📄 ৬৭. প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ
ঈমানের শাখা-৬৭. প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
وَ بِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَى وَ الْمَسْكِينِ وَ الْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ. অর্থ: পিতা মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করো, নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম ও মিসকিনদের প্রতি এবং প্রতিবেশী আত্মীয়ের প্রতি, আত্মীয়ের প্রতিবেশীর প্রতি, চলার সাথী ও পথিক-মুসাফিরদের প্রতি। (সূরা আন নিসা-আয়াত: ৩৬)
ইবনে আব্বাস (রাঃ), মুজাহিদ (র), কাতাদা (র), কালবী (র), মুকাতিল ইবনে হিব্বান (র) এবং মুকাতিল ইবনে সুলাইমান (র) প্রমুখ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন-
وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبي বলতে তোমার ও অন্যান্য প্রতিবেশীর মধ্যে যে বা যারা অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বে রয়েছে তাদেরকে বুঝানো হয়েছে। আর-
وَالْجَارِ الْجُنُبِ বলতে অপেক্ষাকৃত দূরের প্রতিবেশী বা প্রতিবেশীর প্রতিবেশীকে বুঝানো হয়েছে।
وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ বলতে সফরসঙ্গী এবং বন্ধুকে বুঝানো হয়েছে।
আলী (রাঃ), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং ইবরাহীম নাখঈ (র) বলেছেন-
وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ বলতে স্ত্রীকে বুঝানো হয়েছে। সাঈদ ইবনে যুবাইর (র)-এর অভিমতও অনুরূপ।
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন- مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُؤْصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِثُهُ. অর্থ: জিবরাঈল এসে আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এমন উপদেশ দিতে থাকলেন, ভাবলাম হয়তো তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ বানিয়ে দেবেন। [সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম]
📄 ৬৮. অতিথি আপ্যায়ন বা মেহমানদারী করা
ঈমানের শাখা-৬৮. অতিথি আপ্যায়ন বা মেহমানদারী আলাইহি আবু শুরাইহ আল আদাবী থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল আনহু যখন এ হাদীসটি বলেছেন তখন আমার দু'কান তা শুনেছে এবং দু'চোখ তা দেখেছে। তিনি বলেছেন-
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ جَائِزَتَهُ قَالَ وَمَا جَائِزَتُهُ يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ يَوْمٌ وَلَيْلَةٌ وَالضَّيَافَةُ ثَلَاثَةُ أَيَّامٍ فَمَا كَانَ وَرَاءَ ذلِكَ فَهُوَ صَدَقَةٌ عَلَيْهِ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمتُ .
অর্থ: যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে তার উচিত সাধ্যমত অতিথি আপ্যায়ন করা। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, সাধ্যমত কথার তাৎপর্য কী? তিনি বললেন, একদিন একরাত। মেহমানদারী সর্বোচ্চ তিন দিন। এর বেশি যদি কেউ করে সেটি তার বদান্যতা। তিনি আরও বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে তার উচিত ভালো কথা বলা অথবা চুপ থাকা। (সহীহ আল বুখারী হাদীস-৬০১৯; সহীহ মুসলিম)
📄 ৬৯. দোষ গোপন রাখা
ঈমানের শাখা-৬৯. দোষ গোপন রাখা আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ.
অর্থ: যারা চায় ঈমানদারদের মধ্যে নির্লজ্জতা বিস্তার লাভ করুক তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা আন নূর-আয়াত: ১৯)
ইবনে উমর থেকে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহর রাসূল বলেছেন- রাদিয়াল্লাহু আনহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يُسْلِمُهُ وَمَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللهُ فِي حَاجَتِهِ وَمَنْ فَتَجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَتَجَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرُبَاتِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ.
