📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 তাঁদের পথে চলুন...

📄 তাঁদের পথে চলুন...


আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পূর্ববর্তী নবি-রাসূলগণের পথে চলার আদেশ দিয়েছেন-

أُولَئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهُ

'তাঁদেরকে আল্লাহ তাআলা সৎপথে পরিচালিত করেছেন, সুতরাং তুমি তাঁদের পথের অনুসরণ করো।'

ইবনে কাসির (রহ) বলেন, 'فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِ -এর অর্থ হলো, তুমি তাঁদের পথে চলো এবং তাঁদের অনুসরণ করো। নির্দেশটি প্রত্যক্ষভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য হলেও পরোক্ষভাবে তাঁর উম্মতও এর আওতাভুক্ত।'

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ) বলেন, 'পূর্ববর্তী নবিগণের ইতিহাস মুমিনদের জন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। তারা আগের যুগের নবিদের চেয়েও কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তবুও তারা নিরাশ হবে না। কেননা, তারা জানে তাদের চেয়ে উত্তম লোকেরাও পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিলেন। আর দিন শেষে মুমিনদের পরিণাম সর্বদা কল্যাণকরই হয়। তাই সন্দিগ্ধ লোকেরা যেন নিশ্চিন্ত হয়, গুনাহগারেরা যেন তাওবা করে নেয় আর মুমিনদের ইমান যেন সুদৃঢ় হয়। এই অর্থে পূর্ববর্তী নবিগণের অনুসরণ সঠিক।'

টিকাঃ
৩. সুরা আল-আনআম, ৬: ৯০।
৪. তাফসিরু ইবনি কাসির: ২/১৯০।
৫. মাজমুউল ফাতাওয়া: ১৫/১৭৮।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 নবি-রাসূলের অনুসরণের নির্দেশ এসেছে যেসব বিষয়ে

📄 নবি-রাসূলের অনুসরণের নির্দেশ এসেছে যেসব বিষয়ে


* আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য
আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্য নবি-রাসূলগণের জীবনের সবচেয়ে আলোকিত বৈশিষ্ট্য। মানুষের মধ্যে তাঁরাই ছিলেন সর্বাধিক ইবাদতগুজার, সবচেয়ে বেশি সালাত আদায়কারী এবং আল্লাহর সামনে সর্বোচ্চ বিনয়ী। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَاذْكُرْ عِبَادَنَا إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ أُولِي الْأَيْدِي وَالْأَبْصَارِ

'স্মরণ করো, আমার বান্দা ইবরাহিম (আ), ইসহাক (আ) ও ইয়াকুবের (আ) কথা; তাঁরা ছিল শক্তিশালী ও দূরদর্শী।'

আতা আল-খুরাসানি (রহ) বলেন, 'أُولِي الْأَيْدِي وَالْأَبْصَارِ -এর অর্থ হলো, আল্লাহর ইবাদতে সামর্থ্যবান এবং আল্লাহর হুকুম সম্পর্কে জ্ঞাত।'

কাতাদা (রহ) বলেন, 'তাঁদেরকে ইবাদতের শক্তি ও দ্বীনের প্রজ্ঞা দান করা হয়েছিল।'

নবি-রাসূলগণের ইবাদতের দৃষ্টান্ত অগণিত। ইবরাহিম (আ) (আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে) বলেন:

رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ

'হে আমার রব, আমাকে সালাত কায়িমকারী করো এবং আমার বংশধরদের মধ্য হতেও। হে আমাদের রব, আমার দোয়া কবুল করো।'

ইসমাইল (আ)-এর প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ وَكَانَ عِنْدَ رَبِّهِ مَرْضِيًّا

'তিনি তাঁর পরিজনবর্গকে সালাত ও জাকাতের নির্দেশ দিতেন এবং তিনি ছিলেন তাঁর রবের সন্তোষভাজন।'

ইবরাহিম (আ), ইসহাক (আ) ও ইয়াকুব (আ)-এর প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ وَإِقَامَ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءَ الزَّكَاةِ وَكَانُوا لَنَا عَابِدِينَ

'আর তাঁদের করেছিলাম নেতা; তাঁরা আমার নির্দেশ অনুসারে মানুষকে পথ প্রদর্শন করত; তাঁদের প্রতি ওহি প্রেরণ করেছিলাম সৎকর্ম করতে, সালাত কায়িম করতে এবং জাকাত প্রদান করতে; তাঁরা আমারই ইবাদত করত।'

