি শাফাআত প্রার্থনা করেছি। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক না করে মৃত্যুবরণ করবে, সে এই শাফাআতের অধিকারী হবে।”'

মালিক বিন হুওয়াইরিস (রা) বলেন, 'একবার আমার গোত্রের একদল লোকের সঙ্গে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসি। আমরা বিশ রাত তাঁর সাহচর্যে থাকি। তিনি খুবই দয়ালু ও বন্ধুবৎসল ছিলেন। আমাদের মধ্যে তিনি যখন পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে যাওয়ার আগ্রহ দেখেন, তখন তিনি বলেন:

ارْجِعُوا فَكُونُوا فِيهِمْ، وَعَلِّمُوهُمْ، وَصَلُّوا، فَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ فَلْيُؤَذِّنُ لَكُمْ أَحَدُكُمْ، وَلْيَؤْمُكُمْ أَكْبَرُكُمْ

"তোমরা পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে যাও। তাদের দ্বীন শেখাও। সালাত আদায় কোরো। যখন সালাতের ওয়াক্ত হবে একজন আজান দেবে এবং তোমাদের মধ্যে বয়সে যে বড় সে ইমামতি করবে।"

টিকাঃ
৩৭. সুরা আল-আম্বিয়া, ২১: ১০৭।
৩৮. সুরা আল-মায়িদা, ৫: ১১৮।
৩৯. মুসনাদু আহমাদ: ২০৮২১। শাইখ শুআইব আরনাউত (রহ) হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।
৪০. যখন অন্য সব বৈশিষ্ট্যে সবাই সমান হবে, তখন যে বড় সে-ই ইমাম হবে। ওই দলের সবাই যেহেতু অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে সমান, তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বয়সের কথা বলেছেন। কারণ, তাঁরা একসঙ্গে হিজরত করেছে, ইসলাম গ্রহণ করেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সান্নিধ্য লাভ করেছে এবং বিশ রাত তাঁর সাহচর্যে কাটিয়েছে। সুতরাং তাঁর থেকে ইলম অর্জনে সবাই সমান। এখন বয়স ব্যতীত প্রাধান্য দেওয়ার উপযোগী আর কোনো বৈশিষ্ট্য রইল না।- অনুবাদক।
৪১. সহিহুল বুখারি: ৬২৮, সহিহু মুসলিম ৬৭৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00