অর্থ: এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। সে না তার উপর যুলুম করতে পারে আর না তাকে শত্রুর হাতে তুলে দিতে পারে। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট হয় আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করে দেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের একটি কষ্ট দূর করে দেয় এর বিনিময়ে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কষ্টসমূহ থেকে একটি কষ্ট দূর করে দিবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ গোপন করে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন। (সহীহ বুখারী-২৪৪২; মুসলিম)
📄 ৭০. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করা
ঈমানের শাখা-৭০. বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করা
আল্লাহ তাআলা বলেন- وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخُشِعِينَ. অর্থ: তোমরা নামায ও ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর। তবে কাজটি বেশ কঠিন কিন্তু যারা আল্লাহর জন্য নিবেদিতপ্রাণ তাদের জন্য অবশ্য কঠিন নয়। (সূরা আল-বাকারা: আয়াত-৪৫)
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- وَبَشِّرِ الصُّبِرِينَ . الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَجِعُونَ أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَاتٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَ رَحْمَةٌ، وَ أُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ. অর্থ: যারা ধৈর্য ধারণ করে সুসংবাদ তাদের জন্য। যখন তাদের উপর কোনো মুসিবত পতিত হয় তখন তারা বলে- আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর দিকেই আমাদের প্রত্যাবর্তন। তাদের প্রতি তাদের রবের পক্ষ থেকে বিপুল অনুগ্রহ এবং রহমত বর্ষিত হবে। প্রকৃতপক্ষে এরাই সঠিক পথে রয়েছে। (সূরা আল বাকারা-আয়াত: ১৫৫-১৫৭)
সূরা আয যুমারে বলা হয়েছে- إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ অর্থ: যারা ধৈর্যশীল তাদের জন্য রয়েছে এমন বিনিময় যার কোনো হিসেবই নেই। (সূরা আয যুমার-আয়াত: ১০)
সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আবু সাঈদ আল খুদরী থেকে বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে- রাদিয়াল্লাহু আনহু
أَنَّ نَاسًا مِنَ الْأَنْصَارِ سَأَلُوا رَسُولَ اللهِ ﷺ فَلَمْ يَسْأَلْهُ أَحَدٌ مِنْهُمْ إِلَّا أَعْطَاهُ حَتَّى نَفِدَ مَا عِنْدَهُ فَقَالَ لَهُمْ حِينَ نَفِدَ كُلُّ شَيْءٍ أَنْفَقَ بِيَدَيْهِ مَا
يَكُنْ عِنْدِى مِنْ خَيْرٍ لَا اَدَّخِرْهُ عَنْكُمْ وَإِنَّهُ مَنْ يَسْتَعْفَ يُعِفَهُ اللَّهُ وَمَنْ يَتَصَبَّرُ يُصَبِّرْهُ اللهُ وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللهُ وَلَنْ تُعْطَوْا عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ.
অর্থ: আনসারদের কতিপয় লোক রাসূল -এর কাছে সাহায্য চাইলো, যেই তার কাছে চাইলো তিনি তাদেরকে দিলেন। এমনিভাবে দিতে দিতে যা ছিল তার কাছে তা শেষ হয়ে গেল তার কাছে যাহা ছিল দিতে দিতে যখন সমুদয় শেষ হয়ে গেল। তখন তিনি তাদেরকে বললেন-যা আসে তা আমি তোমাদেরকে না দিয়ে জমা করে রাখি না। যে এমন গ্রহণ করা থেকে নিজেকে পবিত্র রাখতে চায় আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখেন। যে ব্যক্তি ধৈর্যধারণ করতে চায় আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন। যে ব্যক্তি কারও মুখাপেক্ষী হতে চায় না, আল্লাহ তাকে স্বাবলম্বী করে দেন। ধৈর্যের চেয়ে উত্তম আর প্রশস্ত কোনো কিছু কাউকে দেয়া হয়নি। (সহীহ আল বুখারী হাদীস-৬৪৭০; সহীহ মুসলিম)
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেছেন-
آتَيْتُ النَّبِيَّ اللهِ وَهُوَ يُوعَكُ وَعْكًا شَدِيدًا فَقُلْتُ إِنَّكَ لَتُوْعَكُ وَعْكًا شَدِيدًا وَذَلِكَ أَنَّ لَكَ أَجْرَيْنِ قَالَ أَجَلْ وَمَا مِنْ مُسْلِمٍ يُصِيبُهُ أَذًى إِلَّا حَاتَتْ عَنْهُ خَطَايَاهُ كَمَا تَحَاتُ وَرَقُ الشَّجَرِ .
অর্থ: একবার আমি রাসূলুল্লাহ -এর কাছে গেলাম তাঁর কঠিন অসুস্থ অবস্থায়। (অত:পর আমি তাকে স্পর্শ করলাম, দেখলাম, তিনি ভীষণ অসুস্থ) বললাম, আমার মনে হয় আপনার অসুস্থতা অনেক বেশি আর এজন্য আপনি অধিক প্রতিদান পাবেন। তিনি স্বীকার করলেন এবং বললেন, আশা করি আমি এজন্য দ্বিগুণ পুরস্কার পাবো। তারপর বললেন, কোনো মুসলিমের উপর বিপদ মুসিবত কিংবা অসুস্থতা তার গুনাহ মাফের কারণ ছাড়া আসে না। গাছের শুকনো পাতা যেমন ঝরে যায় তেমনিভাবে মুমিনের কষ্টের কারণে তার গুনাহগুলোও ঝরে যায়। (সহীহ বুখারী হাদীস-৫৬৬১)