প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পুরো জীবনটাই রচিত হয়েছে আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও আনুগত্যে। তাঁর পূর্বাপর সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা তাঁকে বলেন:

وَمِنَ اللَّيْلِ فَاسْجُدْ لَهُ وَسَبِّحْهُ لَيْلًا طَوِيلًا

'আর রাত্রির কিয়দাংশ তাঁর প্রতি সিজদাবনত হও এবং রাত্রির দীর্ঘ সময় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো।'

অন্য আয়াতে বলেন:

فَاعْبُدْهُ وَاصْطَبِرْ لِعِبَادَتِهِ هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا

'সুতরাং তাঁরই ইবাদত করো এবং তাঁর ইবাদতে ধৈর্যশীল থাকো। তুমি কি তাঁর সমগুণসম্পন্ন কাউকে জানো?'

অন্যত্র বলেন:

وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةٌ لَكَ عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا

'আর রাত্রির কিছু অংশ তাহাজ্জুদ কায়িম করবে-এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, তোমার রব তোমাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে।'

* আল্লাহর জিকির, অত্যধিক বিনয় ও দোয়া
ইবাদতের পাশাপাশি নবি-রাসূলগণ অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করতেন। মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে বিনয়াবনত হতেন। কায়মনোবাক্যে দোয়া করতেন।

স্বীয় প্রয়োজন পূরণের জন্য তাঁরা কীভাবে আল্লাহর দরবারে কাকুতিমিনতি করতেন, কীভাবে তাঁরা ভয় ও আশা নিয়ে রবের দরবারে হাত তুলতেন তার বর্ণনা কুরআনে এসেছে-

وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ . فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِنْ ضُرٍّ وَآتَيْنَاهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُمْ مَعَهُمْ رَحْمَةٌ مِنْ عِنْدِنَا وَذِكْرَى لِلْعَابِدِينَ

'আর স্মরণ করো, আইয়ুবের (আ) কথা, সে তাঁর রবকে আহ্বান করে বলেছিল, "আমি দুঃখ-কষ্টে পড়েছি, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু!” তখন আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিলাম, তাঁর দুঃখ-কষ্ট দূরীভূত করে দিলাম, তাঁর পরিবার-পরিজন ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সঙ্গে তাদের মতো আরও দিলাম আমার রহমতরূপে এবং ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশরূপে।'

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:

وَذَا النُّونِ إِذْ ذَهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَنْ لَنْ نَقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنْجِي الْمُؤْمِنِينَ . وَزَكَرِيَّا إِذْ نَادَى رَبَّهُ رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ . فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَوَهَبْنَا لَهُ يَحْيَى وَأَصْلَحْنَا لَهُ زَوْجَهُ إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ

'আর স্মরণ করো ইউনুসের (আ) কথা, যখন সে ক্রোধভরে বের হয়ে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল আমি তাঁর জন্য শাস্তি নির্ধারণ করব না। অতঃপর সে অন্ধকার হতে আহ্বান করেছিল, "আপনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই; আপনি পবিত্র, মহান! আমি তো সীমালঙ্ঘনকারী।" তখন আমি তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাঁকে উদ্ধার করেছিলাম দুশ্চিন্তা হতে এবং এভাবেই আমি মুমিনদের উদ্ধার করে থাকি। আর স্মরণ করো জাকারিয়ার (আ) কথা, যখন সে তাঁর রবকে আহ্বান করে বলেছিল, "হে আমার রব, আমাকে একা রাখবেন না, আপনি তো শ্রেষ্ঠ মালিকানার অধিকারী।" অতঃপর আমি তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাঁকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়া (আ) এবং তাঁর জন্য তাঁর স্ত্রীকে যোগ্যতাসম্পন্ন করেছিলাম। তাঁরা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করত, তাঁরা আমাকে ডাকত আশা ও ভীতির সঙ্গে এবং তাঁরা ছিলেন আমার নিকট বিনীত।'

প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা আল্লাহর আশ্রয় কামনা করতেন। বিনয়াবনত হয়ে কায়মনোবাক্যে দোয়া করতেন মহান রবের দরবারে। বিশেষ করে যখন কোনো বিপদের সম্মুখীন হতেন, অতিশয় কাকুতিমিনতি সহকারে আল্লাহর দরবারে হাত পাততেন।

