📄 ৫০. জামা'আতবদ্ধ জীবন যাপন
ঈমানের শাখা-৫০. জামা'আতবদ্ধ জীবন যাপন
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا .
অর্থ: তোমরা দৃঢ়ভাবে আল্লাহর রশিকে আকঁড়ে ধর, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। (সূরা আলে ইমরান-আয়াত: ১০৩)
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- مَنْ خَرَجَ مِنَ الطَّاعَةِ وَفَارَقَ الْجَمَاعَةَ ثُمَّ مَاتَ مَيْتَةً جَاهِلِيَّةً.
অর্থ: যে ব্যক্তি জামা'আত থেকে বিচ্ছিন্ন হলো এবং আনুগত্য পরিহার করলো অতপর মারা গেল, তার মৃত্যু হলো জাহেলিয়াতের মৃত্যু। (সহীহ মুসলিম- ৪৮৯২)
আরফাজা ইবনে শুরাইহ আল জুহানী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- سَتَكُونُ بَعْدِى هِنَاةٌ وَهِنَاةٌ فَمَنْ رَأَيْتُمُوهُ يُفَرِّقُ أَمْرَ أُمَّةٍ مُحَمَّدٍ وَهِيَ جَمِيعٌ فَاقْتُلُوهُ كَائِنَّا مَنْ كَانَ مِنَ النَّاسِ.
অর্থ: অচিরেই আমার পরে একের পর এক বিপদ আসবে অত:পর যাকে তোমরা উম্মাতে মুহাম্মাদীর ঐক্য-সংহতি বিনষ্ট করতে দেখবে এবং জামা'আতের ছিন্নভিন্ন করতে চাইবে তাকে তোমরা হত্যা করবে সে যে কেউ হোক না কেন। (সহীহ মুসলিম)
📄 ৫১. আদল-ইনসাফের সাথে বিচার-ফায়সালা করা
ঈমানের শাখা-৫১. আদল-ইনসাফের সাথে বিচার-ফায়সালা করা আদল-ইনসাফের সাথে বিচার-ফায়সালা করাও ঈমানের অন্যতম শাখা।
আল্লাহ তা'আলা বলেন-
وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ .
অর্থ: তোমরা যখন লোকদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করবে তখন আদল- ইনসাফের সাথে ফায়সালা করবে। (সূরা নিসা-আয়াত-৫৮)
আরেক জায়গায় বলা হয়েছে-
وَلَا تَكُنْ لِلْخَائِنِينَ خَصِيمًا. অর্থ: হে নবী! আপনি খিয়ানতকারী ও দুর্নীতিপরায়ণ লোকদের সমর্থনে বিতর্ককারী হবেন না। (সূরা আন নিসা-আয়াত: ১০৫)
সূরা আল হুজুরাতে বলা হয়েছে-
وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ. অর্থ: তোমরা ইনসাফ কর। আল্লাহ ইনসাফকারী লোকদেরকেই পছন্দ করেন। (সূরা আল হুজুরাত-আয়াত: ৯)
আনহু আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ বলেছেন- আলাইহি লَا حَسَدَ إِلَّا فِي اثْنَتَيْنِ رَجُلٍ أَتَاهُ اللهُ مَالاً فَسَلَّطَهُ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الْحَقِّ وَاخَرَا تَاهُ اللَّهُ حِكْمَةً فَهُوَ يَقْضِي بِهَا وَيُعَلِّمُهَا .
অর্থ: দুই ব্যক্তি ছাড়া আর কারও ব্যাপারে ঈর্ষা করা যায় না। ১. যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেছেন এবং তা যথার্থ ক্ষেত্রে ব্যয় করার তাওফিক দিয়েছেন। ২. যাকে আল্লাহ হিকমাত দান করেছেন, সেই ব্যক্তি তদানুযায়ী কাজ করে এবং অন্যকে তা শিক্ষা দেয়। (সহীহ আল বুখারী - ১৪০৯)
📄 ৫২. সৎকাজের আদেশ এবং অন্যায়ের নিষেধ করা
ঈমানের শাখা-৫২. সৎ কাজের আদেশ এবং অন্যায়ের নিষেধ আল্লাহ তাআলা বলেছেন- وَلْتَكُنْ مِنْكُمْ أُمَّةً يَدْعُونَ إِلَى الْخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُوْنَ.
অর্থ: তোমাদের মধ্যে এমন একদল লোক থাকতেই হবে যারা সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অন্যায় কাজে নিষেধ করবে। তারাই সত্যিকারের সফলকাম। (সূরা আলে ইমরান-আয়াত: ১০৪)
আরও বলা হয়েছে- كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ.
অর্থ: তোমরাই উত্তম উম্মাত, মানুষের কল্যাণে চয়ন করা হয়েছে। এই মর্মে যে, তোমরা সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অন্যায় কাজের নিষেধ করবে এবং সেই সাথে আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখবে। (সূরা: আলে ইমরান-আয়াত: ১১০)
সূরা আত তাওবায় বলা হয়েছে- إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ.
অর্থ: অবশ্যই আল্লাহ মু'মিনদের জান-মাল জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। (সূরা আত তাওবা-আয়াত: ১১১)
সমাজ ও রাষ্ট্রকে পরিচ্ছন্ন ও পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত রাখতে এ কাজ অপরিহার্য। বনী ইসরাঈল সম্প্রদায় এ দায়িত্ব সঠিকভাবে ও যথাযথভাবে পালন না করার কারণে আল্লাহ তাদের নিন্দা করেছেন।
বলা হয়েছে-
لُعِنَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَاءِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُدَ وَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ * ذلِكَ بِمَا عَصَوْا وَ كَانُوا يَعْتَدُونَ كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ * لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ .
অর্থ: বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদের প্রতি দাউদ ও মারইয়াম এর পুত্র ঈসার মুখ দিয়ে অভিশাপ করা হয়েছে। কারণ তারা বিদ্রোহী হয়ে গিয়েছিল এবং খুব বাড়াবাড়ি করত। তারা একে অপরকে অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব পালন করত না। তারা যা করত তা ছিল অত্যন্ত নিকৃষ্ট কর্মনীতি। (সূরা আল মায়েদা-আয়াত: ৭৮-৭৯)
আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন-
মَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرُهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيْمَانِ.
অর্থ: তোমাদের কেউ যখন কোনো অন্যায় কাজ দেখে সে যেন হাত দিয়ে (শক্তি প্রয়োগ করে) বন্ধ করে দেয়। যদি না পারে তাহলে যেন বাক্য ব্যয়ে করে। যদি তাও না পারে তবে মনে মনে ঘৃণা করবে। এটি হচ্ছে ঈমানের সবচেয়ে নিচের স্তর। (সহীহ মুসলিম- ১৮৬)
অন্য হাদীসে বলা হয়েছে, আল্লাহর রাসূল বলেছেন-
مَا مِنْ نَبِي بَعَثَهُ اللهُ فِي أُمَّةٍ قَبْلِي إِلا كَانَ لَهُ مِنْ أُمَّتِهِ حَوَارِيُّونَ وَأَصْحَابٌ يَأْخُذُونَ بِسُنَّتِهِ وَيَقْتَدُونَ بِأَمْرِهِ ثُمَّ إِنَّهَا تَخْلُفُ مِنْ بَعْدِهِمْ خُلُوفٌ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ وَيَفْعَلُونَ مَا لَا يُؤْمَرُوْنَ فَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِيَدِهِ فَهُوَ
مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِلِسَانِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَمَنْ جَاهَدَهُمْ بِقَلْبِهِ فَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلَيْسَ وَرَاءَ ذَلِكَ مِنَ الْإِيْمَانِ حَبَّةُ خَرْدَلٍ.
অর্থ: আমার পূর্বে কোনো জাতির কাছে যে নবীকেই প্রেরণ করা হয়েছিল, তাঁর সহযোগিতার জন্য তাঁর উম্মাতের মধ্য থেকে একদল সাহায্যকারী সাথী থাকতো। তারা তাঁর সুন্নাত (নিয়মনীতি)-কে আঁকড়ে ধরতো এবং তাঁর নির্দেশ মেনে চলতো। এদের পর এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটলো, যারা বলতো ঠিকই কিন্তু তারা তা আমল করতো না। এমন কাজ করতো যার নির্দেশ তাদেরকে দেয়া হয়নি। তাই এ ধরনের লোকদের বিরুদ্ধে যে হাত দিয়ে (অর্থাৎ শক্তি প্রয়োগ করে) জিহাদ (সংগ্রাম) করবে সে মু'মিন। যে মুখ দিয়ে এদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে সে মু'মিন। যে অন্তর দিয়ে এদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে সেও মু'মিন। এরপর একটি সরিষা দানা পরিমাণ ঈমানের স্তরও আর নেই। (সহীহ মুসলিম হাদীস-১৮৮)
আনহু নবী করীম -এর স্ত্রী যয়নব বলেছেন, একদিন রাসূল ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠলেন। মলিন মুখ। তিনবার বললেন, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু' তারপর বললেন, আরবদের জন্য ধ্বংস, দ্রুত মন্দ তাদের গ্রাস করতে আসছে। ইয়াজুজ-মাজুজের দেয়াল আজ এতটুকু ছিদ্র করে ফেলেছে। একথা বলে তিনি বৃদ্ধাঙ্গলী ও মধ্যমা গোল করে ধরে দেখালেন। একথা শুনে যয়নাব বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এত সৎ লোক থাকার পরও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? তিনি বললেন- হ্যাঁ, যখন দুর্নীতির বিস্তৃতি ঘটবে। (সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
📄 ৫৩. সৎকাজে পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতা করা
ঈমানের শাখা-৫৩. সৎ কাজে পরস্পর সহযোগিতা করা আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ.
অর্থ: তাকওয়া ও নেক কাজে তোমরা পরস্পর একে অপরের সহযোগিতা করো। তবে পাপ ও সীমালংঘনমূলক কাজে পরস্পর সহযোগিতা করো না। (সূরা আল মায়িদা-আয়াত: ২) আনাস ইবনে মালিক থেকে সহীহ আল বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন-
انْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُومًا فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنْصُرُهُ إِذَا كَانَ مَظْلُومًا فَكَيْفَ اَنْصُرُهُ ظَالِمًا فَقَالَ تَمْنَعُهُ مِنَ الظُّلْمِ فَذُلِكَ نَصْرُكَ إِيَّاهُ.
অর্থ: তোমার ভাইকে সাহায্য কর, সে যালিম (অত্যাচারী) হোক কিংবা মাযলুম (অত্যাচারিত)। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! মাযলুমকে সাহায্য করার ব্যাপারটি তো বুঝলাম কিন্তু যালিমকে সাহায্য করবো কিভাবে? রাসূল বললেন, যুলুম (অত্যাচার) থেকে বিরত রাখাই হচ্ছে যালিমকে সাহায্য করা। (সহীহ বুখারী-৬৯৫২)