📄 ৬৯. দোষ গোপন রাখা
ঈমানের শাখা-৬৯. দোষ গোপন রাখা আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ.
অর্থ: যারা চায় ঈমানদারদের মধ্যে নির্লজ্জতা বিস্তার লাভ করুক তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা আন নূর-আয়াত: ১৯)
ইবনে উমর থেকে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহর রাসূল বলেছেন- রাদিয়াল্লাহু আনহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يُسْلِمُهُ وَمَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللهُ فِي حَاجَتِهِ وَمَنْ فَتَجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَتَجَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرُبَاتِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
অর্থ: এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। সে না তার উপর যুলুম করতে পারে আর না তাকে শত্রুর হাতে তুলে দিতে পারে। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট হয় আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করে দেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের একটি কষ্ট দূর করে দেয় এর বিনিময়ে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্টসমূহ থেকে একটি কষ্ট দূর করে দিবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন করে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন। (সহীহ বুখারী-২৪৪২; মুসলিম)
📄 ৭০. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করা
ঈমানের শাখা-৭০. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করা
আল্লাহ তাআলা বলেন- وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخُشِعِينَ. অর্থ: তোমরা নামায ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর। তবে কাজটি বেশ কঠিন কিন্তু যারা আল্লাহর জন্য নিবেদিতপ্রাণ তাদের জন্য অবশ্য কঠিন নয়। (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-৪৫)
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- وَبَشِّرِ الصُّبِرِينَ . الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَجِعُونَ أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَاتٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَ رَحْمَةٌ، وَ أُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ. অর্থ: যারা ধৈর্য ধারণ করে সুসংবাদ তাদের জন্য। যখন তাদের উপর কোনো মুসিবত পতিত হয় তখন তারা বলে- আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর দিকেই আমাদের প্রত্যাবর্তন। তাদের প্রতি তাদের রবের পক্ষ থেকে বিপুল অনুগ্রহ এবং রহমত বর্ষিত হবে। প্রকৃতপক্ষে এরাই সঠিক পথে রয়েছে। (সূরা আল বাকারা-আয়াত: ১৫৫-১৫৭)
সূরা আয যুমারে বলা হয়েছে- إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ অর্থ: যারা ধৈর্যশীল তাদের জন্য রয়েছে এমন বিনিময় যার কোনো হিসেবই নেই। (সূরা আয যুমার-আয়াত: ১০)
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আবু সাঈদ আল খুদরী থেকে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে- রাদিয়াল্লাহু আনহু
أَنَّ نَاسًا مِنَ الْأَنْصَارِ سَأَلُوا رَسُولَ اللهِ ﷺ فَلَمْ يَسْأَلْهُ أَحَدٌ مِنْهُمْ إِلَّا أَعْطَاهُ حَتَّى نَفِدَ مَا عِنْدَهُ فَقَالَ لَهُمْ حِينَ نَفِدَ كُلُّ شَيْءٍ أَنْفَقَ بِيَدَيْهِ مَا
يَكُنْ عِنْدِى مِنْ خَيْرٍ لَا اَدَّخِرْهُ عَنْكُمْ وَإِنَّهُ مَنْ يَسْتَعْفَ يُعِفَهُ اللَّهُ وَمَنْ يَتَصَبَّرُ يُصَبِّرْهُ اللهُ وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللهُ وَلَنْ تُعْطَوْا عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ.