বদর যুদ্ধের দিন তিনি প্রাণভরে মুনাজাত করেছিলেন মহান রবের সমীপে। দেহ-মন উজাড় করে তিনি নিজের জন্য এবং মুমিনদের জন্য সাহায্যের নিবেদন করেছিলেন। উমর বিন খাত্তাব (রা) বলেন, 'বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিবলামুখী হয়ে দুহাত প্রসারিত করে মহান আল্লাহর দরবারে উচ্চস্বরে দোয়া করেন--

اللهُمَّ أَنْجِزْ لِي مَا وَعَدْتَنِي ، اللهُمَّ آتِ مَا وَعَدْتَنِي، اللهُمَّ إِنْ تُهْلِكُ هَذِهِ الْعِصَابَةَ مِنْ أَهْلِ الْإِسْلَامِ لَا تُعْبَدُ فِي الْأَرْضِ

'হে আল্লাহ, আপনি আমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়ন করুন। হে আল্লাহ, আপনি আপনার ওয়াদা পূর্ণ করুন। হে আল্লাহ, আপনি যদি ইসলামের ছোট্ট এই কাফেলাটিকে ধ্বংস করে দেন, পৃথিবীতে আর আপনার ইবাদত করা হবে না।'

তিনি কিবলামুখী হয়ে দুহাত প্রসারিত করে এভাবে উচ্চস্বরে দোয়া করতে থাকেন। একপর্যায়ে তাঁর কাঁধ থেকে চাদর পড়ে যায়। আবু বকর (রা) এসে চাদরটি নিয়ে তাঁর কাঁধে তুলে দেন। তারপর পেছন থেকে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেন, 'হে আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, রবের সমীপে আপনার এতটুকু দোয়াই যথেষ্ট। তিনি নিশ্চয় আপনার সঙ্গে তাঁর কৃত ওয়াদা পূর্ণ করবেন।'

* আল্লাহর স্মরণে ভয়, কান্না ও রোনাজারি
আল্লাহ তাআলা নবিদের প্রশংসা করে বলেন:

أُولَئِكَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ مِنْ ذُرِّيَّةِ آدَمَ وَمِمَّنْ حَمَلْنَا مَعَ نُوحٍ وَمِنْ ذُرِّيَّةِ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْرَائِيلَ وَمِمَّنْ هَدَيْنَا وَاجْتَبَيْنَا إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُ الرَّحْمَنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا

'এঁরাই তাঁরা, নবিদের মধ্যে যাঁদের আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, আদমের (আ) বংশ হতে ও যাঁদের আমি নুহের (আ) সঙ্গে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম এবং ইবরাহিম (আ) ও ইসরাইলের (আ) বংশোদ্ভূত ও যাঁদের আমি পথনির্দেশ করেছিলাম আর মনোনীত করেছিলাম; যাঁদের নিকট দয়াময়ের আয়াত তিলাওয়াত করা হলে তাঁরা সিজদায় লুটিয়ে পড়ত ক্রন্দন করতে করতে।'

মানুষের মধ্যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করতেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি বলতেন:

وَاللَّهِ، إِنِّي لَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ أَخْشَاكُمْ لِلَّهِ، وَأَعْلَمَكُمْ بِمَا أَتَّقِي

'আল্লাহ কসম, আশা করি, তোমাদের মধ্যে আমিই আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি এবং বর্জনীয় বিষয়গুলো সম্পর্কে সবার চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখি।'

প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই দোয়ায় বলতেন:

يَا مُقَلِّبَ القُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ

'হে অন্তর পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন।'

* আল্লাহর মারিফাত অর্জনে নবিদের অনুসৃত পন্থার অনুসরণ
আল্লাহ তাআলা নবি-রাসূলগণকে স্বীয় মারিফাত দ্বারা ধন্য করেছেন। দান করেছেন পরিপূর্ণ ইমান ও অবিচল বিশ্বাস। মানুষের মধ্যে তাঁরাই আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী।

বান্দা যত বেশি আল্লাহকে জানবে, তত বেশি তাঁকে ভয় পাবে, ভালোবাসবে, সম্মান করবে, তাঁর সামনে বিনয়াবনত হবে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর ইবাদত করবে।

ইবনুল কাইয়িম (রহ) বলেন, 'দুনিয়া ও আখিরাতে সৌভাগ্য ও সাফল্যের অধিকারী হতে হলে নবিদের অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। তাঁদের কথা ও কর্মই ভালো ও মন্দ নির্ণয়ের একমাত্র মাপকাঠি। তাঁদের অনুসরণ ব্যতীত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কোনো উপায় নেই।'

বিশুদ্ধ জ্ঞান, সঠিক কর্ম ও উত্তম চরিত্রের একমাত্র উৎস নবিদের সিরাত এবং তাঁদের ওপর অবতীর্ণ ওহি। তাঁদের কথা, কর্ম ও চরিত্রের কষ্টিপাথরে বিচার করা হবে পৃথিবীর যাবতীয় কথা, কর্ম ও চরিত্রের শুদ্ধাশুদ্ধি। তাঁদের অনুসরণের মাপকাঠিতেই নির্ণয় করা হবে কারা সঠিক পথপ্রাপ্ত এবং কারা পথভ্রষ্ট।

জীবের জন্য জীবনের, রুহের জন্য হায়াতের কিংবা চোখের জন্য দৃষ্টির যতটা না প্রয়োজন, মানুষের মুক্তির জন্য নবিদের তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন। যত প্রয়োজনই আপনি কল্পনা করুন না কেন, বান্দার নাজাতের জন্য রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজন তার চেয়ে সর্বদা অধিক হবে।

ওই ব্যক্তির ব্যাপারে আপনার কী ধারণা, জীবনপথে চলতে গিয়ে যার পদচিহ্ন আপনার দৃষ্টি থেকে হারিয়ে গেলে কিংবা যার নির্দেশনা ও কর্মপন্থা এক মুহূর্তের জন্য বিস্মৃত হলে আপনার অন্তর সম্পূর্ণরূপে বিভ্রান্ত হয়ে যায়, ডাঙায় তোলা মাছের ন্যায় ছটফট করে কিংবা গনগনে উনুনে বসানো কড়াইয়ে রাখা জীবন্ত মাছের ন্যায় তড়পাতে থাকে!

বান্দার হৃদয় যখন রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনীত শরিয়ত থেকে বিচ্যুত হয়, তার অবস্থা ওই মাছের চেয়েও বহুগুণে খারাপ হয়। তবে জীবন্ত অন্তরই কেবল তা উপলব্ধি করতে পারে। মৃত মানুষ কি আঘাতের ব্যথা অনুভব করতে পারে?

যেহেতু বান্দার উভয় জাহানের সাফল্য নির্ভর করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণের ওপর, তাই যে ব্যক্তি নিজের কল্যাণ চায়, সৌভাগ্যবান হতে ভালোবাসে এবং আখিরাতে নাজাত কামনা করে-তার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিরাত জানা এবং তাঁর আনীত শরিয়তের জ্ঞান লাভ করা অপরিহার্য; যাতে সে মূর্খ ও অজ্ঞদের ভিড় থেকে বের হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসারীদের দলে শামিল হতে পারে।

মানুষের মধ্যে কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করার চেষ্টা করে, কেউ অবহেলা ও শৈথিল্য প্রদর্শন করে, আবার কেউ অনুসরণের নিয়ামত থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হয়। এটি আল্লাহরই অনুগ্রহ-যাকে ইচ্ছা তিনি দান করেন। আল্লাহ তো মহা অনুগ্রহশীল।'

টিকাঃ
৬. সুরা সাদ, ৩৮:৪৫।
৭. মাজমুউল ফাতাওয়া: ১৯/১৭০
৮. সুরা ইবরাহিম, ১৪:৪০
৯. সুরা মারইয়াম, ১৯: ৫৫।
১০. সুরা আল-আম্বিয়া, ২১: ৭৩।
১১. সুরা আল-ইনসান, ৭৬: ২৬।
১২. সুরা মারইয়াম, ১৯: ৬৫।
১৫. সুরা আল-আম্বিয়া, ২১: ৮৭-৯০।
১৬. সহিহু মুসলিম: ১৭৬৩।
১৭. এটি আয়াতে সিজদা। তিলাওয়াতকারীর ওপর সিজদা করা ওয়াজিব।
১৮. সুরা মারইয়াম, ১৯: ৫৮।
১৯. সহিহুল বুখারি: ২০, সহিহু মুসলিম: ১১১০। বর্ণনাটি আয়িশা (রা)-এর সূত্রে মুসলিম থেকে উদ্ধৃত।
২০. সুনানুত তিরমিজি: ৩৫২২। উম্মে সালামাহ (রা) থেকে বর্ণিত। ইমাম তিরমিজি (রহ) হাদিসটিকে 'হাসান' বলেছেন।
২১. জাদুল মাআদ ১/৬৯।

📘 যেমন ছিলেন তিনি ﷺ > 📄 রাসূল ﷺ-এর অনুসরণ কেন করব?