অর্থ: আনসারদের কতিপয় লোক রাসূল -এর কাছে সাহায্য চাইলো, যেই তার কাছে চাইলো তিনি তাদেরকে দিলেন। এমনিভাবে দিতে দিতে যা ছিল তার কাছে তা শেষ হয়ে গেল তার কাছে যাহা ছিল দিতে দিতে যখন সমুদয় শেষ হয়ে গেল। তখন তিনি তাদেরকে বললেন-যা আসে তা আমি তোমাদেরকে না দিয়ে জমা করে রাখি না। যে এমন গ্রহণ করা থেকে নিজেকে পবিত্র রাখতে চায় আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখেন। যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করতে চায় আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন। যে ব্যক্তি কারও মুখাপেক্ষী হতে চায় না, আল্লাহ তাকে স্বাবলম্বী করে দেন। ধৈর্যের চেয়ে উত্তম আর প্রশস্ত কোনো কিছু কাউকে দেয়া হয়নি। (সহীহ আল বুখারী হাদীস-৬৪৭০; সহীহ মুসলিম)
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেছেন-
آتَيْتُ النَّبِيَّ اللهِ وَهُوَ يُوعَكُ وَعْكًا شَدِيدًا فَقُلْتُ إِنَّكَ لَتُوْعَكُ وَعْكًا شَدِيدًا وَذَلِكَ أَنَّ لَكَ أَجْرَيْنِ قَالَ أَجَلْ وَمَا مِنْ مُسْلِمٍ يُصِيبُهُ أَذًى إِلَّا حَاتَتْ عَنْهُ خَطَايَاهُ كَمَا تَحَاتُ وَرَقُ الشَّجَرِ .
অর্থ: একবার আমি রাসূলুল্লাহ -এর কাছে গেলাম তাঁর কঠিন অসুস্থ অবস্থায়। (অত:পর আমি তাকে স্পর্শ করলাম, দেখলাম, তিনি ভীষণ অসুস্থ) বললাম, আমার মনে হয় আপনার অসুস্থতা অনেক বেশি আর এজন্য আপনি অধিক প্রতিদান পাবেন। তিনি স্বীকার করলেন এবং বললেন, আশা করি আমি এজন্য দ্বিগুণ পুরস্কার পাবো। তারপর বললেন, কোনো মুসলিমের উপর বিপদ মুসিবত কিংবা অসুস্থতা তার গুনাহ মাফের কারণ ছাড়া আসে না। গাছের শুকনো পাতা যেমন ঝরে যায় তেমনিভাবে মুমিনের কষ্টের কারণে তার গুনাহগুলোও ঝরে যায়। (সহীহ বুখারী হাদীস-৫৬৬১)
📄 ৭১. দুনিয়ার মোহমুক্তি (যুহুদ) ও পরিমিত আশা
ঈমানের শাখা-৭১. দুনিয়ার মোহমুক্তি (যুহুদ) ও পরিমিত আশা দুনিয়ার নশ্বরতা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
ফَهَلْ يَنْظُرُونَ إِلَّا السَّاعَةَ أَنْ تَأْتِيَهُمْ بَغْتَةً فَقَدْ جَاءَ أَشْرَاطُهَا. অর্থ: এরা কি শুধু কিয়ামতের অপেক্ষায় রয়েছে যে, সহসা তা তাদের উপর এসে পড়বে? তার নিদর্শন তো এসেই পড়েছে। (সূরা মুহাম্মদ-১৮)
আনাস ইবনে মালিক এবং সাহল ইবনে সা'দ থেকে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন-
بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةَ كَهَاتَيْنِ وَأَشَارَ بِأَصْبُعَيْهِ السَّبَابَةِ الْوُسْطَى .
অর্থ: আমি এবং কিয়ামত এরূপ দূরত্বে, একথা বলে তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল দুটো একত্রিত করে দেখালেন। (সহীহ আল বুখারী; মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ আরও বলেছেন-
نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِّنَ النَّاسِ الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ. অর্থ: আল্লাহ প্রদত্ত দুটো নিয়ামাত অধিকাংশ মানুষকেই বিভ্রান্ত করে ছাড়ে। একটি সুস্বাস্থ বা সুস্থতা অপরটি অবকাশ। (সহীহ বুখারী; জামি আত তিরমিযী; নাসাঈ, ইবনে মাজাহ)
আবু সাঈদ থেকে বর্ণিত। নবী করীম বলেছেন-
إِنَّ الدُّنْيَا حُلُوَةٌ خَضِرَةٌ وَإِنَّ اللهَ مُسْتَخْلِفُكُمْ فِيهَا فَيَنْظُرُ كَيْفَ تَعْمَلُونَ فَاتَّقُوا الدُّنْيَا وَاتَّقُوا النِّسَاءَ فَإِنَّ أَوَّلَ فِتْنَةِ بَنِي إِسْرَائِيلَ كَانَتْ فِي النِّسَاءِ .