📄 রাসূল ﷺ-এর অনুসরণ কেন করব?


* পরিপূর্ণ মানুষের আদর্শ নমুনা
আল্লাহ তাআলা আপন জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে তাঁকে নির্বাচন করেছেন এবং আদর্শ হিসেবে পেশ করেছেন মানবজাতির সামনে। আল্লাহ তাআলার নিখুঁত তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছে তাঁর পূত-পবিত্র জীবন। তাই তাঁর মুবারক সিরাত সম্পর্কে জানা আমাদের জন্য অতীব জরুরি। কেননা, তাঁর জীবনাদর্শের অনুসরণই মানুষের মুক্তির একমাত্র উপায়।

* আল্লাহ তাআলার নির্দেশ
নবি-রাসূলের অনুসরণের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন:

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللهَ كَثِيرًا

'তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।'

অন্য আয়াতে বলেন:

فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

'সুতরাং যাঁরা রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশের বিরুদ্ধাচারণ করে তারা সতর্ক হোক যে, তাদের ওপর নেমে আসবে বিপর্যয় অথবা আপতিত হবে মর্মন্তুদ শাস্তি।'

* নিষ্পাপ ও নিষ্কলুষ জীবনের অধিকারী
আল্লাহ তাআলা তাঁকে সব ধরনের পাপ ও পদস্খলন থেকে হিফাজত করেছেন। সামান্য অসংগতির ওপরও তিনি কখনো স্থির থাকেননি। এমন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত সত্তাই অনুসরণীয় হওয়ার যোগ্য।

* শিক্ষণীয় দৃষ্টান্তে ভরপুর
মানবজীবনের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও নির্দেশনা ছড়িয়ে আছে সিরাতুন্নবির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরতে পরতে। ইমান ও তাওহিদ, সততা ও সচ্চরিত্র, আদব ও শিষ্টাচার, সবর ও শোকর, দাওয়াত ও জিহাদ-এককথায় দ্বীন ও দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি বিষয়ে আপনি পর্যাপ্ত দৃষ্টান্ত খুঁজে পাবেন তাঁর জীবনে।

* রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ সাফল্য ও বিজয়ের পূর্বশর্ত
আমরা যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা, কর্ম ও শিষ্টাচারের অনুসরণ না করি, তবে কখনো বিজয় ও সাফল্য লাভ করতে পারব না।

* নবিজীবনের প্রতিটি দিকই অনুকরণীয়
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি সন্তানের জনক ছিলেন না? তাঁর কি স্ত্রী ছিল না? তাঁর কি ভাই ছিল না? তাঁর কি বন্ধু ছিল না? তিনি কি শাসক ছিলেন না? তিনি কি নেতা ছিলেন না? আল্লাহ তাআলা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নবি-ব্যক্তিত্বকে কি আমাদের জন্য আদর্শ বানাননি?

* অনুসরণের তাগিদেই সিরাত অধ্যয়ন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুসরণ করতে হলে প্রথমে আপনাকে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করতে হবে-

কীভাবে আপনি তাঁর নির্দেশিত পথে চলবেন?
তাঁর সুন্নাহর অনুসরণের রূপরেখা কী?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবজাতির জীবনাদর্শ হওয়ার তাৎপর্য কী?

আর এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হলে আপনাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিরাত গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হবে আর একাত্ম হতে হবে তাঁর চিন্তা-চেতনার গতি-প্রকৃতির সঙ্গে। সর্বোপরি ব্যক্তিক ও সামষ্টিক জীবনে বিভিন্ন শ্রেণির, পেশার, অঞ্চলের ও বৈশিষ্ট্যের মানুষের সঙ্গে তাঁর আচরণবিধি কেমন ছিল, তা জানতে হবে।

টিকাঃ
২২. সুরা আল-আহজাব, ৩৩ ২১।
২৩. সুরা আন-নূর, ২৪: ৬৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00