অর্থ: 'নিঃসন্দেহে দুনিয়া খুবই আকর্ষণীয় ও সবুজ শ্যামল। আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিনিধি বানিয়ে এখানে পাঠিয়েছেন। তিনি দেখতে চান তোমরা কী করো। কাজেই তোমরা দুনিয়া এবং নারীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। বনী ইসরাঈলের বিপর্যয় শুরুই হয়েছিল নারী দিয়ে। (মুসলিম-৭১২৪)
📄 ৭২. আত্মসম্মানবোধ থাকা
ঈমানের শাখা-৭২. আত্মসম্মানবোধ
আল্লাহ তাআলা বলেন-
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَ قُوْدُهَا النَّاسُ وَ الْحِجَارَةُ .
অর্থ: হে ঈমানদারগণ! নিজে বাঁচো এবং অধীনস্থদের বাঁচাও সেই আগুন থেকে যার জ্বালানি হবে মানুষ ও পাথর। (সূরা আত তাহরীম-আয়াত: ৬)
সূরা আন নূরে বলা হয়েছে-
قُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ .
অর্থ: হে নবী! আপনি মু'মিন মহিলাদের বলে দিন তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করে। (সূরা আন নূর-আয়াত: ৩১)
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন-
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَغَارُ وَإِنَّ الْمُؤْمِنَ يَغَارُ وَغَيْرَةَ اللَّهِ أَنْ يَأْتِي الْمُؤْمِنُ مَا حَرَّمَ عَزَّ وَ جَلَّ عَلَيْهِ.
অর্থ: আল্লাহরও আত্মসম্মানবোধ আছে এবং মু'মিনেরও আত্মসম্মানবোধ রয়েছে। আল্লাহর আত্মসম্মানে তখনই বাধে যখন একজন মু'মিন এমন কাজে লিপ্ত হয় যা তিনি হারাম করেছেন। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত আরেক হাদীসে বলা হয়েছে-
كَانَ عِنْدَهَا وَرَسُولُ اللهِ لا فِي الْبَيْتِ فَقَالَ لِأَخِي أُمِّ سَلَمَةَ يَا عَبْدَ اللَّهِ بْنَ أَبِي أُمَيَّةَ إِنْ فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ الطَّائِفَ غَدًا فَإِنِّي أَدُلُّكَ عَلَى بِنْتِ غَيْلَانَ
فَإِنَّهَا تُقْبِلُ بِأَرْبَعٍ وَتُدْبِرُ بِثَمَانٍ . قَالَ فَسَمِعَهُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ « لَا يَدْخُلُ هَؤُلَاءِ عَلَيْكُمْ .
অর্থ: রাসূলুল্লাহ বাড়িতে থাকা অবস্থায় একদিন এক নুপংসুক (হিজড়া) বাড়িতে এসেছিল (নপুংসক বিধায় সে অন্দর মহলেও প্রবেশ করতো)। সে উম্মু সালামা -এর ভাই আব্দুল্লাহকে বললো, আগামীকাল যদি তায়েফ বিজয় হয় তাহলে তুমি গায়লানের কন্যাকে আয়ত্তে নেবে। তার এমন অবস্থা যে পেটে চারটি ভাঁজ পড়ে। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ পরিবারকে বলে দিলেন, তোমরা আর কখনও তাকে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করতে দেবে না। (সহীহ আল বুখারী; সহীহ মুসলিম-৫৮১৯)
আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ বলেছেন-
الْغِيْرَةُ مِنَ الْإِيْمَانِ وَإِنَّ الْمِذَاءَ مِنَ النِّفَاقِ.
অর্থ: আত্মসম্মানবোধ সৃষ্টি হয় ঈমান থেকে আর লৌকিকতা সৃষ্টি হয় মুনাফিকী থেকে। (বায়হাকী)